সরকারের নানা সহায়তা ও নীতিগত সমর্থনের পরও অযোগ্য নেতৃত্ব ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার।
ক্ষমতার রদবদল এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের টেকসই উত্থান দেখবন—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একাংশের। ধারণা করা হয়েছিল, নতুন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আবহে বাজারের দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব কাটবে এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজির ক্ষতি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে। তবে বাস্তবে সে আশার গুড়ে বালি ঢেলে সূচকের ধারাবাহিক দরপতন এবং চরম তারল্যসংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশের দুই প্রধান পুঁজিবাজার—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।
সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবে বাজারে ক্রেতার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। মূল্যসূচক ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ার পাশাপাশি দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ—সরকার বা রাজনৈতিক পরিক্রমায় পরিবর্তন এলেও বাজার মধ্যস্থতাকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বা প্রত্যাশার ওপর ভর করে কোনো দেশের শেয়ারবাজার চলতে পারে না। বর্তমান বাজার মন্দার নেপথ্যে একাধিক বড় কারণ কাজ করছে:
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত: দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তালিকাভুক্ত বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে চলতি অর্থবছরে করপোরেট মুনাফা কম হওয়ার আশঙ্কায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি (BSEC) ও স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন তদন্ত এবং তদারকিমূলক পদক্ষেপ অনেক সাধারণ ও বড় বিনিয়োগকারীকে সতর্ক অবস্থানে বা 'ওয়েট অ্যান্ড সি' মোডে ঠেলে দিয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার: ব্যাংকে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ কমেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাজারের তারল্য প্রবাহে।
মৌলভিত্তির চেয়ে গুজবে নির্ভরতা: অনেক বিনিয়োগকারী রাজনৈতিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন, যা বাস্তব আর্থিক পারফরম্যান্সের সাথে না মেলায় বড় ধরনের বিক্রয়চাপ (Selling Pressure) তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, বড় কোম্পানিগুলোর আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করা পর্যন্ত শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাশার জোরে টেকসই বুুলিশ (উর্ধ্বমুখী) ট্রেন্ড ফেরা কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত লোকসানে থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন বাজারের দৃশ্যমান সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
মতামত