বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

কলাম

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষক ও শিক্ষামন্ত্রীর করণীয় ভূমিকা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষক ও শিক্ষামন্ত্রীর করণীয় ভূমিকা

গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা মানুষকে সুন্দর ও মানবিক মানুষ হতে সাহায্য করে। মানুষকে বিবেকবান করে তোলে। ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণের সক্ষমতা দান করে। মনুষত্ববোধ জাগ্রত করে। জাতিকে আলোকিত করে। শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা। শিক্ষা যেখানে অনুপস্থিত, জ্ঞান ও মূল্যবোধ সেখানে খুবই দুর্বল। এজন্য শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হয়। শিক্ষা এবং সংস্কৃতি একটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। শিক্ষা এবং সংস্কৃতি নষ্ট হলে দেশ ধ্বংস হয়ে যায়। জাতিকে মেধা এবং মননশীলতা তৈরিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিহার করে কারিকুলাম পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। যাতে ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা পরিহার করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মানানসই হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বহির্বিশ্বের সিলেবাসের সাথে আমাদের সিলেবাসের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। যাতে করে আমাদের সন্তানেরা যখন বহির্বিশ্বে কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে যাবে তারা যেন সেখানে সামঞ্জস্য বিধান করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। শিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে ক্ষুধার্ত শিক্ষক দিয়ে তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়। শিক্ষকদের পারিশ্রমিক যেমন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমনি শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে মান-সম্মত শিক্ষা দানের জন্য জবাবদিহিতারও ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাঙ্গনে এবং শ্রেণীকক্ষে উত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের স্টাডি করে যথাসময়ে শ্রেণীকক্ষে লেকচার শীট নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করতে হবে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দুজনই উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে একজন সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তার সময় নকল বন্ধ হয়েছিল। এবার ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোকে সিসি টিভি ক্যামেরার আওতায় এনে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে একটা সচেতনতার বীজ রোপন করেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যেমন দেখাদেখির প্রবণতা কমে গেছে, তেমনি শিক্ষকরা প্রকৃত অর্থে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমালোচনা যে যাই করুক শিক্ষামন্ত্রী জাতির বিবেক তৈরি করার জন্য সঠিক কাজটি করেছেন। আমরা লাখ লাখ এ প্লাস পাইনি বটে তবে প্রকৃত অর্থে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার হলে লেখনীর মাধ্যমে মেধার পরিচয়ের সাক্ষ্য রেখেছেন। আমরা অটোপাস থেকে মুক্ত হয়েছি। যদিও বর্ষায় কোমর পানিতে ভিজে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়াটা সমীচীন মনে হয়নি। এহেন পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় এবং মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষ আগামীতে পরীক্ষা গুলো এগিয়ে এনেছেন যা প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী মেনে নিবেন এটাই জাতির বিবেক, বা বাতিঘর শিক্ষক সমাজ প্রত্যাশা করেন। ইতোমধ্যে অনেক কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে। নবম পে স্কেল ঘোষিত হয়েছে। এতে করে সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং কর্মচারীরা উপকৃত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন একজন জনদরদি ব্যক্তিত্ব। ভঙ্গুর অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে তিনি ইতোমধ্যে যেসব কাজ হাতে নিয়েছেন তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং তিনি ইতিমধ্যে চমক সৃষ্টি করেছেন। এত দাবি না করে তাকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। তার শাসনামলে বাংলার জনপদ হবে শান্তিময়। প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীকে সমান চোখে দেখে তাদের মানসিক প্রশান্তির বিস্তার ঘটাবেন এটাই হবে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র সমুন্নত করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক আইনগুলো সন্নিবেশিত করতে হবে। যাতে তারা অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে। আইসিটি ও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। ছাত্র ছাত্রীদের মনোযোগ বৃদ্ধিকরণের জন্য ক্লাসে আলোচনার পর ফিডব্যাক গ্রহণ করতে হবে। হোমওয়ার্কের উপর জোর দিতে হবে এবং ড্রপআউট ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করে তাদের লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে। নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের আচার-আচরণ এবং পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়গুলো জানাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ যদি তাদের সহকর্মীদের নিয়ে এ ধরনের কাজগুলো অব্যাহত রাখেন তাহলে অবশ্যই ছাত্রছাত্রীরা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং জাতিকে ভালো কিছু উপহার দিতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্য মহোদয় শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করে ভূয়সি প্রশংসা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। যা জাতির জন্য সুখকরও বটে। শিক্ষকদের দাবি চাকুরীর বয়সসীমা ৬৫ করতে হবে। কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধার ফান্ড লুটপাট করে নষ্ট করলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মানিত কোন শিক্ষককে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। পর্যায়ক্রমে সকলকে প্রাপ্য টাকা তিনি বুঝিয়ে দিবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যদি নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থেকে নিষ্ঠার সাথে সময়োপযোগী জ্ঞান দান করতে পারেন তাহলে শিক্ষিত জাতি তৈরি হবে। এক্ষেত্রে দুজন মন্ত্রী মহোদয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। তবেই আমাদের সন্তানরা হবে ভাগ্যবান এবং ভাগ্যবতী। এক্ষেত্রে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে মাস্তুলটা সোজা করে ধরে রাখতে হবে। শিক্ষকদেরকে উপযুক্ত ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে পাঠদানে উপযোগী করে শ্রেণীকক্ষে পাঠাতে হবে। শিক্ষিত জাতি তৈরির মাধ্যমে আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। মোঃ আব্দুর রাজ্জাকলেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। সমাজকর্ম বিভাগ। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা। 

সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

মিখাইল সের্গেইয়েভিচ গর্বাচভ মারা গেছেন ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর আজ যখন আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন গর্বাচভকে কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁকে বিচার করতে হবে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে—যে প্রক্রিয়ার পরিণতিতে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন আসে।একজন কমিউনিস্ট হিসেবে গর্বাচভের মৃত্যুতে আমার কোনো ব্যক্তিগত শোক নেই। কারণ, আমার বিবেচনায় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতির রক্ষক ছিলেন না; বরং সেই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন।তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে শুধু ঘৃণা প্রকাশের দিকে নিয়ে যায় না; বরং ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। কীভাবে একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের ভিত দুর্বল করা হলো? কীভাবে সংশোধনবাদের বিভিন্ন ধারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার নীতিতে পরিণত হলো? কীভাবে সমাজতন্ত্রের নামে এমন সব সংস্কার আনা হলো, যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলল?নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে একই ধরনের বিপর্যয় অন্য সময়, অন্য নামে, অন্য স্লোগানে আবারও ফিরে আসতে পারে।কমরেড স্তালিন-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন: পরিবর্তনের সূচনাসোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ইতিহাসকে বুঝতে হলে কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পরবর্তী সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। ১৯৫৩ সালে কমরেড জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত পার্টি ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৫৬ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ব্যক্তিপূজার বিরোধিতা’র নামে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচার সোভিয়েত রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় অংশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।এরপর কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত অর্থনীতিতে আমলাতান্ত্রিকতা, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া, ভোক্তা পণ্যের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা জমতে থাকে। একই সঙ্গে পার্টির ভেতরে আদর্শিক দৃঢ়তার জায়গায় আপস ও সুবিধাবাদ প্রবেশ করে।এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল; কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমস্যা। বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হওয়া, আমলাতান্ত্রিক বিশেষ সুবিধার বিস্তার, পার্টির অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের বিকৃতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের নানা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বও সংকটকে গভীর করে।এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সুবিধাভোগী স্তর তৈরি হয়েছিল। তাদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের সঙ্গে এই স্তরেরই একটি অংশ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এবং রাশিয়ার নবগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘অলিগার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।গর্বাচভের আবির্ভাব১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। উৎপাদনশীলতা কমছিল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছিল, আফগানিস্তান যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছিল।এই পরিস্থিতিতে গর্বাচভ ‘পেরেস্ত্রইকা’—পুনর্গঠন—এবং ‘গ্লাসনস্ত’—উন্মুক্ততা—এর কথা বলেন।প্রথমদিকে তাঁর বক্তব্যে সমাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের কথাই বেশি শোনা যায়। তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েত ক্ষমতার মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করাই তাঁর লক্ষ্য।এই ভাষা শুধু সোভিয়েত জনগণকেই নয়, বিশ্বের বহু কমিউনিস্টকেও আশাবাদী করেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, গর্বাচভ হয়তো সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার দুর্বলতাগুলো দূর করতেই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংস্কারের দিক কোন দিকে যাচ্ছিল?এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।পেরেস্ত্রইকা থেকে ব্যবস্থার রূপান্তরগর্বাচভের সংস্কারের প্রথম পর্যায়ে অর্থনীতিকে অধিক কার্যকর করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ক্রমে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে থাকে এবং বাজারের ভূমিকা বাড়তে থাকে।১৯৮৭ সালের পর থেকে সংস্কারের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে বাজারের নানা উপাদানকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের আইনগুলোতে সমবায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে।এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বাজারকে কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নিয়ন্ত্রিত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি বাজার ধীরে ধীরে উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে?ইতিহাস দেখিয়েছে, দ্বিতীয় পথটিই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো উৎপাদনের প্রধান উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ক্ষমতা। যখন এই ভিত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফা এবং বাজারের স্বতন্ত্র শক্তি ক্রমে প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রও বদলাতে থাকে।‘অখণ্ড বিশ্ব’ এবং শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নগর্বাচভের রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রেণি-সংঘাতের গুরুত্বকে ক্রমশ কমিয়ে দেখা।তাঁর ‘নতুন রাজনৈতিক চিন্তা’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন এক ধারণা সামনে নিয়ে আসে, যেখানে মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থকে প্রধান করে দেখা হয় এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মৌলিক বিরোধকে তুলনামূলকভাবে গৌণ করে তোলা হয়।মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ অবশ্যই অস্বীকার করার বিষয় নয়। যুদ্ধবিরোধিতা, শান্তি, পরিবেশ রক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্ন। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ‘সার্বজনীন মানবিক স্বার্থ’ বলতে গিয়ে যদি শোষক ও শোষিতের স্বার্থের পার্থক্য অস্বীকার করা হয়, তখন তা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে না।মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো শ্রেণি-বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য না করা।সমাজে কে উৎপাদনের মালিক? কে শ্রম বিক্রি করে? কে মুনাফা অর্জন করে? রাষ্ট্রের নীতি কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়?—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু ‘মানবিক মূল্যবোধের’ কথা বললে সামাজিক সম্পর্কের বস্তুগত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।এই জায়গাতেই সংশোধনবাদের বিপদ।সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ‘নতুন’ ধারণাগর্বাচভের নতুন রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সংঘাতের চরিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা।শীতল যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমানো, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক বিষয় হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।পুঁজিবাদের বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শক্তির অসমতা, বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য, সম্পদ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক জোট এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপ—এসব বাস্তবতা রয়ে গিয়েছিল।ফলে সাম্রাজ্যবাদকে কেবল একটি সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি অনুধাবন করা যায় না।শ্রেণিসংগ্রামকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণাগর্বাচভীয় চিন্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি ছিল শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে কমিয়ে দেওয়া।‘শ্রেণির ঊর্ধ্বে’ উঠে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচার করার আহ্বান শুনতে মানবিক ও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমাজে শ্রেণি কি বিলুপ্ত হয়েছিল?সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনিক সুবিধাভোগী স্তরের পার্থক্য ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছিল। উৎপাদন ও বণ্টনের প্রশ্ন ছিল। শ্রমের ফল কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নও ছিল।অর্থাৎ শ্রেণি-প্রশ্ন বাস্তবেই ছিল।তাই শ্রেণিসংগ্রাম অপ্রাসঙ্গিক—এমন ধারণা বাস্তবতার পরিবর্তে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়।আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘শ্রেণির রাজনীতি পুরোনো’, ‘সবাই একই সমাজের মানুষ’, ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানবতা’—এই ধরনের বক্তব্য শোনা যায়। মানবতার কথা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু মানবতার নামে শ্রেণি-বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না।শ্রমিকের রাষ্ট্র থেকে বাজারের রাষ্ট্রগর্বাচভের সময় রাজনৈতিক সংস্কারও দ্রুত এগোতে থাকে। গ্লাসনস্তের ফলে দীর্ঘদিন চাপা থাকা নানা সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, অতীতের নানা ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক শুরু হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়।কিন্তু এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো যখন তার অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে।১৯৮৯ সালের নির্বাচনী পরিবর্তন, কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটিজের উত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।১৯৯০ সালে সোভিয়েত সংবিধান থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক ভূমিকার সাংবিধানিক ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়।এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মোড়।কারণ, যে রাজনৈতিক দল বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই পার্টিই যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারাতে শুরু করল, তখন রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনগর্বাচভের নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাবও ছিল গভীর।১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের একের পর এক সমাজতান্ত্রিক সরকার পতনের মুখে পড়ে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া—সর্বত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে।বার্লিন প্রাচীরের পতন শীতল যুদ্ধের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করে।সোভিয়েত নেতৃত্ব পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোর টিকে থাকার জন্য আগের মতো সামরিক হস্তক্ষেপের পথ গ্রহণ করেনি। এটি শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এর ফলে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ে।১৯৯০ সালে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ এবং ন্যাটোর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বিস্তারও পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেয়।সোভিয়েত অর্থনীতির সংকট ও পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। উৎপাদন কমে যায়, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, পণ্যের ঘাটতি বাড়ে এবং বাজেট সংকট তীব্র হয়।এখানে গর্বাচভের নীতির একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—পুরনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হলেও তার বিকল্প হিসেবে একটি কার্যকর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা।পরিকল্পনার শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কার্যকর বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমেছে, কিন্তু উৎপাদন ও বণ্টনের নতুন কাঠামো স্থিতিশীল হয়নি।এই শূন্যতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী।রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী রাশিয়ায় ‘অলিগার্ক’ নামে পরিচিত ধনী পুঁজিপতিদের উত্থানের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি এই রূপান্তরকালেই গড়ে ওঠে।১৯৯১: পতনের শেষ অধ্যায়১৯৯১ সালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শক্তিশালী হয়।আগস্ট ১৯৯১-এ গর্বাচভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং কমিউনিস্ট পার্টির ওপর আঘাত তীব্র হয়।ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের নেতারা বেলাভেজা চুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বিদ্যমান নেই। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্রও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।২৫ ডিসেম্বর গর্বাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১—সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।একটি রাষ্ট্রের পতন হলো। একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও অবসান ঘটল।কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে গেল—এই পতন কি অনিবার্য ছিল?পতন কি অনিবার্য ছিল?সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে শুধু একজন ব্যক্তি—গর্বাচভের—কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের গভীর শিক্ষা পাওয়া যাবে না।গর্বাচভ ছিলেন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে আবির্ভূত একজন নেতা। তাঁর আগে বহু দশক ধরে সোভিয়েত ব্যবস্থায় নানা সমস্যা জমা হয়েছিল। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র, পার্টির অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, জাতীয় প্রশ্নের জটিলতা, জনগণের অংশগ্রহণের সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ—সবকিছু মিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছিল।কিন্তু এটাও সত্য যে সংকটের সমাধান কোন পথে করা হবে, সেটিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।গর্বাচভের নেতৃত্বে যে পথ নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রকে পুনর্গঠন করার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।অতএব গর্বাচভকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না; আবার তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।‘সংশোধনবাদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সংশোধনবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়।মার্কসবাদকে সময়োপযোগী করার নামে তার মৌলিক শ্রেণিচরিত্রকে বাদ দেওয়া, শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণিসমঝোতাকে প্রাধান্য দেওয়া, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে অস্বীকার করা, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দেওয়া—এসবই বিভিন্ন সময়ে সংশোধনবাদের নানা রূপে দেখা গেছে।সমস্যা হলো, সংশোধনবাদ সাধারণত নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রবিরোধী’ বলে ঘোষণা করে না। বরং সে সমাজতন্ত্রকে আরও মানবিক, আরও আধুনিক, আরও গণতান্ত্রিক, আরও বাস্তবসম্মত করার কথা বলে।এই কারণেই সংশোধনবাদ বিপজ্জনক।কারণ, সে অনেক সময় শত্রুর ভাষায় কথা বলে না; বন্ধুর ভাষায় কথা বলে।গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্থান ও পরবর্তী নীতির মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।গর্বাচভের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারপশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ গর্বাচভকে গণতন্ত্র ও শান্তির নায়ক হিসেবে দেখে। শীতল যুদ্ধের অবসান, পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস এবং পূর্ব-পশ্চিম উত্তেজনা কমানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন।এই মূল্যায়নের ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্যই আছে।কিন্তু একজন কমিউনিস্টের মূল্যায়নের প্রশ্ন আলাদা।আমাদের প্রশ্ন হবে—তিনি কোন শ্রেণির স্বার্থকে শক্তিশালী করেছিলেন? তাঁর নীতির ফলে উৎপাদনের মালিকানার সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল? শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছিল, নাকি দুর্বল হয়েছিল? সমাজতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, নাকি পুঁজিবাদের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।ইতিহাসের শিক্ষাসোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবীর একাংশ ঘোষণা করেছিল—সমাজতন্ত্রের যুগ শেষ। কেউ কেউ বলেছিলেন, পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত ব্যবস্থা।কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের পৃথিবী সেই দাবিকে সরলভাবে সত্য প্রমাণ করেনি।বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বেড়েছে। বিপুল সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। শ্রমের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সম্পদের অসম বণ্টন আজও মানবসভ্যতার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে আছে।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাই সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি।বরং প্রশ্নটিকে আরও জটিল করেছে—কী ধরনের সমাজতন্ত্র? কীভাবে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে? কীভাবে আমলাতন্ত্র ও বিশেষ সুবিধাভোগী স্তরের বিকাশ ঠেকানো যাবে? কীভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক মালিকানার সমন্বয় ঘটানো যাবে? কীভাবে পার্টিকে জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কের মধ্যে রাখা যাবে?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে।গর্বাচভের মৃত্যু এবং আমাদের শপথগর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্ট হিসেবে আমার ব্যথিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাকে আত্মতুষ্টও করে না।বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।শুধু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই সমাজতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। শুধু বিপ্লবের ইতিহাসের গৌরবগাথা বললেই বিপ্লবী পার্টি বিপ্লবী থাকে না। শুধু মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের নাম উচ্চারণ করলেই মার্কসবাদী হওয়া যায় না।প্রয়োজন তত্ত্ব ও বাস্তবতার সৃজনশীল ঐক্য। প্রয়োজন শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক। প্রয়োজন পার্টির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সততা ও মতাদর্শগত দৃঢ়তা। প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান। এবং সর্বোপরি প্রয়োজন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর আদর্শিক সংগ্রাম।গর্বাচভের মৃত্যু তাই আমার কাছে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা মাত্র নয়। এটি ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আমাদের শিখিয়েছে—একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তার অভ্যন্তরে যদি শ্রেণিচেতনা দুর্বল হয়, যদি আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগী স্তর শক্তিশালী হয়, যদি বিপ্লবী পার্টির আদর্শিক দৃঢ়তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং যদি সংশোধনবাদ রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করে, তাহলে বিপ্লবের অর্জনও বিপন্ন হতে পারে।সুতরাং গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্টের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘৃণার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের সংগ্রামের অঙ্গীকার।সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী ভিত্তিকে ধারণ করে, সব ধরনের সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই হতে পারে এই ইতিহাসের প্রতি আমাদের যথার্থ জবাব।ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে শেষ করেনি।বরং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রামকে আরও গভীরভাবে বোঝার দায়িত্ব আমাদের ওপর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রদূত এম সাইফুর রহমান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন,সংস্কার ও আধুনিকায়নের ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে,তাঁদের অন্যতম সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আজ তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকী।রাজনীতির অঙ্গনে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও দৃঢ়চেতা। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কঠোর অবস্থান,হিসাব-নিকাশে সতর্কতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনমনীয়তার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কড়া মেজাজের অর্থমন্ত্রী’ হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ছিল একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ,দক্ষ সংস্কারক এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আধুনিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা।মৌলভীবাজারের এক প্রত্যন্ত এলাকায় জন্ম নেওয়া এম সাইফুর রহমান পেশাজীবনে ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অল্পসংখ্যক এফসিএ ডিগ্রিধারীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি চা-বাগানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিতে নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন।হিসাব,নিরীক্ষা ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়, রাজস্বনীতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর হিসাবনির্ভর ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমান ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। সে সময় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিসরেও ছিল নানা সমালোচনা ও চাপ।তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। সময়ের সঙ্গে ভ্যাট দেশের রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে সে সময়ের বিতর্কিত ও কঠিন সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এম সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংক,আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তিনি দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিতেন।তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল,উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে,কিন্তু দেশের বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতির আলোচনায় তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এম সাইফুর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত অর্জনগুলোর একটি হলো জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট উপস্থাপন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।তাঁর সময়ে করব্যবস্থা,আর্থিক খাত, বাণিজ্যনীতি ও বাজারব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে অধিকতর বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং একাধিক অপারেটরের জন্য সুযোগ তৈরি হওয়ার ফলে পরবর্তী সময়ে মোবাইল যোগাযোগ দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।এই পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের নীতিগত পরিবেশ তৈরিতে এম সাইফুর রহমানের সময়ের সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ মোবাইল ফোন যখন দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ,তখন সেই পরিবর্তনের শুরুর দিকের নীতিগত পদক্ষেপগুলোর কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন।অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমানের প্রকাশ্য ভাবমূর্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কঠোরতা। সংসদে কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও হিসাবের গুরুত্ব বেশি থাকত।তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই সাদাসিধে ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকা।মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করা হয়। সড়ক যোগাযোগ,শিক্ষা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে তাঁর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা এ অঞ্চলের উন্নয়ন-ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।একজন অর্থমন্ত্রীর মূল্যায়ন কেবল তিনি কতটি বাজেট দিয়েছেন,তা দিয়ে শেষ করা যায় না। তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে, অর্থনীতির কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আনে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের ভিত্তি তৈরি করে,সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এম সাইফুর রহমানের ক্ষেত্রেও সেই মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। রাজনীতির বাইরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি,রাজস্ব সংস্কারের প্রচেষ্টা,বাজারমুখী অর্থনীতির প্রতি আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে দরকষাকষির মানসিকতা ছিল,তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল,তা আজও অনুভূত হয়। সময়ের সঙ্গে মানুষ চলে যায়,কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম ও সিদ্ধান্ত ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়।এম সাইফুর রহমান তেমনই এক নাম। তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও আধুনিকায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা।এই দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রদূত এম সাইফুর রহমান

ভিয়েতনাম বিপ্লবের কিংবদন্তি মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সারাবিশ্বের মেহনতি মানুষ এবং নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ধ্রুব নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল ভিয়েতনাম বিপ্লবের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।কমিউনিস্ট বিপ্লবী এই নেতা পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার পেছনেও কমরেড হো-র উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। আজ তাঁর ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতৃত্ব কমরেড হো চি মিন। বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়জন নেতৃত্ব সামগ্রিক মুক্তির জন্য সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করে স্বাধীনতার দূত হয়ে উঠেছিলেন কমরেড হো চি মিন তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অসাধারণ ও একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠতে পারেন তারই বড় প্রমাণ হো চি মিন। এই আধুনিক বিশ্বেও তার কীর্তি পরিবর্তন অভিমুখী মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রাতঃস্মরণীয় ও অনুপ্রেরণীয়।কমরেড হো চি মিন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমৃত্যু ভিয়েত কং-এর নেতৃত্ব দান করেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছেন নতুন ভিয়েতনামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের। স্বপ্ন দেখেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করেছেন ফরাসি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা সাধারণ জনগণের জন্য। পড়াশোনা শেষ করেই জড়িয়ে পড়েন ফরাসি বিপ্লবে। তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন তার বাবা নগুয়েন সাক। পরিণতি হিসেবে শাসকগোষ্ঠী অন্যান্য আন্দোলনকারীর সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করে। পরে ফরাসি শাসকগোষ্ঠী সিন সাককে আটকে রাখে পৌলো বন্দর কারাদ্ব্বীপে। বাবা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল হো চি মিনের ছাত্রজীবন এবং শুরু হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামী জীবন। এ সময় তিনি হুয়েং শহর ত্যাগ করে ফ্যান থিয়েট শহরে চলে যান। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সময়টা ছিল ১৯০৭ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত। ইতিহাসবিদরা এটি তার আন্দোলনের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এদিকে হো চি মিনের বাবাকে পৌলো বন্দর কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলো। এ সময় বাবার সঙ্গে পুত্রের দেখা হয়। হো চি মিনের বাবা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন তার এ তরুণ সন্তানের মনে ব্যাপক ক্ষোভ আর যন্ত্রণা। তিনি অন্তরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করলেন এ সন্তান তার একার নয়। এ সন্তান এখন সারা ভিয়েতনামের সংগ্রামী মানুষের। তিনি হো চি মিনকে প্যারিস পাঠানোর চিন্তা করলেন। কিন্তু এ জন্য কারিগরি বিদ্যালয়ে পড়তে হবে তিন বছর। হো চি মিন তিন বছর সময় নষ্ট না করে একটি চাকরি জোগাড় করে ফেললেন। সায়গান আর ফ্রান্সের ভার্সাই বন্দরের মধ্যে যাতায়াতকারী এস এস লা তুচে ত্রিভেলি নামের এক জাহাজে চাকরি হলো তার। তিনি যাত্রা শুরু করলেন প্যারিসের পথে।ভার্সাই সম্মেলন এবং আট দফা দাবিপ্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ থেমে গেছে। কিন্তু সারা দুনিয়ার ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হয়নি। শেষ হয়নি বিভিন্ন জাতির ভাগ্য নির্ধারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর এ স্থানেই ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্রবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ভার্সাই চুক্তি নামে পরিচিত, নটরডেম প্যারিসে অবস্থিত। সাম্রাজ্যবাদী দস্যুরা সেই কাজ শেষ করার জন্য ১৯১৯ সালের বসন্তকালে সম্মিলিত হন ভার্সাইতে। উন্নত বিশ্বের নেতাদের যখন নিজেদের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বোমা ফাটান বিপ্লবী এই নেতা। বজ্রকণ্ঠে উত্থাপন করলেন আট দফা দাবি। ভিয়েতনামি জনগণের পক্ষ থেকে ‘জাতিসমূহের অধিকার’ শিরোনামে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কে এই প্রস্তাব উত্থাপনকারী যুবক? নগুয়েন ভ্যান কুং অর্থাৎ দেশপ্রেমিক নগুয়েন। শুরু হলো ছদ্মনাম গ্রহণের পালা। নাম হলো হো চি মিন, এর অর্থ আলোর দিশারী। ভার্সাইতে তার উপস্থাপিত মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, ফরাসি ও ভিয়েতনামিদের মধ্যে সমান অধিকার, জবরদস্তিমূলক শ্রম বিলোপ, লবণ কর রহিত এবং জবরদস্তিমূলক মদ্যপান ব্যবস্থার বাতিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রস্তাবই হলো সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের বিরুদ্ধে তার প্রথম আঘাত। ভিয়েতনামের ওপর কর্তৃত্বকারী ফ্রান্সের বুকে বসে ফরাসি উপনিবেশবাদবিরোধী তার পিতৃ-মাতৃভূমির মুক্তির সনদ দাখিল করলেন হো চি মিন। অবাক বিস্ময়ে দেখল বিশ্ব!দেশে দেশে বিপ্লবী ভাষণবিপ্লবী মহান এই নেতা ভিয়েতনামকে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন আন্দোলন করে গেছেন। ১৯২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের প্যারিস সফরে যান। সেখানে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির ১৮৩তম অধিবেশনে যোগ দেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের নিপীড়নের কথা। দেশের মানুষের ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমে বিপ্লব গড়ে তুলতে গঠন করেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ। অনেক সংগ্রামের পর ভিয়েতনামে শেষ হয় ফরাসি শাসন। ভিয়েতনামের আলোর দিশারি হো চি মিন তার ভাষণে বলেন, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, বিপ্লবের জন্য আপনাদের সাহায্য করার প্রয়োজনে আজ এখানে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে স্বীকার করছি যে, আমার জন্মভূমিতে যে ঘৃণ্য ও অবিচার সংঘটিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কমিউনিস্ট হিসেবে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা অবগত আছেন, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় হতে চলল ফরাসি পুঁজিবাদী শোষকগোষ্ঠী ইন্দোচীনে তার হিংস্র রূপ নিয়ে এ অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনে বেয়নেটের শক্তিতে তারা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। শুরু থেকে আজ অবধি আমাদের ওপর শুধু যে নির্যাতন ও শোষণ চলছে তাই নয়, চলছে অবাধ হত্যাকাণ্ড ও বিষ প্রয়োগও। পুঁজিবাদী লুটেরারা ইন্দোচীনের ওপর কী পরিমাণ কুৎসিত নিপীড়ন চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে তার বিশদ বর্ণনা সামান্য কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনাদের সামনে উপস্থিত করা সম্ভব নয়।’ এ ছাড়া ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হো চি মিন কমিন্টার্নের নির্দেশে চীনের ক্যান্টনে বলেন, ‘একজন মানুষ যা চাইবে ইন্দোচীনে তার সবই আছে। যেমন বন্দর, খনি, বিস্তীর্ণ শস্যখেত, বিরাট বনভূমি এবং যোগ্য ও কঠোর পরিশ্রমী শ্রেণি। কিন্তু আমাদের সংগঠন ও সংগঠকের বড্ড অভাব। সে কারণেই আমাদের শিল্প আর ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো মূল্য নেই। যদি তোমার যুবসমাজ জীবনের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।’না ফেরার দেশেমহান এই বিপ্লবী নেতা ১৯৬৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। হো চি মিন হয়তো তার জীবনকালে নিজ দেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। এখন নিশ্চয়ই মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল সেই মহান নেতা যখন দেখেন তার দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তখন তিনি নিশ্চয়ই আনন্দিত হন। কমরেড হো চি মিন আজও দুনিয়ার শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কাছে অসামান্য প্রেরণা।শৈশব থেকেই সংগ্রামীনগুয়েন ভ্যান কুং, নগুয়েন তাত থান, ভুয়ং সন নিহি, লিনভ এবং হো চি মিন প্রতিটি নাম একজন মানুষেরই। প্রথম দুটি ছদ্ম নাম হলেও শেষের নামটিতে তাকে সবাই চেনেন। ছেলেবেলায় আদর করে ‘আঙ্কেল হো’ বলে ডাকা হতো। ১৮৯০ সালের ১৯ মে তার জন্ম। ফরাসি আশ্রিত রাজ্য আন্নামের নগেয়ান প্রদেশের হোয়াংট্রু গ্রামটি তার জন্মস্থান হলেও শৈশব কাটে কিম লিয়েন গ্রামে। বাবার নাম নগুয়েন হুই ওরফে নগুয়েন সিন সাক ছিলেন ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান। দাসত্বের এ জীবন সিন সাকের ভালো লাগত না। তাই মুক্তির উপায় হিসেবে শিক্ষাকে বেছে নেন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পড়াশোনা করে হয়ে ওঠেন শিক্ষক। প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পণ্ডিত আন তার বড় মেয়ে হোয়াং আই লোয়ানের সঙ্গে তার বিয়ে দেন। হো চি মিনের মা হোয়াং আই লোয়ানও পরিশ্রমী নারী ছিলেন। বাবা-মায়ের মতো হো চি মিনের জীবন সংগ্রামও শুরু হয় শৈশব থেকেই। তার বাবার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন। তার যখন বয়স ১০ তখন তারা গ্রাম ছেড়ে বাবার শিক্ষকতা পেশা শুরু করার জন্য হুয়েং শহরে চলে আসেন। সংসারে তিন ভাই-বোনের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো হো চি মিনের বাবার। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হতো হো চি মিনের মায়ের। এভাবে মা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মারা যান হো চি মিনের মা। মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন তিনি। তার বাবাও হতাশায় পড়েন। ঠিক করা হলো হো চি মিনকে আবারও গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন। হুয়েং শহর ছেড়ে হো চি মিন আবারও চলে আসেন তার প্রিয় সবুজ ঘেরা গ্রামে।পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে১৯০৪ সালে তরুণ হো চি মিন দ্বিতীয়বারের মতো পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে। গ্রামে থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করেন তাকে আরও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাই পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তিনি নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষ এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে যান। তার একটাই উপলব্ধি ছিল, ‘শিখতে হবে মানুষের কাছ থেকে, জানতে হবে পৃথিবীকে।’ ১৯০৭ সালে হো চি মিন বিদ্যালয়ের পড়াশোনা বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই শেষ করেন। তার পড়াশোনা শেষ হতেই ভিয়েতনামজুড়ে চলতে থাকে খণ্ড খণ্ড ফরাসিবিরোধী বিক্ষোভ। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের মাটি থেকে বিদেশিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। শহরে এসেই বুঝতে পারলেন নিজেদের মাতৃভূমিতে তাদের কোনো অধিকার নেই। তাদের দেশ শাসন করছে ফরাসিরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফরাসি নাগরিক। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েতনামি হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারও কিছু বলার সাহস ছিল না। স্কুলেই এমন পরাধীনতা তাকে আরও বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত করে। সে সময় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আন্দোলন হলেও সুসংগঠিত কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ঠিক এ সময়ে হুয়েং শহরে গড়ে ওঠে এক গোপন বিপ্লবী সংগঠন। হো চি মিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে প্রচারপত্র বিলি করতেন এবং বোঝাতেন, অত্যাচারী ফরাসিদের দেশ থেকে বিতাড়িত না করলে দেশে শান্তি আসবে না। বিদেশি শাসন-শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ এ আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শেপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন, ঠিক তখনই তিনি ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শে। কীভাবে তিনি লেনিনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, তা নিজেই লিখেছেন- ‘গোড়ার দিকে, সাম্রাজ্যবাদ নয়, দেশপ্রেমই আমাকে লেনিন ও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রতি বিশ্বাসী করে তুলেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সংগ্রামে, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ অধ্যয়ন আর তার পাশাপাশি বাস্তব কার্যকলাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি যে, কেবল সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই সমস্ত বিশ্বের নিপীড়িত জাতি এবং শ্রমজীবী জনগণকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে পারে।’বিশ্ব ভ্রমণেহো চি মিন সুদীর্ঘকাল এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ আর আমেরিকার দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাহাজের রসুইখানায় বাবুর্চির সহকারী হিসেবে। প্যারিসে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন তা হলো নগরকেন্দ্রিক জীবনের পঙ্কিলতা। শিক্ষা সভ্যতার ছদ্মাবরণে বীভৎস ক্রিয়াকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত তার কাছে স্পষ্ট হয়। তার মনে হয় নগরীর ভদ্রজনেরা জরাগ্রস্ত পঙ্গু। সবাই মানসিক ব্যাধির ভুগন্ত রোগী। হো চি মিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাহাজের সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মিশতেন। আর নতুন করে পরিচিত হতেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে।"আলোর দিশারী"উনিশে মে জন্ম নিলেন সবুজ গ্রামের কোলে,দারিদ্র্যেরই কঠিন পাঠ নিলেন চোখের জলে।পরাধীনতার শিকল দেখে জ্বলে উঠল প্রাণ,মাটির মানুষ স্বপ্ন দেখল—মুক্ত হবে দেশ-প্রাণ।হুয়েং শহর, ছাত্রজীবন, শোষণেরই ছবি,ফরাসিদের ঔপনিবেশিক দম্ভ দেখেন কবি।মায়ের মৃত্যু, দুঃখ-বেদনা, নিঃস্ব ঘরের ক্ষয়,তবু তাঁরই হৃদয়জুড়ে মানুষেরই জয়।জানতে হবে বিশ্বটাকে, শিখতে হবে সবার,মানুষেরই মুখের ভাষায় খুঁজতে হবে ধার।জাহাজের সেই রসুইঘরে শ্রমের ঘ্রাণ মেখে,দেখলেন তিনি কত মানুষ বঞ্চনারই দেখে।এশিয়া আর আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকা,ঘুরে ঘুরে চিনলেন তিনি শোষণেরই লিখা।নগরীর ওই সভ্যতারও মুখোশ গেল খুলে,মানুষ তখন মানুষ খোঁজে পুঁজির ঘন কূলে।ভার্সাইয়ের সেই সভায় যখন বিশ্বনেতারা,ভাগের অঙ্কে ব্যস্ত তখন সাম্রাজ্যবাদীরা,তখন উঠে বজ্রকণ্ঠে এক তরুণের গান—জাতির অধিকার চাই, চাই মানুষের সম্মান।রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, চাই সমান অধিকার,জবরদস্তি শ্রমের অবসান, ভাঙুক শোষণ-কারাগার।লবণ করের বোঝা নামাও, মদের জুলুম থামাও,ভিয়েতনামের স্বাধীনতার দ্বারটি খুলে দাও।নগুয়েন নামে এলেন তিনি বিশ্বসভা-প্রাঙ্গণে,হো চি মিন নামটি পরে জ্বলে উঠল রণে।‘আলোর দিশারী’ নামটি যেন ইতিহাসের দীপ,অন্ধকারের বুক চিরে যায় তাঁর সংগ্রামের শিখা।লেনিনের সেই বাণী শুনে পেলেন নতুন পথ,মার্কসবাদে খুঁজে পেলেন মুক্তির অমোঘ রথ।দেশপ্রেম তাঁর পথ দেখালো বিশ্বমানবতার,শ্রমিক-কৃষক এক কাতারে—মুক্তি সবার।ক্যান্টনের সেই আহ্বান আজও বাজে কানে—সংগঠনহীন জাতি কভু জাগে না সংগ্রামে।যুবসমাজের শক্তি দিয়ে গড়তে হবে দেশ,নিপীড়নের প্রাচীর ভেঙে আনতে হবে রেশ।গড়লেন তিনি বিপ্লবী দল, জাগালেন জনতা,স্বাধীনতার স্বপ্ন হলো কোটি প্রাণের কথা।ফরাসি শাসন কাঁপল শেষে জনতারই রোষে,মুক্তির পতাকা উঠল তখন রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে।তারপর এলো নতুন শত্রু, সাম্রাজ্যবাদের ছায়া,মার্কিন বোমার আগুন নামে ভিয়েতনামের মায়া।ধানের ক্ষেতে, গ্রামের পথে, জ্বলল অগ্নিশিখা,তবু হো-র জনতা বলে—হারব না আর দীক্ষা।মৃত্যুও তাঁকে থামাতে পারেনি সংগ্রামেরই শেষে,তিন সেপ্টেম্বর উনিশশো ঊনসত্তর এল অবশেষে।উনআশি বছর বয়সে থামল তাঁর প্রাণ,কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে রইল মানুষেরই গান।তিনি নেই—তবু তাঁর পথে জাগে মুক্তিকামী,শোষিত মানুষের স্বপ্নজুড়ে আজও আছেন হো চি মিন।স্বাধীনতার অর্থ শুধু পতাকা ও ভূখণ্ড নয়,মানুষ যেন মর্যাদা পায়—সেই তো সত্য জয়।যেখানে কৃষক ঘামে ভেজে, শ্রমিক গড়ে ভোর,যেখানে ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে জমে অন্ধ ঘোর,সেখানে তাঁর ডাক শোনা যায়—ভাঙো বৈষম্য-জাল,মানুষেরই হাতে ফিরিয়ে দাও মানুষেরই কাল।বাংলার মাটিও দেখেছে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষণ,রক্ত দিয়ে স্বাধীন হলো প্রিয় স্বদেশভূমি তখন।সেই স্বাধীনতার পূর্ণতা কি বৈষম্যের মাঝে হয়?সমতা আর ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলাই জয়।হো চি মিনের জীবন তাই শুধু অতীত নয়,আজও শোষিত মানুষের প্রাণে তাঁরই পরিচয়।সাম্য, ন্যায়, অসাম্প্রদায়িক মুক্ত সমাজের গান—মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অমর তাঁর প্রাণ।লাল সালাম হে বিপ্লবী, আলোর দিশারী,তোমার পথে জাগুক আবার জনতারই সারি।শ্রমিক-কৃষক, মেহনতি জন এক হোক অবিরাম,বৈষম্যহীন পৃথিবীর তরে উঠুক মুক্তির নাম।হো চি মিন, তোমার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক প্রাণে,মুক্ত মানুষের নতুন ভোর ফুটুক বাংলার গানে।শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী হোক মহান—তোমার সংগ্রাম পথ দেখাক, জাগুক বিশ্বমানব প্রাণ।—( আলোর দিশারী,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই মহান এই নেতার জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।ভিয়েতনাম মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি মহানায়ক ও বিপ্লবী নেতা কমরেড হো চি মিন লাল সালাম ও বিপ্লবী অভিবাদন!সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

ভিয়েতনাম বিপ্লবের কিংবদন্তি মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ!

রবীন্দ্র-নজরুল : গুরু-শিষ্যে সম্পর্কের সঘন রসায়ন …“রসের রসিক না হলে” সব সম্পর্কের রসায়নের গন্থি উন্মোচন সম্ভব হয়না। তৎকালে ইংরেজ শাসক জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিয়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেই সময় ইংরেজ সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতায় হাবুডুবু খাওয়া একটি চক্র তাঁদের দুজনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সর্বাত্মক অপচেষ্টা করেছিল। এ ধারাবাহিকতা আজও পরিলক্ষিত হয়। যদিও তা সাফল্য লাভ করে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের ছিল গভীর সখ্যতা। নির্মল গুরু-শিষ্য সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুল ইসলামের আন্তরিক সম্পর্ক অটুট থাকুক এটা মৌলবাদী মুসলমানরা যেমন চাননি, তেমনি চাননি মৌলবাদী হিন্দুরাও। দু’জনের সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টির জন্য দু’পক্ষ থেকেই নানা ধরনের সমালোচনা, আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র অবিরামভাবে চলে আসছিল। সাহিত্যের মর্মমূলে প্রবেশ করার যোগ্যতা বা অধিকার যারা রাখেন না, তারা রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বিচার করেছেন ধর্ম দিয়ে। তারা বুঝতে পারেননি মানবিকতার সাধনাই করে গেছেন চিরকাল রবীন্দ্র-নজরুল।কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে। দুজনের বয়সের ব্যবধান ৩৮ বছরের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় ১৯১১-তে আর তিনি নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। অর্থাৎ গীতাঞ্জলি যখন প্রকাশিত হয় তখন কাজী নজরুলের বয়স ১২ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন কাজী নজরুল ইসলামের বয়স প্রায় ১৪ বছর।নজরুল যেমন রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু বলে সম্মান করতেন রবীন্দ্রনাথও তেমনি নজরুলের কবি প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানাতে পিছুপা হননি। নজরুলের ‘ধূমকেত’ পত্রিকাকে আশীর্বাদ জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে, উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন/অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা/জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন।’ নজরুল ইসলাম এটিকে কবিগুরুর আশির্বাদ হিসেবেই মনে করতেন। সে কারণে ধূমকেতু পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আশীর্বাণীটি নিয়োমিত প্রকাশিত হতো। নজরুল ইসলাম সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশীর্বচন লেখেন : ‘ধর, হাল বলরাম, আন তব মরু-ভাঙা হল,/বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।’কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ, ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোক ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে।’ কথাশিল্পী মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন নজরুলের এই ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বললেন নজরুলের উপস্থিতিতেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেসে বলেছিলেন, যাক আমার আর ভয় নেই তাহলে। নজরুল সঙ্কোচে দূরে গিয়ে বসলেও রবীন্দ্রনাথ সস্নেহে তাকে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সৈনিক নজরুল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের শারীরিক শিক্ষা দেবেন। কিন্তু অস্থির প্রকৃতির বিদ্রোহী নজরুল কোথায়ও এভাবে নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকতে চাননি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দার্জিলিংয়ে দেখা হয়। এ সময় নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি তো ইতালি গেছেন সেখানে কবি দ্যনুনজিও’র সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না? রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন, “দেখা হবে কি করে তিনি যে তোমার চেয়েও পাগল।”নজরুল নিজেই লিখেছেন, ‘তখন আমার মনে হতো আমার পূজা সার্থক হলো, আমি বর পেলাম।’ ‘অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে (শান্তিনিকেতন) গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।’ নজরুল তাঁর শেষ অভিভাষণে উল্লেখ করেছেন, “কবিগুরু তাকে প্রায় বলতেন – এই উন্মাদ তুই প্রস্তুত হ’। তোর জীবনে বিরাট ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে শেলীর মত, কিটসের মত। তুই নিজেকে প্রস্তুত কর।” (শেষ অভিভাষন)কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। নজরুল তখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে কারারুদ্ধ। কবি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে জেলখানায় বইখানি পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি উৎসর্গপত্রে নজরুলকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করে লেখেন, জাতির জীবনের বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছাকাছি যেসব কবি-সাহিত্যিক থাকতেন তাদের অনেকেই তখন অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন তাঁর প্রতি। জবাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়সহ উপস্থিতজনদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করছে। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করেনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছে মাত্র। …কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত।” দুখানা ‘বসন্ত’ দিয়ে একখানায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম দস্তখত করে দিয়ে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে বললেন, ‘তাকে (নজরুলকে) বলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা যোগাবার কবিও তো চাই।’নজরুল ইসলামও ১৯২৮ সালে নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। বিভিন্ন রচনায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানাবিধ উল্লেখ থাকলেও সম্পূর্ণ তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো হলো ‘নতুন চাঁদ’ গ্রন্থের ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ ও ‘কিশোর রবি’ এবং ‘শেষ সওগাত’ গ্রন্থের ‘রবিজন্মতিথি’।এ থেকে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে কবি স্বীকৃতি দিতে কত আন্তরিক ও উদার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তাঁর বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ডাকতেন ‘উদ্দাম’, “ক্ষ্যাপা” বলে। নজরুল অনেকবার ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কবিতা, গান ইত্যাদি শুনিয়েছেন। পেয়েছেন প্রচুর উৎসাহ। রবীন্দ্রনাথ চাইতেন না যে, নজরুল তাঁর কবি প্রতিভাকে যথার্থ সৃষ্টি কাজে না লাগিয়ে অন্য বিষয়ে নষ্ট করেন। এজন্য নজরুলকে তিনি একদিন (সঙ্গে ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর) তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচতে নিষেধ করেছিলেন। এই কথায় নজরুল ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাঁর ক্ষোভের প্রকাশ লক্ষণীয় কৈফিয়ত কবিতায়। নজরুল পরে বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর তত্ত্বের কথা। অনেক সময় নিন্দুকের দলের পাল্লায় পড়ে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা বিরক্ত হয়েছেন (সাহিত্য ধ্বস)। নজরুলও অভিমান করেছেন। তার প্রমাণ মেলে “বড়র পিরিতি বালির বাঁধ”–এ।নজরুল ইসলাম যৌবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। এ ছাড়া গীতাঞ্জলির সবগুলো কবিতা ও গান তাঁর মুখস্থ ছিল। এ কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবহিত হওয়ার পর খুবই খুশি হয়ে বলেছিলেন, আমারই তো মুখস্থ নেই। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে যে কী স্নেহ করতেন তার আরেকটি উদাহরণ – রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুল ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এতে বাধ সাধলে রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালনার স্বীকৃতি প্রদান করেন। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, বিদ্রোহী, ভাঙ্গার গান পড়ে রবীন্দ্রনাথ অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন নজরুল ইসলামকে। কবি নজরুল ইসলাম সৈনিক হিসেবে চাকুরি করে ২১ বছর বয়সে কলকাতায় ফিরে আসেন ১৯২০-এর মার্চ মাসে। কলকাতার ৩২, কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে ওঠেন নজরুল। তখন তাঁর বাক্স-পেটরার মধ্যে ছিল কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি। কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছেন, ‘নজরুল ইসলাম বহু রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। তিনি কি করে যে রবীন্দ্র সঙ্গীতগুলো মুখস্ত করেছিলেন তা ভেবে অবাক হই।’হুগলী জেলে কারারুদ্ধ নজরুল জেল কর্মকর্তার অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন। একটানা ৩৯ দিন চলে অনশন। সমগ্র দেশবাসী উদ্বিগ্ন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুরু হয় মিটিং-মিছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে ১৯২৩ সালের ২১ মে কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে বিশাল জনসভা হয়। উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করার জন্য টেলিগ্রাম পাঠান। টেলিগ্রামটি করা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায়। তিনি লিখেছিলেন, Give up hunger strike, our literature claims you. অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষ টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠায়। কারণ, নজরুল তখন ছিলেন হুগলি জেলে। নজরুল তাঁর বন্ধু কুমিল্লার বীরেন্দ্রকুমারের মা বিরজা সুন্দরী দেবীর হাতে লেবুর সরবত পান করে অনশন ভঙ্গ করেন।রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সরাসরি দেখা হয়েছিল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে। তখন নজরুলের বয়স ২২ বছর। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। বোলপুর স্টেশনে কাজী নজরুল ইসলাম এবং ড. শহীদুল্লাহকে অভ্যর্থনা জানান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত সচিব কবি সুধাকান্ত রায় চৌধুরী। নজরুল সেদিন রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি কবিতার আবৃত্তি শুনতে চেয়েছিলেন। কবিগুরু বললেন, ‘সে কি? আমি যে তোমার গান ও আবৃত্তি শোনবার জন্যে প্রতীক্ষা করে আছি, তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।’ নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন, অগ্নি-বীণা’র ‘আগমনী’ কবিতাটি। এছাড়াও তিনি কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনান। নজরুলের অনুরোধে সেদিন রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করে শোনান, ‘মাধবী হঠাৎ কোথা হতে, এল ফাগুন দিনের স্রোতে, এসে হেসেই বলে যাই যাই।’ …এরপর বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎ হয়।নোবেলপ্রাপ্তি উত্তর দীর্ঘ বিদেশ সফরের পর কবিগুরু দেশে ফিরলে কলকাতায় সম্বর্ধনানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিকে, যুদ্ধ ফেরৎ হাবিলদার কবি নজরুলও কলকাতায়। প্রায় ২ বছর অধিকাল তিনি সওগাতসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ও সাময়িকীতে নিয়োমিত অগ্নিঝরা কবিতা লিখে রীতিমত হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ কিছু তথ্য শুনেছেন। দেশে ফিরে কিছু কিছু পড়েছেন। হঠাৎ নজরুল অবাঞ্ছিতের মত ওই অনুষ্ঠানে হাজির। ছুটে যান মঞ্চের আসনে বসা গুরুদেবের নিকট। প্রণাম সেরে নিয়ে নিজের পরিচয় দিতে গেলে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন সজনী কান্ত দাস। তিনি খেঁকিয়ে উঠে নজরুলকে অপমান করে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। সে সময় রবীন্দ্রনাথ সজনী কান্ত দাসকে সরে যেতে বলে নজরুলকে পাশে টেনে বসিয়েছিলেন।এরপর ১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় নজরুলকে ডেকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থেই নজরুল ছিলেন উত্তররৈবিক কবি। একথা রবীন্দ্রনাথ মানলেও সজনীকান্ত দাসরা মানতে নারাজ। অথচ রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও মোহিতলাল মজুমদারসহ অনেকেই মেনে নিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, “কৈশরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছাটাকেও অন্যায় মনে হত – যেন রাজদ্রোহের সামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রা ভরা নেশা, তাঁর বেলোয়াড়ি আওয়াজের যাদু – তাও আমি জেনেছি। আর এ নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার। আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না – যতদিন না বিদ্রোহী কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙ্গল। (রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক)১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ গাইতে গাইতে নজরুল ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকলেন গুরুদেব আমি এসেছি। উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেন, গুরুদেব আমি আপনাকে খুন করবো। রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শুনে কবিতার প্রশংসা করেন এবং নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস’।নজরুল ১৯৩৫-এর জুন মাসে ‘নাগরিক’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়ে চিঠি পাঠান। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭৫ বছর। বেশ অসুস্থ। এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬-এর ১ সেপ্টেম্বর লিখেছিলেন, ‘…তুমি তরুণ কবি, এই প্রাচীন কবি তোমার কাছে আর কিছু না হোক করুণা দাবি করতে পারে। শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি পাশের জিলায় (বীরভুমের বোলপুরে)। কখনো যদি ঐ সীমানা পেরিয়ে আমাদের এদিকে আসতে পারো খুশি হব।’ উক্ত চিঠির জবাবে নজরুল ‘নাগরিক’ পত্রিকায় লেখেন, কবিতা “হে কবি, হে ঋষি অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা।/পর্বত-সম শত দোষত্রুটিও চরণে হল জমা।…/তুমি শ্রষ্টার শ্রেষ্ঠ বিস্ময়-/তব গুণে-গানে ভাষা-সুর যেন সব হয়ে যায় লয়।…/প্রার্থণা মোর, যদি আরবার জন্মি এ ধরণীতে,/ আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে।”রবীন্দ্রনাথের বয়স আশি বছর পূর্তি হয় ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। তখন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লেখেন, ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’। ১৯২০ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পূর্বকাল পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্নেহ ও শ্রদ্ধার। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে নজরুল যে গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়েছিলেন তার পরিচয় রবীন্দ্রনাথের পরলোকগমনে তাৎক্ষণিকভাবে রচিত নজরুলের বিভিন্ন কবিতা ও গানে পাওয়া যায়। এই দিন (২২ শ্রাবণ’ ১৩৪৮) কাজী নজরুল ইসলাম আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে ধারাবর্ণনা প্রচার করেন। তিনি আবৃত্তি করেন ‘রবিহারা’ কবিতা এবং রচনা করেন ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’। এ ছাড়া ‘সালাম অস্তরবি’ এবং ‘মৃত্যুহীন রবীন্দ্র’ নামে দুটি কবিতা রচনা করেন।"সাহিত্যের দুই নক্ষত্র"রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধ আলো ঝরে, বাংলারই প্রাণে,নজরুলের অগ্নিবীণা জাগে ঝড়ের গানে।দুই কবির দুইটি ধারা, একই সাগর-জল,একজনের শান্ত বাণী, অন্যজনের বল।গুরুর প্রতি শিষ্যের যে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা,শিষ্যের প্রতি গুরুর যে স্নেহের অবিরাম—সেই রসায়ন বুঝতে হলে চাই হৃদয়খানি,ধর্মের দেয়াল ভেঙে চাই মানবতার বাণী।ইংরেজ শাসন বিষ ছড়ালো জাতি-ধর্মের ফাঁদে,হিংসার কালো ছায়া নামল মানুষেরই কাঁধে।তবু দুই কবি পাশাপাশি সত্যের পথে রয়,মানুষেরই জয়গান গেয়ে মুছে দিল ভয়।ধূমকেতুর দীপ্ত কপাল গুরুর আশীর্বাদ,অন্ধকারে জ্বলে উঠল অগ্নিমাখা সাধ।লাঙলেরই পাতায় আবার শ্রমের গান জাগে,গুরুর স্নেহ শিষ্যকবির বিদ্রোহী রণে।শান্তিনিকেতনের পথে ডাক পড়েছিল তার,বাঁধনহারা কবির মনে ছিল যে অস্থির ভার।তবু গুরু চিনেছিলেন দুরন্ত সেই প্রাণ,ঝড়ের মাঝে জন্ম নেবে নতুন দিনের গান।কারাগারের কালো ঘরে অনশনরত কবি,দূর আকাশে উদ্বিগ্ন রবি—কাঁদে তারই ছবি।‘ফিরে এসো’—গুরুর বাণী ছুঁতে চেয়েছিল প্রাণ,সাহিত্যেরই বিকাশে যেন বেজে উঠল গান।‘বসন্ত’ এল কারাগারে আশীর্বাদের ফুল,শিষ্যের হাতে গুরু দিলেন আপন হৃদয়ের কূল।বললেন—সৈনিক মিলবে, কবি চাই আরও,যুদ্ধজয়ের প্রেরণাতে জাগুক দেশটা ফের।‘বিদ্রোহী’র বজ্রকণ্ঠে কেঁপে উঠল ঘর,শিষ্য বলল—‘গুরুদেব, আপনাকে করব খুন!’হেসে গুরু বুকে টেনে বললেন স্নেহভরে,‘সত্যিই তো খুন করেছিস’—প্রেমেরই স্বরে।সঞ্চিতার অর্ঘ্য গেল গুরুর চরণতলে,শ্রদ্ধার ফুল ফুটল যেন দুই কবিরই বলে।রবীন্দ্র-নজরুল পাশাপাশি বাংলা মায়ের ধন,দুই প্রদীপে জ্বলে একই মানবতার মন।কেউ চায়নি এই মিলন, কেউ ছড়িয়েছে বিষ,মৌলবাদের অন্ধ ঘরে ওঠেনি মানবদিশ।হিন্দু-মুসলমান নামের যত কৃত্রিম দেয়াল,দুই কবির কণ্ঠে সেদিন ভেঙে হলো লালনকাল।কবিগুরুর জন্মদিনে শিষ্য অশ্রু দিয়ে লেখে,গুরুর মহিমা বুকে নিয়ে নত হয় সে দেখে।আর যখন অস্তরবি ডুবে গেল আকাশে,নজরুলের বুকের ভিতর শোকের নদী ভাসে।‘শ্রান্ত রবিরে ঘুমাও’—বেজে ওঠে গান,অশ্রুভেজা শব্দে কাঁদে কবিরই প্রাণ।সালাম জানায় অস্তরবিকে ব্যথিত বাংলাদেশ,মৃত্যু পেরিয়ে বেঁচে থাকে কবিতাদের রেশ।তারপর এল নীরবতা বিদ্রোহীর কণ্ঠে,সময় যেন থেমে গেল ইতিহাসের অন্তে।একজন আগে স্তব্ধ হলেন, আরেকজনও পরে,দুই কণ্ঠ আজ নীরব শুধু বাংলার অন্তরে।তবু কি তাঁরা নীরব?—না, জেগে আছেন আজ,ধানের ক্ষেতে, নদীর স্রোতে, শ্রমিকেরই সাজ।রবির গানে, নজরুলেরই বজ্রকণ্ঠের তানে,দুই কবি পথ দেখান আজও বাঙালির প্রাণে।যতদিন এই বাংলাতে মানুষ মানুষ হবে,যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের প্রদীপ রবে,ততদিন রবীন্দ্র-নজরুল পাশাপাশি থাকবেন জেগে—মানবতার জয়ধ্বনি উঠবে তাঁদের গান বেয়ে।গুরু-শিষ্যের সেই প্রেম আজও অমলিন,দুই নক্ষত্র জ্বলে আছে আকাশজোড়া ঋণ।গন্ধবিধুর ধূপের মতো স্মৃতি পুড়ুক ধীরে,রবীন্দ্র-নজরুল বেঁচে থাকুন বাঙালির অন্তরে।—(সাহিত্যের দুই নক্ষত্র, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালি জাতি ও বাংলার দুই মহান ব্যক্তিত্ব ও বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক জাজ্বল্যমান তারকা। তাঁদের মহত্ব আর ঔদার্য বাঙালির গর্বের বিষয়। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরেই নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়। নজরুলের কবিতার ভাষায় – “নিশ্চল নিঃচুপ। আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।”সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ!

বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থা

সভ্য দুনিয়ার দেশে দেশে সর্বত্র বুর্জোয়া বিজ্ঞানের (সরকারী এবং উদারনৈতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে কার্ল মার্কসের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়; মার্কসবাদকে তারা দেখে একধরনের ‘ক্ষতিকর গোষ্ঠী’ হিসেবে। অবশ্যই অন্য মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা শ্রেণিসংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে ‘নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। সবরকমের সরকারী ও উদারনৈতিক বিজ্ঞানই কোনো না কোনোভাবে মজুরি-দাসত্বের সমর্থন করে থাকে, আর সে মজুরি-দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা করেছে মার্কসবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কি- এই প্রশ্নে মিল মালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা, আর মজুরি-দাসত্বের সমাজে বিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা।… … কার্ল মার্কসের সমগ্র প্রতিভাটাই এইখানে যে মানবসমাজের অগ্রণী ভাবনায় যেসব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল তিনি তারই জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতবাদের উদ্ভব হয়েছে দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মহাচার্যেরা যে শিক্ষা দান করেছিলেন, তারই প্রত্যক্ষ ও অব্যবহিত অনুবর্তন হিসেবে।কার্ল মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য। এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমঞ্জস, এর কাছ থেকে লোকে একটা সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করে যা কোনোরকম কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া অথবা বুর্জোয়া জোয়ালের কোনো রূপ সমর্থনের সঙ্গে আপোস করে না। উনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজী অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসী সমাজতন্ত্র রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হল মার্কসবাদ।মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস এবং সেই সঙ্গে তার তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।১. মার্কসবাদের দর্শন হল বস্তুবাদ। ইউরোপের সমগ্র আধুনিক ইতিহাস ধরে এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, ফ্রান্সে যখন সবরকমের মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠান ও ধ্যানধারণায় নিহিত ভূমিদাস প্রথার বিরুদ্ধে বদ্ধপরিকর সংগ্রাম জ্বলে উঠেছিল, তখন থেকে বস্তুবাদই দেখা দিয়েছে একমাত্র সঙ্গতিপরায়ন দর্শন হিসেবে, যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত শিক্ষায় বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভণ্ডামি প্রভৃতির শত্রু। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই বস্তুবাদকে ‘খণ্ডন করার’ জন্য, তাকে ধূলিসাৎ ও ধিক্কৃত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং সমর্থন করেছে নানা ধরনের দার্শনিক ভাববাদ যা সর্বদাই পর্যবসিত হয় কোনো না কোনোভাবে ধর্মের সংরক্ষণে অথবা সমর্থনে।কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস অতি দৃঢ়তার সঙ্গে দার্শনিক বস্তুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং এই ভিত্তি থেকে যেকোনো বিচ্যুতিই যে কী দারুণ ভুল তা বারবার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের মতামত সবচেয়ে পরিষ্কার করে এবং বিশদে ব্যক্ত হয়েছে এঙ্গেলসের ‘ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ’ এবং ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ রচনায়। ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর মতো এ বই দু’খানিও প্রত্যেকটি সচেতন শ্রমিকের নিত্যপাঠ্য।অষ্টাদশ শতাব্দীর বস্তুবাদেই কিন্তু মার্কস থেমে যাননি, দর্শনকে তিনি অগ্রসর করে গেছেন। এ দর্শনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান দর্শনের সম্পদ দিয়ে, বিশেষ করে হেগেলীয় তন্ত্র দিয়ে, যা আবার পৌঁছিয়েছে ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এই সব সম্পদের মধ্যে প্রধান হল দ্বান্দ্বিকতা অর্থাৎ বিকাশের পূর্ণতম, গভীরতম, একদেশদর্শিতাবর্জিত তত্ত্ব, যে মনুষ্যজ্ঞানে আমরা পাই নিরন্তর বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। জরাজীর্ণ ও পুরনো ভাববাদের ‘নব নব’ প্রত্যাবর্তনের সমস্ত বুর্জোয়া দার্শনিক শিক্ষা সত্ত্বেও- রেডিয়ম, ইলেকট্রন, মৌলিক পদার্থের রূপান্তর, প্রকৃতিবিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিষ্কার- মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের চমৎকার প্রমাণ।দার্শনিক বস্তবাদকে গভীরতর ও পরিবিকশিত করে মার্কস তাকে সম্পূর্ণতা দান করেন, প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞানকে প্রসারিত করেন মানবসমাজের জ্ঞানে।বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকীর্তি হল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক মতামতে যে বিশৃঙ্খলা ও খামখেয়ালের রাজত্ব এযাবৎ চলে আসছিল তার বদলে দেখা দিল এক আশ্চর্য রকমের সর্বাঙ্গীণ ও সুসমঞ্জস বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখাল কী করে উৎপাদন-শক্তিসমূহের বিকাশের ফলে আমাদের সমাজজীবনে একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভব হয় উচ্চতর ব্যবস্থার- দৃষ্টান্তস্বরূপ, কী করে সামন্ততন্ত্র থেকে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ।মানুষের জ্ঞান যেমন মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক জগতের অর্থাৎ বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন, তেমনি সমাজের অর্থনেতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হল মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ দার্শনিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন মতামত ও তত্ত্ব)। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হল অর্থনৈতিক বনিয়াদের উপরিকাঠামো। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যাবে যে, আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক রূপ যত বিভিন্ন হোক, তার কাজ হল প্রলেতারিয়েতের ওপর বুর্জোয়া প্রভুত্ব সংহত করা।মার্কসের দর্শন হল সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ- তা থেকে মানবসমাজ এবং বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণি তার জ্ঞানাঞ্জন-শলাকা লাভ করেছে।২. অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হল বনিয়াদ, তার ওপরেই রাজনৈতিক উপরিকাঠামো দণ্ডায়মান- একথা উপলব্ধির পর মার্কস তাঁর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধ্যয়নে। মার্কসের প্রধান রচনা ‘পুঁজি’-তে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে। মার্কসের পূর্বেকার চিরায়ত অর্থশাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশে- ইংল্যন্ডে।অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো শ্রমের মূল্য-তত্ত্বের সূত্রপাত করেন। মার্কস তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি এ তত্ত্বকে আমূলরূপে সুসিদ্ধ ও সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন। তিনি দেখান যে, পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যক যে শ্রমসময় ব্যয় হয়েছে, তা দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়।বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখছিলেন দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের বিনিময়), মার্কস সেখানে উদ্ঘাটিত করলেন মানুষে মানুষে সম্পর্কে। পণ্যবিনিময়ের মধ্যে যোগাযোগ। মুদ্রার অর্থ হল সে যোগসূত্র ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, বিভিন্ন উৎপাদকদের গোটা অর্থনৈতিক জীবন অবিচ্ছিন্ন হয়ে সংযুক্ত হচ্ছে একটি অখন্ড সমগ্রতায়। পুঁজির অর্থ এই যোগসূত্রের আরো বিকাশ: মানুষের শ্রমশক্তি পরিণত হচ্ছে পণ্যে। জমি, কলকারখানা ও শ্রমের হাতিয়ারপাতির মালিকের কাছে মজুরি-শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে। শ্রমদিনের এক অংশ সে খাটে তার সপরিবার ভরণপোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরি), বাকি অংশটা সে খাটে বিনামজুরিতে, সৃষ্টি করে পুঁজিপতির জন্য বাড়তি মূল্য, পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফার উৎস ও সম্পদের উৎস।মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হল এই বাড়তি মূল্যের তত্ত্বটা। শ্রমিকের মেহনতে গড়া এই পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, ক্ষুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে: বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রা পুঁজির ফাঁসে আটকে যাচ্ছে, তারপর নিজের পশ্চাৎপদ টেকনিকের বোঝায় ভেঙ্গে পড়ছে ও ধ্বংস পাচ্ছে। কৃষিতে ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনের যে ভাঙ্গন তার রূপগুলো অন্যরকম, কিন্তু ভাঙনটা তর্কাতীত সত্য।ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনকে ধ্বংস করে পুঁজি শ্রম-উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ঘটায় এবং বড় বড় পুঁজিপতিদের সঙ্ঘগুলির একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করে। উৎপাদনটাও উত্তরোত্তর সামাজিক হতে থাকে- লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মজুর বাঁধা পড়ে একটি প্রণালীবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়- অথচ যৌথ শ্রমের ফল আত্মাসাৎ করে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। বৃদ্ধি পায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্য ক্ষিপ্ত প্রতিযোগিতা, এবং ব্যাপক জনসাধারণের জীবনধারণের অনিশ্চয়তা।পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তুলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্মিলিত শ্রমের মহাশক্তি গড়ে তোলে।পণ্য অর্থনীতির ভ্রূণাবস্থা থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুরু করে তার সর্বোচ্চ রূপ বৃহদাকার উৎপাদন পর্যন্ত মার্কস পুঁজিবাদের বিকাশ পর্যালোচনা করেছেন।এবং নতুন পুরনো সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতায় মার্কসের এ মতবাদের সঠিকতা বছরের পর বছর বেশি বেশি মজুরের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠছে।সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদের জয় হয়েছে, কিন্তু এ জয় শুধু পুঁজির ওপর শ্রমের বিজয়লাভের পূর্বাভাস।৩. ভূমিদাস প্রথার পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই একথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মেহনতী মানুষের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হল এ মুক্তির অর্থ। সে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদ স্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু আদিম সমাজতন্ত্র ছিল ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নততর এক ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনীদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি-দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পারেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি সেই সামাজিক শক্তি বা নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।ইতিমধ্যে সামন্ততন্ত্র, ভূমিদাসত্বের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে যেসব উত্তাল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরোত্তর পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, শ্রেণীসমূহের সংগ্রামই হল সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।মরিয়া প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ভূমিদাস-মালিক শ্রেণির ওপর রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি বিজয়লাভও সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম বিনা কোনো পুঁজিবাদী দেশই ন্যূনাধিক মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।মার্কসের প্রতিভা এইখানে যে এ থেকে তিনি সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন ও তাকে সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন, যা পাওয়া যায় বিশ্বইতিহাসের শিক্ষা থেকে। সে সিদ্ধান্ত হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদ।যেকোনো নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি তারা একথা না বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন, প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সবশ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায় আছে: যে শক্তি পুরনোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থানহেতু যা তাকে করতেই হবে- তেমন সব শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে দীক্ষিত ও সংগ্রামের জন্য সংগঠিত করে তোলে।যে মানসিক দাসত্বের মধ্যে নিপীড়িত শ্রেণিগুলির সকলে এতদিন বাঁধা পড়ে ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রলেতারিয়েত পেয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ থেকে। একমাত্র মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সাধারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থাটা কী?"প্রলেতারিয়েত"সভ্যতার প্রাসাদ ওঠে শ্রমিকেরই ঘামে,শ্রমিকের রক্ত ঝরে পুঁজির অট্টালিকায়;যে হাতে গড়ে ওঠে নগর, কারখানা, গ্রাম,সে হাতই শূন্য থাকে নিজেরই ঠিকানায়।মুক্তির মন্ত্র শুনি—মুক্ত মানুষ, মুক্ত দেশ,অদৃশ্য শিকল পরে শ্রমিক কেন বন্দী?বাজারের দরজাজুড়ে স্বাধীনতার বেশ,ভেতরে মজুরি-দাস, বাইরে স্বপ্নের ফন্দি।শ্রমশক্তি বিকোয় আজ পুঁজির বাজারে,দিনভর ঘাম ঝরে জীবনের দায়ে;জীবিকার মূল্যটুকু মজুরি হয়ে ফেরে,অবশিষ্ট শ্রমফল যায় মালিকের ঘরে।শ্রমিক যে সম্পদ গড়ে, তার মালিক অন্যজন,শ্রমিকেরই পরিশ্রমে পুঁজির বিস্তার;এক অংশে বাঁচে তার সংসার-জীবন,অন্য অংশে জমে ওঠে মালিকের পাহাড়।এ যে উদ্বৃত্ত মূল্য—শোষণের মূল কথা,ঘামের বিনিময়ে গড়ে মুনাফার সাম্রাজ্য;শ্রম যত সামাজিক, সম্পদ তত কেন্দ্রীভূত,মুষ্টিমেয় হাতে কেন কোটি মানুষের রাজ্য?কলকারখানা বাড়ে, যন্ত্রের গতি বাড়ে,বাড়ে উৎপাদনশক্তি, বাড়ে পুঁজির বল;তবু কেন শ্রমজীবী অনিশ্চিত থাকে,কেন তার ঘরে নামে অভাবেরই জল?ক্ষুদ্র মালিক ভাঙে, কৃষক পড়ে ঋণে,পুঁজি তার জাল বোনে মাঠে ও বাজারে;বৃহৎ পুঁজির ছায়া দীর্ঘতর হয় দিনে,স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন হারায় অন্ধকারে।একদিকে অঢেল ধন, অন্যদিকে ক্ষুধা,একদিকে ভোগের মেলা, অন্যদিকে হাহাকার;উৎপাদনের ফল যখন মানুষের নয়,তখনই সভ্যতার বুকে জন্মে বৈষম্যভার।শ্রেণি আছে যেখানে, নিরপেক্ষতা কোথায়?স্বার্থেরই ছাপ থাকে বাণী ও বিজ্ঞানে;যে জ্ঞান শোষণ ঢাকে মিথ্যার আবরণে,সে জ্ঞান প্রশ্নহীন থাকে শাসকের গানে।মার্কস তাই দেখালেন ইতিহাসের অন্তর,মানুষের ভাগ্য লেখে উৎপাদনের ধারা;অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠেরাজনীতি, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের কারাগার।সামন্তের শিকল ভেঙে পুঁজির যুগ এলো,‘স্বাধীন’ মানুষের নামে নতুন বাঁধন হলো;ভূমিদাস গেল বটে, মজুরের শৃঙ্খল রইল—শোষণের রূপ বদলাল, শোষণ কি তবে গেল?ইউটোপিয়ার স্বপ্ন শুধু নিন্দা জানায়,পুঁজির নিয়ম জানে না, পথও দেখায় না;মার্কস দিলেন শ্রমিকের হাতে সেই জ্ঞান—কোন শক্তি ইতিহাসে নতুন ভোর আনে।শ্রেণিসংগ্রাম শুধু সংঘাতের নাম নয়,ইতিহাসের গতিপথ বদলেরই শক্তি;যে শ্রেণি উৎপাদন করে, তারই হাত ধরেজন্ম নিতে পারে এক শোষণহীন ভোরটি।মানুষের শ্রম হবে মানুষেরই সম্পদ,মুষ্টিমেয় পুঁজির নয় কোটি প্রাণের ফল;উৎপাদনের শক্তি পাবে মানবতার অধিকার,ভাঙবে শোষণের প্রাচীর, নিভবে বৈষম্যজ্বাল।আজও তাই প্রশ্ন ওঠে কার হাতে পৃথিবী,কার ঘামে গড়ে ওঠে সভ্যতার ভিত?যে শ্রমিক বাঁচায় বিশ্ব, তার জীবন কেনক্ষুধা, ঋণ, বেকারত্বে প্রতিদিন ক্ষত-বিক্ষত?জাগো হে শ্রমজীবী, জাগো কৃষকজন,নিজের শক্তি চিনে নাও, ভাঙো ভয়ের দ্বার;তোমাদের সম্মিলিত শ্রমের মহাশক্তিগড়তে পারে নতুন এক মানবিক সংসার।পুঁজির জয় আজ যদি পৃথিবীজুড়ে হয়,তার অন্তরে তবু শ্রমের বিজয়ের বীজ;ইতিহাস থেমে থাকে না কোনো সিংহাসনে—মানুষের মুক্তিই তার চূড়ান্ত অভীষ্ট।যে হাত কারখানা গড়ে, যে হাত ফসল ফলায়,যে হাত রেলপথ গড়ে, শহর বানায় রাতদিন,সেই হাতেই ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখা—সেই হাতেই মানুষের মুক্তির অমোঘ ঋণ।শ্রমিকের ঘামে লেখা সভ্যতার কাহিনি,শ্রমিকের অধিকারেই মানবতার জয়;শোষণহীন পৃথিবীর প্রত্যাশিত প্রভাতেমানুষের শ্রম একদিন মানুষেরই হয়।—(প্রলেতারিয়েত,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থা

কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তী কমরেড হায়দার আকবর খান রনো

কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি ও মার্কসবাদী তাত্বিক কমরেড হায়দার আকবর খান রনো, কাজী জাফর আহমদ ও কমরেড রাশেদ খান মেনন রাজনীতির ত্রিরত্ন। কমরেড রাশেদ খান মেনন ও কমরেড হায়দার আকবর খান রনো বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক জুটি হিসেবে খ্যাতি ছিল দীর্ঘদিন। উভয়ের সাথে আমার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ বিষয়ে অন্য কোন নিবন্ধে আলোচনা করার ইচ্ছা রইলো।মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তৎকালীন স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার প্রবক্তা, বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক পলিটব্যুরোর সদস্য, শেষ জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড হায়দার আকবর খান রনো’র ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ।আগেই উল্লেখ করেছি যে, তিনি ছিলেন কমরেড মেননের সাথে কমিউনিস্ট মতাদর্শের রাজনৈতিক জুটি ও বন্ধু, একাধারে তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী এবং বহু গ্রন্থের লেখক। তিনি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রণনীতি-রণকৌশলগত রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাতাদের অন্যতম প্রধান কারিগর। যে বিশ্লেষণ ও ভিত্তির উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সংগ্রাম অব্যাহত আছে। এমনকি তিনি বিপ্লবের প্রস্তুতিকালে ও বিপ্লব সম্পন্ন করে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় গেলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নীতি ও কৌশল কী হবে? তা বিস্তৃত বিশ্লেষণ সহ নির্ধারণ করেছেন। এ যাবৎ তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থগুলোই এসব কথার দালিলিক প্রমাণ। তিনি বাংলা একাডেমির কাছ থেকে ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।কমরেড হায়দার আকবর খান রনো ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। নড়াইল জেলায় এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান রনো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর ডাক নাম রাখা হয়েছিল রনো। তিনি এই নামেই পরিচিত ছিলেন। পিতৃভূমি নড়াইল জেলার নড়াইল থানার অন্তর্গত চিত্রা নদীর পাড়ে বরশালা গ্রাম (বর্তমানে নড়াইল পৌরসভার অন্তর্গত)। নানাবাড়ি নড়াইল থানায় অন্তর্গত মির্জাপুর গ্রাম। নানা ছিলেন ছিলেন উপ-মহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিক সৈয়দ নওশের আলী।পিতা হাতেম আলী খান ছিলেন একজন প্রকৌশলী। ১৯৬৮ সালে মরহুম হাতেম আলী খান তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে অবসরগ্রহণ করেন। সৎ ও যোগ্য অফিসার হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিল। ১৯৯৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কমরেড রনোর মা কানিজ ফতেমা মোহসিনা ছিলেন সৈয়দ নওশের আলীর দ্বিতীয় কন্যা। বাম রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি কমরেড রনোর মায়ের অকৃত্রিম ভালবাসা ও সহযোগিতার জন্য বাম প্রগতিশীল মহলের তিনি বিশেষ পরিচিত ও শ্রদ্ধার স্থানে অবস্থান করেছিলেন। কমরেড রনোর মানসিক গড়নের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। রনোর ছোট ভাই হায়দার আনোয়ার খান জুনোও একজন বিশিষ্ট বামপন্থি রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।হায়দার আকবর খান রনো’র একমাত্র কন্যা রানা সুলতানা। তার দুই নাতি আছে। অরিত্র ও অন্তিক।শিক্ষাজীবন:হায়দার আকবর খান রনো ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্কুলজীবনে তিনি বরাবরই ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। যশোর জিলা স্কুল, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকার সেন্টগ্রেগরী স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকাস্থ সেন্টগ্রেগরী স্কুল হতে ম্যট্রিক পাশ করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তিনি মেধা তালিকায় ১২তম স্থান লাভ করেছিলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ হতে আইএসসি পাশ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পদার্থবিদ্যার কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি কারাবাস ও অন্যান্য কারণে। পরে তিনি কারাগারে অবস্থানকালে আইনশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টের সনদও লাভ করেছিলেন। কিন্তু কোনদিন ওকালতি পেশা গ্রহণ করেননি।ছোট বয়েসেই রনো বাংলা ও বিদেশী ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য পাঠ করেছিলেন। কিশোর বয়সেই বাবার কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, নজরুল, সেক্সপিয়ারের বিভিন্ন কাব্য শুনে শুনে তাঁর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। চমৎকার আবৃত্তির পাশাপাশি তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বহু পুরস্কার লাভ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ভালো বক্তা হিসাবেও পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ছাত্রজীবনে তাকে বলা হতো অনলবর্ষী বক্তা।ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যার ছাত্র থাকাকালে ১৯৬০ সালে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৬৩ সাল হতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন তদানিন্তন সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচত হন। ১৯৬১ সালে তিনি মেধাবী ছাত্র হিসাবে যে সিয়াটো স্কলারশিপ পেয়েছিলেন, তার পুরোটাই কমিউনিস্ট পার্টিকে চাঁদা হিসাবে দিয়েছিলেন।তখন দেশে সামরিক শাসন চলছিল। প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল না। কোন ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্বও ছিল না। এই সময়ে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ছাত্র গোপনে সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার মধ্যে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ ও হায়দার আকবর খান রনো। টার্গেট ছিল ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিল থেকে শুরু হবে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন। ইতোমধ্যে ৩০ জানুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হলে টার্গেটের তারিখ এগিয়ে আনা হয়। ঠিক হয় ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট ডাকা হবে। রনোসহ অন্যান্যরা এই ধর্মঘটের ব্যবস্থা করেন। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয় এবং ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে ছাত্র সভা হয়েছিল, সেখানে একজনই বক্তা ছিলেন হায়দার আকবর খান রনো। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য রেখেছিলেন।৬২ সাল জুড়ে যে ঐতিহাসিক সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তীতে শিক্ষা আন্দোলন হয় রনো তার নেতৃত্বে ছিলেন। তখনো পর্যন্ত কোন সংগঠিত ছাত্র সংগঠন ছিল না। ছাত্র নেতারা ঠিক করলেন ১৯৫২ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নকে (যা ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের পর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো) পুনর্জীবিত করা হোক। বস্তুতঃ পুরাতন নাম গ্রহণ করলেও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নকে নতুন করে গঠন করা হয়েছিল।অক্টোবর মাসে এক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এই সংগঠনের পুনর্জন্ম হয়েছিল। ঐ সম্মেলনে হায়দার আকবর খান রনো ৬২-এর আন্দোলনের উপর রাজনৈতিক রিপোর্ট পেশ করেন। ডাঃ আহমদ জামান’কে সভাপতি, কাজী জাফর আহমদ’কে সাধারণ সম্পাদক ও হায়দার আকবর খান রনোকে যুগ্ম সম্পাদক করে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ৬২ সালে রনো দুইবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। ৬২-এর মার্চ মাসে তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়েছিল। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। যেখানে ছাব্বিশ সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তিনি একত্রে ছিলেন।পরের বছর ১৯৬৩ সালে হায়দার আকবর খান রনো পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ও দক্ষ সাংগঠনিক যোগ্যতার কারণে সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ক্ষুদ্র অবস্থা থেকে দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে তাঁর নামে হুলিয়া বের হয়, যা তখনকার সকল পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। তিনি আত্মগোপনে গেলেন। কিন্তু দুই মাস পর ধরা পড়েন। তাঁকে গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে দুই দিন ও দুই রাত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছিল। ঘুমাতে দেয়া হয়নি তাঁকে। মাথার উপর রাখা হয়েছিল অনেক পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি।১৯৬৫ সালের তাঁর জেলে থাকাকালেই ছাত্র ইউনিয়নের একাংশকে (মেনন গ্রুপ) সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ইতোমধ্যে ১৯৬৫ সালে তিনি রেল ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং আবার স্বল্পকালের জন্য কারারুদ্ধ হন। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, মুক্তির পর তিনি আর ছাত্র সংগঠন করবেন না এবং সরাসরি শ্রমিক বা কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হবেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।শ্রমিক আন্দোলন:১৯৬৬ সালে কাজী জাফর আহমদ ও হায়দার আকবর খান রনো টঙ্গী শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক আন্দেলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই দুইজন একত্রে টঙ্গী অঞ্চলে যে শ্রমিক আন্দেলন গড়ে তুলেছিলেন তা বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।হায়দার আকবর খান রনো ঢাকার বাসা ছেড়ে টঙ্গীর শ্রমিক বস্তিতে বাস করতে শুরু করেন। সপ্তাহে এক আধবার ঢাকায় আসতেন রাজনৈতিক কারণে। মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসা রাজনৈতিক কর্মীর নিজস্ব বাড়ী-ঘর ছেড়ে শ্রমিক বস্তিতে দিনের পর দিন থেকে তৃণমূল পর্যায়ে শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার ঘটনা আমাদের দেশে খুব বেশী নেই। রনোর এই জীবন বিপ্লবীদের জন্য এক দৃষ্টান্ত।গ্রেফতারী পরওয়ানা এড়িয়ে তিনি শ্রমিক কলোনী বা বস্তিতে বাস করতেন। টঙ্গীতে যে ধরণের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল তাতে এবং শ্রমিকদের মধ্যে তাঁর যে ধরণের বিশাল জনপ্রিয়তা ছিল, তাতে টঙ্গী অঞ্চল থেকে পুলিশের পক্ষে খুব বড় রকমের প্রস্তুতি ও ঝুঁকি নেয়া ছাড়া তাঁকে গ্রেফতার করা সহজ ছিল না। এরপর তিনি আর কখনো গ্রেফতার হননি। তবে আত্মগোপনে গেছেন অনেকবার।১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তাঁর ভূমিকা ছিল। একদিকে টঙ্গীতে শ্রমিক আন্দোলন, পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা দুটোই পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টঙ্গী থেকেই শুরু হলো ঐতিহাসিক ঘেরাও আন্দোলন। এই আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। পরে ঘেরাও আন্দোলন অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। রনোকে তখন টঙ্গীর বাইরে অন্যান্য শ্রমিক অঞ্চলেও যেতে হয়েছে সংগঠন গড়ে তুলতে ও নেতৃত্ব দিতে। বলা যেতে পারে তাঁর নেতৃত্বে এক নতুন ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।১৯৬৯-৭০ সালে দ্বিতীয় সামরিক শাসন আমলে টেক্সটাইল শ্রমিকদের যে ঐতিহাসিক দুইমাস ব্যাপী বেআইনী ধর্মঘট হয়েছিল রনো ছিলেন তার নেতৃত্বে। টঙ্গী অঞ্চলে অসংখ্য বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছিলেন এই সাহসী নেতা হায়দার আকবর খান রনো। সেসব ঘটনা এখনো কিংবদন্তির মতো রয়েছে। ১৯৭০ সালে তিনি তদানিন্তন সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও কমিউনিস্ট আন্দোলন:ছেলে বেলায় পারিবারিক সূত্রে তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শের সংস্পর্শে আসেন। কিছু কিছু মার্কসবাদী গ্রন্থ তিনি স্কুলজীবনে কলকাতা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের আগে এদেশে মার্কসবাদী সাহিত্য নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৬০ সালে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৬৬ সালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিক মতবিতর্কের ফলে বিভক্ত হলে তিনি চীনপন্থী অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী দুই বছরে ঐ অংশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেনন সহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে একত্রে গঠন করেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি।১৯৭১ সালে এই সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় ১৪টি সশস্ত্র ঘাঁটি তৈরী হয়েছিল। এই সকল অঞ্চলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি শিবপুর যান যেখান থেকে পরবর্তীতে সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র ঘাঁটি অঞ্চলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। শিবপুরের সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য মান্নান ভুঁইয়ার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল বিশাল মুক্তিবাহিনী এবং ঘাঁটি অঞ্চল। সেখান থেকে তিনি এবং কমরেড রাশেদ খান মেনন নানা পথ ঘুরে টাঙ্গাইলের বিন্নাফুর গ্রামে গিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে (৩ এপ্রিল, ১৯৭১)। পরদিনই মাওলানা ভাসানীর বাসা পাক বাহিনী কর্তৃক আক্তান্ত হয়েছিল। একদিন পরেই ভাসানীর সঙ্গে কমরেড রনো ও কমরেড মেনন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যুদ্ধের সময় অনেক চেষ্টা করেও তারা আর যোগযোগ করতে পারেননি।১৯৭১-এর ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটায় ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় বামপন্থীদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়েছিল। হায়দার আকবর খান রনো এই কমিটির ঘোষাণাপত্র রচনা ও পেশ করেছিলেন।ছাত্রজীবন থেকেই মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালেই রনোর পরিচয় ঘটে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমদসহ ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন নেতার সাথে। কমরেড রনোর সঙ্গে অনেক বিদেশী কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল ও আছে। কমিউনিস্ট পার্টিসমুহের অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও তিনি যোগদান করেছেন।১৯৭৩ সালে কমরেড রনো ও অন্যান্য সহকর্মীরা মিলে গঠন করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী)। পরে ১৯৭৯ সালে পার্টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। প্রথম থেকেই তিনি পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯-৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৯ সালে কমরেড রাশেদ খান মেননের সাথে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিরোধ তৈরি হলে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির একাংশ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি ঐ পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। তিনি কমিউনিস্ট ঐক্যের জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।মাওলানা ভাসনীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হলেও এবং বিভিন্ন সময় ন্যাপের কর্মকান্ডে ভূমিকা রাখলেও তিনি কখনও ন্যাপের সভ্য হননি। ১৯৭৪ সালে ইউপিপি গঠিত হলে তিনি তাঁর সহসভপতি ছিলেন ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত। সুদীর্ঘ রাজনৈতিকজীবনে জাতীয় পর্যায়ের সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে তিনি যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় তিনি বুর্জোয়া সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং প্রতিটি রাজনৈতিক প্রশ্নে শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তত্ত্বগতভাবে এবং বাস্তব সাংগঠনিক আন্দোলনগত কাজের মধ্য দিয়ে। রনোর মধ্যে বাস্তব সংগ্রাম ও তত্ত্বেও সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। সাহস, দৃঢ়তা, কৌশলগত নমনীয়তা ও বুদ্ধিমত্তার এক অর্পূব সমন্বয় দেখা যায়।এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি প্রথম থেকেই নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন। সাতবার তাঁর নামে হুলিয়া জারী হয়েছে। প্রতিবারই তিনি আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন। এরশাদ আমলের নয় বছরে তাঁর বাসায় পঞ্চাশ বারের বেশী মিলিটারী পুলিশ রেইড করেছিল। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের তিনি ছিলেন অন্যতম রূপকার।মৃত্যু :২০২৪ সালের ১০ মে দিবাগত রাত ২টা ৫ মিনিটে (১১ মে) রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। প্রবীণ এ কমিউনিস্ট নেতা ওই বছরের ৬ মে সন্ধ্যায় অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যুর আগে সেখানেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি।লেখালেখি:কমরেড রনো একদিকে জননেতা, অপরদিকে তাত্ত্বিক ও লেখক। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন এমনকি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের উপরও তাঁর অজস্র লেখা আছে। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২৪ বৎসর বয়সে “সাম্রাজ্যবাদের রূপরেখা”।এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা অনেক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১) শতাব্দী পেরিয়ে, ২) ফরাসী বিপ্লব থেকে আক্টোবর বিপ্লব, ৩) পুঁজিবাদের মৃত্যু ঘন্টা, (৪) সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সত্তর বছর, ৫) গ্রাম শহরের গরীব মানুষ জোট বাধো, ৬) মার্কসবাদের প্রথম পাঠ, ৭) মার্কসীয় অর্থনীতি, ৮) মার্কসবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম, ৯) সিপিবির বন্ধুদের প্রতি (পুস্তিকা), ১০) চীনপন্থী বন্ধুদের প্রতি (পুস্তিকা), ১১) শ্রেণী দৃষ্টিকোন থেকে রবীন্দ্রনাথ, ১২) মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ, ১৩) কোয়ান্টাম যগৎ – কিছু বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রশ্ন, ১৪) বাংলা সাহিত্যের প্রগতির ধারা – প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড, ১৫) পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ – প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড, ১৬) মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা (সম্পাদিত), ২০) স্টালিন প্রসঙ্গে, ২১) অক্টোবর বিপ্লবের তাৎপর্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট, ২২) নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন (প্রথম খন্ড)।তাঁর কিছু কিছু বই ও প্রবন্ধ বিশেষ সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০০৫ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “শতাব্দী পেরিয়ে” প্রথম আলোর নির্বাচনে বছরের সেরা বই হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। তাঁর কিছু লেখা বিদেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে।২০১৬ সালে বই মেলায় প্রকাশিত নতুন বই: ১. মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ- প্রকাশক, বাংলা একাডেমি। ২. বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা (প্রথম খন্ড) প্রকাশক, ছায়াবীথি। ৩. নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন (প্রথম খন্ড), প্রকাশক, অগ্রদূত। ৪. উত্তাল ষাদের দশক।অন্যান্য:হায়দার আকবর খান রনো খুব সরল জীবনযাপন করেন। নিরহংকারী মানুষটি সহজ সরলভাবে মিশতে পারেন যে কোন স্তরের মানুষের সঙ্গে এবং সকলেই তাঁর আন্তরিকতার স্পর্শে মুগ্ধ হন। বিশেষ করে যে গরীব জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনি কাজ করেন, তারা তাঁকে আপন বলে গ্রহণ করতে পারে রনোর নিজস্ব চারিত্রিক ও আচরণগত বৈশিষ্টের কারণে।একমাত্র রাজনীতি ছাড়া অন্য কোন পেশাও তার ছিল না। তিনি ছিলেন সার্বক্ষনিক রাজনীতিবিদ। তবে খবরের কাগজে কলাম লেখা ও প্রকাশিত বইয়ের থেকে তিনি কিছু অর্থ উপার্জন করেছেন।আগ্রহের বিষয়:তিনি সাহিত্য পড়তে ভালবাসেন। বাংলা ইংরেজী সাহিত্যের বহু কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। সুযোগ পেলেই তিনি ভালো সিনেমা ও নাটক দেখতেন। ক্রিকেট খেলায় তাঁর আগ্রহ ছিল।"লাল সালাম, কমরেড রনো"চিত্রা নদীর তীরে জেগে উঠেছিল যে প্রাণ,শোষিতের স্বপ্ন বুকে, চোখে মুক্তির গান;কলকাতার সেই ভোরে জন্ম নিলেন তিনি,অন্যায়ের অন্ধ রাতে হয়ে উঠলেন আলো।নড়াইলের মাটি দিয়েছিল জনম বীর,জনতার দুঃখ দেখে জ্বলে উঠেছিলেন দিন;বইয়ের পাতায় মার্কস, মনের গভীরে দেশ,জীবনের ব্রত হলো শোষণমুক্তির রেশ।সেন্টগ্রেগরীর পথে মেধার দীপ্তি ছিল,তারুণ্যের কণ্ঠে তখন প্রতিবাদের ঝড় মিলল;ঢাকার আমতলায় উঠল বজ্রকণ্ঠ বাণী—সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সে বিদ্রোহী ধ্বনি।বাষট্টির উত্তাল দিন, শিক্ষা আন্দোলনের ঢেউ,রাজপথে তরুণ রনো—পিছু ফেরেননি কেউ;কারাগারের অন্ধ কুঠি, শিকল, নির্যাতন,তবু তাঁর বুকের ভিতর জ্বলেছে বিপ্লবী ক্ষণ।ছাব্বিশ সেলের পাশে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে,ইতিহাস লিখেছে সময় নীরব কারাকক্ষে;দেহ বন্দী হতে পারে, চিন্তা বন্দী নয়—জনতার মুক্তির স্বপ্ন মৃত্যুঞ্জয়ী হয়।ছাত্রের মিছিল পেরিয়ে শ্রমিকের ঘামে,টঙ্গীর বস্তিতে গেলেন জনতারই নামে;নিজের ঘর ছেড়ে তিনি শ্রমিকের ঘরে ছিলেন,রুটি-রুজির লড়াইয়ে জীবনটাকে দিলেন।ঘেরাওয়ের আগুন জ্বলে টঙ্গীর রাজপথে,শ্রমিকের অধিকার ওঠে বজ্রকণ্ঠ রথে;ধর্মঘটের দিনগুলোয় নেতৃত্বের শপথ,শ্রমিকের মুক্তির পথে অবিচল তাঁর রথ।উনসত্তরের গণজোয়ার, উত্তাল জনস্রোত,শোষণের প্রাসাদ কাঁপে, জাগে মানুষের ক্ষোভ;সত্তরের শ্রমিক লড়াই, ইতিহাসের গান—রনোর কণ্ঠে উচ্চারিত শ্রমজীবীর প্রাণ।একাত্তরের কালরাত্রি, আগুনমাখা দেশ,মুক্তির জন্য উঠল তখন রক্তাক্ত পরিবেশ;শিবপুর থেকে গ্রামান্তরে সংগ্রামের আহ্বান,মুক্তিযুদ্ধের পথজুড়ে রনোর অগ্রযাত্রা মহান।বিন্নাফুরের পথে গিয়ে ভাসানীর সনে,মুক্তির স্বপ্ন জেগে ছিল সংগ্রামী ক্ষণে;সীমান্ত পেরিয়ে সংগঠিত মুক্তির প্রত্যয়,স্বাধীনতার লড়াইয়ে ছিল তাঁর নির্ভয় হৃদয়।বেলেঘাটার সম্মেলনে উচ্চারিত যে বাণী,বাংলার মুক্তিসংগ্রাম—জনতারই কাহিনি;চৌদ্দ ঘাঁটির অগ্নিশপথ, প্রতিরোধের গান,স্বাধীনতার ইতিহাসে অমলিন তাঁর নাম।তারপরও থামেনি পথ, থামেনি সংগ্রাম,শ্রমিক-কৃষকের অধিকারে অবিরত অবিরাম;মার্কসের দর্শন হাতে, বাংলার মাটি পায়ে,তত্ত্ব আর বাস্তবতা মিলেছিল তাঁর গায়ে।ওয়ার্কার্স পার্টির গঠনে নির্মাণের কারিগর,রাজনীতি ও তত্ত্বে ছিলেন নির্ভীক পথপ্রদর্শক;বুর্জোয়া সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় উচ্চারণ,শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিতে করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষণ।এরশাদের কালো রাতে যখন দেশ অবরুদ্ধ,হুলিয়া মাথায় নিয়েও কণ্ঠ ছিল অদম্য;বারবার ঘরে হানা, বারবার আত্মগোপন,তবু রাজপথে ছিল তাঁর সংগ্রামের স্পন্দন।নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান জাগল জনতার প্রাণে,স্বৈরাচারের দুর্গ কাঁপল রাজপথের গানে;যে মানুষ ভয়কে জয় করে দাঁড়ায় মানুষের পাশে,তার নাম লেখা থাকে ইতিহাসেরই আশে-পাশে।কলমও ছিল তাঁর হাতে সংগ্রামেরই অস্ত্র,চিন্তার ভুবনজুড়ে ছিল জিজ্ঞাসার বিস্তর;মার্কসবাদ, অর্থনীতি, দর্শন, ইতিহাস,রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্য—সবখানেই তাঁর আভাস।‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বলে নিজ জীবনকথা,সময়ের আয়নায় তুলে ধরেছেন কত ব্যথা;বিপ্লবের তত্ত্ব নিয়ে করেছেন নিরন্তর পাঠ,জ্ঞান আর সংগ্রামে গড়েছেন নিজস্ব পথ।পুঁজির মৃত্যু, বিপ্লব, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন,গরিব মানুষের জোট—ছিল তাঁরই যাপন;বিজ্ঞানের প্রশ্নেও ছিল অনুসন্ধিৎসু মন,মানুষের মুক্তির জন্য নিবেদিত জীবন।চুরাশি বছরের পথ শেষে থেমে গেল প্রাণ,দুই হাজার চব্বিশের মে-রাতে নিভল দীপের টান;কিন্তু কি নিভে যায় কখনো সংগ্রামের অগ্নিশিখা?জনতার হৃদয়জুড়ে থাকে তার দীপ্ত লেখা।রনো মানে কেবল নয় একটি ব্যক্তির নাম,রনো মানে প্রতিরোধ, রনো মানে সংগ্রাম;রনো মানে শ্রমিকের অধিকার চাওয়ার গান,রনো মানে শোষণহীন সমাজের সন্ধান।যতদিন বৈষম্য থাকবে, যতদিন শোষণ,যতদিন মানুষের বুকে জমে থাকবে ক্ষোভের ক্ষরণ,ততদিন ফিরে আসবে তাঁর উচ্চারিত বাণী—মানুষের মুক্তির পথে নেই কোনো পরাজয় জানি।হে কমরেড রনো, আজ জন্মদিনে তোমায়,লাল সালাম জানাই আমরা সংগ্রামেরই ছায়ায়;তোমার ত্যাগ, তোমার স্বপ্ন, তোমার দীপ্ত পথ,জনতার মুক্তির লড়াইয়ে হোক আমাদের শপথ।সাম্প্রদায়িক অন্ধকার ভেঙে উঠুক ভোর,বৈষম্যের দেয়াল ভাঙুক, খুলুক মুক্তির দ্বার;সমতা আর ন্যায়ের পথে জাগুক বাংলার প্রাণ—মানুষের বাংলাদেশ হোক তোমার স্বপ্নের গান।লাল পতাকা উড়ুক আবার শ্রমিকেরই হাতে,কৃষকের হাসি ফুটুক সবুজ ধানের মাঠে;শোষণহীন মানবসমাজ গড়ার প্রত্যয়ে—রনোর স্মৃতি জেগে থাকুক মানুষের হৃদয়ে।কমরেড, তুমি নেই আজ—তবু আছো সঙ্গে,লড়াইয়ের প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি মানুষের রঙ্গে;ইতিহাসের পাতায় নয়, জনতার কণ্ঠে—লাল সালাম, হে রনো, বিপ্লবের অনন্ত স্রোতে।—(কমরেড রনো,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই বিশ্বজনীন মহান এই গুণীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তৎকালীন স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার প্রবক্তা, বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড হায়দার আকবর খান রনো’র জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তী কমরেড হায়দার আকবর খান রনো

বাংলাসাহিত্যের দ্রোহী আর সাম্যের কবি নজরুল

সাম্যবাদের অগ্রদূত, বাংলাসাহিত্যের দিকপাল, দ্রোহী আর সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী ২৯ আগস্ট।রাঢ় বাংলায় জন্ম নেওয়া নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিংশ শতাব্দীর অন্যতম স্বতন্ত্র ধারার সৃজনশীল ও প্রকৃতিবাদী অগ্রণী কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক। যিনি বাংলাসাহিত্যে অগ্রগামী ও প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি বাঙালি মনীষার এক তুঙ্গীয় নিদর্শন। দুই বাংলাতেই তার কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তার কবিতায় সাম্যবাদ আর দ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে – কাজেই “বিদ্রোহী কবি”, তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উভয় বাংলাতে প্রতি বৎসর উদযাপিত হয়ে থাকে।নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াযযিন হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মতো কবিতা; ধূমকেতুর মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী, এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ও শোষিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন।পরবর্তীতে ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা “নজরুল গীতি” নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।জন্ম ও প্রাথমিক জীবন১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে অবস্থিত। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাযারের খাদেম। নজরুলের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড় কাজী সাহেবজান ও কনিষ্ঠ উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম “দুখু মিয়া”। নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। ১৯০৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয় তাকে। এসময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা করেন। একই সাথে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন (আযান দাতা) হিসেবে কাজ করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেন না। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট উস্তাদ ছিলেন এবং আরবি, ফার্সি ও উর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গান রচনা করতেন। ধারণা করা হয়, বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়া ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং কবিয়া বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটো দলেই সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদের সাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজ কর্ম এবং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। একইসাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করেন। সেই অল্প বয়সেই তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং মেঘনাদ বধ। একদিকে মসজিদ, মাজার ও মক্তব জীবন, অপর দিকে লেটো দলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের অনেক উপাদান সরবরাহ করেছে। নজরুল কালীদেবীকে নিয়ে প্রচুর শ্যামা সঙ্গীতও রচনা করেন। নজরুল তার শেষ ভাষনে উল্লেখ্য করেন – “কেউ বলেন আমার বানী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।”১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। লেটো দলে তার প্রতিভায় সকলেই যে মুগ্ধ হয়েছিল তার প্রমাণ নজরুল লেটো ছেড়ে আসার পর তাকে নিয়ে অন্য শিষ্যদের রচিত গান: “আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন / ভাবি তাই নিশিদিন, বিষাদ মনে / নামেতে নজরুল ইসলাম, কি দিব গুণের প্রমাণ”, এই নতুন ছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল, এরপর ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে। মাথরুন স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন কুমুদরঞ্জন মল্লিক যিনি সেকালের বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার সান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। কুমুদরঞ্জন স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে নজরুল সম্বন্ধে লিখেছেন, “ছোট সুন্দর ছনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাশ পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত। আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম। সে বড় লাজুক ছিল।”যাহোক, আর্থিক সমস্যা তাকে বেশিদিন এখানে পড়াশোনা করতে দেয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়েছে। প্রথমে যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে। এরপর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবে বেশ কষ্টের মাঝেই তার বাল্যজীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এই দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ’র সাথে তার পরিচয় হয়। দোকানে একা একা বসে নজরুল যেসব কবিতা ও ছড়া রচনা করতেন তা দেখে রফিজউল্লাহ তার প্রতিভার পরিচয় পান। তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেন। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণী থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালে নজরুল এখানকার চারজন শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত হন। এরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনাবিশিষ্ট নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফার্সি সাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্য চর্চায় নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।সেনাবাহিনীতে নজরুল১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবী মৌলবীর কাছে তিনি ফার্সি ভাষা শিখেন। এছাড়া সহ-সৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সাথে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প: হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধি ইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এই সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফার্সি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।সাংবাদিকতায় নজরুলযুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্‌ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্‌, এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দুটির প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, আফজালুল হক প্রমুখের সাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদার আড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায় অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপি গ্রন্থের প্রচ্ছদ চিত্র। নজরুল নিজেই স্বরলিপি করেছিলেন।১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক- এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এই পত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশের নজরদারী শুরু হয়। যাই হোক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবিতা ও সঙ্গীতের চর্চাও চলছিল একাধারে। তখনও তিনি নিজে গান লিখে সুর দিতে শুরু করেননি। তবে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তার কয়েকটি কবিতায় সুর দিয়ে স্বরলিপিসহ পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে: হয়তো তোমার পাব দেখা, ওরে এ কোন স্নেহ-সুরধুনী- সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম গান প্রকাশিত হয়। গানটি ছিল: “বাজাও প্রভু বাজাও ঘন”।পারিবারিক জীবন১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে পরিচিত হন। তার সাথেই তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে প্রণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল।তবে এর আগে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথে। বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পরে কাবিনে নজরুলের ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং বাসর সম্পন্ন হবার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলের পরিচর্যা করেন। এক পর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।নজরুল সাম্যবাদের একজন অগ্রদূত ছিলেন। তিনি মুসলিম হয়েও চার সন্তানের নাম বাংলা এবং আরবি/ফারসি উভয় ভাষাতেই নামকরণ করেন। যেমন: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ।বিদ্রোহী নজরুলতখন দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নজরুল কুমিল্লা থেকে কিছুদিনের জন্য দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে থেকে আবার কুমিল্লা ফিরে যান ১৯ জুনে- এখানে যতদিন ছিলেন ততদিনে তিনি পরিণত হন একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীতে। তার মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গান গাওয়া। তখনকার সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে “এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়, আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে” প্রভৃতি। এখানে ১৭ দিন থেকে তিনি স্থান পরিবর্তন করেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবার কুমিল্লায় ফিরে যান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল- এ উপলক্ষে নজরুল আবার পথে নেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সাথে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গান করেন, “ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী”- নজরুলের এ সময়কার কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বিদ্রোহী নামক কবিতাটি। বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ করে। এই কবিতায় নজরুল নিজেকে বর্ণনা করেন:-“আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ জ্বালা, চির লাঞ্ছিত বুকে গতি ফেরআমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,আমি চপল মেয়ের ভালবাসা তার কাকন চুড়ির কন-কন।…মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত।যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,অত্যাচারীর খড়ুগ কৃপাণ ভীম রণ, ভূমে রণিবে না-বিদ্রোহী রণক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত।……………………..আমি চির বিদ্রোহী বীর –বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!”১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। ১৯২০-এর দশকে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন এক সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরপর স্বরাজ গঠনে যে সশস্ত্র বিপ্লববাদের আবির্ভাব ঘটে তাতে ধূমকেতু পত্রিকার বিশেষ অবদান ছিল। এই পত্রিকাকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,“ কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।”পত্রিকার প্রথম পাতার শীর্ষে এই বাণী লিখা থাকতো। পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হয়। এই রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জানুয়ারি নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দি প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তার এই জবানবন্দি বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:“আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে …।”১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। নজরুলকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে যখন বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জানুয়ারি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এতে নজরুল বিশেষ উল্লসিত হন। এই আনন্দে জেলে বসে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবিতাটি রচনা করেন।অসুস্থতা১৯৪০ সালে ৪২ বছর বয়সী নজরুল নবযুগে সাংবাদিকতার পাশাপাশি নজরুল বেতারে কাজ করছিলেন। এমন সময়ই অর্থাৎ ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তার অসুস্থতা সম্বন্ধে সুষ্পষ্টরূপে জানা যায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। এরপর তাকে মূলত হোমিওপ্যাথি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু এতে তার অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। সেই সময় তাকে ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হলে নিউরো সার্জারি করা হত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এরপর নজরুল পরিবার ভারতে নিভৃত সময় কাটাতে থাকে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তারা নিভৃতে ছিলেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে কবি ও কবিপত্নীকে রাঁচির এক মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল নজরুলের আরোগ্যের জন্য গঠিত একটি সংগঠন যার নাম ছিল নজরুল চিকিৎসা কমিটি, এছাড়া তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সহযোগিতা করেছিলেন। কবি চার মাস রাঁচিতে ছিলেন।এরপর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে নজরুল ও প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। ১০ মে লন্ডনের উদ্দেশ্যে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন ছাড়েন। লন্ডন পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে ছিলেন: রাসেল ব্রেইন, উইলিয়াম সেজিয়েন্ট এবং ম্যাককিস্ক- তারা তিনবার নজরুলের সাথে দেখা করেন। প্রতিটি সেশনের সময় তারা ২৫০ পাউন্ড করে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। রাসেল ব্রেইনের মতে নজরুলের রোগটি ছিল দুরারোগ্য বলতে গেলে আরোগ্য করা ছিল অসম্ভব। একটি গ্রুপ নির্ণয় করেছিল যে নজরুল “ইনভল্যুশনাল সাইকোসিস” রোগে ভুগছেন। এছাড়া কলকাতায় বসবাসরত ভারতীয় চিকিৎসকরাও আলাদা একটি গ্রুপ তৈরি করেছিলেন। উভয় গ্রুপই এই ব্যাপারে একমত হয়েছিল যে, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা ছিল খুবই অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। লন্ডনে অবস্থিত লন্ডন ক্লিনিকে কবির এয়ার এনসেফালোগ্রাফি নামক এক্স-রে করানো হয়। এতে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ড: ম্যাককিস্কের মত বেশ কয়েকজন চিকিৎসক একটি পদ্ধতি প্রয়োগকে যথোপযুক্ত মনে করেন যার নাম ছিল ম্যাককিস্ক অপারেশন। অবশ্য ড: ব্রেইন এর বিরোধিতা করেন।এই সময় নজরুলের মেডিকেল রিপোর্ট ভিয়েনার বিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়। এছাড়া ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও পাঠান হয়েছিল। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন অধ্যাপক রোঁয়েন্টগেন ম্যাককিস্ক অপারেশনের বিরোধিতা করেন। ভিয়েনার চিকিৎসকরাও এই অপারেশনের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তারা সবাই এক্ষেত্রে অন্য আরেকটি পরীক্ষার কথা বলেন যাতে মস্তিষ্কের রক্তবাহগুলির মধ্যে এক্স-রেতে দৃশ্যমান রং ভরে রক্তবাহগুলির ছবি তোলা হয় (সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি)- কবির শুভাকাঙ্খীদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে ভিয়েনার চিকিৎসক ডঃ হ্যান্স হফের অধীনে ভর্তি করানো হয়। এই চিকিৎসক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসক জুলিয়াস ওয়েগনার-জাউরেগের অন্যতম ছাত্র। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর কবিকে পরীক্ষা করানো হয়। এর ফলাফল থেকে ড. হফ বলেন যে, কবি নিশ্চিতভাবে পিক্‌স ডিজিজ নামক একটি নিউরনঘটিত সমস্যায় ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্তদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও পার্শ্বীয় লোব সঙ্কুচিত হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন বর্তমান অবস্থা থেকে কবিকে আরোগ্য করে তোলা অসম্ভব। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা ভিয়েনায় নজরুল নামে একটি প্রবন্ধ ছাপায় যার লেখক ছিলেন ডঃ অশোক বাগচি- তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ভিয়েনায় অবস্থান করছিলেন এবং নজরুলের চিকিৎসা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। যাহোক, ব্রিটিশ চিকিৎসকরা নজরুলের চিকিৎসার জন্য বড় অঙ্কের ফি চেয়েছিল যেখানে ইউরোপের অন্য অংশের কোন চিকিৎসকই ফি নেননি। অচিরেই নজরুল ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এর পরপরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায় ভিয়েনা যান এবং ড. হ্যান্স হফের কাছে বিস্তারিত শোনেন। নজরুলের সাথে যারা ইউরোপ গিয়েছিলেন তারা সবাই ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর রোম থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।বাংলাদেশে আগমন ও প্রয়াণ১৯৭২ সালের ২৪ মে তারিখে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। স্বাধীনতার স্থপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবির বাকি জীবন এখানেই কাটে। ১৯৭৬ সালে নজরুলকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারী করা হয়।এরপর যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৭৪ সালে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালে জাতীয় কবি নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই / যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”:- কবির এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তার সমাধি রচিত হয়। তবে প্রমিলা দেবীর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর স্বামীকে যেন তাঁর কবরের পাশে (চুরুলিয়ায় নজরুলের পৈতৃক বাড়িতে) সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু প্রমিলার শেষ ইচ্ছাটি আর পূরণ হয়ে উঠে নি।তার জানাজার নামাজে ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়। জানাজার নামায আদায়ের পরে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকামণ্ডিত নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুইদিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।সাহিত্য১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে কামাল পাশা- এতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। পরপর এর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: “প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্‌-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা” ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তার শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা খুকী ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ। কবি তার মানুষ কবিতায় বলেছিলেন:“পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল মূর্খরা সব শোন/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন”তিনি কালী দেবিকে নিয়ে অনেক শ্যামা সঙ্গিত রচনা করেন, ইসলামী গজলও রচনা করেন।সঙ্গীতনজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের অধিক। নজরুলের গান নজরুল সঙ্গীত নামে পরিচিত।১৯৩৮ সালে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। সেখানে তিনটি অনুষ্ঠান যথাক্রমে ‘হারামণি’, ‘নবরাগমালিকা’ ও ‘গীতিবিচিত্রা’র জন্য তাকে প্রচুর গান লিখতে হতো। ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানটি কলকাতা বেতার কেন্দ্রে প্রতি মাসে একবার করে প্রচারিত হতো যেখানে তিনি অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় রাগরাগিণী নিয়ে গান পরিবেশন করতেন।উল্লেখ্য, এই অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি কোনো একটি লুপ্তপ্রায় রাগের পরিচিতি দিয়ে সেই রাগের সুরে তার নিজের লেখা নতুন গান পরিবেশন করতেন। এই কাজ করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম নবাব আলী চৌধুরীর রচনায় ‘ম আরিফুন নাগমাত’ ও ফার্সি ভাষায় রচিত আমীর খসরুর বিভিন্ন বই পড়তেন এবং সেগুলোর সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাগ আয়ত্ত করতেন। এসব হারানো রাগের ওপর তিনি চল্লিশটিরও বেশি গান রচনা করেন। তবে স্বভাবে অগোছালো হওয়ায় নজরুল টুকরো কাগজে এসব গান লিখলেও সেগুলো মাসিক ভারতবর্ষের সঙ্গীত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জগৎ ঘটক একটি মোটা বাঁধানো খাতায় স্বরলিপিসহ তুলে রাখতেন। বাংলা গানের দুর্ভাগ্য যে, এই সংকলিত খাতাটি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়, যার বিজ্ঞপ্তি তিনি সে সময়কালের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে দিয়েছিলেন কিন্তু সেটি আর পাওয়া যায়নি।গদ্য রচনা, গল্প ও উপন্যাসনজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী”। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: “হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে”। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান- এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।নজরুল ‘ধূপছায়া‘ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এটিতে তিনি একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ এবং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রের। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন তিনি।সৈনিক জীবন ত্যাগ করে নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বাস করছিলেন। কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ ছিলেন এদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। এখান থেকেই তাই নজরুলের শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কমিউনিস্ট চেতনার বিকাশ শুরু হয়। কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও বক্তৃতায় অংশ নিতেন। এ সময় থেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পরিচিত হন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তার লাঙ্গল ও গণবাণী পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করেন সাম্যবাদী ও সর্বহারা কবিতাগুচ্ছ। এরই সাথে প্রকাশ করেছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর অনুবাদ জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যত- তার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রেড ফ্ল্যাগ-এর অবলম্বনে রচিত রক্তপতাকার গান।তখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন এবং মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন- অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের বিতারণ। আর খিলাফত আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কে মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, কারণ এই সমন্বিত সুলতানী শাসন ব্যবস্থার প্রধান তথা তুরস্কের সুলতানকে প্রায় সকল মুসলমানরা মুসলিম বিশ্বের খলিফা জ্ঞান করতো। নজরুল এই দুটি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা তথা স্বরাজ অর্জনে বিশ্বাস করতেন যা মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের বিপরীত ছিল। আবার মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদের মাধ্যমে নতুন তুরস্ক গড়ে তোলার আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমর্থন ছিল। তারপরও তিনি অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর কারণ, এই সংগ্রাম দুটি ভারতীয় হিন্দু মুসলমানদের সম্মিলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।সবদিক বিচারে নজরুল তার রাষ্ট্রীয় ধ্যান ধারণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন কমরেড মুজফফর আহমদ ও কামাল পাশার দ্বারা। নজরুল ভেবেছিলেন তুরস্কের মুসলমানরা তাদের দেশে যা করতে পেরেছে ভারতীয় উপমহাদেশে কেন তা সম্ভব হবে না? গোড়ামী, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল কঠোর। তবে তার এই অবস্থানের পিছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল কামাল পাশার। তার জীবনের নায়ক ছিলেন কামাল পাশা ও কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। নজরুলও তার বিদ্রোহী জীবনে অনুরূপ ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। উল্লেখ্য ১৯২১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ ও নজরুল তালতলা লেনের যে বাসায় ছিলেন সে বাড়িতেই ভারতের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়েছিল। ১৯১৭ সনের রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেও নজরুল প্রভাবিত হন। এছাড়া তিনি কমরেড মুজফ্‌ফর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আজীবন।১৯২০-এর দশকের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন। প্রথমে কংগ্রেসে সমর্থন লাভের জন্য তিনি কলকাতা যান। কিন্তু কংগ্রেসের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে তিনি একাই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাচনে তিনি তেমন সাফল্য পান নি। এরপর সাহিত্যের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ অব্যাহত থাকে।কাজী নজরুল ইসলামের সম্মানে উৎসর্গিত কলকাতা মেট্রোর কবি নজরুল (গড়িয়া বাজার) মেট্রো স্টেশন।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চুরুলিয়ায় “নজরুল অ্যাকাডেমি” নামে একটি বেসরকারি নজরুল-চর্চা কেন্দ্র আছে। চুরুলিয়ার কাছে আসানসোল মহানগরে ২০১২ সালে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। আসানসোলের কাছেই দুর্গাপুর মহানগরের লাগোয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় অবস্থিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজধানী কলকাতার যোগাযোগ-রক্ষাকারী প্রধান সড়কটির নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম সরণি। কলকাতা মেট্রোর গড়িয়া বাজার মেট্রো স্টেশনটির নাম রাখা হয়েছে “কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন”।১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয়।কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তার রচিত “চল্‌ চল্‌ চল্‌, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) ২০০৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। এছাড়া সরকারিভাবে স্থাপিত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা শহরের একটি প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তাকে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একুশে পদক বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানসূচক পদক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।"দ্রোহের দীপ, সাম্যের কবি"অগ্নিবীণার তানে জাগে শোষিতের প্রাণ,ঝড়ের মতো ছুটে আসে মুক্তিরই গান।শৃঙ্খলের ঝনঝন ভেঙে দিয়ে রাত,নজরুলের কণ্ঠে ওঠে বিদ্রোহের প্রভাত।চুরুলিয়ার মাটিতে জন্ম নিল যে বীর,দুখু মিয়া নামটি ছিল—হৃদয় ছিল স্থির।দারিদ্র্যের কাঁটা মাড়িয়ে উঠল যে শিখর,মানুষেরই জয়গানে কাঁপল বিশ্ব-অন্তর।মসজিদের আজান আর লেটোর গানের সুর,পুরাণ কোরআনে বিচরণ, খুঁজলেন সত্যের নূর।হিন্দু-মুসলমান ভেদ ভুলে এক কাতার,মানুষের পরিচয়ই হলো তার সাধন ভজন।অগ্নিবীণা হাতে কবি, চোখে আগুন-জ্বালা,অত্যাচারীর প্রাসাদ কাঁপে শুনে তার বালা।“বিদ্রোহী”র বজ্রবাণী আকাশ করে চির,অন্যায়ের বুকের ওপর ওঠে ন্যায়ের শির।আমি সেই ক্ষুধার্ত মুখ, আমি মজুরের ঘাম,আমি কৃষকের মাটির গন্ধ, শ্রমিকেরই নাম।যতদিন শোষিত ঠকে, যতদিন জাগে ক্ষোভ,ততদিন নজরুলের গান জ্বালাবে বিপ্লব।সাম্যের সেই কবি বলেন—মানুষ সবার আগে,ধর্ম-বর্ণের প্রাচীর কেন মানুষেরই মাঝে?নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র—একই রক্তধারা,মানবতার মহাসাগরে সবাই সমান তারা।“মানুষ” বলে উচ্চারিত তার অমর বাণী,গ্রন্থের চেয়ে মানুষ বড়—সত্য তারই জানি।কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ান,যুক্তির দীপ জ্বেলে কবি অন্ধকার তাড়ান।ধূমকেতুর পত্র হাতে জ্বাললেন প্রতিবাদ,রাজশক্তির কারাগারেও হারেনি তার সাধ।রাজবন্দীর জবানবন্দী বজ্রকণ্ঠে কয়—সত্যকে কি বন্দী করা যায়? সত্য কখনো নয়।শৃঙ্খল যত শক্ত হোক, মুক্তির গান বাজে,বন্দী কবির কণ্ঠস্বর আজও মানুষের মাঝে।সাম্রাজ্যবাদের কালো রাত পেরিয়ে ভোরের টানে,নজরুল আজও পথ দেখান সংগ্রামী প্রাণে।গজলে যেমন প্রেমের সুর, শ্যামাসংগীতে ভক্তি,একই বুকে মিলল এসে নানা ধর্মের শক্তি।হাজার গানের সুরে তিনি গড়লেন মিলন-সেতু,বাংলার প্রাণে আজও বাজে সেই অমর ঋতু।সৈনিকের পোশাক খুলে কলম হলো তলোয়ার,শোষিতের অধিকারেতে উঠল দৃপ্ত শপথ।মুজফ্ফরের সাথী হয়ে সাম্যের পথে চলা,শ্রমিক-কৃষক-জনতারই স্বপ্ন করলেন ভোলা?না—তাদেরই অধিকার ছিল তাঁর সাধনার ধন,সমতার বাংলাদেশ হোক—ছিল সেই স্পন্দন।বৈষম্যের বিষদাঁত ভেঙে ন্যায়ের সমাজ চাই,নজরুলের সেই স্বপ্ন আজও ভুলিনি ভাই।রোগ এসে স্তব্ধ করল কবির বাণীধারা,নীরব হলো কণ্ঠ, তবু নীরব নয় সে তারা।শরীর যখন বন্দী হলো, মুক্ত রইল গান,নজরুলের অগ্নিস্মৃতি জাগায় কোটি প্রাণ।দুই বাংলার হৃদয়জুড়ে একই সুরের ঢেউ,নজরুলের মতো কবি পৃথিবীতে আর ক'জন কেউ?জাতীয় কবির মর্যাদায় বাংলাদেশে তিনি,মানবতার বিশ্বকবি—সবার আপন তিনি।ঊনসত্তরের নয়—শতবর্ষ পেরিয়ে আজও,তারুণ্যের রক্তে বাজে বিদ্রোহী সেই সাজও।যেখানে অন্যায়, সেখানেই তার ডাক—“শির উঁচু করে দাঁড়াও, ভাঙো অন্যায়ের বাঁধ।”মসজিদেরই পাশে শুয়ে শুনছেন আজান,ঢাকার মাটির বুকেই ঘুমায় অগ্নিমান।মৃত্যু তাকে থামায়নি, থামেনি তার বাণী,শোষিত মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও অম্লানখানি।যতদিন ক্ষুধা থাকবে, যতদিন থাকবে ভয়,যতদিন বৈষম্যের হাতে মানুষের পরাজয়,ততদিন দ্রোহী কবি ফিরবেন গান হয়ে—সাম্যের পতাকা তুলে জনতার প্রাণ হয়ে।এসো তবে নজরুল হাতে নতুন শপথ নিই,বৈষম্যের সব দেয়াল আজ একে একে ভাঙি।অসাম্প্রদায়িক মানবভূমি গড়ি ন্যায়ের তরে,শ্রমিক-কৃষক মানুষের অধিকার থাকুক ঘরে ঘরে।দ্রোহের আগুন জ্বালো, সাম্যের মশাল ধরো,অন্যায়ের অন্ধকারে সত্যের সূর্য গড়ো।নজরুল মানে মুক্তি, নজরুল মানে গান—নজরুল মানে মানুষের অমর জয়গান।রেড সেলুট, হে কবি, দ্রোহের মহারথী,সাম্যের স্বপ্নে তুমি চির অমর জ্যোতি।বাংলার মাটি যতদিন, যতদিন মানবপ্রাণ—ততদিন বাজবে তোমার বিদ্রোহী জয়গান।—(দ্রোহের দীপ, সাম্যের কবি নজরুল,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই বিশ্বজনীন মহান এই গুণীর সাহিত্য, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। রেড সেলুট বাংলাসাহিত্যের দিকপাল, দ্রোহী আর সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম!সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

বাংলাসাহিত্যের দ্রোহী আর সাম্যের কবি নজরুল

স্বার্থের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা

দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা, রটনা, দুর্ঘটনা, হানাহানি কিংবা ছোট-বড় সংঘাতের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এর নেপথ্যে কোনো না কোনো স্বার্থ প্রায়ই কাজ করে। কখনো সেই স্বার্থ প্রয়োজনের সীমায় থাকে, আবার কখনো তা স্বার্থপরতার অন্ধকার সীমা অতিক্রম করে মানুষকে এমন এক আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যের সুখ,দুঃখ, প্রাপ্য কিংবা অধিকার আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।আধুনিক সমাজে মানুষের মূল্যায়নও অনেক সময় মানুষ হিসেবে নয়, তার অবস্থান ও সামর্থ্য দিয়ে করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্ধুতালিকায় কত মানুষই তো থাকে। কিন্তু যার সামাজিক পদমর্যাদা আছে, প্রভাব আছে কিংবা ভবিষ্যতে আরও ওপরে ওঠার সম্ভাবনা আছে, তার একটি পোস্ট ঘিরে শুরু হয় প্রশংসার বন্যা। দীর্ঘ মন্তব্য, প্রশংসাসূচক শব্দ, অতিরিক্ত সমীহ। অথচ একই তালিকায় থাকা এমন কেউ, যার সামাজিক অবস্থান আছে কিন্তু আর্থিক বা প্রভাবের দিক থেকে ‘দেওয়ার’ মতো কিছু নেই, তার পোস্টে হয়তো একটি লাইক দিয়েই দায়িত্ব শেষ। আর যার সামাজিক মর্যাদাই নেই, সে আপন আত্মীয় হলেও অনেকের কাছে যেন অদৃশ্য।মানুষের প্রতি ভালোবাসার জায়গায় যদি মানুষের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেখানে সম্পর্ক থাকে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের প্রাণ থাকে না। থাকে হিসাব। কে কতটা কাজে আসবে, কার কাছ থেকে কী পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে থাকলে নিজের পরিচিতি বাড়বে, কার সান্নিধ্য ভবিষ্যতে সুবিধা এনে দিতে পারে, এসব হিসাব নিঃশব্দে অনেক সম্পর্কের ভিত গড়ে দিচ্ছে।সমাজে যার দাপট আছে,তার চারপাশে মানুষের ভিড় জমে। যার অর্থ আছে, তার কথার গুরুত্ব বেড়ে যায়। তিনি খুব শিক্ষিত নাও হতে পারেন,কথাবার্তায় প্রজ্ঞার গভীরতা নাও থাকতে পারে,তবু তার সামনে অনেকে মনোযোগী শ্রোতার ভান করেন। মাথা নাড়েন,সম্মতি জানান,প্রশংসা করেন। কারণ সেখানে কোনো না কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকে।অথচ যে মানুষটি সৎ, পরিশ্রমী, নিরহংকার কিন্তু অর্থহীন, তার মূল্যায়ন অনেক সময় হয় না। দরিদ্র আত্মীয় অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়ার সময় থাকে না; কিন্তু অর্থবান আত্মীয় অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়ার মানুষের অভাব হয় না। যেন মানুষের মূল্য তার হৃদয়ে নয়, তার সম্পদের পরিমাণে।এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রেও স্বার্থপরতা দলগত সম্পর্ক নষ্ট করে। কেউ অন্যের শ্রমের কৃতিত্ব নিজের নামে নিতে চায়, কেউ সহকর্মীর সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার বদলে ঈর্ষান্বিত হয়। কারণ আধুনিক প্রতিযোগিতার এক অদৃশ্য শিক্ষা যেন হয়ে উঠেছে, ‘আমি বড় হলেই হলো; অন্যজন কোথায় দাঁড়াল, তা আমার বিষয় নয়।’সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সেখানে অনেকেই নিজের জীবনের সুখের মুহূর্তগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন জীবন মানেই আনন্দ,সাফল্য ও প্রাচুর্য। অথচ ছবির আড়ালে থাকতে পারে অশান্তি, নিঃসঙ্গতা কিংবা গভীর শূন্যতা। অন্যদিকে ভিউ, লাইক, শেয়ার কিংবা অর্থের জন্য কেউ কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে বিনোদনে পরিণত করে। কেউ দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে ক্যামেরা বের করেন। কেউ গুজব ছড়ান কয়েকটি ক্লিকের আশায়। কেউ অন্যকে অপমান করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান।মানুষের অসহায়ত্ব যখন অন্যের বিনোদন হয়ে যায়, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো সমাজের বিবেক আহত হয়।তবে জীবনের একটি অদ্ভুত সত্যও আছে। অর্থ ও প্রাচুর্য সব সুখের নিশ্চয়তা নয়। যার অর্থ আছে, সে হয়তো ইচ্ছেমতো সবকিছু কিনতে পারে, কিন্তু সবকিছু উপভোগ করতে পারে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থেকেও তার ঘুম নাও আসতে পারে। আর যে মানুষটি অল্পে জীবন কাটায়, সে হয়তো সাধারণ খাবারেই তৃপ্ত, সাধারণ বিছানাতেই শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে নেয়। মানুষের সুখের হিসাব ব্যাংক ব্যালান্সে লেখা থাকে না। সুখের একটি অংশ থাকে মনের ভেতর, আর সেই অংশটি অনেক সময় অর্থ দিয়ে কেনা যায় না।ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে গভীর সতর্কবাণী রয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১১৭তম সূক্তে ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষের সঙ্গে অন্ন ভাগ করে নেওয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দানের বিপরীতে কৃপণতাকে শুধু সামাজিক দোষ হিসেবে নয়, নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের কাছে থাকা অন্ন, সম্পদ কিংবা সামর্থ্য কেবল নিজের জন্য আটকে না রেখে অন্যের প্রয়োজনেও তা ব্যয় করার মধ্যেই মানবতার প্রকৃত পরিচয়।‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীকে এক পরিবার হিসেবে দেখার যে মহৎ দর্শন ভারতীয় চিন্তায় পাওয়া যায়, তার সঙ্গে চরম আত্মকেন্দ্রিকতার কোনো মিল নেই। যে মানুষ শুধু নিজের সুখ, নিজের সম্পদ, নিজের সাফল্য এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত, সে ধীরে ধীরে বৃহত্তর মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।শিবপুরাণের আধ্যাত্মিক ভাবধারাতেও মানুষের অন্তর্গত পশুবৃত্তি জয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাগ, দ্বেষ, ঈর্ষা, অহংকার ও তীব্র স্বার্থপরতা মানুষকে তার মানবিক সত্তা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। মানুষের প্রকৃত উন্নতি বাহ্যিক আড়ম্বর, বিপুল সম্পদ কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে নয়; বরং অন্তরের শুদ্ধতা, পরোপকার, সংযম ও নিঃস্বার্থ কর্মে।শিবকে খুঁজতে দূর তীর্থে যাওয়ার আগে যদি একজন মানুষ তার পাশের ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকাতে না পারে, অসুস্থ প্রতিবেশীর কষ্ট অনুভব করতে না পারে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারে, তবে তার আধ্যাত্মিকতার গভীরতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।কারণ ঈশ্বরকে মন্দিরে খোঁজা যত সহজ, জীবের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখা তত কঠিন।নিঃস্বার্থ সেবা তাই কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি এক ধরনের সাধনা। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের উপকার করা, কারও দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, কারও অশ্রু মুছে দেওয়া, কারও ক্ষুধার সময় অন্ন ভাগ করে নেওয়া, এমনকি কখনো কখনো বিনিময়ের প্রত্যাশা না করে একটি ভালো কথা বলাও মানুষের ভেতরের আলোকে জাগিয়ে তোলে।যে মানুষ সারাজীবন সম্পর্ককে লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায় মাপে, একদিন যখন তার নিজের প্রয়োজন হয়, তখন সেই দাঁড়িপাল্লাই তার সামনে ফিরে আসে। মানুষ তখন তাকে ঘিরে থাকে না, কারণ সে নিজেই কোনোদিন মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসেনি। পরিবারে দূরত্ব তৈরি হয়, বন্ধুত্বে বিশ্বাস নষ্ট হয়, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। বাইরে যত পরিচিতি থাকুক, ভেতরে ততই বাড়তে থাকে শূন্যতা।স্বার্থপরতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষকে নিজের সাফল্যে বন্দি করে ফেলে। অন্যের উন্নতি তখন আনন্দের কারণ হয় না, বরং ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য কেউ এগিয়ে গেলে মনে হয়, নিজের জায়গা যেন ছোট হয়ে গেল। অথচ সত্য হলো, অন্যের আলো নিভিয়ে নিজের আলো উজ্জ্বল করা যায় না।পৃথিবীর সব অর্জনই ক্ষণস্থায়ী। অর্থ থাকবে না,পদ থাকবে না,ক্ষমতা থাকবে না,খ্যাতিও একদিন মুছে যাবে। যে মানুষ আজ শত মানুষের শ্রদ্ধার কেন্দ্রে, কাল হয়তো তার নামটিও কেউ মনে রাখবে না। শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে থেকে যায় তার ব্যবহার,তার ভালোবাসা,তার দয়া,তার সততা এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কিছু আলো।তাই স্বার্থ থাকা অপরাধ নয়। নিজের প্রয়োজন, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা ভাবা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই স্বার্থ যখন অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করে, সম্পর্ককে পণ্যে পরিণত করে, তখন তা স্বার্থ নয়, স্বার্থপরতা।আমাদের প্রয়োজন স্বার্থহীন মানুষ হওয়ার চেয়ে স্বার্থের সীমা বোঝা মানুষ হওয়া। কারণ মানুষ নিজের জন্য বাঁচবে, কিন্তু শুধু নিজের জন্য বাঁচবে না।জীবন যত দ্রুত এগিয়ে  যাচ্ছে, মানুষের হতে প্রযুক্তি যত বাড়ছে, পৃথিবী যত ছোট হয়ে আসছে, ততই আমাদের হৃদয় যেন ছোট হয়ে না যায়। মানুষের পরিচয় তার অর্থে নয়, তার পদে নয়, তার সামাজিক দাপটে নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতায়।যে হাত অন্যকে ঠেলে নিজে ওপরে উঠতে চায়, সে হয়তো সাময়িকভাবে ওপরে উঠতে পারে। কিন্তু যে হাত অন্যকে তুলে ধরতে শেখে, সে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।স্বার্থ থাকবে, কিন্তু স্বার্থপরতা নয়। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু হিংসা নয়। সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা থাকবে, কিন্তু অন্যের পতনের বিনিময়ে নয়। ধর্ম থাকবে, কিন্তু প্রদর্শন নয়। সম্পদ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে দানের হাত। আর জীবনের পথে যতদূরই যাই, মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাটুকু যেন হারিয়ে না ফেলি।কারণ পৃথিবীতে মানুষ অনেক, কিন্তু সত্যিকারের মানবিক মানুষই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখে।

স্বার্থের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমন: অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর জাগরণ

লায়ন মো: গনি মিয়া বাবুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)  একজন মহান পথপ্রদর্শক। তাঁর আগমন শুধু আরবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক নতুন আলোর সূচনা। এমন এক সময়ে তিনি পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়, বৈষম্য, অজ্ঞতা ও হিংসা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সত্য, ন্যায়, মানবতা, সাম্য ও শান্তির নতুন পথের সন্ধান পায়।হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম মক্কায় কুরাইশ বংশে। তাঁর জন্মের পূর্বেই পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং শৈশবেই তিনি মাতা আমিনাকেও হারান। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর চরিত্র গড়ে ওঠে সততা, বিশ্বস্ততা, সংযম ও মানবিকতার অসাধারণ বৈশিষ্ট্যে। নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বস্ত এবং ‘আস-সাদিক’ অর্থাৎ সত্যবাদী হিসেবে অভিহিত করত। তাঁর ব্যক্তিত্বের এই বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে, মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার আগে তিনি নিজের জীবনকেই সেই আদর্শের বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।তৎকালীন আরব সমাজে গোত্রভিত্তিক বিভাজন ছিল প্রবল। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ ও রক্তপাত ঘটত। দুর্বলদের ওপর সবলের অত্যাচার ছিল স্বাভাবিক বিষয়। নারী ও শিশুর অধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। দাসপ্রথা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সুদ, প্রতারণা, মদ্যপান, জুয়া ও নানা ধরনের সামাজিক অনাচার মানুষের জীবনকে গ্রাস করেছিল। কন্যাশিশুকে অবজ্ঞা করার মতো নির্মম প্রথাও সমাজের কিছু অংশে প্রচলিত ছিল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা কেবল কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত লাভ করেন। হেরা গুহায় প্রথম ওহি নাজিলের মধ্য দিয়ে তাঁর ওপর অর্পিত হয় মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বানের মহান দায়িত্ব। তাঁর আহ্বানের মূলকথা ছিল এক আল্লাহর ইবাদত, মানুষের প্রতি ন্যায় ও সদাচরণ এবং অন্যায় ও অসত্য থেকে বিরত থাকা। এই আহ্বান শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রজীবনে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার পথ নির্দেশ করেছিল।হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষের মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল মানুষকে তার বংশ, সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা নয়, বরং মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার নৈতিকতা ও কর্মে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন শ্রেণি ও গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় এক গভীর পরিবর্তনের বার্তা বহন করেছিল। ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল, প্রভু-দাসের মধ্যে মানবিক মর্যাদার যে মৌলিক সমতা তিনি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। কন্যাসন্তানকে অবহেলা না করে তাদের ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে লালন-পালনের শিক্ষা দেওয়া হয়। নারীর সম্পত্তির অধিকার, বিবাহে সম্মতি, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরিবারে নারীর প্রতি সদাচরণকে নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার যে দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর শিক্ষায় প্রতিফলিত হয়েছে, তা সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে।শুধু মানুষের অধিকার নয়, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি বিশেষ যত্নের শিক্ষা দিয়েছেন। এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, দরিদ্রকে অবহেলা করা কিংবা অসহায়ের অধিকার নষ্ট করাকে তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। সমাজের উন্নয়ন কেবল বিত্তবানদের সমৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রকৃত পরিচয় নিহিত, তাঁর শিক্ষায় এই উপলব্ধি সুস্পষ্ট।ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মাপে ও ওজনে কম দেওয়া, প্রতারণা, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ এবং শোষণমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা না থাকলে সমাজে বৈষম্য ও অবিচার বাড়ে। বর্তমান সময়েও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সততা, ন্যায় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে সেই উন্নয়ন মানুষের প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ক্ষমাশীলতা। মক্কাবাসীর নির্যাতন, অপমান ও বিরোধিতার মুখেও তিনি প্রতিশোধপরায়ণতার পথ বেছে নেননি। মক্কা বিজয়ের পর তাঁর হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যাপক ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত শক্তি কেবল প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়, বরং ক্ষমা, সংযম ও মানবিকতার মাধ্যমে হৃদয় জয় করার মধ্যেও শক্তির প্রকাশ ঘটে।হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনে শান্তি ও সহাবস্থানের গুরুত্বও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক ও চুক্তির ক্ষেত্রে তিনি ন্যায় ও দায়িত্বশীলতার নীতি অনুসরণ করেছেন। মদিনায় একটি বহুমাত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও পারস্পরিক দায়িত্বের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বিশ্বে ধর্ম, মত, জাতি ও রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে যখন বিভাজন ও সংঘাত দেখা যায়, তখন তাঁর ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থানের শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করা জরুরি।হযরত মুহাম্মদ (সা.) জ্ঞান ও চিন্তার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। অজ্ঞতা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নতির বড় বাধা। জ্ঞান মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। তাই তাঁর শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানার্জন, চিন্তা ও উপলব্ধির পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটে।হযরত মুহাম্মদ  (সা.) এর চরিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিনয়। তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা দাবি করেননি। নেতৃত্বকে তিনি কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং মানুষের সেবা ও কল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই নেতৃত্বের দর্শন আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। কারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে ক্ষমতার পাশাপাশি সততা, জবাবদিহিতা ও সেবার মানসিকতা অপরিহার্য।আজকের পৃথিবী প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুততর হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে নানা সুবিধা। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রতারণা, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিভাজনও মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা নতুন করে উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।হযরত মুহাম্মদ (স.) এর  আগমনের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু তাঁর জন্মের ঘটনা স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর আদর্শকে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে কতটা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান বিবেচনা। সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, অন্যের অধিকার সম্মান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা নিশ্চিত করার মধ্যেই তাঁর শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে পারে।হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন তাই ইতিহাসের একটি ঘটনা মাত্র নয়, এটি মানবতার জন্য একটি নৈতিক জাগরণের সূচনা। তিনি এমন এক সমাজকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে পরিচালিত করেছিলেন, যে সমাজের বহু প্রচলিত অন্যায় ও বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করা সহজ ছিল না। তাঁর জীবন দেখিয়েছে, পরিবর্তন শুধু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আসে না, সত্য, নৈতিকতা, ধৈর্য, আদর্শ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমেও একটি সমাজের আমূল পরিবর্তন সম্ভব।আজ যখন পৃথিবী নানা সংকটে জর্জরিত, তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক প্রয়োজনও বটে। তাঁর শিক্ষা মানুষকে বিভেদ নয়, ঐক্যের দিকে; ঘৃণা নয়, সহমর্মিতার দিকে; অন্যায় নয়, ন্যায়ের দিকে এবং অজ্ঞতা নয়, জ্ঞানের দিকে আহ্বান জানায়।অন্ধকারের মধ্যে আলো যেমন পথ দেখায়, তেমনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ মানবজাতির জন্য নৈতিক আলোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর আগমনের মর্মার্থ তখনই যথাযথভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব, যখন তাঁর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর শিক্ষা ও আদর্শকে আমাদের চরিত্র, পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও শান্তির যে পথ তিনি দেখিয়েছেন, সেই পথেই নিহিত রয়েছে একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গড়ার শক্তি। তাঁর আগমন তাই অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর জাগরণ, আর সেই আলো আজও মানবতার পথকে আলোকিত করে চলেছে।হযরত মুহাম্মদ (সা.)  আলোর পথপ্রদর্শক, যাঁর আগমনে শুধু একটি জাতি নয়, সমগ্র মানবতার সামনে ন্যায় ও কল্যাণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। তাঁর আদর্শের আলোয় ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক জাগরণই পারে পৃথিবীকে আরও সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক করে তুলতে।  হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন শুধু  একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়,এটি ছিল অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর জাগরণ, যে আলো যুগের পর যুগ মানবতার পথ দেখিয়ে চলেছে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে বিশ্বমন্ডলের  সকল বাসিন্দাকে   জাগ্রত থাকার আহ্বান জানায়। মানবিক, শান্তিময়, মঙ্গলময়  ও আলোকিত  পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করতে সর্বস্তরে আমাদের প্রিয় রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শের বাস্তবায়ন অপরিহার্য।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি), কেন্দ্রীয় কমিটিসভাপতি, টেপিরবাড়ী পশ্চিমপাড়া মরহুম কাছম আলীর বাড়ী জামে মসজিদ, শ্রীপুর, গাজীপুরযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমন: অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর জাগরণ

বিশ্ব ভূ-রাজনীতির উত্তাপ ও ইংল্যান্ডের ভঙ্গুর অর্থনীতি: সংকট, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা যুক্তরাজ্য বা ইংল্যান্ডের অর্থনীতিকে এক নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারী এবং পরবর্তী মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই এই আন্তর্জাতিক সংঘাত যুক্তরাজ্যের শিল্প, বিদ্যুৎ খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে।​জ্বালানি সংকট ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি (Cost of Living): যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাজ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে; যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি (Inflation) বৃদ্ধি পেয়ে ২.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের কেনাকাটার ক্ষমতা হ্রাস করেছে।  ​সুদের হার ও ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের নীতি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Bank of England) সুদের হার উঁচুতে ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মর্টগেজ (বাড়ির ঋণ) শোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।  ​সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত (Supply Chain Disruption): আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত না থাকায় ব্রিটেনে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে, যা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।  ​যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ONS)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:  ​বর্তমান বেকারত্বের হার (Unemployment Rate): যুক্তরাজ্যের বর্তমান বেকারত্বের হার ৪.৯%। অর্থাৎ দেশের প্রায় ১৭.৬ লাখ মানুষ এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিহীন।  ​শ্রমবাজারের মন্দা: উচ্চ বেতন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো নতুন কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান বা "Job Vacancy" দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।সূচকবর্তমান হার/সংখ্যাজাতীয় বেকারত্বের হার৪.৯%বেকার মানুষের সংখ্যাপ্রায় ১৭.৭ লাখ (১.৭৭ মিলিয়ন)কর্মক্ষম মানুষের হার৭৫.১%৩. ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: কোন পথে হাঁটছে দেশ?​আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থাগুলো (যেমন OECD) আশঙ্কা করছে যে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হওয়া দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য অন্যতম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস (GDP Growth Forecast) কমিয়ে প্রায় ০.৭%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।  ​সংক্ষিপ্ত থেকে মাঝারি মেয়াদী চাপ: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় আগামী শীতে মূল্যস্ফীতি ৩% ছাড়িয়ে যেতে পারে। সাধারণ জনগণের ওপর করের চাপ আরও বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হয়ে পড়বে।​দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা: যদি সরকার দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) প্রসার বাড়াতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়, তবে যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। তবে এর জন্য বাণিজ্য নীতি সংস্কার ও নতুন শিল্পে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।  ইরান-আমেরিকা সংঘাতের পর পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে, তা ইংল্যান্ডকে নতুন এক মন্দার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেকারত্বের হার নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক রাখা বর্তমান সরকারের জন্য এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব ভূ-রাজনীতির উত্তাপ ও ইংল্যান্ডের ভঙ্গুর অর্থনীতি: সংকট, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ মেনে চলি: সুখী ও সফল জীবন গড়ি

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুলমানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো ইহকালীন জীবনে শান্তি ও কল্যাণ লাভ করা এবং পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মানবজাতির জন্য এই সফলতার সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসুল এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর জীবনাদর্শ  সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, ধৈর্য, সততা ও মানবকল্যাণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আমরা সত্যিকারের সুখী ও সফল জীবন গড়ে তুলতে পারব।হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের  জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তাঁর শৈশব থেকেই সততা ও বিশ্বস্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে অভিহিত করত। তিনি কখনো মিথ্যা বলতেন না এবং কারও আমানতের খিয়ানত করতেন না। তাঁর এই গুণ আমাদের শেখায় জীবনে সফল হতে হলে সর্বপ্রথম সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত হতে হবে।প্রিয় রাসুল (সা.) সব সময় সত্য কথা বলতেন এবং অন্যদেরও সত্যবাদী হতে উৎসাহিত করতেন। বর্তমান সমাজে মিথ্যা, প্রতারণা ও অসততার কারণে নানা ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আমরা যদি রাসুল (সা.)-এর সত্যবাদিতা ও আমানতদারির আদর্শ অনুসরণ করি, তাহলে পারস্পরিক বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।প্রিয় রাসুল (সা.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ছিল উত্তম চরিত্র। তিনি মানুষের সঙ্গে নম্র ও বিনয়ী আচরণ করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন, বড়দের সম্মান করতেন এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়াতেন। তিনি কাউকে অপমান করতেন না এবং কারও মনে অযথা কষ্ট দিতেন না। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার পোশাক বা সম্পদে নয়, বরং তার চরিত্র ও ব্যবহারে। তাই সুখী জীবন গড়তে হলে আমাদের কথাবার্তা ও আচরণে ভদ্রতা, নম্রতা ও সহানুভূতি থাকতে হবে।প্রিয় রাসুল (সা.) ছিলেন অসীম দয়া ও ক্ষমার প্রতীক। যারা তাঁর সঙ্গে অন্যায় করেছে, সুযোগ পেলে তিনি তাদের অনেককেই ক্ষমা করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর হাতে শত্রুদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই মহানুভবতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ঘৃণা ও প্রতিশোধ মানুষের জীবনকে অশান্ত করে, আর ক্ষমা মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আমরা যদি ক্ষমাশীল ও সহনশীল হই, তাহলে অনেক বিরোধ সহজেই দূর করা সম্ভব।প্রিয় রাসুল (সা.) সব মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতেন। ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল কিংবা আপন-পর কারও ক্ষেত্রে তিনি ন্যায়ের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি অন্যায় ও জুলুমকে কখনো সমর্থন করেননি। আজকের পৃথিবীতে বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়সহ নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। তাই রাসুল (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ করে আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে অন্যায় পরিহার করতে হবে এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হবে।প্রিয় রাসুল (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, পিতা, আত্মীয় ও প্রতিবেশী। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতেন এবং তাদের অধিকারকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি সন্তানদের ভালোবাসতেন এবং নারীদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে পারিবারিক অশান্তি, অবহেলা ও সম্পর্কের দূরত্ব অনেক বেড়েছে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের মাধ্যমে আমরা রাসুল (সা.)-এর পারিবারিক আদর্শ অনুসরণ করতে পারি।প্রিয় রাসুল (সা.) প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন মানুষ নিজে ভালো থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার আশপাশের মানুষও ভালো আছে কি না, সে বিষয়েও তাকে সচেতন হতে হয়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর মহান আদর্শের অংশ। সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পেলে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি গড়ে উঠবে।ইসলামে জ্ঞানার্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) মানুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথে আহ্বান করেছেন। জ্ঞান মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। তাই তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হলে আমাদের ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় ধরনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে হবে। শিক্ষিত, নৈতিক ও দক্ষ মানুষই দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।প্রিয় রাসুল (সা.) অলসতা পছন্দ করতেন না। তিনি পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন। একজন মানুষকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং অন্যের ওপর অযথা নির্ভরশীল না হয়ে আত্মনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, কর্মজীবীকে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং প্রত্যেককে নিজের কাজকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নতি সম্ভব।প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবন ছিল অসংখ্য পরীক্ষা ও সংকটে পরিপূর্ণ। মক্কার বিরোধিতা, নির্যাতন, সামাজিক বয়কট এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ধৈর্য হারাননি। তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সত্যের পথে অটল ছিলেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি জীবনে বিপদ ও ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু হতাশ না হয়ে ধৈর্য ও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সৎ পথে পরিশ্রম করলে সফলতার পথ অবশ্যই উন্মুক্ত হবে।প্রিয় রাসুল (সা.) শুধু মানুষের প্রতিই নয়, জীবজন্তু ও প্রকৃতির প্রতিও দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অকারণে গাছপালা ধ্বংস বা পরিবেশের ক্ষতি করা তাঁর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমান পৃথিবীতে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তাঁর দয়া ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা অনুসরণ করে আমাদের পরিবেশ রক্ষা এবং জীবজন্তুর প্রতি সদয় হতে হবে।দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণদের উচিত রাসুল (সা.)-এর আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সৎ, দায়িত্বশীল ও কর্মঠ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। মাদক, সন্ত্রাস, অশ্লীলতা, মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে দূরে থেকে শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবসেবার পথে এগিয়ে যেতে হবে। সময়ের মূল্য বুঝে তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই তরুণ সমাজ দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারবে।শুধু রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ  জানা যথেষ্ট নয়, তাঁর আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সত্য কথা বলব, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব, বাবা-মাকে সম্মান করব, ছোটদের স্নেহ করব, অসহায়কে সাহায্য করব, অন্যের অধিকার নষ্ট করব না এবং রাগের সময় সংযমী হওয়ার চেষ্টা করব। একই সঙ্গে প্রত্যেককে  নিয়মিত ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও ভালো কাজের মাধ্যমে নিজেদের চরিত্র উন্নত করতে হবে।প্রিয় রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর জীবন থেকে আমরা সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমা, ধৈর্য, পরিশ্রম, জ্ঞানার্জন, দায়িত্ববোধ ও মানবসেবার শিক্ষা পাই। বর্তমান বিশ্বের অশান্তি, হিংসা, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে তাঁর আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। তাই শুধু মুখে রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কথা না বলে তাঁর সুন্নাহ ও উত্তম চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে। ব্যক্তি যদি আদর্শবান হয়, পরিবারে শান্তি আসে, পরিবার আদর্শবান হলে সমাজ সুন্দর হয়, আর সমাজ সুন্দর হলে দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়।আসুন আমরা প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ মেনে চলি, সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে যাই এবং সুখী, শান্তিময় ও সফল জীবন গড়ে তুলি।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি), কেন্দ্রীয় কমিটিসভাপতি, টেপিরবাড়ী পশ্চিমপাড়া মরহুম কাছম আলীর বাড়ী জামে মসজিদ, শ্রীপুর, গাজীপুরযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটিই-মেইল:  lionganibabul@gmail.com 

প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ মেনে চলি: সুখী ও সফল জীবন গড়ি

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কথাসাহিত্যিক শহীদ জহির রায়হানের জন্মের ৯১ বছর

এ দেশের প্রথিতযশা লেখক ও সাংবাদিক, চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি পরিচালক ও প্রযোজক জহির রায়হানের ৯১তম জন্মবার্ষিকী আজ।তিনি ছিলেন একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক শহিদুল্লাহ কায়সারের অনুজ।দেশের খ্যাতিমান এই কথাসাহিত্যিক ও কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতার নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান। তবে তিনি জহির রায়হান নামেই বেশি পরিচিত।দেশে ও বিদেশে জহির রায়হান নামটাই তাঁকে চিনে নেবার জন্য যথেষ্ট। তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধানের পর তাঁকে নিয়ে ও তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে লেখা ও গবেষণা হয়েছে বিস্তর। এখনো তিনি আছেন লেখায়, আলোচনায়, গবেষণায়। পেয়েছেন (মরণোত্তর) একুশে পদক, (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার, (মরণোত্তর) বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ সম্মাননা (মরণোত্তর)। এ ছাড়া জীবদ্দশাতেই তিনি পেয়েছেন দেশি ও বিদেশি অনেক পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা।১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জহির রায়হান জন্মগ্রহন করেন। এই মহান চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিকের প্রতি শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট চলার সময় রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। মানুষ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার কাজে ব্যস্ত, তখন তিনি বিভিন্নভাবে নিখোঁজ ভাইকে খোঁজার অভিযান শুরু করেন। মিরপুরে তাঁর ভাই শহীদুল্লা কায়সারসহ আরও অনেককে বিহারিরা আটকে রেখেছে বলে খবর পেয়ে ৩০ জানুয়ারি সকালে তিনি সেনাবাহিনী ও পুলিশের বহরের সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে যান। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিহারিরা কালাপানি পানির ট্যাংকের সামনে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে তিনি নিহত হন। পরদিন ৩১ জানুয়ারি মিরপুর বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলমুক্ত হলেও তার লাশ পাওয়া যায় নি।বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আমাদের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রতি।স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে লিখলেন ‘ওদের জানিয়ে দাও’ নামের একটি কবিতা। সেই কবিতা প্রকাশিত হলো চতুষ্কোণ পত্রিকায়। কবিতায় উঠে এলো নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মর্ম যাতনার কথা।‘ওদের জানিয়ে দাও,ওরা আমার ভাই-বোনকেকুকুর বিড়ালের মত মেরেছেওদের স্টীম রোলারের নিচেওদের জানিয়ে দাওওরা দেখেও যদি না দেখেবুঝেও যদি না বোঝে’তারও আগের কথা- কলকাতার বিখ্যাত মিত্র ইন্সটিটিউটে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের প্রভাবে প্রথম রাজনৈতিক সংস্পর্শে আসা মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ’র। তারপর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে বিক্রি করতেন ‘স্বাধীনতা পত্রিকা’। তার বাবা মাওলানা হাবিবুল্লাহ ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক।১৯৪০ সালে কলকাতা মডেল স্কুলে ভর্তির মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল জহির রায়হানের। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার পর তাকে মিত্র ইন্সটিটিউটে ভর্তি করানো হয়। দেশভাগের কিছুদিন পরেই তারা চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। স্থানীয় আমিরাবাদ স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে।মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ থেকে জহির রায়হান, এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ। তখন ইন্টারমিডিয়েটে তিনি ঢাকা কলেজে পড়ছেন। বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের সুবাদে মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যেক কর্মীর পার্টির দেওয়া একটি নাম থাকতো। মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ’র পার্টি নাম রায়হান রেখেছিলেন মণি সিংহ। তারপর থেকে মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ দিনে দিনে পরিচিত হয়ে উঠলেন জহির রায়হান নামেই।১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারির রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রদের মিছিলে যে দশ জনের দলটি সর্বপ্রথম ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলো তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া জহির রায়হান।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন জহির রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই সাংবাদিক হিসেবে যুগের আলো পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু হয় তার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আরও দুটি পত্রিকায় কাজ করেছিলেন জহির রায়হান। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়েছিলো তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ।চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের অভিষেক হয় ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাভেরা চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন আখতার জং কারদার। পরিচালক হিসেবে জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ১৯৬১ সালে, ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রের অভিনয় করেছিলেন খান আতাউর রহমান, শবনম, সুমিতা দেবী। একই বছর সুমিতা দেবীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল জহির রায়হানের। এই চলচ্চিত্র জহির রায়হানের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র হলেও চারটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ফেলেছিলেন সুমিতা দেবী। এর আগের বছর প্রকাশিত হয়েছিলো জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’। পরের বছর জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন সোনার কাজল। তবে জহির রায়হান মূল আলোচনায় আসেন তারও এক বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কাঁচের দেয়াল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল এটি। জহির রায়হান পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মাননা।জহির রায়হানের হাত ধরেই পাকিস্তানের চলচ্চিত্র রঙিন চলচ্চিত্রের জগতে প্রবেশ করেছিল। ১৯৬৪ সালে তার নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের ৬টি গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বছরটি জহির রায়হানের জন্য দারুণ একটি বছর ছিল। একই বছরে প্রকাশিত হয়েছিল তার রচিত কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’। এই উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন জহির রায়হান।এরপর একাধারে একুশে ফেব্রুয়ারি, বাহানা, বেহুলা, আনোয়ারা, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’। একই বছর প্রকাশিত হয়েছিল তার আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘বরফ গলা নদী’।১৯৭০ সালে মুক্তি পেয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। এটি জহির রায়হানের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বলে বিবেচিত। সামাজিক এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন বাঙালি স্বাধীনতা আন্দোলনকে রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল। এতে অভিনয় করেছিলেন রাজ্জাক, সুচন্দা, রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন। চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে আমার সোনার বাংলা গানটি প্রথম চিত্রায়িত হয়েছিল। এখন যা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। একই বছর ‘টাকা আনা পাই’ নামে আরও একটি অসামান্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেই বছরই তিনি নির্মাণ শুরু করেছিলেন তার লেট দেয়ার বই লাইট চলচ্চিত্রের। এই চলচ্চিত্রটি ছিল চিত্রনাট্য ছাড়া। এই চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্য থেকে সংলাপ সবই ছিলো জহির রায়হানের উপস্থিত মেধায় রচিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় চলচ্চিত্রটি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়।মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হান চলে যান ভারতের কলকাতায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। শুরু করেন তার বিখ্যাত স্টপ জেনোসাইড তথ্যচিত্র তৈরির কাজ। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডকুমেন্টারি বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা নিয়ে তার নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’কে। যার প্রতিটি সেকেন্ডে মিশে আছে একটি জাতির চিহ্ন। একটি জাতির অসীম ত্যাগের ইতিহাস।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকালসহ বহুকিছু এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরেছিলেন জহির রায়হান। স্টপ জেনোসাইডের প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিলো কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে। প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদসহ মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা।বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে ‘স্টপ জেনোসাইড’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে জহির রায়হানের প্রভাব এতো বিস্তৃত যে হাজার পৃষ্ঠা লিখলেও শেষ হবে না। স্টপ জেনোসাইড থেকে শরণার্থী ক্যাম্প, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে মিটিং, সভা সমাবেশে জনমত গঠন করেছিলেন।কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র কয়েকটি প্রদর্শনী হয়েছিল। যেখানে উপস্থিত ছিলেন- সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহাদের মতো নির্মাতারা। চলচ্চিত্রটি দেখার পর সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘এ এক অনন্য প্রতিভা, চলচ্চিত্রে এক নতুন যাত্রার সূচনা হলো। এক দুর্দান্ত প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের মাইফলক।’তখন অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন জহির রায়হান। তারপরেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে যতো অর্থ এসেছিল সব অকাতরে মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেছিলেন।দেশ স্বাধীনের পর ভারত থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণার পাঁচ দিন পর ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে রফিক নামের এক অজ্ঞাত টেলিফোন কল আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, আপনার বড়দা (শহীদুল্লা কায়সার) মিরপুর বারো নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন। সেদিন সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ি নিয়ে মিরপুরে রওনা দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির, শ্যালক বাবুলসহ আরও তিনজন। মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়িসহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। এরপর আর জহির রায়হানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।"সংগ্রামে জেগে আছে শহীদ জহির"উনিশ আগস্টের প্রভাতে জেগে ওঠে মাটি,নবাবপুরের মজুপুরে জন্ম নিলে খাঁটি।নাম ছিল জহিরুল্লাহ, রায়হান হলে পরে,শোষিত মানুষের স্বপ্ন এঁকেছিলে ঘোরে।চৌদ্দ বছর বয়সে তুমি লিখেছিলে গান,‘ওদের জানিয়ে দাও’—জেগে উঠল প্রাণ।নিরস্ত্র মানুষের কান্না, রক্ত, ক্ষত, হাহাকার,তোমার কলমে হয়ে উঠল প্রতিবাদের অঙ্গার।বায়ান্নর সেই রাজপথে ভাঙলে অবরোধ,মাতৃভাষার অধিকারে ছিলে অটল যোদ্ধা।একুশের রক্তধারা বুকে নিয়ে পরে,লিখলে তুমি ইতিহাসটি মানুষেরই তরে।‘হাজার বছর ধরে’ মাটির মানুষের কথা,‘আরেক ফাল্গুন’-এ জ্বলে একুশেরই ব্যথা।‘বরফ গলা নদী’ বয়ে যায় সময়েরই স্রোতে,তোমার গল্প আজও কথা কয় মানুষের নোটে।রূপালি পর্দায় তুমি স্বপ্ন দিলে প্রাণ,‘কাঁচের দেয়াল’ ভেঙে খুললে নতুন দিগন্তখান।‘সঙ্গম’ রঙিন হলো তোমারই নির্মাণে,বাংলা চলচ্চিত্র পেল নতুন দিনের টানে।‘জীবন থেকে নেয়া’—জীবন হলো ভাষা,পর্দাজুড়ে ফুটে উঠল স্বাধীনতার আশা।‘আমার সোনার বাংলা’ উঠল গানের সুরে,একটি জাতির স্বপ্ন তখন জেগে উঠল দূরে।তারপর এলো একাত্তর—আগুন জ্বলে দেশ,হানাদারের বুলেট গর্জে, চারদিকে নিঃশেষ।তুমি তখন ক্যামেরা হাতে সীমান্ত পেরিয়ে,জাতির দুঃখ বিশ্বজুড়ে ধরলে তুলে নিয়ে।‘স্টপ জেনোসাইড’ হলো রক্তমাখা দলিল,গণহত্যার বিরুদ্ধে উঠল প্রতিবাদ বিল।শরণার্থীর অশ্রু, মায়ের বুকের শোক,তোমার দৃশ্যে পৃথিবী পেল সত্যেরই লোক।স্বাধীন দেশের মাটিতে ফিরলে বিজয় শেষে,হারানো ভাইকে খুঁজতে গেলে মিরপুরের দেশে।তিরিশ জানুয়ারির সেই অমোঘ কাল,নিভে গেল প্রদীপ—রইল অমর জ্বলজ্বল।শহীদুল্লা কায়সার—ভাইয়ের খোঁজে তুমি,হারিয়ে গেলে ইতিহাসের অন্ধকার ভূমি।লাশ মেলেনি, তবু তুমি হারাওনি কভু,বাংলাদেশের হৃদয়জুড়ে বেঁচে আছ আজও।মাত্র সাঁইত্রিশ বছর—কী বিস্ময় জীবন!এত অল্প সময়ে এত দীপ্তি-দহন!সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগ্রাম আর গান,তোমার পদচিহ্নে জেগে থাকে বাংলাদেশ মহান।ভাষার অধিকারে তুমি, মুক্তির মিছিলে,ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান—ছিলে তারই কূলে।একাত্তরের বজ্রকণ্ঠে ছিলে অগ্রসেনা,তোমার মতো স্বপ্নবাজ আজও মেলে না।নব্বই এক বসন্ত আজ স্মৃতির পটে রয়,তোমার সৃষ্টির আলোয় আজও আঁধার ক্ষয়।পর্দা যখন জ্বলে ওঠে, কলম যখন লেখে,জহির রায়হান ফিরে আসেন বাংলাদেশের বুকে।তোমার প্রতি শ্রদ্ধা আজ প্রজন্মের অর্ঘ্য,তোমার স্বপ্ন বেঁচে থাক—এই আমাদের কর্তব্য।শোষণহীন, সাম্যভিত্তিক মানবতার গান—তোমার লাল স্বপ্ন হোক আগামী বাংলাদেশের প্রাণ।হে কিংবদন্তি, তোমার প্রতি রইল অনন্ত সালাম,তোমার সৃষ্টির আলোতেই অমর তোমার নাম।রক্তে লেখা মুক্তিযুদ্ধ, স্বপ্নে স্বাধীন দেশ—জহির, তুমি বেঁচে আছ—বাংলাদেশের শেষ-নিঃশেষ।—(সংগ্রামে জেগে আছে শহীদ জহির,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)মাত্র ৩৭ বছর জীবনের পরিধি ছিলো জহির রায়হানের। এই ক্ষুদ্র জীবনে দাপটের সঙ্গে চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে দোর্দণ্ড প্রভাববিস্তার করে গেছেন। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনেই এই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার। কেবল সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নয়- স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গণ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। তা ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান হোক কিংবা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রভাগের সৈনিক। ছোট্ট এই ক্ষুদ্র জীবনে একজন মানুষ কতোটা দিতে পারেন, জহির রায়হান যেন ছিলেন তার সীমারেখা। যার জীবন ছিল অবিস্মরণীয় কীর্তিতে ভরা।তোমার প্রতি অভিবাদন এবং রেড স্যালুট।সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯Bikash number : +8801716599589 (personal)

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কথাসাহিত্যিক শহীদ জহির রায়হানের জন্মের ৯১ বছর

অভিনয় থেকে বিদায় নিয়েও কেন এত জনপ্রিয় শাবানা

বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী শাবানা কেবল একজন নায়িকা নন; তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক, সামাজিক মূল্যবোধ এবং সাধারণ মানুষের আবেগের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। রূপালী পর্দায় তাঁর অভিনয় লক্ষ কোটি দর্শকের মনে এক চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।শাবানা এমন একটি সময়ে অভিনয় করেছেন যখন চলচ্চিত্র ছিল বাঙালি পরিবারের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। মা, ভাবি, স্ত্রী কিংবা আত্মত্যাগী বোনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতই নিখুঁত ও জীবন্ত ছিল যে সাধারণ মানুষ তাঁর চরিত্রের মধ্যে নিজেদের দুঃখ-সুখ ও জীবন সংগ্রাম খুঁজে পেত।পর্দার চরিত্র নির্বাচন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন—সবক্ষেত্রেই তিনি দারুণ শালীনতা বজায় রেখেছেন। ফলে তিনি কেবল তরুণ প্রজন্মের কাছেই নায়িকা ছিলেন না, বরং পরিবারের আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।ভাত দে, ছুটির ঘণ্টা, রাঙাভাবী, পেনশন, সত্য মিথ্যা কিংবা অবুঝ শিশু-র মতো অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা তাঁকে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। ভাত দে সিনেমায় 'বাসন্তী' চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য এক দৃষ্টান্ত। рекорд ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়।শুধু শান্ত ও আত্মত্যাগী চরিত্রই নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী নারীর চরিত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য। গ্রামীণ বধূ থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারী—সব ধরনের রূপেই তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন।ক্যারেরিয়ারের শীর্ষ অবস্থানে থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে তিনি অভিনয়কে বিদায় জানান। খ্যাতি বা লাইমলাইটের লোভে পড়ে মানহীন কাজ করেননি। অন্তরালে গিয়েও নিজের সম্মান ও ব্যক্তিত্ব ধরে রাখা এবং নীরবে নানা সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে যাওয়া তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।মূলত তাঁর অভিনয়শৈলী, পারিবারিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্বের কারণেই যুগের পর যুগ পার হলেও শাবানাকে সাধারণ দর্শক আজও ভুলতে পারেনি।

অভিনয় থেকে বিদায় নিয়েও কেন এত জনপ্রিয় শাবানা

বঙ্গবন্ধু কী হারিয়ে যাবেন ইতিহাস থেকে? নাকি বেঁচে থাকবেন জনগণের মাঝে!

বঙ্গবন্ধু কী হারিয়ে যাবেন ইতিহাস থেকে? নাকি বেঁচে থাকবেন সামগ্রিক মুক্তির জন্য জনগণের সংগ্রামের মাঝে। প্রশ্ন করতে পারেন, নিবন্ধের শুরুতেই এ কথা কেন বলছি। কারণ হচ্ছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কার্যাবলী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন’। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট ২০২৫) মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের সই করা প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়।এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস বাতিল করা হয়। প্রায় ১০ মাস পর ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’ সংশোধন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কার্যাবলী থেকে এই কর্মসূচি বিলুপ্ত করা হলো।ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসসহ আটটি জাতীয় দিবস উদ্‌যাপন বা পালন না করার সিদ্ধান্ত নেয় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক আদেশে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।এর আগে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দিবসগুলো বাতিল হচ্ছে বলে জানানো হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, উপদেষ্টা পরিষদ সম্প্রতি এক বৈঠকে আটটি দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।যে দিবসগুলো উদ্‌যাপন বা পালন না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিবস ও জাতীয় শিশু দিবস, ৫ আগস্ট শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী, ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেল দিবস, ৪ নভেম্বর জাতীয় সংবিধান দিবস এবং ১২ ডিসেম্বর স্মার্ট বাংলাদেশ দিবস।১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হতো। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের এক মহান নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর ৫১তম শাহাদত বার্ষিকী আজ। যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির অন্তরে এখনো গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে তাঁর প্রতি।জাতির সূর্য সন্তান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লাখ শহীদ ও সকল শহীদ বুদ্ধিজীবী, সম্ভ্রম হারানো ২ লক্ষ মা-বোন, নির্যাতিত পনের লাখেরও বেশি মানুষ, সর্বস্ব হারানো ১ কোটি মানুষসহ গোটা জনগণের লড়াই-সংগ্রাম-ত্যাগ তিতিক্ষা আর অবদানের জন্য তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা জনগণের। ৫৫ বছরের মাথায় কেউ চাইলেও এটা মুছতে পারবে না। বাঙালি জাতি ও জনগণের বড় ও শ্রেষ্ঠ অর্জন এই স্বাধীনতা। বাংলাদেশের ইতিহাস হলো স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের সুদীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। এ দেশের মানুষ লড়াই করেছে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শ্রেণি শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে। দেশীয় সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচার ও লুটেরা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে। জনগণের সংগ্রামের মুখেই একদিন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকে এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলে গেলেও আমাদের উপর চেপে বসল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধরণের শাসন ও শোষণ।বাংলাদেশের মানুষ প্রথম থেকেই জাতিগত শাসন-শোষণ-বঞ্চণা-অনুন্নয়ন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এসেছে- যার চূড়ান্ত রূপ লাভ করল ’৭১-এর সুমহান সশস্ত্র স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ভিতর দিয়ে। অল্পসংখ্যক ঘাতক রাজাকার-আল বদর-আল শামস-শান্তি কমিটির সদস্য ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষ ধর্ম-বর্ণ-বিশ্বাস-নারী-পুরুষ-আবাল বৃদ্ধ বণিতা-দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতার স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (ভাসানী), অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (মোজাফফর), কমরেড মণি সিং-এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিষ্ট পার্টি, কাজী জাফর-রাশেদ খান মেনন-হায়দার আকবর খান রনো’র নেতৃত্বাধীন কমিউনিষ্ট পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি (বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি), ছাত্র ইউনিয়ন [মেনন]-(বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী), ছাত্র ইউনিয়ন [মতিয়া]-(বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন), কমিউনিষ্ট পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি (দেবেন শিকদারের নেতৃত্বে), শ্রমিক-কৃষক কর্মীসংঘ, কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার), পূর্ব বাংলার কৃষক সমিতি, পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন (পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন), পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও গণ-সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিসহ অন্যান্য প্রগতিশীল নানা গ্রুপ-দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ফলেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পরাজয় ঘটলো এবং পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটলো। জাতিগত নিপীড়ন ও শোষণের শিকার জনগণের বিজয় অর্জিত হল। কিন্তু যুগযুগব্যাপী এ দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ অন্যান্য মেহনতী ও সাধারণ জনগণ শ্রেণি শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির যে আকাঙ্খাকে বুকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে এসেছে, সে আকাঙ্খা পূর্ণ হয় নি। তাই বলে, ইতিহাস তো কেউ মুছতে পারবে না।কী ঘটেছিল সেদিন :১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপদগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ ও মেয়ে বেবি, সুকান্তবাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আব্দুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূখণ্ড লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাঙ্খা মূর্ত হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে।বস্তুত ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকেই বাংলাদেশে এক বিপরীত ধারার যাত্রা শুরু হয়। গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসনের অনাচারের ইতিহাস রচিত হতে থাকে।সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনীদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।বঙ্গবন্ধু হত্যার সুবিধাভোগী কারা তা আজ সুষ্পষ্ট। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রসহ চার মূলনীতি সংযোজনের কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়। দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত না হলে নয় মাসে স্বাধীন হতো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে অনেকেই বিরোধী পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তা চরম বেঈমানীর সামিল।২০২২ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি “বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড: অভ্যন্তরীণ ষড়ষন্ত্র ও মার্কিন যোগসাজশ” শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা কোন ব্যক্তি হত্যা ছিল না। ছিল না কিছু ‘বিপথগামী সেনা সদস্য’র হঠকারিতা। এই হত্যার জন্য ’৭২ সাল থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট তার বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পথভ্রান্ত হয়েছে, সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যা সম্পর্কে অস্পষ্টতা রেখে দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলংকমুক্ত করা যাবে না, শংকামুক্ত করা যাবে না।ওইসভায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘৭৫ এর পটপরিবর্তন আমরা মানি না। ‘৭৫ এর পক্ষ বিপক্ষ আছে। আমরা ‘৭৫ এর হত্যাকান্ডের বিপক্ষে। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যোদ্ধায় পরিণত করেছিলেন। এক কৌশলী নেতা হিসাবে সব কিছুকে সমন্বয় করেছিলেন। বাঙালী মন থেকে দ্বিজাতির তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তান মনস্কতা দূর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল ‘৭২ সাল থেকে। পাকিস্তানের পরাজয় মেনে না নেয়ার পক্ষ এবং পুনরায় পাকিস্তানের পথে নিতে ‘৭৫ এর নৃশংস হত্যাকান্ড সংগঠিত করা হয়। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিরাপদ করতে রাজনীতির বিষবৃক্ষ বিএনপির রাজনীতি উপড়ে ফেলার আহবান জানিয়েছিলেন।ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল নেপথ্যের খলনায়কদের চিহিৃত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে ‘৭২ এ সংবিধান দিয়েছিলেন। জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে সেই সংবিধান কাটাছেঁড়া করে হত্যা করেছে। পাকিস্তানের পরাজয় ওরা মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধু ধর্মের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। সামরিক শাসকরা সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম জুড়ে দেয়। ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা আমাদের বিপক্ষে ছিল আজও তারা বিপক্ষে। সে দিন তারা জামাতের পক্ষে ছিল আজও তারা জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে।বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি সোহরাব হাসান বলেন, শুধু মার্কিন না তাদের দোসর পাকিস্তান ও তার মিত্ররা ‘৭৫ এর ঘটনাবলীর সাথে সম্পৃক্ত।তিনি বলেন, বামপন্থী নেতা আব্দুল হক শেখ মুজিবর রহমানকে হটাতে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন।তিনি বলেন, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সে সময়ের ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতৃবৃন্দের ভূমিকাও তদন্ত করা দরকার।তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির কারণে গড়ে ওঠা ১৪ দল যদি আদর্শিক জোট না হয় তাহলে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নতুন মিত্র হিসাবে আগামী জোট সঙ্গী হবে।সভাপতির বক্তব্যে কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সৃষ্ট সংকটে জনগণের পক্ষে ১৪ দলের শরীকরা কথা বলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ১৪ দলকে ‘আদর্শিক জোট’ না বলে বক্তব্য দিচ্ছেন, এটা সঠিক নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যই ১৪ দল গড়ে উঠেছে যা পরিপূর্ণভাবে আদর্শিক। এখানে ভিন্নতা দেখানোর কোন সুযোগ নেই। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার নেপথ্যের কারিগরদের জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের আহবান জানান।“বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড: অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও মার্কিন যোগসাজশ” শীর্ষক জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকান্ডের ৪৬ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। দু’দিন পর শোকাবহ পনেরই আগস্ট। এইদিন বাংলাদেশ ও সারাবিশ্ব পৃথিবীর অন্যতম নৃশংস হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেছিল। এই দিন উষালগ্নে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সকল আন্দোলন সংগ্রামের অনুপ্রেরণা দানকারি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন কামাল, পুত্র লেঃ শেখ জামাল, পুত্রবধুগণসহ শিশু শেখ রাসেলও এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায় নাই। রেহাই পান নাই তার ভগ্নিপতি মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবারের সদস্যরা, ভাগ্নে যুবনেতা মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনিসহ তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, ভাই মুক্তিযোদ্ধা আবু নাসেরসহ বত্রিশ নম্বরে তার বাড়ির প্রহরা ও কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিরা। বঙ্গবন্ধুর উপর আক্রমণের খবর পেয়ে ছুটে আসা তার সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জামিলকেও এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ দিতে হয়েছে। এই হত্যাযজ্ঞের নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতার ইতিহাস এখন সর্বজনবিদিত। তার আর বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন নাই।২। বঙ্গবন্ধু হত্যার বহু বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে। দায়ী খুনীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের ফাঁসির হুকুম হয়েছে। কিন্তু ঐ রায় বিচারিক প্রক্রিয়া পার হয়ে বাস্তবায়িত হতে বহু বছর সময় লেগেছে। এখনও হত্যাকারীদের বেশ কয়েকজন বিদেশের মাটিতে পলাতক জীবনযাপন করছে। এদের কয়েক জনের অবস্থান চিহ্নিত হলেও তাদের আশ্রয়দানকারী দেশসমূহের আইনের ম্যারপ্যাঁচে এইসব পলাতক খুনীদের ফিরিয়ে আনা এখনও সম্ভব হয় নাই। শেখ হাসিনার সরকার আমলে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকার কথা বললেও বাস্তবে তার কোন ফলাফল নাই। এর একটি বড় কারণ হল বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্য হলেও এর পিছনের ষড়যন্ত্র এখনও সঠিকভাবে উদ্ঘাটিত হয় নাই। শেখ হাসিনার সরকার আমলে তার তিন দফার এই শাসনামলে পার্লামেন্টে ও পার্লামেন্টের বাইরে এই হত্যাকান্ডের পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন, ঐ ষড়যন্ত্রের দায় নিরুপণের প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রতিশ্রুত একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় নাই এবং সেই ধরণের কোন কার্যকর উদ্যোগ আছে বলেও প্রতীয়মান হয় নি।৩। বঙ্গবন্ধুর এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পিছনের ষড়যন্ত্র ও হত্যাকারীদের বিচারের পদক্ষেপ প্রথম থেকেই বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনী খন্দকার মোশতাক পনেরই আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর ঐ বিচার বন্ধ করতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ইতিমধ্যে জিয়াউর রহমান প্রধান সেনাপতি হয়েছে। অপরদিকে তেসরা ও সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আইন বলে সংবিধান সংশোধন করে যে অর্ডার জারি করে তাতে মোশতাকের ঐ ইনডেমনিটি আইনকে সাংবিধানিক ছত্রছায়া দেয়া হয়। ১৯৭৯-এর দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ, একতা পার্টির বিরোধিতা সত্বেও তা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত হয়।৪। ফলে ঐ বিচারকাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আইনের বাধা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাউত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার হত্যার পর বিচারের দাবি সেভাবে রাজনীতির এজেন্ডাভূক্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই তাঁর লাশ বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িতে রেখেই তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যরা অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী খুনী মোশতাকের মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের কর্ণধার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহম্মদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে গ্রেফতার ও জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর তরুণ সহকর্মীদের গ্রেফতার করে তীব্র নির্যাতন করা হয়।একই সময় এটাও সত্য যে দু’একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ব্যতীত বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ সংঘটিত হয় নি। এই ব্যতিক্রমের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তার অনুসারিদের নিয়ে ভারত সীমান্ত থেকে প্রতিরোধ গড়ার প্রচেষ্টা, বরগুনার এসডিও সিরাজুদ্দিন আহমদের ঐ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নিয়ে চারদিনের মত খন্দকার মুশতাকের অবৈধ সরকারকে অস্বীকার করা এবং ছাত্র অঙ্গনে মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের একটি ক্ষুদ্র অংশের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রচারপত্র বিলি ও মফস্বল শহরে প্রতিবাদ মিছিলের চেষ্টা।৫। ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সকল রাজনৈতিক দল অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় দেশে আর কোন রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য ও আইনী অস্তিত্ব ছিল না। মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফফর ন্যাপ বাকশালে একীভূত হয়েছিল। অপরদিকে বিরোধীদল জাসদ, ইউপিপি ‘লেনিনবাদী পার্টি, বর্তমানের ওয়ার্কার্স পার্টি যার অন্তর্ভুক্ত ছিল’, জাগমুই আত্মগোপনে বাকশালের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার আগেই পনেরই আগস্টের ঘটনা ঘটে যায়। এটা ইতিহাসের সত্য যে, এইসব দল কেবল বাকশাল ব্যবস্থার বিরোধী ছিল তাই নয়, মুজিব শাসনামলের সাড়ে তিন বছরে রক্ষীবাহিনী, লালবাহিনী, স্পেশাল পুলিশ ও আওয়ামী লীগ দল দ্বারা চরমভাবে নিগৃহীত হয়েছে, জেলে গেছে, হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। পাল্টা এই সব দলগুলোর মধ্যে জাসদ ১৯৭৪-এর শেষভাগে গণবাহিনী তৈরী করে মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ গ্রহণ করেছিল। এর বাইরে সিরাজ শিকদার নিহত হলেও তার অনুসারি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিসহ গোপন অতি-বাম কমিউনিস্ট গ্রুপগুলো তখনও ‘বিপ্লবে’র নামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ছিল।৬। এই অবস্থা বাকশালের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি উত্থাপিত হয় নাই। বরং বহু বছর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের প্রশ্নটি রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ ও পাল্টাপাল্টির বিষয় ছিল। ফলে এই সময়কালে পুন:সংগটিত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবি উত্থাপিত হলেও তা সাধারণ রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হতে পারেনি।৭। ইতিমধ্যে পনেরই আগস্টের ঘটনার সময় বিদেশে থাকায় জীবনে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন ও বিচারের জন্য বিদেশের মাটিতে ব্রিটিশ এমপি স্যার টমাস উইলিয়ামসকে প্রধান করে বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান ঐ ট্রাইব্যুনালকে বাংলাদেশে প্রবেশে অনুমতি দেয় নাই। বরঞ্চ স্যার উইলিয়াম টমাসকে বাংলাদেশে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। টমাস উইলিয়ামকে বলেছিলেন, চিলির পর বাংলাদেশে তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে।৮। বস্তুতঃ ১৯৮১-এর ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসাবে জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের হাল ধরে তিনিই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান এজেন্ডায় পরিণত করেন। এদিকে প্রথমে জিয়া বিরোধী দশ দল ও এরশাদ স্বৈরাচারবিরোধী পনের দল গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের বিষয়টি বিরোধী রাজনীতির অন্যতম এজেন্ডায় পরিণত হয়।৯। এই সময়কালে সবসময় আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার তরফ থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী কালোহাতের কথা স্পষ্ট করেই বলা হত এবং চিলির আলেন্দের মতই বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে একইভাবে সিআইএ-র হাত ছিল একথাও বলা হত। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বিশেষ সোচ্চার ছিলেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের এককালীন তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ চৌধুরীর একটি বই রয়েছে।এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সে সময়টা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধের সময়। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তার সহায়তাকারী অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে বিবেচনা করলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ সে পথ থেকে ক্রমশই দূরে সরে আসে এবং জিয়া-এরশাদ আমলে বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে বৈরী নীতি অনুসৃত হয়। রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগও ক্রমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার দুরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। নব্বইয়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর আর কোন বাধা রইল না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সিআইয়ের হস্তক্ষেপের বিষয়টি হারিয়ে যায়। এ বিষয়ে এখন আর বিশেষ কোন কথা শোনা যায় না।১০। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পিছনে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের বিষয়টি এখন সবার জানা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু মেজর, সেনাবাহিনীর আর্টিলারি ও ল্যান্সার বাহিনী নিয়ে এই অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। এরা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে এই হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে ফাঁসির দন্ড দেয়া হয়েছে ও তা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এর সাথে যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল সে সম্পর্কে কিছু কথা বলা হলেও সেই সব কুশীলবদের চিহ্নিতও করা হয় নাই এবং তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয় নাই।১১। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে এটা সুস্পষ্ট যে, সে সময়ের সেনা উপ-প্রধান জিয়াউর রহমান এই মেজরদের চক্রান্ত সম্পর্কে জানতেন। খুনী ফারুকের দেয়া সাক্ষাতকার অনুযায়ী জিয়াকে তাদের এই উদ্যোগের বিষয় অবহিত করলে তিনি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন নাই বা বাধা দানের কোনরকম চেষ্টা করেন নাই। সেনা কর্তৃপক্ষ বা সরকার কাউকে তিনি বিষয়টি অবহিত করেন নাই। নিজে নিরাপদ থাকার জন্য বরং ঐ মেজরদের তাকে না জড়াতে বলেন। এবং নিম্ন পর্যায়ের অফিসাররা কিছু করলে করতে পারে বলে জানান। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি মনোভাব নেবে সে সম্পর্কেও খুনী রশীদ-ফারুককে মার্কিন দূতাবাসে পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিলেন। এসব আমার কথা নয় ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড’ শীর্ষক বইয়ে অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক প্রয়াত মীজানুর রহমান খান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। আমি এখানে তার বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এই লেখাকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। আমি সকলকে বইটি পড়তে বলব।জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাড়াও ঐ অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সেনা দপ্তরের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সকল বাহিনী প্রধানদের খুনী মুশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন, পরবর্তীকালে ঐ সেনা প্রধানদের বিভিন্ন দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ এবং বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসাবে মুশতাক সরকারে যোগদান ও তৎকালীন বিডিআর প্রধান জেনারেল খলিলুর রহমানের চীফ অব ডিফেন্স স্টাফ হিসাবে নিযুক্তি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থনেরই পরিচায়ক।১২। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যপটে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন খন্দকার মুশতাক। তিনি কতবড় বিশ্বাসঘাতক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৪ আগস্ট রাতে নিজ বাড়ির রান্না দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আপ্যায়িত করার ঘটনায়। খুনী ফারুক-রশীদ বিশেষ করে খুনী রশীদ এই চক্রান্ত পর্বে সবসময়ই তার সাথে আলোচনা-পরামর্শ করেছে। চক্রান্ত বাস্তবায়নের দিন সম্পর্কে সাবধানতার কারণে মুশতাককে অবহিত করা না হলেও, তাকে যে পূর্ব মানসিক প্রস্তুতি দেয়া হয় তাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরপরই খন্দকার মুশতাক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিজে ক্ষমতা হাতে তুলে নিতে এতটুকু দেরি করেনি। দেশে তখনও সাংবিধানিকভাবে একজন উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কিন্তু মুশতাক সরাসরি নিজের হাতে ক্ষমতা তুলে নিয়ে তিনিই যে ঐ চক্রান্তের বেসামরিক হোতা তার প্রমাণ দিয়েছে। তার সাথে অতি দ্রুততার সাথে যুক্ত হয়েছে শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের ঠাকুর, কে এম ওবায়দুর রহমান ও নুরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রমুখ। আর আমলাদের মধ্যে যুক্ত হয়েছিল মাহবুবুল আলম চাষী যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্তের সাথে যুক্ত ছিল। সে সময়ের প্রধান আমলার কথা নাইবা বললাম, তিনি প্রয়াত। বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর যারা দলে দলে ‘বাকশালে’ যোগ দিয়েছিল তারা এক মুহুর্তেই তাদের চেহারার পরিবর্তন করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ দূরে থাক তার বিরুদ্ধে নানারকম কটুকাটব্য করতেও দ্বিধা করে নাই।১৩। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি আজকের আলোচ্য বিষয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যায় মার্কিন যোগসাজশের বিষয়টি সম্প্রতি অবমুক্ত হওয়া মার্কিন দলিলসমূহে দেখা যায়। মীজানুর রহমান খানের ঐ বইয়ে ঐ সকল দলিলের ভিত্তিতে তিনি উল্লেখ করেছেন- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পরপরই ১৯৭২ সালে খুনী ফারুক অস্ত্র সংগ্রহের নামে মার্কিন দূতাবাসে যোগাযোগ করেছিল। সে দূতাবাসকে জানিয়েছিল অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সেনাবাহিনীতে যে কমিটি করা হয়েছে তার প্রধান উপ-প্রধান সেনাপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন। তাদের পক্ষ হয়ে দূতাবাসে সে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে যায়। ১৯৭৩-এ এই একই বিষয়ে সরাসরি মার্কিন দূতাবাসে আবার যোগাযোগ করেছিল। আর ১৯৭৪-এর এপ্রিলে এসে মেজর ফারুক-রশিদ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সরকার বিরোধী কোন অভ্যুত্থান হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি মনোভাব হবে সেটা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ সবই ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো টেলিগ্রাম ও রিপোর্টে উল্লেখ আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে মার্কিন যোগসাজশ অনুসন্ধানরত সাংবাদিক লরেন্স লিফসুজের কাছে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জন বোস্টার বলেছিলেন যে, এ ধরনের যোগাযোগের ব্যাপারে মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত সকলকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সিআইএ নিজ থেকে এ ব্যাপারে কোন ভূমিকা রেখেছিল কিনা তা তিনি বলতে পারেন নি। তবে ঢাকায় সে সময়ে সিআইএ-র স্টেশন চীফ চেরী বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করে।মীজানুর রহমান খান তার অনুসন্ধানে বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয় সম্পর্কে নিঃসংশয় হতে না পারলেও এই হত্যাকান্ডে মার্কিনী হাত থাকার ব্যাপারে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিক লিফসুজ বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে জড়িত ছিল সে বিষয়টি তার লেখায় একাধিকবার ব্যক্ত করেছেন। তবে মীজানুর রহমান খান মনে করেন যে, ক্রমপ্রকাশমান মার্কিন দলিলসমূহে এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।১৪। এই পরিপ্রেক্ষিতে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই তা’হল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলেও এর পিছনে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী যোগসাজশের ব্যাপারে তদন্ত করে ঐ ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন, ঐ হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দায় নিরূপণ করা জরুরি। মাননীয় আইনমন্ত্রী সংসদের আলোচনার বিভিন্ন সময় এ ব্যাপারে ‘জাতীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের কথা বলেছেন। মুজিববর্ষে সংসদের আলোচনায় সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ বহু সিনিয়র সংসদ সদস্য এই দাবি তুলেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার জাতীয় এই শোক দিবসে কেবল তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, মিলাদ অনুষ্ঠান, কাঙালিভোজ ও আলোচনা সভা করেই শেষ করা ঠিক হবে না। এ বছর জাতীয় শোক দিবসে সকল জায়গা থেকে এই ‘জাতীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি তুলতে হবে। তা না হলে দেশে যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি মাঝে মাঝেই দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, সাত দিনের মধ্যে সরকার ফেলে দেয়ার হুংকার দেয় তার স্বরূপ উন্মোচন করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। এখনই সময় অঙ্কুরেই তার বিনাশ সাধন। বাংলাদেশে আরেকটি পনেরই বা একুশে আগস্ট ঘটতে দেয়া যাবে না।১৫। বঙ্গবন্ধু হত্যা কোন ব্যক্তি হত্যা ছিল না। ছিল না কিছু ‘বিপথগামী সেনা সদস্য’র হঠকারিতা। এই হত্যার জন্য ’৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট তার বাস্তবায়ন করা হয়েছে।বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পথভ্রান্ত হয়েছে, সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যা সম্পর্কে অস্পষ্টতা রেখে দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলংকমুক্ত করা যাবে না, শংকামুক্ত করা যাবে না।”স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত মহান এই সংগ্রামী নেতা ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদত বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন ও অভিবাদন জানিয়ে যে কথা স্পষ্ট করেই বলতে হয়, তিনি বেঁচে থাকবেন অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সামগ্রিক মুক্তির জন্য জনগণের সংগ্রামের মাঝে।বাঙালি জাতি ও জনগণের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এক অনন্য ভাষণ। ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর ওই ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।এ দিন লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে এই মহান নেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা।’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একাত্তরের ৭ মার্চ দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ পরবর্তীতে স্বাধীনতার সংগ্রামের বীজমন্ত্র হয়ে পড়ে। একইভাবে এ ভাষণ শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলিলই নয়, জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিধানের একটি সম্ভাবনাও তৈরি করে।বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান শুধু নয়। এটি অন্যান্য জাতিস্বত্বাসহ সকল স্তরের জনগণের সামগ্রিক মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার দিক-নির্দেশনা।এ দিন লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে এই মহান নেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা।’একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা। এরপরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রনিনাদে আসন্ন মহামুক্তির আনন্দে বাঙালি জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কাক্সিক্ষত মুক্তির লক্ষ্যে।ধর্মীয় চিন্তা, সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা ও দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বা, জাতীয়তাবোধ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে ভিত রচিত হয় তারই চূড়ান্ত পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।আবারও বলছি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ভাসানী) ও এর অন্তর্ভুক্ত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি, ন্যাপ (মোজাফফর) ও কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় অংশগ্রহণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালি জাতি। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে গর্জে ওঠে উত্তাল জনসমুদ্র। লাখ লাখ মানুষের গগন বিদারী শ্লোগানের উদ্দামতায় বসন্তের মাতাল হাওয়ায় সেদিন পত্ পত্ করে ওড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা। শপথের লক্ষ বজ্রমুষ্টি উত্থিত হয় আকাশে। সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আরোহণ করেন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে। ফাগুনের সূর্য তখনো মাথার ওপর। মঞ্চে আসার পর তিনি জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন। তখন পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লাখ লাখ বাঙালির ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। তিনি দরাজ গলায় তাঁর ভাষণ শুরু করেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি…।’ এর পর জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার মহাকাব্যের কবি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা ।’মাত্র ১৮-১৯ মিনিটের ভাষণ। এই স্বল্প সময়ে তিনি ইতিহাসের পুরো ক্যানভাসই তুলে ধরেন। তিনি তাঁর ভাষণে সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, গোলাগুলি ও হত্যা বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন স্থানের হত্যাকান্ডের তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানান।বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, আমি বাংলা মানুষের অধিকার চাই। প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র-মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করবো। আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।’তিনি বলেন, ‘আমি বলে দিতে চাই-আজ থেকে কোর্ট-কাচারি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোন কর্মচারী অফিসে যাবেন না। এ আমার নির্দেশ।’বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সর্বশেষ দু’টি বাক্য, যা পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিক-নির্দেশনা ও প্রেরণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়বাংলা’।অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর একটি নিবন্ধে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছেন। রণকৌশলের দিক থেকে এই ভাষণ অসাধারণ। এই বক্তৃতা এখনো মানুষকে শিহরিত করে। এই বক্তৃতার আগে রাজনৈতিক কর্মী ও জনসাধারণ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে যে পাকিস্তানি সেনা শাসকরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাঁদের উপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাবে, সে বিষয়েও তিনি অবহিত ছিলেন।আনিসুজ্জাামান লিখেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন কি-না, এমন এক প্রশ্নর জবাবে বঙ্গবন্ধু নিউজউইকের এক সাংবাদিককে বলেছিলেন ‘আমরাতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিমাদের উপর নির্ভর করছে তারা বিচ্ছিন্ন হতে চায় কি-না।’আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং সেই সভায় উপস্থিত তোফায়েল আহমেদ একটি নিবন্ধে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর চশমাটা সেদিন ডায়াসের উপর রেখে ১৮ মিনিটের যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার পুরোটাই অলিখিত। একদিকে তিনি পাকিস্তানীদের প্রতি চার দফা শর্ত আরোপ করলেন, অন্যদিকে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলতে বললেন। ভাতে মারার কথা বললেন, পানিতে মারার কথা বলেন।তিনি বলেন, ‘৭ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। একজন তাঁকে বললেন, জনগণ কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া মানবে না। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি তোমার কাজ কর। আমি তাদের নেতা, আমি তাদের পরিচালিত করবো, তারা আমাকে নয়।’বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরে ইতিহাসের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের পর গোটা বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের পরিবর্তে বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকে বিভিন্ন জায়গায় পূর্ব পাকিস্তান শব্দ মুছে বাংলাদেশ লেখে।তিনি বলেন, এ ভাষণের পর গোটা দেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় চলতে থাকে। এ ভাষণ গুটি কয়েক রাজাকার ছাড়া গোটা বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো।স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে বলতে হয়, অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে’।’তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের। তিরিশ লাখ মানুষের জীবনদানসহ এ দেশের স্বাধীনতার জন্য সরকারি হিসাবে লাখ, বেসরকারি হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন, পনের লাখেরও বেশি মানুষ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দলের বিভিন্ন ঘাতক বাহিনীর হাতে নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক কোটি মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশী ভারতে গিয়ে শরণার্থীর বিড়ম্বিত জীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন।১৯৭১-এর ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এরই ভিত্তিতে এক পক্ষকাল সময়ের ভেতর ’৭১-এর ১০ এপ্রিল প্রণীত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, যা ছিল নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনগত ভিত্তি।’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূখণ্ডে লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাক্সক্ষা মূর্ত হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে।পাকিস্তানি শাসকচক্র ২৩ বছরের শাসনকালে বাঙালির যে কোনো ন্যায়সঙ্গত দাবি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে।১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের। জন্মলগ্নেই এই কৃত্রিম অস্বাভাবিক রাষ্ট্রটির মৃত্যুঘণ্টা বেজেছিল যখন ’৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন। কারণ বাংলা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবির ভেতর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিচ্ছিন্নতা ও ভারতের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে তাঁকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল। ধর্মভিত্তিক কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান সম্পর্কে বাঙালির মোহভঙ্গ হতে সময় লেগেছিল মাত্র সাত মাস। ’৪৮-এর মার্চে পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকা সফরে আসেন, তখন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয় ’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার চূড়ান্ত রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি রফিক, জব্বার ও বরকতসহ অগণিত ভাষাশহীদের আত্মদানে। এই ভাষা আন্দোলনের পলল জমিতে বেড়ে উঠেছে নব আঙ্গিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালিত্বের পরিচয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠলেও অচিরেই বাংলার রাজনীতিও এই চেতনায় উদ্ভাসিত হয়।ইউরোপে জাতীয়তাবাদকে মূল্যায়ন করা হয় সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক চেতনা হিসেবে। ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেছে। হিটলারের নাৎসিবাদের জন্ম হয়েছিল জার্মান জাতীয়তাবাদের উগ্রতা থেকে। এই জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রতিপক্ষ সেমেটিক ইহুদিরা হলেও যা কিছু প্রগতি ও উদারনৈতিকতার সমার্থক সবই নাৎসিদের আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়। আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম উন্মেষ ঘটেছিল ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে। বাঙালিত্বের চেতনা মূর্ত হয়েছে।রবীন্দ্রনাথের রচনা ও গানে, যখন তিনি লিখেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি,’ ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল’, আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ প্রভৃতি গানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা নানারূপে উদ্ভাসিত হয়েছে। নাৎসি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সব সময় বিদ্বেষ নয় সম্প্রীতির কথা বলেছে। ছয়শ বছর আগে বাংলার কবি চণ্ডিদাস লিখেছিলেন ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ দেড়শ বছর আগে বাংলার আরেক মরমী কবি লালন শাহ লিখেছেন ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ আর খৃস্টান/ জাতিগোত্র নাহি রবে।’ প্রায় একশ বছর আগে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোনজন/কাণ্ডারী বলে ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল এই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ।পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক পাঞ্জাবি শোষক চক্র বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক শোষণের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। ২৩ বছরের সীমাহীন শোষণে পশ্চিম পাকিস্তানের উষর মরুভ‚মি হয়েছে শস্য শ্যামল এবং সোনার বাংলা পরিণত হয়েছিল শ্মশানে। সোনার বাংলা শ্মশান কেন এই প্রশ্নের উত্তর বাঙালি খুঁজে পেয়েছে মধ্য ষাটে আওয়ামী লীগের ছয় দফায়। বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা মূর্ত হয়েছে সত্তরের নির্বাচনে। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সকল হিসাব ও চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছিল। সত্তরের নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতাকে দলের অন্যতম নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের চেতনা ও সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর পক্ষপাত বিভিন্ন অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে। ষাটের দশকে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে বামপন্থীদের ব্যাপক প্রভাব সমাজতন্ত্রের ধারণা জনপ্রিয় করেছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি, ন্যাপ (ভাসানী ও মোজাফফর)সহ অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বিশাল।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা, বাঙালি জাতিসত্তার বিরুদ্ধে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং বাংলাদেশে গণহত্যার প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে যখন বঙ্গবন্ধু ’৭১-এর ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণে ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি করে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবার আহ্বান জানান। ৭ মার্চের এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব।’ তারপরই বলেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই একটি আহ্বান সমগ্র জাতির চেতনায় স্বাধীনতা ও শোষণ-পীড়ন মুক্তির যে বোধ সঞ্চারিত করে তা মূর্ত হয়েছে পরবর্তী নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে, যা ছিল সার্বিক অর্থে একটি গণযুদ্ধ।মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত রাখবার জন্য নৃশংসতম গণহত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জনপদ ধ্বংসসহ যাবতীয় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। তাদের এই নৃশংসতার প্রধান দোসর ছিল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম নামক উগ্র মৌলবাদী ও ধর্মব্যবসায়ীদের দল। ইসলামের দোহাই দিয়ে এই সব দল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে যেভাবে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনসহ যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞে প্ররোচিত করেছে নিজেরাও উদ্যোগী হয়ে গঠন করেছে রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি ঘাতক বাহিনী। এইসব ঘাতক দলের নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও কামরুজ্জামানরা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বাঙালিদের হত্যা করতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং দলের কর্মীদের প্ররোচিত করেছে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে সেই সময় প্রকাশিত জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর প্রতিদিনের পাতায়। জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযম পাকিস্তানকে ইসলামের সমার্থক বানিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান না থাকলে দুনিয়ার বুকে ইসলামের নাম নিশানা থাকবে না। পাকিস্তান রক্ষার দোহাই দিয়ে জামায়াতিরা তখন যাবতীয় গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেছে ইসলামের নামে। এভাবেই তারা ইসলামকে হত্যা, ধর্ষণ নির্যাতন ও ধ্বংসের সমার্থক শব্দে পরিণত করতে চেয়েছে।কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমান যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন তারা জামায়াতের গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পাকিস্তানের ৯০ হাজারেরও বেশি নৃশংস সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়েও জামায়াতিরা তাদের প্রাণপ্রিয় পাকিস্তান রক্ষা করতে পারেনি। পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা তালিকা তৈরি করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগেই জামায়াতের শীর্ষ নেতারা যারা সুযোগ পেয়েছিলেন পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন অন্যরা দেশের ভেতর আত্মগোপন করেছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশে ধর্মব্যবসায়ী জামায়াতিদের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছিল।’৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাঙালি জাতির নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে স্বদেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে ফেরার পথে দিল্লিতে যাত্রাবিরতিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর জন্য এক বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করেন। এই সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী দুজনের ভাষণই ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংক্ষিপ্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহান বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন আমি আপনাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমার প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল বাংলাদেশের শরণার্থীদের আমি সসম্মানে ফেরত পাঠাব। আমার দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে আমি সবরকম সহযোগিতা করব। আমার তৃতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল শেখ মুজিবকে আমি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের করে আনব। আমি আমার তিনটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি।… শেখ সাহেব তাঁর দেশের জনগণকে একটিই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি তাদের স্বাধীনতা এনে দেবেন। তিনি তাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।এর জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাকে বলা হয়েছে ভারতের সঙ্গে আপনার কীসের এত মিল? আমি বলেছি ভারতের সঙ্গে আমার মিল হচ্ছে নীতির মিল। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীও তাই বিশ্বাস করেন। আমাদের এই মিল হচ্ছে আদর্শের মিল, বিশ্বশান্তির জন্য…। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু একই দিনে দেশে ফিরে রমনার বিশাল জনসমুদ্রে আবারও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’’৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে। বাংলাদেশের মূল সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রের এই চার মূলনীতিকে আমরা বলি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যা অর্জিত হয়েছে ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে। এই সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কিন্তু ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্মপালন ও প্রচারের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। বাংলাদেশের মতো অনগ্রসর মুসলমানপ্রধান দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শের এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।৪ নভেম্বর (১৯৭২) গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু এক অনন্যসাধারণ ভাষণ দিয়েছিলেন। আমার মতে, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বরের এই ভাষণ, যেখানে বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন ও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা প্রতিফলিত হয়েছে। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নতুন ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা দিয়েছেন। গণতন্ত্র সম্পর্কে এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র সেই গণতন্ত্র যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। মানুষের একটা ধারণা আছে এবং আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যে সব দেশে চলেছে, দেখা যায় সে সব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশন দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে প্রয়োজন হয় শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্রের ব্যবহার। সে গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই, শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো আমার দেশের যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে তাতে সেসব বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে এদেশের দুঃখী মানুষ রক্ষা পায়, শোষকরা যাতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা নাই। সেজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সাথে অন্যের পার্থক্য আছে। সেটা আইনের অনেক সিডিউলে রাখা হয়েছে, অনেক বিলে রাখা হয়েছে, সে সম্বন্ধে আপনিও জানেন। অনেক আলোচনা হয়েছে যে, কারোর সম্পত্তি কেউ নিতে পারবে না। সুতরাং নিশ্চয় আমরা কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হাত দিচ্ছি না। কিন্তু যে চক্র দিয়ে মানুষকে শোষণ করা হয়, সেই চক্রকে আমরা জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে চাই। তার জন্য আমরা প্রথমেই ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, কাপড়ের কল, পাট কল, চিনির কারখানা সবকিছু জাতীয়করণ করে ফেলেছি। তার মানে হলো, শোষকগোষ্ঠী যাতে এই গণতন্ত্র ব্যবহার করতে না পারে। শোষিতকে রক্ষা করার জন্য এই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হবে। সেজন্য এখানে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সংজ্ঞার সঙ্গে অনেকের সংজ্ঞার পার্থক্য হতে পারে।’সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৪ নভেম্বরের ভাষণে বলেছেন ‘আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি; এবং বিশ্বাস করি বলেই আমরা ঐগুলি জাতীয়করণ করেছি। যারা বলে থাকেন, সমাজতন্ত্র হলো না, সমাজতন্ত্র হলো না, তাদের আগে বুঝা উচিত, সমাজতন্ত্র কি? সমাজতন্ত্রের জন্মভ‚মি সোভিয়েত রাশিয়ায় ৫০ বছর পার হয়ে গেল, অথচ এখনও তারা সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলেছে। সমাজতন্ত্র গাছের ফল নয় অমনি চেখে খাওয়া যায় না। সমাজতন্ত্র বুঝতে অনেক দিনের প্রয়োজন, অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। সেই পথ বন্ধুর। সেই বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছা যায়। এবং সেজন্য পহেলা স্টেপ- যাকে প্রথম পদক্ষেপ বলা হয়, সেটা আমরা গ্রহণ করেছি; শোষণহীন সমাজ। আমাদের সমাজতন্ত্রের মানে শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র আমরা দুনিয়া থেকে হাওলাত করে আনতে চাই না। এক এক দেশ এক এক পন্থায় সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেই দেশের কি আবহাওয়া, কি ধরনের অবস্থা, কি ধরনের মনোভাব, কি ধরনের আর্থিক অবস্থা, সবকিছু বিবেচনা করে ক্রমশ এগিয়ে যেতে হয় সমাজতন্ত্রের দিকে, এবং তা আজকে স্বীকৃত হয়েছে। রাশিয়া যে পন্থা অবলম্বন করেছে, চীন তা করেনি সে অন্যদিকে চলেছে। রাশিয়ার পাশে বাস করেও যুগোশ্লাভিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া নিজ দেশের পরিবেশ নিয়ে, নিজ জাতির পটভূমি নিয়ে সমাজতন্ত্রের অন্য পথে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যান, দেখা যাবে, ইরাক একদিকে এগিয়ে চলেছে, আবার মিসর অন্যদিকে চলেছে। বিদেশ থেকে হাওলাত করে এনে কোনোদিন সমাজতন্ত্র হয় না; তা যারা করেছেন, তাঁরা কোনোদিন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। কারণ লাইন, কমা, সেমিকোলন পড়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না যেমন তা পড়ে আন্দোলন হয় না। সেজন্য দেশের পরিবেশ, দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের রীতিনীতি, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব, সবকিছু দেখে ক্রমশ এগিয়ে যেতে হয়। একদিনে সমাজতন্ত্র হয় না। কিন্তু আমরা ৯ মাসে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছি, তা আমার মনে হয় দুনিয়ার কোনো দেশ, যারা বিপ্লবের মাধ্যমে সোশ্যালিজম এনেছে তারাও সেগুলো করতে পারেননি, এ ব্যাপারে আমি চ্যালেঞ্জ করছি। কোনো কিছু প্রচলন করলে কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়ই। সেটা প্রসেসের মাধ্যমে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।’অনেকে বলেন ১৯৭২-এর সংবিধানে বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র যুক্ত করেছেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের প্রভাবে। কমিউনিস্ট না হয়েও যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গ্রহণ করা যায় এটি বঙ্গবন্ধুর ৪ নভেম্বরের ভাষণে স্পষ্ট। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের কর্তব্য বিশ্বশান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে যারা আবদ্ধ ছিল, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যাদের সর্বস্ব লুট করেছে তাদের প্রয়োজন নিজের দেশকে গড়া ও জনগণের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির দিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। বিশ্বশান্তির জন্য জনমত সৃষ্টি করা তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সমাজতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে তাঁর অবস্থান একাধিক স্থানে স্পষ্ট করেছেন ‘আওয়ামী লীগ ও তার কর্মীরা যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করে। আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক নেতা ও কর্মী আছে যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে; এবং তারা জানে সমাজতন্ত্রের পথই একমাত্র জনগণের মুক্তির পথ। ধনতন্ত্রবাদের মাধ্যমে জনগণকে শোষণ করা চলে। যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা কোনোদিন কোনো রকমের সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করতে পারে না। তাদের কাছে মুসলমান, হিন্দু, বাঙালি, অবাঙালি সকলেই সমান। শোষক শ্রেণিকে তারা পছন্দ করে না। পশ্চিম পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এ রকম অপপ্রচার করা হয়েছে।’বঙ্গবন্ধু গণপরিষদে প্রদত্ত ৪ নভেম্বরের ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলেছেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। … মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি। কেউ যদি বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নাই, আমি বলবো সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটিকয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে।’’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শুধু সামরিক পরাজয়ই হয়নি, তাদের ধর্মের নামে রাজনীতি, হানাহানি, হত্যা ও ধ্বংসের দর্শনেরও পরাজয় ঘটেছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল সকল ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালিত্বের চেতনায় জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালিত্বের এই চেতনার প্রধান রূপকার, যার ভিত নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির এই ঐক্য পাকিস্তান ভেঙেছে, ধর্মের নামে রাজনীতির অমানবিক ধারণা ভেঙেছে। পরাজিত পাকিস্তান এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বাঙালির এই ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য প্রথমে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীদের হত্যা করে পাকিস্তানের সেবকদের ক্ষমতায় বসিয়েছে, ’৭২-এর সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলে বাঙালিত্বের চেতনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ধর্মকে, যা তারা পাকিস্তান আন্দোলনের সূচনা থেকেই করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি ও সন্ত্রাসের প্রতিষ্ঠাতা বিএনপির জনক জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য জাতিকে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি-বাংলাদেশী, ধর্মনিরপেক্ষতা-ইসলাম (রাজনৈতিক), সমরতন্ত্র-গণতন্ত্র প্রভৃতি দ্বন্দ্বে বিভক্ত করেছেন। ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দি পলিটিশিয়ানস’ এই ঘোষণা দিয়ে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক আদর্শকে ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিনাশ ঘটানোর পাশাপাশি ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির এই বিভাজন ঘটানো হয়েছে।স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে অধিকাংশ সময় এ দেশটি শাসন করেছে পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। ’৭৫-এর পর বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির যে পাকিস্তানিকরণ/মৌলবাদীকরণ/ সাম্প্রদায়িকীকরণ আরম্ভ হয়েছে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি প্রায় এক যুগ একটানা ক্ষমতায় থাকার পরও আমরা ’৭১-এর চেতনায় ফিরে যেতে পারিনি। ’৭২-এর সংবিধানে জেনারেল জিয়া কর্তৃক বাতিলকৃত রাষ্ট্রের চার মূলনীতি পুনঃস্থাপিত হলেও এখনও সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্ক থেকে সংবিধানকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা যায়নি। সেখানেও বাধা হচ্ছে বিভাজনের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রাবল্য।’৭২-এর সংবিধান কার্যকর থাকলে বাংলাদেশে ধর্মের নামে এত নির্যাতন, হানাহানি, সন্ত্রাস, বোমাবাজি, রক্তপাত হতো না। বাংলাদেশের ৪৮ বছর এবং পাকিস্তানের ৭২ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যাবতীয় গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসের জন্য দায়ী জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সমগোত্রীয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো, যা তারা করেছে ইসলামের দোহাই দিয়ে। ’৭২-এর সংবিধান এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শ মান্য করতে হলে ধর্মকে রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে বিযুক্ত রাখতে হবে ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও হত্যা বন্ধের পাশাপাশি ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য।বাংলাদেশ যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, যদি বৈষম্যহীন উন্নত ব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায়, যদি যুদ্ধ-জেহাদ বিধ্বস্ত বিশ্বে মানবকল্যাণ ও শান্তির আলোকবর্তিকা জ্বালাতে চায় তাহলে ভবিষ্যত বিপ্লবের জন্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যাকে ‘৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলা হয়, তা দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন ও অনুসরণ ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। আর তাইতো সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল সব শক্তি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।” সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

বঙ্গবন্ধু কী হারিয়ে যাবেন ইতিহাস থেকে? নাকি বেঁচে থাকবেন জনগণের মাঝে!

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!

সৈয়দ আমিরুজ্জামানবৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিংবদন্তি ও অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!তিনি ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর বেলায় বৃটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার জন্য নির্ভয়ে দৃঢ় পায়ে হাসতে হাসতে পরেছিলেন ফাঁসির দড়ি। কোন কোন চরিত্র জীবনভর মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে | ক্ষুদিরাম সেরকম একটি চরিত্র |ফাঁসির সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বৎসর ৭ মাস ১১ দিন। ফাঁসির দড়ি পরানোর সময় ক্ষুদিরাম হাসতে হাসতে জানতে চান জল্লাদের কাছে, ‘আচ্ছা তোমরা ফাঁসির দড়িতে মোম দাও কেন?’ এই হচ্ছেন ক্ষুদিরাম।অঞ্জলি লও হে বিপ্লবী | ক্ষুদিরামরা বাংলার বুকে বার বার জন্ম নেন , শিখিয়ে দেন কিভাবে দেশ ও মানুষকে ভালবাসতে হয়-গাইতে হয় মরণ জয়ের গান।ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে মুক্ত বাতাস কিনতে।’প্রায় দুইশ বছর শাসন করা ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন, যারা অস্ত্র হাতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন সেই তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে তাঁর নাম।কিশোর ক্ষুদিরাম বসু’র স্বপ্ন ছিলো স্বদেশকে মুক্ত করা। এর নির্মম পরিণতির কথা তাঁর অজানা ছিলো না। তারপরও দুঃখ, কষ্ট, বিপদ এবং মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি দেশকে মুক্ত করতে পিছপা হননি। মুক্ত হাওয়া, মুক্ত পরিবেশ এবং বাধাহীন শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে আত্মপরিচয়ে বাঁচতে শেখার নাম স্বাধীনতা।বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর থেকে বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশের হাতে চলে যায়। সেখান থেকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে প্রাণ দিয়েছেন বহু দেশপ্রেমিক।ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ১৯০৮ সালের ১২ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সেই সময়ের বর্ণনায় জানা যায়:‘মুজাফফরপুর, ১১ আগস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমন কি তাহার মাথার ওপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল। স্বদেশের জন্য মৃত্যুকে কিভাবে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তা শিখেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।আঠারো বছর বয়স যে কি সাহসী হয় তারও প্রমাণ ক্ষুদিরামের দৃঢ় মনোবল। তার স্মরণে রচিত বিখ্যাত গান, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি- আজ মানুষের অন্তরে প্রবাহিত।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ক্ষুদিরাম আজও আছে এই বাংলায়। প্রতিটি সাহসী দেশপ্রেমিক কিশোরই আজ একজন ক্ষুদিরাম।ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদেনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মাতা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম নামকরণের পেছনেও রয়েছে ছোট্ট ইতিহাস। তিনকন্যা সন্তান জন্মের পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। তার আগেই দুই পুত্র জন্মের পর মারা গিয়েছিল বলে জন্মের পরই তিন মুঠ ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদির কাছে দেন। এর থেকে তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। ১৮৯৫ সালে তার মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে তার বড় বোন অপরূপা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন। তার ভেতরে স্বদেশের চেতনা জন্ম নিতে সময় নেয়নি। ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে মেদেনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় বিপ্লবী পত্রিকা ’সোনার বাংলা’ বিলি করার সময় ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ক্ষুদিরাম বসু ক্রমেই ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন কাজে অংশ নেন। স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার জন্য তার জামাইবাবুর সরকারি চাকরিতে অসুবিধা হলে তাকে আশ্রয় দেন মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়েজেদের বোন। এ সময় কিংসফোর্ড নামটি ছিল বাঙালিদের কাছে ঘৃণার।বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে, কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম জীবন বাজি রেখে ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন কিংসফোর্ডকে। তার সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। যে গাড়িটিতে তাদের থাকার কথা ছিল তারা ছিলেন না সেদিন। তার বদলে মারা যায় দুই ইংরেজ মহিলা। দুই বিপ্লবী নিজের রাস্তায় পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বসু। বিচারে তার ফাঁসির রায় দেন বিচারক মি. কর্নডফ। তিনি ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা বুঝেছো? জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, বুঝেছি। তার মুখের অবিচলিত হাসি হাসি ভাব দেখেই বিচারক প্রশ্নটি করেছিলেন।এ প্রসঙ্গে ‘সঞ্জিবনী’তে লেখা হয়, ‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাহার নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবতঃ এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আসামীর প্রতি যে চরমদণ্ড প্রদত্ত হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এই ধারণাতে বিচারক ক্ষুদিরামকে উক্ত প্রশ্নটি করেছিলেন। মৃত্যুকে যে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তার কাছে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে কোনো বিভেদ নেই সেকথা তখন বিচারকও বুঝতে অক্ষম ছিল।’মৃত্যু যে কত সহজে বরণ করে নেওয়া যায় তা শিখিয়ে গেছে ক্ষুদিরাম। ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। ক্ষুদিরামের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিল, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে তিনি তার বোমা বানানোর বিদ্যা ভারতবাসীকে শিখিয়ে যেতে চান। কি অসীম সাহস থাকলে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভাবা যায়, মানুষের মুক্তির কথা চিন্তা করা যায় তার উদাহরণ ক্ষুদিরাম বসু।"ক্ষুদিরাম, তোমায় সালাম"অগ্নিযুগের রক্তভেজা পথে যে কিশোর যায়,হাসিমুখে মৃত্যুর কাছে জীবনের গান গায়;শিকল ভাঙার স্বপ্ন বুকে, মুক্ত আকাশ চায়—সে তো ক্ষুদিরাম, আজও বাংলার হৃদয় গায়।মেদিনীপুরের মাটির ঘরে জন্মেছিল ছেলে,দুঃখ-কাঁটার দিন পেরিয়ে উঠল আগুন জ্বেলে;স্বদেশ তখন শৃঙ্খলিত, পরাধীনতার জালে,কিশোর বুকে বজ্র উঠল অন্যায়েরই কালে।দুটি চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল আঁকা,মায়ের মুখে দেশের মাটি—সেই তো ছিল মাখা;জীবন তার ক্ষুদ্র হলেও স্বপ্ন ছিল বড়,দেশের তরে মৃত্যুকেও করল সে আপন করে।বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে জেগেছিল যে দেশ,স্বদেশি সেই অগ্নিমন্ত্রে জ্বলল অবশেষ;কাগজ হাতে, পথে পথে সে বিলিয়েছে বাণী,ব্রিটিশ শাসন কাঁপিয়ে দিল কিশোরেরই প্রাণী।কিংসফোর্ডের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ ছিল প্রাণ,বিচার নামে নিপীড়নের বাড়ছিল অপমান;প্রফুল্ল চাকী পাশে ছিল, দুজন অগ্নিশপথে,জীবন রেখে এগিয়ে গেল মৃত্যুরই রথে।মুজাফফরপুরের অন্ধ রাতে বজ্রের মতো ক্ষণ,বোমার শব্দ কাঁপিয়ে দিল ঔপনিবেশিক মন;লক্ষ্যভ্রষ্ট সেই বিস্ফোরণে ঘটল মর্মান্তিক ক্ষয়,তবু ইতিহাস লিখে রাখল তাদের অমর জয়।প্রফুল্ল গেল আত্মবলিদানে, বন্দি হলো ক্ষুদিরাম,বিচারক দিল মৃত্যুদণ্ড—নিভল না তার প্রাণ;“ফাঁসির দড়ি বুঝেছ?”—প্রশ্ন, শান্ত কিশোর হাসে,মৃত্যু যেন তুচ্ছ তার কাছে স্বাধীনতার আশে।এগারো আগস্ট ভোরের বেলা উঠল শেষ প্রহর,ফাঁসির মঞ্চে কিশোর গেল দৃপ্ত পায়ে নির্ভর;মাথার উপর মৃত্যুর টুপি, চোখে অমলিন হাসি,বাংলার মাটি দেখল সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসি।মাত্র আঠারো বছর বয়স—কতটুকু সে কাল!তবু তারই বুকের ভিতর জ্বলল সূর্যজাল;যে বয়সে হয় খেলাঘর আর স্বপ্ন বোনার দিন,সে বয়সেই মৃত্যুর সাথে করল আলিঙ্গন।শেষ ইচ্ছাতেও নিজের কথা ভাবেনি সে আর,বোমা বানানোর বিদ্যাটি দিতে চেয়েছে সবার;দেশের মানুষ শিখুক কেমন শিকল ভাঙার রণ—মৃত্যুকূপেও জেগে ছিল মুক্তিরই স্পন্দন।“একবার বিদায় দে মা”—কেঁদে ওঠে বাংলার গান,ক্ষুদিরামের রক্তে লেখা স্বাধীনতার মান;প্রতিটি সাহসী কিশোর যখন অন্যায়ের রুখে,ক্ষুদিরামের ছায়া যেন দাঁড়ায় তারই বুকে।স্বাধীনতা শুধু পতাকা নয়, শুধু বিজয়গান নয়,ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি—সেই তো সত্য জয়;বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার শপথ হোক আজ প্রাণে,মানুষ যেন মানুষ থাকে মানুষেরই সম্মানে।ধর্ম-বর্ণের বিভেদ মুছে, শোষণ-শৃঙ্খল ভেঙে,ন্যায়-সমতার সূর্য উঠুক বাংলার আকাশ রাঙিয়ে;যে স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ দিয়েছিল অগ্নিযুগের ছেলে,সেই স্বপ্ন আজ বাঁচুক মানুষের অধিকারের মেলে।ক্ষুদিরাম, তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেব না আর,অন্যায়ের কাছে নত হবে না বাংলার অধিকার;শোষিত মানুষের মুক্তির পথে জ্বলুক তোমার নাম,অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী—তোমায় লাল সালাম।ফাঁসির দড়ি ভয় দেখাতে পারেনি যে প্রাণ,আজও তারই সাহস জাগায় কোটি মানুষের গান;মৃত্যু পেরিয়ে বেঁচে আছো বাংলার প্রতিটি ধাম—স্বাধীনতার অমর সৈনিক, ক্ষুদিরাম—সালাম।—(ক্ষুদিরাম, তোমায় সালাম;—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই অগ্নিযুগের মহান এই বিপ্লবীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। ১১৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু তোমায় সালাম! সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream