আনোয়ার আলমগীর
পুঁজিবাজার ও জাতীয় অর্থনীতি কেবল কয়েকটি সূচক বা টেবিল-চেয়ারের পরিবর্তনের খেলা নয়; এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, সুশাসন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা এবং পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দাবস্থা নিয়ে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবায়াত-উল-ইসলামের মেয়াদে বাজারে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেলেও, বড় ধরনের নীতিগত ভুল, সিদ্ধান্তহীনতা ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থান্বেষী চক্রের প্রভাবে বাজার কখনো টেকসই ভিত পায়নি। এর মধ্যে অন্যতম বড় বড় আঘাত ছিল বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক (Beximco Green Sukuk) বন্ডের ৩,০০০ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি আমার বন্ডের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা।
তারল্য শূন্যতা ও জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের খেসারত
সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বন্ডগুলোর প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ফান্ড এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে একপ্রকার বাধ্যতামূলকভাবে সুকুক বন্ড কিনতে বাধ্য করা হয়। এককভাবে একটিমাত্র গ্রুপের হাতে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দেওয়ার ফলে পুরো পুঁজিবাজারে ভয়াবহ তারল্য সংকট (Liquidity Crisis) তৈরি হয়। যে প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডগুলোর সাধারণ শেয়ার কিনে বাজারকে সাপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল, তাদের হাত সম্পূর্ণ শক্ত হয়ে যায় এই লোকসানি বন্ডে টাকা আটকে যাওয়ার কারণে। ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের সুকুক বন্ডের দাম পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো আজ বিপুল লোকসানের মুখে।
যেখানে পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশগুলোর শেয়ারবাজার রেকর্ড ভেঙে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নির্দেশক তাদের চেয়ে ভালো হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পুঁজিবাজার কেন তলানিতে?
পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কা তাদের মূল সংকটগুলো স্বীকার করে আইএমএফ (IMF) ও বৈশ্বিক কাঠামোর সাথে সংগতি রেখে বাজারে দ্রুত নীতিগত স্বচ্ছতা এনেছে, সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে এবং বড় বড় কারসাজিকারীদের শক্ত বার্তা দিয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের ওপর আস্থা ফেরত পেয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক পটের পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নেতৃত্ব বদল হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রায় আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। শুধু আইওয়াশমূলক জরিমানা, শোকজ আর ইচ্ছা মতো নীতি পরিবর্তন করে বাজার চালানো হচ্ছে—যা কাজের চেয়ে ক্ষতি বেশি করছে।
১. তারল্য সংকট নিরসন ও নীতিগত স্বাধীনতা
বিএসইসি-কে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও কর্পোরেট প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
ব্যাংক ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর আটকে থাকা তারল্য মুক্ত করতে বিশেষ রিফাইন্যান্সিং বা সহায়তা তহবিল তৈরি করা প্রয়োজন, যেন তারা মূল শেয়ারবাজারে ক্রয়ক্ষমতা ফেরত পায়।
২. শুধুমাত্র জরিমানা নয়, কঠোর আইনগত জবাবদিহিতা
বাজারে নামমাত্র জরিমানা করে ফাইল বন্ধ করার কালচার বন্ধ করতে হবে। যারা ভুয়া ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট দিয়ে বা কারসাজি করে বিনিয়োগকারীর টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা ও বাজার থেকে স্থায়ী বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মানসম্পন্ন ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তকরণ
দুর্বল, জাঙ্ক বা অস্তিত্বহীন কোম্পানিকে আইপিও (IPO) দিয়ে বাজারে আনার পথ বন্ধ করতে হবে।
দেশের বড় বড় লাভজনক বহুজাতিক ও দেশীয় গ্রুপগুলোকে আকর্ষণীয় পলিসি সুবিধা দিয়ে বাজারে আনা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
হুটহাট নিয়ম পরিবর্তন না করে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছরের একটি স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার পলিসি ঘোষণা করা আবশ্যক।
অডিটিং ব্যবস্থার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে কোনো কোম্পানি ভুয়া হিসাব দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করতে না পারে।
পুঁজিবাজার ভালো করতে হলে কোনো আইওয়াশ বা টেবিল-চেয়ারের পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন সদিচ্ছা ও কাঠামোগত বাস্তব সংস্কার। নীতি নির্ধারকরা যখন মুখের কথা বা আইওয়াশ জরিমানার বাইরে এসে অনিয়মের মূল জায়গায় হাত দেবেন এবং বাজারকে সুশাসনের ভিত্তিতে নিজস্ব গতিতে চলতে দেবেন, তখনই কেবল সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরে পাওয়া সম্ভব।
মতামত