শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতি ও আস্থার সংকটে পঙ্গু ডিএসই: ৭ দশক পেরিয়েও পুঁজিবাজারের ব্যর্থতায় ক্ষোভ


আনোয়ার আলমগীর
আনোয়ার আলমগীর
| ফটো কার্ড

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতি ও আস্থার সংকটে পঙ্গু ডিএসই: ৭ দশক পেরিয়েও পুঁজিবাজারের ব্যর্থতায় ক্ষোভ
প্রতীকি ছবি

পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো চরম সংকটাপন্ন দেশগুলোর বাজার রেকর্ড গড়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। ৩৫১টিরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আটকে আছে মাত্র ৬ হাজার পয়েন্টের ঘরে।

​ আমাদের বাজার ৭২ বছর আগে যাত্রা শুরু করা একটি শেয়ারবাজার যেখানে পূর্ণাঙ্গ সাবালক হয়ে ওঠার কথা, সেখানে এখনো এটি চরম স্থবিরতায় হামাগুড়ি দিচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের এই ব্যর্থতা ও দৈন্যদশার মূল কারণ হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণের’ নামে দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

আঞ্চলিক বাজারের তুলনামূলক চিত্র

​সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের আড্ডায় এখন আঞ্চলিক সূচকের এই চরম বৈষম্যের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসছে:

​ভারত: বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (NSE) ৫,০০০-এর বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। বর্তমানে নিফটি ৫০ সূচক ২৪,০০০–২৫,০০০ পয়েন্টের ঘরে এবং সেনসেক্স ৮০,০০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে।

​পাকিস্তান: চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পার করার পরও পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের (PSX) কেএসই-১০০ (KSE-100) সূচকটি সম্প্রতি ৮০,০০০ থেকে ৮৫,০০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে নতুন ইতিহাস গড়েছে।

​শ্রীলঙ্কা: কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জে (CSE) তালিকাভুক্ত কোম্পানি মাত্র ২৯০টির মতো। অথচ সঠিক নীতিমালার কারণে সংকট কাটিয়ে তাদের অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স (ASPI) বর্তমানে ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

​বাংলাদেশ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) মূল বাজারে ৩৫১টিরও বেশি কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও প্রধান সূচক (DSEX) দীর্ঘদিন ধরে ৫,০০০ থেকে ৬০০০ পয়েন্টের ঘরে বন্দি হয়ে রয়েছে।

​আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রণের নামে নীতিগত ভুল

​বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।

বাজারকে স্বাভাবিক নিয়মে ওঠানামা করতে দেওয়ার বদলে দীর্ঘ দিন কৃত্রিম 'ফ্লোর প্রাইস' দিয়ে আটকে রাখা, ভালো কোম্পানির ক্ষেত্রে অহেতুক তদন্ত কমিশন বসানো এবং স্বাধীন লেনদেনে হস্তক্ষেপের ফলে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

বিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ ও উত্তরণের দাবি

​বাজার সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের মতে, বিএসইসি যদি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো বাজার পরিচালনায় অভিজ্ঞ কোনো আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞকে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করত, তবে সঠিক কৌশল ও নীতিমালার জোরে ডিএসই সূচক খুব সহজেই ৮ থেকে ১০ হাজার পয়েন্টে উন্নীত হতে পারত।

​একটি শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ নিরপেক্ষ আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করা, নিজে খেলোয়াড় হয়ে বাজার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। ভুল নীতির কারণে ৭২ বছরের পুরোনো একটি বাজারকে পঙ্গু করে রাখা কেবল ক্ষুদ্র

বিনিয়োগকারীদের মূলধন ধ্বংস করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নীতি সংশোধন না করলে এই বাজার কখনোই স্বাবলম্বী হতে পারবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতি ও আস্থার সংকটে পঙ্গু ডিএসই: ৭ দশক পেরিয়েও পুঁজিবাজারের ব্যর্থতায় ক্ষোভ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো চরম সংকটাপন্ন দেশগুলোর বাজার রেকর্ড গড়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। ৩৫১টিরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আটকে আছে মাত্র ৬ হাজার পয়েন্টের ঘরে।

​ আমাদের বাজার ৭২ বছর আগে যাত্রা শুরু করা একটি শেয়ারবাজার যেখানে পূর্ণাঙ্গ সাবালক হয়ে ওঠার কথা, সেখানে এখনো এটি চরম স্থবিরতায় হামাগুড়ি দিচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের এই ব্যর্থতা ও দৈন্যদশার মূল কারণ হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণের’ নামে দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

আঞ্চলিক বাজারের তুলনামূলক চিত্র

​সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের আড্ডায় এখন আঞ্চলিক সূচকের এই চরম বৈষম্যের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসছে:

​ভারত: বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (NSE) ৫,০০০-এর বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। বর্তমানে নিফটি ৫০ সূচক ২৪,০০০–২৫,০০০ পয়েন্টের ঘরে এবং সেনসেক্স ৮০,০০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে।

​পাকিস্তান: চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পার করার পরও পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের (PSX) কেএসই-১০০ (KSE-100) সূচকটি সম্প্রতি ৮০,০০০ থেকে ৮৫,০০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে নতুন ইতিহাস গড়েছে।

​শ্রীলঙ্কা: কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জে (CSE) তালিকাভুক্ত কোম্পানি মাত্র ২৯০টির মতো। অথচ সঠিক নীতিমালার কারণে সংকট কাটিয়ে তাদের অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স (ASPI) বর্তমানে ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

​বাংলাদেশ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) মূল বাজারে ৩৫১টিরও বেশি কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও প্রধান সূচক (DSEX) দীর্ঘদিন ধরে ৫,০০০ থেকে ৬০০০ পয়েন্টের ঘরে বন্দি হয়ে রয়েছে।

​আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রণের নামে নীতিগত ভুল

​বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।

বাজারকে স্বাভাবিক নিয়মে ওঠানামা করতে দেওয়ার বদলে দীর্ঘ দিন কৃত্রিম 'ফ্লোর প্রাইস' দিয়ে আটকে রাখা, ভালো কোম্পানির ক্ষেত্রে অহেতুক তদন্ত কমিশন বসানো এবং স্বাধীন লেনদেনে হস্তক্ষেপের ফলে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

বিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ ও উত্তরণের দাবি

​বাজার সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের মতে, বিএসইসি যদি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো বাজার পরিচালনায় অভিজ্ঞ কোনো আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞকে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করত, তবে সঠিক কৌশল ও নীতিমালার জোরে ডিএসই সূচক খুব সহজেই ৮ থেকে ১০ হাজার পয়েন্টে উন্নীত হতে পারত।

​একটি শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ নিরপেক্ষ আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করা, নিজে খেলোয়াড় হয়ে বাজার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। ভুল নীতির কারণে ৭২ বছরের পুরোনো একটি বাজারকে পঙ্গু করে রাখা কেবল ক্ষুদ্র

বিনিয়োগকারীদের মূলধন ধ্বংস করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নীতি সংশোধন না করলে এই বাজার কখনোই স্বাবলম্বী হতে পারবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream