আজকের আধুনিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি তেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পেট্রোলিয়ামকে বলা হয় "আধুনিক শিল্প সভ্যতার রক্ত।" এটি শুধু গাড়ি চালানো বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়; প্লাস্টিক, সার, ওষুধ, বিমান চলাচল থেকে শুরু করে উন্নত দেশের বিশাল অর্থনীতিকে সচল রাখতে এটি অপরিহার্য।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় যুদ্ধ শুরু হলে এবং হোরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে কোনো দেশই রক্ষা পাবে না। তবে ক্ষতির ধরণ ও মাত্রা দেশভেদে ভিন্ন হবে:
১. উন্নত দেশগুলোর অবস্থা: কেন তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা পঙ্গু হওয়া: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর জীবনযাত্রা ১০০% বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোল ও গ্যাসের জোগান বন্ধ হলে বা অতিমাত্রায় দাম বাড়লে তাদের বিশাল পরিবহণ ব্যবস্থা, বিমান সংস্থা, হিটিং সিস্টেম এবং রোবোটিক শিল্প কারখানা স্তব্ধ হয়ে যাবে।
বিশাল অর্থনৈতিক পতন: উন্নত দেশগুলোর মূল শক্তি তাদের বিশাল শেয়ারবাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্য। জ্বালানির ঘাটতিতে উৎপাদন বন্ধ হলে তাদের পুঁজিবাজার ধসে পড়বে, যা তাদের ব্যাংকিং খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
নাগরিকদের জীবনযাত্রায় মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়: উন্নত দেশের নাগরিকরা প্রযুক্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সুবিধার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থার সামান্য ব্যাঘাতও সেখানে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
২. কোনো দেশ কি ভালো থাকবে?
অল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান দেশ: রাশিয়া, ক্যানাডা বা আফ্রিকার কিছু দেশ—যাদের নিজস্ব তেল, গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর রয়েছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তারা কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকবে।
তবে এককভাবে কেউ নিরাপদ নয়: আজকের বিশ্ব "গ্লোবালাইজড" বা সার্বিকভাবে সংযুক্ত। এক অঞ্চল ধসে পড়লে বৈশ্বিক বাণিজ্য বন্ধ হয়ে সব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই স্থবির হয়ে যাবে।
৩. আমাদের বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে?
বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সংকট বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হবে:
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট: বাংলাদেশের ব্যবহৃত জ্বালানির সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। হোরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের জাহাজের চলাচল বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশে তীব্র তেল ও এলএনজি (LNG) গ্যাস সংকট তৈরি হবে, যার ফলে মারাত্মক লোডশেডিং দেখা দেবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ পাম্প চালানো ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে খাদ্য উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
পোশাক খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা (রেমিট্যান্স):
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়ালে সেখানে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি সংকটে পড়বেন, যা রেমিট্যান্স আসার হার কমিয়ে দিতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট এবং বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের রপ্তানি মারাত্মক ধাক্কা খাবে।
চরম মূল্যস্ফীতি: জ্বালানি ও জাহাজের ভাড়া (Freight Cost) বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, উন্নত দেশগুলো তাদের বিশাল অর্থনৈতিক উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়ার কারণে মানসিক ও কাঠামোগতভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাপূরণ এবং জীবনযাত্রার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
মতামত