বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

কলাম

কালজয়ী কবি পাবলো নেরুদা : সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণা যুগে যুগে

কালজয়ী কবি পাবলো নেরুদা : সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণা যুগে যুগে

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু কবি রয়েছেন, যাঁদের রচনা কেবল সাহিত্যিক রুচি পূরণের জন্য নয়, বরং যুগে যুগে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। চিলির কবি ও বিপ্লবী রাজনীতিক পাবলো নেরুদা তাঁদেরই একজন। দুনিয়া কাঁপানো কিংবদন্তি বিপ্লবী চে গুয়েভারা জীবনের শুরুতে তাঁর প্রথম প্রেমিকাকে নেরুদার কবিতা শোনাতেন এবং সারা জীবন এই কবির লেখা সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধের সময় বিকেলবেলায় তিনি সহযোদ্ধাদের কবিতা পড়ে শোনাতেন ক্যান্ত জেনেরাল থেকে। এমনকি মৃত্যুর মুহূর্তে বলিভিয়ায় তাঁর ব্যাকপ্যাকে পাওয়া যাওয়া সবুজ রঙের নোটবুকে নেরুদার কবিতা ছিল সর্বাধিক।পাবলো নেরুদা কেবল একজন নোবেল বিজয়ী কবি নন, তিনি ছিলেন সংগ্রামী চেতনার কণ্ঠস্বর। নিপীড়িত মানুষের দুঃখ, ক্ষোভ ও স্বপ্নকে তিনি কবিতার পরিশ্রমী শব্দচয়নে রূপ দিয়েছেন। ফলে তাঁর কাব্যকীর্তি বিশ্বসাহিত্যে এক অমর উচ্চতায় অবস্থান করছে।জন্ম, নাম ও শৈশবের অভিজ্ঞতা১৯০৪ সালের ১২ জুলাই চিলির পাররাঙ্গল নামের প্রত্যন্ত গ্রামে নেরুদার জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। মা রোসা বাসোআলতো সন্তান জন্মের এক মাস পরেই মারা যান। রেলকর্মী পিতা হোসে দেল কার্মেন রেইয়েস তাঁকে নিয়ে তেমুকো গ্রামে চলে আসেন। দরিদ্র পরিবারের এই শিশু কাদামাখা রাস্তায় ঠেলাগাড়িওয়ালাদের কষ্ট দেখে বড় হতে থাকেন। শৈশবের সেই করুণ অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে কবিতায় রূপ নেয়—“আমি বাস করছি তেমুকো,আর আমার ঘরের বাতায়ন পথেদুচোখ মেলে দেখি আমি কাদা আর কাদা…”কৈশোরেই তিনি ছদ্মনাম ‘পাবলো নেরুদা’ গ্রহণ করেন। পিতার কঠোর মানসিকতা থেকে লেখালেখি লুকিয়ে রাখাই ছিল এর প্রধান কারণ। ‘নেরুদা’ নামটি নিয়েছিলেন চেক সাহিত্যিক জান নেরুদার কাছ থেকে, আর ‘পাবলো’ সম্ভবত ফরাসি কবি পল ভারলেইন থেকে।সাহিত্যকর্ম : প্রেম থেকে বিপ্লবনেরুদার সাহিত্যকীর্তি বহুমাত্রিক। তাঁর প্রথম দিককার কাব্যগ্রন্থ টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপেয়ার প্রেম ও কামনার আবেগে ভরপুর। এই সংকলন তাঁকে তরুণ বয়সেই জনপ্রিয়তা এনে দেয়।তবে সময়ের সাথে সাথে তাঁর কলম হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্র। স্পেনের গৃহযুদ্ধ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ফ্যাসিস্ট ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে স্পেনের সংগ্রামে অংশ নিয়ে তিনি রচনা করেন প্রাণের স্পেন (১৯৩৮)। এই কাব্যগ্রন্থ কেবল সাহিত্য নয়, একেবারে রাজনৈতিক ঘোষণা হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে তাঁর মহাকাব্য ক্যান্ত জেনেরাল লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কণ্ঠস্বর হিসেবে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়।তেরো শতাধিক কবিতা রচনা করেছেন নেরুদা, যার মধ্যে প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রাম—সবই সমানভাবে স্থান পেয়েছে। তাঁর কবিতা প্রেমের কোমল স্পর্শে যেমন ভরপুর, তেমনি সেখানে আছে শোষিত শ্রমিকের রক্তাক্ত আর্তনাদ।কূটনৈতিক জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রামমাত্র তেইশ বছর বয়সে তাঁকে রেঙ্গুনে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ করা হয়। পরে ভারত, জাপান, চীন, মেক্সিকোসহ নানা দেশে দায়িত্ব পালন করেন। এই ভ্রমণ তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত করে।১৯৪৫ সালে তিনি চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সিনেটর নির্বাচিত হন। খনি শ্রমিকদের আন্দোলন গড়ে তোলায় তিনি শ্রমিকনেতা হিসেবেও পরিচিত হন। তবে রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলার কমিউনিজমবিরোধী অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। মাইহু হ্রদের গিরিপথ পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই তাঁর বিখ্যাত কবিতা পলাতক রচিত হয়।পরবর্তীতে সালভাদর আলেন্দের ঘনিষ্ঠ সহকারী হয়ে ওঠেন তিনি। আলেন্দে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে নেরুদার রাজনৈতিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়।নোবেল পুরস্কার ও বিশ্বজনীন স্বীকৃতি১৯৭১ সালে নেরুদা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে বিতর্ক থাকলেও বিশ্বসাহিত্য তাঁকে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন—“বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি।”নোবেল বক্তৃতায় নেরুদা বলেন—“আমরা আমাদের শোণিত ও তমসা দিয়েই তার বুক ভরে তুলি; কবিতা তো লিখতে হয় শোণিত ও তমসা দিয়েই।”এই উক্তি তাঁর সাহিত্য ও রাজনৈতিক জীবনের মূল দর্শনকেই প্রকাশ করে।প্রেমের কবিতার রসায়নকেরুদাকে অনেকেই কেবল বিপ্লবী কবি বলে জানেন। কিন্তু তিনি একইসঙ্গে অসাধারণ প্রেমের কবিও। নারীর শরীর, প্রেম, অভিলাষ ও বেদনা—সবকিছুকে তিনি নতুন ব্যঞ্জনায় কবিতায় তুলে ধরেছেন।তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতায় তিনি নারীকে পৃথিবীর উর্বর মাটির সঙ্গে তুলনা করেছেন—“নারীর রমণীয় শরীর, সাদা পাহাড়, শুভ্র উরু…আমার এ চাষাড়ে দেহ তোমাকে গভীরভাবে কর্ষণ করছেযাতে মাটির গহন থেকে লাফিয়ে উঠতে পারে শিশু।”এখানে প্রেম, প্রকৃতি ও জীবনের চিরন্তনতা একাকার হয়ে গেছে।প্রশ্নপুস্তক : দার্শনিক কাব্যের মহার্ঘ দলিলনেরুদার পড়ন্ত বয়সের রচনা প্রশ্নপুস্তক কাব্যগ্রন্থটি অনন্য। এই গ্রন্থজুড়ে আছে কেবল প্রশ্ন—জীবন, মৃত্যু, প্রকৃতি ও অস্তিত্ব নিয়ে।তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন—“আমায় বলো, গোলাপ কি নগ্ন?নাকি ওইটাই তার একমাত্র পোষাক?”এই প্রশ্ন সৌন্দর্যের দর্শনকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। আবার আরেক জায়গায় লিখেছেন—“যেখানে স্থানের শেষসেটাই কি মৃত্যু নাকি অনন্ত?”এখানে ফুটে উঠেছে মৃত্যুর পরবর্তী অজানাকে ঘিরে তাঁর গভীর চিন্তা।মৃত্যু ও উত্তরাধিকার১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় নেরুদা মারা যান। একনায়ক অগাস্তো পিনোচেট তাঁর অন্ত্যেষ্টিকে জনসমক্ষে করার অনুমতি দেননি। তবুও হাজারো মানুষ কারফিউ ভেঙে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। এই অন্ত্যেষ্টিই চিলির একনায়কতন্ত্রবিরোধী প্রথম গণআন্দোলনে রূপ নেয়।বিশ্বজনীন প্রাসঙ্গিকতানেরুদা প্রেমের কবি, বিপ্লবের কবি, মানবতার কবি—সব পরিচয়েই তিনি সমানভাবে অনন্য। তাঁর কবিতা নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন এখনও অসম্পূর্ণ, সেখানে নেরুদা পাঠ অপরিহার্য। তাঁর প্রশ্নপুস্তক আমাদের শেখায় প্রশ্ন করতে, আর তাঁর বিপ্লবী কবিতা শেখায় প্রতিরোধ গড়তে।"নেরুদার প্রতি"রেললাইনের ধোঁয়া পেরিয়ে জন্ম নিল যে কবি,কাদামাটির পথের পাশে শুনল মানুষের রব;বুকের ভেতর জমল তারই পৃথিবীজোড়া ব্যথা,শব্দ হলো অস্ত্র তার, কবিতা হলো কথা।নাম ছিল তার রিকার্দো, নেরুদা হলো পরে,গোপন খাতার স্বপ্নগুলো আগুন হয়ে ঝরে।পিতার চোখের আড়াল থেকে শব্দ পেল ডানা,ছোট্ট ছেলের কবিতাতে জেগে উঠল জানা।দক্ষিণ দেশের বৃষ্টিভেজা অরণ্য, নদী, মাটি,তারই মাঝে মানুষ খুঁজে পেয়েছিল সে সাথী।শুধু প্রেমের গোলাপ নয়, শুধু চাঁদের আলো—ক্ষুধার্ত মুখ, শ্রমিকের ঘাম, তারও ছিল ভালো।যখন স্পেন রক্তে ভাসে, জ্বলে ওঠে ঘর,ফ্যাসিবাদের বুটের নিচে কাঁপে জনতার পর;লরকার চোখ নিভে যায় আর বন্দুক গর্জে ওঠে,নেরুদার কলম তখন মানুষের পাশে ছোটে।মৃত্যু যদি আসে তবে আসুক—শব্দ থামবে না,রক্ত দিয়ে লেখা কবির স্বপ্ন মুছে যাবে না।যে কবিতা মানুষের, তার মৃত্যু কই হয়?অন্ধকারের বুক চিরে সে নতুন সূর্য রয়।চে-র ব্যাগে ছিল যে কবির কবিতারই পাতা,গেরিলা-শিবিরে সন্ধ্যা হলে উঠত সেই গাঁথা।বন্দুক হাতে যোদ্ধারাও শুনত প্রেমের বাণী,যুদ্ধের মাঝেও মানুষ থাকে—সেই তো কবির জ্ঞানী।প্রেমের কবি, শ্রমের কবি, নিপীড়িতের গান,সমুদ্রজোড়া মানুষেরই দুঃখ তাঁর প্রাণ।নারীর দেহে দেখেছেন তিনি উর্বর ধরিত্রী,জীবনেরই বীজ বুনেছে প্রেমের অন্তরাত্মা-স্মৃতি।আর যখন তিনি লিখলেন শুধু প্রশ্নের মালা,গোলাপ কেন নগ্ন থাকে—কী তার রঙের জ্বালা?বৃষ্টিভেজা বিষণ্ন ট্রেন কোথায় যায় শেষে,মৃত্যুর পরে অনন্ত কি অপেক্ষায় থাকে দেশ?অরণ্যের হলুদ রং কি আগের মতো থাকে?পাখির কালো ঝাঁক কি ফেরে পুরনো কোনো ডাকে?স্থানের শেষে মৃত্যু নাকি অনন্তের দ্বার—প্রশ্ন রেখে কবি যেন পেরিয়ে গেলেন পার।সাদা কাগজ রক্ত চায়—বলেছিলেন যে কবি,শব্দ যদি সত্য হয়, সে শব্দ থাকে মুক্তি।তমসা ভেঙে মানুষেরই মুক্তির স্বপ্ন বোনে,কবিতা তাই বেঁচে থাকে মানুষেরই মনে।আলেন্দের সেই স্বপ্ন যখন রক্তে গেল ডুবে,পিনোচেটের কালো ছায়া নেমে এলো ভুবনে;হাসপাতালের শয্যায় তখন মৃত্যুর পদধ্বনি,তবু কবির নামটি ছিল মানুষেরই ধ্বনি।কার্ফুর রাতে শোকাহত জনতা পথে নামে,নীরব চোখে লাল পতাকা কাঁদে কবির নামে।শাসকেরা দেহ রুখতে পারে, রুখতে পারে না গান—নেরুদারই কবিতা আজও মানুষের প্রাণ।যে কবি মাটির গন্ধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে গেলেন,শ্রমিক-কৃষক-প্রেমিকেরই হৃদয় ছুঁয়ে নিলেন;তার কবিতার প্রতিটি শব্দ জিজ্ঞাসে আজও—মানুষ কেন বঞ্চিত হবে, কেন থাকবে লাজে?পৃথিবী যদি বৈষম্যের শৃঙ্খলে হয় বাঁধা,কবির প্রশ্ন জেগেই থাকে—কার হাতে এই ফাঁদা?ক্ষুধার পাশে অন্ন চাই, মানুষের পাশে মানুষ,স্বাধীনতার স্বপ্ন যেন না হয় কেবল ফানুস।নেরুদা, আজ তোমার কাছে আমাদের এই সালাম,শ্রমের ঘামে, সংগ্রামে যে জেগে থাকে নাম।তোমার প্রশ্ন বাতাস বেয়ে আজও আসে কানে—মানুষ হবে মানুষেরই—এই কি স্বপ্ন জানে?তোমার প্রেমে পৃথিবী জাগে, তোমার ক্রোধে আগুন,তোমার শব্দ পথ দেখাক অন্ধ সময়ের ভেতর।কবির মৃত্যু শেষ নয় তো, শেষ নয় কোনো গান—নেরুদা, তুমি বেঁচে আছো মানুষেরই প্রাণ।যতদিন এই পৃথিবীতে বৈষম্য থাকবে জেগে,যতদিন শ্রমিকের ঘাম ঝরবে মাটির বুকে লেগে,যতদিন প্রেম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখবে প্রাণ—ততদিনই নেরুদা তুমি অমর, অবিনাশী গান।লাল সালাম, কবি তোমায়—মানবতার কবি,লাল সালাম সংগ্রামী সেই শব্দ-সৈনিক কমরেড।প্রশ্নপুস্তক খুলে রেখে চলে গেছ যে দূর—তোমার প্রশ্ন জেগে থাকুক, জাগুক মানুষের সুর।—(নেরুদার প্রতি,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)উপসংহারপাবলো নেরুদা শুধু সাহিত্যিক নন; তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষী, সংগ্রামী, বিপ্লবী এবং মানবতার সৈনিক। নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা, প্রেমের আবেগ, প্রকৃতির সৌন্দর্য—সবকিছু তিনি কবিতার দ্যুতিতে অমর করে রেখেছেন।আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের। বিশ্বজনীন এই কবির সাহিত্য, জীবন ও সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাক।নোবেল বিজয়ী কবি কমরেড পাবলো নেরুদার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.com

অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর মানচিত্রে সব রাষ্ট্রপ্রধান ও সকল মানুষের নিকট আলোচিত এবং পরিচিত একটি নাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ২১শে সেপ্টেম্বর বিশেষ বিমানযোগে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে দেশবাসীর দোয়া নিয়ে যাত্রা করে সেখানে ইতোমধ্যে ভালোভাবে পৌঁছে অবস্থান করছেন। তিনি দেশ পরিচালনায় দক্ষতার ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। তার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে অল্প দিনে মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র প্রধানদের নিকট তার ব্যক্তিগত গুণাবলীর উৎকর্ষতা ও আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে। তাইতো তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি মুগ্ধ। যার প্রমাণ জাতিসংঘের ৮১ তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের জয় লাভ। এ জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। যার অংশীদার বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণ।জাতিসংঘের ৮১ তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সম্মানিত সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর মোহাম্মদ খলিলুর রহমানের জয়লাভের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। পরাশক্তি দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীন ও রাশিয়ার বৈরিতা বা মতবিরোধ থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার সমর্থনে বাংলাদেশ এ গৌরব উজ্জ্বল  সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব হুমায়ুন রশিদ এ সম্মান লাভে সমর্থ হয়েছিলেন ।সুদীর্ঘ প্রায় চার দশক পর ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।এমন একজন ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আলোকিত করেছেন তিনি শুধু বাংলাদেশের নন সারা পৃথিবীর সম্পদ। তিনি হলেন ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি পৃথিবীর সকল দেশ ও মানুষের নিকট বরণীয় ও সমাদৃত একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তার অনুপ্রেরণা একটু পরামর্শ, সুপারিশ বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিতে পারে। তার প্রতি   প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের অগাধ বিশ্বাস, আস্থা , শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাদার অফ ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে নোবেল জয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস এর সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। এজন্য প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গুলোতে  ডঃ মোঃ ইউনুস সব সময় আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ার  পিছনে ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস এর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশনে জনাব তারেক রহমান ২৪ শে সেপ্টেম্বর ২০২৬  বিশ্বমঞ্চে বক্তৃতা প্রদান করবেন  । এটা যেমন গৌরবের তেমনি  সম্মানের। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান  ২৭শে আগস্ট ১৯৮০ সালে জাতিসংঘে তার প্রদত্ত ভাষণে বৈশ্বিক সমতার ডাক দিয়েছিলেন। মাদার অফ ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের পহেলা অক্টোবর জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এ বিরল সম্মানের অধিকারী হবেন তাদের উত্তরসূরী জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য (১৯৮০---২০২৬) জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি তার বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র ,দারিদ্র্য বিমোচন, বৈশ্বিক শান্তি , আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে মতবিনিময় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের  আমন্ত্রনে নৈশ ভোজে অংশগ্রহণ করবেন।জাতিসংঘে তার অংশগ্রহণ ,প্রদত্ত ভাষণ,  বাংলাদেশের জনগণের জন্য কল্যাণ ও সম্মান বয়ে আনুক । তার সফর হোক সফল ও সার্থক। দেশের জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে।মোঃ আব্দুর রাজ্জাক লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান , সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা

অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

নীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত: সার্কুলার অর্থনীতির হাত ধরে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন দুটি পরস্পরসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ—একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘নাও–তৈরি করো–ব্যবহার করো–ফেলে দাও’ বা linear economic model এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য হ্রাস এবং প্রকৃতি সংরক্ষণকে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রূপান্তরের ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।আর এই সার্কুলার অর্থনীতির সঙ্গে যখন সমুদ্র, উপকূল, মৎস্য, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারকে যুক্ত করা হয়, তখন সামনে আসে ‘সার্কুলার ব্লু ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার নীল অর্থনীতির ধারণা। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অথচ বিশাল সামুদ্রিক সম্পদসমৃদ্ধ একটি দেশের জন্য এ ধারণা কেবল একটি নতুন উন্নয়ন-দর্শন নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত বিষয়।১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের গুজরাটের গান্ধীনগরে অনুষ্ঠিতব্য World Circular Economy Forum (WCEF) 2026-এর অ্যাক্সিলারেটর সেশন ‘A Circular Blue Economy: Bangladesh as a South Asian Pioneer’ এই আলোচনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে সামনে নিয়ে এসেছে। ১৫ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত WCEF2026 যৌথভাবে আয়োজন করেছে Finnish Innovation Fund Sitra এবং ভারতের Ministry of Environment, Forest and Climate Change-এর অধীন Central Pollution Control Board (CPCB), সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীদার। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিকে সার্কুলার অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে এই বিশেষ সেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।সমুদ্র শুধু সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র নয়বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে গত এক দশকে অনেক আলোচনা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণের পর সামুদ্রিক সম্পদ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। মৎস্য, সামুদ্রিক পরিবহন, বন্দর, জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক জীবসম্পদ, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে রাখা জরুরি: আমরা কি সমুদ্রকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণের জায়গা হিসেবে দেখব, নাকি সমুদ্রের প্রাকৃতিক উৎপাদনক্ষমতা ও প্রতিবেশব্যবস্থাকে রক্ষা করেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করব?সার্কুলার ব্লু ইকোনমি দ্বিতীয় পথটির কথাই বলে।একটি সুস্থ সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা ছাড়া টেকসই মৎস্য উৎপাদন সম্ভব নয়। ম্যানগ্রোভ, মোহনা, সামুদ্রিক ঘাসভূমি, প্রবাল বা অন্যান্য উপকূলীয় ও সামুদ্রিক আবাসস্থল শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এগুলো মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র, উপকূল সুরক্ষা, কার্বন ধারণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার ভিত্তি। ফলে সমুদ্র থেকে যত বেশি সম্পদ আহরণ করা যাবে, সেটিই নীল অর্থনীতির সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। বরং প্রশ্ন হতে হবে—প্রকৃতির পুনরুৎপাদনক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে কত বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব?বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত বাস্তবতাবাংলাদেশ একদিকে একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির দেশ, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখোমুখি। একই সময়ে দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় মৎস্য খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির নীতি হতে হবে একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী, সংরক্ষণমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।WCEF2026-এর আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য যে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো—নীল অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রকল্প বা খাত হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সার্কুলার অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা।‘বর্জ্য’ থেকে ‘সম্পদ’—নতুন অর্থনৈতিক দর্শনসার্কুলার অর্থনীতির অন্যতম মূল ধারণা হলো, একটি প্রক্রিয়ায় যে উপাদান বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, অন্য একটি প্রক্রিয়ায় সেটিই সম্পদে পরিণত হতে পারে। সামুদ্রিক অর্থনীতিতে এই ধারণার প্রয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে।মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের বর্জ্য থেকে প্রোটিন, তেল, কোলাজেন, জৈবসার বা অন্যান্য মূল্যবান পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সামুদ্রিক শৈবাল ও অন্যান্য marine biomass থেকে খাদ্য, পশুখাদ্য, জৈবসার, প্রসাধনী কিংবা শিল্পের কাঁচামাল তৈরি হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলা যায়।এখানেই ‘marine bio-valorization’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—অর্থাৎ সামুদ্রিক জৈবসম্পদকে শুধু কাঁচা পণ্য হিসেবে আহরণ ও বিক্রি না করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর করা।বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা এবং শিল্প খাতকে এ ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া নীল অর্থনীতি অসম্পূর্ণবাংলাদেশের নীল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো মৎস্যসম্পদ। কিন্তু সামুদ্রিক মাছের মজুতের ওপর চাপ, অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা, আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।তাই মৎস্য খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মৎস্যসম্পদের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক stock assessment, কার্যকর fisheries management, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, seasonal বা area-based management, উপযুক্ত নজরদারি এবং স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা।একই সঙ্গে sustainable aquaculture বা টেকসই জলজ চাষের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব কমানো, রোগ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পানির দক্ষ ব্যবহার, traceability এবং আন্তর্জাতিক বাজারের sustainability standards পূরণ করা ভবিষ্যৎ রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।রপ্তানি বাজারে ‘সবুজ’ হওয়া এখন অর্থনৈতিক প্রয়োজনবিশ্ববাজারে পরিবেশ ও জলবায়ু-সংক্রান্ত মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে তাই শুধু উৎপাদন খরচ বা পণ্যের গুণগত মান দিয়ে প্রতিযোগিতা করলে হবে না; supply chain-এর পরিবেশগত footprint-ও বিবেচনায় নিতে হবে।মৎস্য ও সামুদ্রিক পণ্যের ক্ষেত্রে sustainable sourcing, traceability, eco-certification এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশগত মান পূরণ করতে না পারলে অনেক পণ্যের বাজারে প্রবেশ কঠিন হতে পারে।অতএব সার্কুলার ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি একটি trade strategy-ও হতে পারে।জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ: সম্ভাবনার সঙ্গে দায়িত্ববাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ship recycling hub। এই খাত দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখলেও এর সঙ্গে পরিবেশ, শ্রমিক নিরাপত্তা ও hazardous materials ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত।সার্কুলার অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ circular industry—কারণ পুরোনো জাহাজের ইস্পাত ও অন্যান্য উপাদান পুনরুদ্ধার করে অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত না হলে সার্কুলার অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে।তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি safe, green and internationally credible ship recycling industry গড়ে তোলা। প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, hazardous material handling, occupational safety এবং পরিবেশগত monitoring-এ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো নীল অর্থনীতি নয়নীল অর্থনীতির আলোচনায় প্রায়ই বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর কথা বলা হয়। কিন্তু উপকূলের মানুষ—জেলে, মাছচাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী, যুবক এবং অন্যান্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী—এই অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অংশ।যদি নতুন বিনিয়োগ ও প্রকল্পের ফলে স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জীবিকা সংকুচিত হয়, ভূমি বা জলসম্পদে প্রবেশাধিকার কমে যায় কিংবা আয়বৈষম্য বাড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।তাই inclusive coastal livelihood হতে হবে সার্কুলার ব্লু ইকোনমির একটি মৌলিক স্তম্ভ। নারীদের জন্য মূল্যশৃঙ্খলে নতুন সুযোগ, যুবকদের জন্য সবুজ দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র জেলে ও মাছচাষিদের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।ব্লু কার্বন: পরিবেশ থেকে অর্থনৈতিক মূল্যবাংলাদেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য blue carbon ecosystem জলবায়ু প্রশমন ও উপকূল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে blue carbon এখন শুধু পরিবেশগত আলোচনার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে এটি climate finance-এর একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রও হতে পারে।তবে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন। কার্বন বাজার বা blue carbon প্রকল্পকে কেবল কার্বন ক্রেডিট তৈরির ব্যবসা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রকৃত কার্বন ধারণের পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে পরিমাপ, রিপোর্টিং ও যাচাই করতে হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।অর্থাৎ blue carbon-এর অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সঙ্গে ecosystem integrity এবং community rights—দুইটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।অর্থায়নের নতুন কাঠামো প্রয়োজনসার্কুলার ব্লু ইকোনমিতে বিনিয়োগের একটি বড় বাধা হলো—অনেক প্রকল্প পরিবেশগত ও সামাজিকভাবে উপকারী হলেও প্রচলিত অর্থায়ন কাঠামোয় তাৎক্ষণিকভাবে আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক মডেল হয়ে উঠতে পারে না।এখানে blended finance গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারি অর্থ, উন্নয়ন সহযোগী, development finance institutions, impact investors এবং private capital-কে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া সম্ভব।বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি, circular aquaculture, marine waste-to-value, blue biotechnology, renewable marine energy এবং coastal resilience-এর মতো খাতে catalytic capital প্রয়োজন হতে পারে।বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কীভাবে পরিবেশগত ও সামাজিক সুফলকে পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার কাঠামো তৈরি করা যায়।নীতির সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাবাংলাদেশে নীল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগী কাজ করছে। কিন্তু সমুদ্রের প্রকৃতি নিজেই আন্তঃখাতীয়। মৎস্য, নৌপরিবহন, বন্দর, জ্বালানি, পরিবেশ, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন, স্থানীয় সরকার—সব খাতের কার্যক্রমের সঙ্গে সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।তাই শুধু ‘Blue Economy’ নামে একটি নীতিপত্র বা প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত marine spatial planning এবং ecosystem-based management framework, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ecological limits একই পরিকল্পনার মধ্যে বিবেচিত হবে।একই সঙ্গে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সমুদ্রসম্পদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য, মাছের মজুত, দূষণের উৎস, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিভিন্ন খাতের cumulative impacts সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন।আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগবঙ্গোপসাগর কোনো একটি দেশের একক সম্পদ নয়; এটি একটি আন্তঃসীমান্ত সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমারসহ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সামুদ্রিক সম্পদ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে বহু আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, fisheries management, marine research, disaster preparedness, blue carbon, sustainable shipping এবং ocean technology-তে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।এই জায়গায় WCEF2026-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা, বিনিয়োগকারী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের একই আলোচনায় নিয়ে আসা আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে।সামনে কী করতে হবেবাংলাদেশ যদি সত্যিই সার্কুলার ব্লু ইকোনমিতে একটি আঞ্চলিক উদাহরণ তৈরি করতে চায়, তাহলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।প্রথমত, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সার্কুলার মূল্যশৃঙ্খল চিহ্নিত করে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, মৎস্য ও সামুদ্রিক পণ্যের traceability ও sustainability certification বাড়াতে হবে। চতুর্থত, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে পরিবেশ ও শ্রম নিরাপত্তার মান আরও উন্নত করতে হবে। পঞ্চমত, marine waste-to-value ও marine biotechnology-তে গবেষণা ও উদ্যোক্তা বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।ষষ্ঠত, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য inclusive green jobs ও livelihood diversification-এর সুযোগ তৈরি করতে হবে। সপ্তমত, blue carbon ও blended finance-এর জন্য শক্তিশালী governance এবং measurement framework গড়ে তুলতে হবে। এবং সর্বোপরি, এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত জাতীয় circular blue economy roadmap-এর আওতায় আনা প্রয়োজন।বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নতুন উন্নয়ন-পর্বের সুযোগবাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরবর্তী পর্যায়ে সমুদ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ frontier। কিন্তু এই frontier-এর অর্থ শুধু আরও বেশি মাছ ধরা, আরও বেশি জাহাজ ভাঙা কিংবা আরও বেশি সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো—প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে সমুদ্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা যায়।এই দৃষ্টিকোণ থেকেই circular blue economy ধারণাটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অর্থনীতি ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি মাছের বর্জ্য যেখানে নতুন পণ্যের কাঁচামাল হতে পারে, একটি পুরোনো জাহাজ যেখানে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে, উপকূলীয় ecosystem যেখানে একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, কার্বন ধারণ ও মানুষের জীবিকার ভিত্তি হতে পারে—সেখানেই সার্কুলার নীল অর্থনীতির প্রকৃত সম্ভাবনা।WCEF2026-এর আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তাই হতে পারে: সমুদ্রকে কেবল আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক-পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা মাছ ধরতে পারি, কতটি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে পারি বা কত বেশি সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানি করতে পারি—শুধু তার ওপর নয়। বরং নির্ভর করবে, এই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা সমুদ্রের উৎপাদনশীলতা, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা কতটা দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখতে পারছি তার ওপর।অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু সম্পদের ভাণ্ডার নয়, হয়ে উঠতে পারে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রকৃতিবান্ধব অর্থনীতির ভিত্তি।সার্কুলার ব্লু ইকোনমির পথ তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন নীতি-ধারণা নয়; এটি সমুদ্রকে কেন্দ্র করে আগামী দিনের উন্নয়ন-দর্শন নির্মাণের একটি সুযোগ।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

নীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত: সার্কুলার অর্থনীতির হাত ধরে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা

একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনের অনন্য দলিল

লেখক: মো. মাহবুব কবীর মিলন, সাবেক অতিরিক্ত সচিবইদানিং জেন-জি'রা প্রায় জানতে চায়, চাকুরি জীবনে আমি কী করেছি আগে!! মানে ঘাস কেটেছি কিনা। শিশুদের জানার জন্য আবার রিপোস্ট করলাম। যারা পড়েছেন আগে, তাদের জন্য নয়।আমার কর্ম জীবনের কিছু এ্যাচিভমেন্ট ( Achievement) বা অর্জন। নতুন সরকারি কর্মকর্তা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমার চাকুরিজীবনের সামান্য প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরলাম, যাতে তাঁরা সাহসী হয়।এখানে বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা অসততা নেই। বানান ভুল এবং অতি বড় লিখার  জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।    ১। ফরমালিনের অপব্যবহার দূরীকরণঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৫ সালে “ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ চুড়ান্ত হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এর পর এই আইনের মারাত্মক একটি ত্রুটি নজরে আসে আমার। আমদানি নীতি আদেশে “ফরমালিনের” সংজ্ঞায় শুধু “ফরমালিন” শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছিল, অথচ ফরমালিনের আরও ১০টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাম রয়েছে। যা সংজ্ঞায় আনা প্রয়োজন। পরদিন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে গিয়ে জানতে পারি বিগত এক বছরে অন্য দশটি নামে ফরমালডিহাইড পাউডার (১:৪০ জ্বলীয় দ্রবন=ফরমালিন) আমদানি হয়ে এসেছে প্রায় ১৭৫০০ মেঃটন, অথচ ঐ সময়ে আইনের সংজ্ঞায় উল্লেখিত ফরমালিন আমদানি হয়েছে মাত্র পাঁচ কেজি।সংজ্ঞায় ফরমালিনের সাথে অন্য ১০টি নাম উল্লেখ করে আমি বিকালেই তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ইমেইল করি। তা করা না হলে আইন পাশ হলেও ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করা যেত না। পরদিন আইন মন্ত্রী মহোদয় জনাব আনিসুল হক স্যারের সাথে চট্টগ্রাম থেকে ফোনে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি বিস্তারিত জানাই। তিনি ফরমালিনের অন্য দশটি নাম লিখে নেন। আইন মন্ত্রী মহোদয় আইনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে ফেরত এনে আইনের সংজ্ঞায় সব নাম যুক্ত করে চুড়ান্ত করেন। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করি যাতে দ্রুততম সময়ে আমদানি নীতি সংশোধন করে ফরমালিনের অন্য দশটি নাম যুক্ত করে শিল্প ছাড়া ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। সংশোধন করা হয় আমদানি নীতি। বন্ধ হয়ে যায় ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় খোলা বাজারে ফরমালিনের ক্রয় বিক্রয়। বাজারে ফরমালিন নেই, কাজেই এর অপব্যবহারও নেই। ২০১৫ হতে আজ পর্যন্ত আর এক কেজি ফরমালিন বাণিজ্যিকভাবে আমদানি হয়নি। দেশে কোথাও খোলা বাজারে ফরমালিন বিক্রি হয় না। ফরমালিন আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং তা কঠিনভাবে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই সময়ের সিনিয়র বাণিজ্য সচিব জনাব Hedayetullah Al Mamoon স্যার এবং বর্তমান পরিকল্পনা সিনিয়র সচিব আমার বন্ধু Satyajit Karmaker মহোদয়।২। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অপব্যবহার দূরীকরণঃ ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে সরকার। শুধু শিল্পে ব্যবহারের জন্য এর আমদানি নিয়ন্ত্রিত। কাঁচামাল হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে মাত্র ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আমদানির পারমিশন দিয়েছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, অথচ বাজারে অবাধে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে ক্যালসিয়াম কার্বাইড। এই আইন ঘাঁটতে গিয়ে লক্ষ্য করি যে একটি বিশাল ত্রুটি রয়ে গিয়েছে এর লাইসেন্সের শর্তাবলীতে। শিল্প ছাড়া আমদানি, ক্রয়, বিক্রয় পরিবহন নিষিদ্ধ হলেও লাইসেন্সের শর্তাবলীর ৯ নাম্বার ধারায় সুস্পষ্ঠ উল্লেখ রয়েছে যে, দেশে যে কোন ব্যক্তি বা আমদানিকারক, যে কোন ব্যক্তির কাছে ২০ কেজি পর্যন্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড ক্রয় বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদ করতে পারবে। ২০ কেজি ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে সারা দেশের এক সিজনের আম বা ফল পাকানো যায়। লাইসেন্সের এই ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলীর জন্য বাজারে সহজলভ্য ছিল ক্যালসিয়াম কার্বাইড। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নিকট তুলে ধরি। মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি সভা করে (সব ক’টিতে আমি উপস্থিত ছিলাম) লাইসেন্সের ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলী বাতিল করে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অবৈধ ব্যবহারের জন্য ছয় মাসের শাস্তি আরোপ করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। বন্ধ হয়ে যায় ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বাণিজ্যিক ক্রয় বিক্রয়, সরবরাহ ও মজুদ। এখন ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।কৃতজ্ঞতা DG Ahsanul Jabbar  স্যার৩। হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণঃ ড্রাগ প্রশাসনের নীতিমালা বা আইনে চিকিৎসা খাতে নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা সামগ্রীর মূল্য বেঁধে দেয়া বা এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) নির্ধারণ করার ব্যবস্থা থাকা সত্বেও দেশে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর মূল্য ছিল লাগামহীন। যে যেভাবে পারত স্টেন্ট এর দাম আদায় করত অসহায় রোগির কাছ থেকে। এক চিকিৎসকের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর এমআরপি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বিষয়টি নিয়ে পোস্ট দেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন পেজে। সেখানে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে, চিঠি লিখি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যারের কাছে। কপি প্রেরণ করা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহ মহাপরিচালক ড্রাগ প্রশাসন মহোদয়ের নিকট। একাধিক সভা আহ্বান করে ড্রাগ প্রশাসন। উপস্থিত ছিলাম আমি সেখানে। এরপর হার্টের স্টেন্ট বা রিং এর এমআরপি নির্ধারণ করা হয়। তিন থেকে চার লাখ টাকার স্টেন্ট এর দাম নেমে আসে সর্বোচ্চ ১থেকে ১.৫ লক্ষ টাকায়।কৃতজ্ঞত Abul Azad স্যার @জাহিদুর রহমান (ভাইরোলজিস্ট)৪। ইয়াবা তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় ঔষধের উপাদান সিউডোএফিড্রিন নিষিদ্ধ ঘোষণাঃ এক ঔষধের দোকানে জানতে পারি সর্দি কাশির সিরাপের উপাদান সিউডোএফিড্রিন পাউডার দিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাউডার আমদানি করে তা ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে, যা দিয়ে ইয়াবার মূল উপাদান মেথাএম্ফিটামিন বানানো হয়। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে এর সত্যতা যাচাই করে নেই। আরো জানতে পারি যে, সিউডোএফিড্রিন এর ব্যবহার পৃথিবীর অনেক দেশেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ এবং চিকিৎসা খাতে অনেক বিকল্প উপকরণ থাকায় সিউডোএফিড্রিন এর কোন প্রয়োজন নেই। এটা অবশ্যই আমাদের দেশেও নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে সিউডোএফিড্রিন যুক্ত একটি কফ কাশির ট্যাবলেট দিয়ে দশটি ইয়াবা বানানো যায়। সেই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ, ঢাকা শহরে চারটি ইয়াবা তৈরির কারখানার খোঁজ পায়। তারমানে দেশেই ইয়াবা তৈরি শুরু হয়েছিল।এরপর আমি সিউডোএফিড্রিন যুক্ত কয়েকটি ট্যাবলেট এবং সিউডোএফিড্রিন আমদানি, ক্রয় বিক্রয় এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য চিঠি সহ দেখা করি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের সাথে এবং ট্যাবলেট ও চিঠি প্রদান করি তাঁর হাতে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সচিব স্যারকে (বর্তমানে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান) সভাপতি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডিজি ড্রাগ প্রশাসন, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেন। কমিটি অনেকগুলো সভা করে অবশেষে সিউডোএফিড্রিন পাউডারের আমদানি এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা সহ সিউডোএফিড্রিন দিয়ে বানানো সব ঔষধের লাইসেন্স বাতিল করে ঐসব ঔষধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। যা এখনো কার্যকর আছে। এরফলে বন্ধ হয়ে যায় দেশে ইয়াবা তৈরির কারখানা।কৃতজ্ঞতা @Abul Azad স্যার৫। ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফি বন্ধে ব্যবস্থাঃ একবার ঈদে রংপুরে গ্রামের বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে, গ্রামের ছেলেরা বাজারে গিয়ে ১০ টাকা দিয়ে দুই জিবি পর্ণগ্রাফি মোবাইলে ডাউনলোড করে দেখে এবং এই আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তারা। এ থেকে আমাদের বাড়ির কৃষি কাজের ছেলেও মুক্ত ছিল না। পর্ণগ্রাফি আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ। ফিরে এসে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের কাছে তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি লিখি। কপি প্রদান করি তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব স্যারের কাছে এবং দেখা করি তাঁর সাথে। পৃথিবীর অনেক দেশেই পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রিত, অথচ আমাদের দেশে অবাধ এবং সহজ এক্সেস। প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যার সেই চিঠির প্রেক্ষিতে দ্রুত একটি প্রজেক্ট নেয়ার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ প্রদান করেন। অবশেষে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়, যা বাস্তবায়ন করে ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন বা ডট। সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এন্ড রেসপঞ্জ নামে এটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিটিআরসি। যেখানে পর্ণগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ সহ আরও অনেক কাজ করা হচ্ছে।কৃতজ্ঞতা @abul azad স্যার৬। ঘন চিনি বা সোডিয়াম সাইক্লামেট খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ি মিথ্যা ডিক্লারেশন দিয়ে অন্য নামে সোডিয়াম সাইক্লামেট আমদানি করে আসছিল। এছাড়া সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে জমিতে ব্যবহারের রাসয়নিক সার সোডিয়াম সালফেট মিশ্রণ করে প্যাকেটজাত অবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছিল খোলা বাজারে। যা ব্যবহৃত হত সারা দেশে বেকারি এবং মিস্টিতে। সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে যে সোডিয়াম সালফেট সার মেশানো হত তার কোন ক্লু বা প্রমাণ কোথাও ছিল না। আমার নিজের চেষ্টায় তা অনুধাবন করে খামার বাড়ি মৃত্তিকা গবেষণা ও উন্নয়ন ইন্সটিটিউট (এসআরডিআই) হতে পরীক্ষা করে সন্দেহের যথার্থতা প্রমাণিত হয় যে, তা সোডিয়াম সালফেট রাসয়নিক সার। এরপর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিষয়টি কাস্টমস সহ র্যা ব এবং পুলিশকে অবহিত করি।৭। চায়না থেকে অননুমোদিতভাবে সম্পূর্ণ তৈরি বা ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি বন্ধে বিএসটিআইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। উল্লেখ্য যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি হয়ে আসে দেশে, যা সম্পূর্ণ বে-আইনি।৮। সংশোধীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৮ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিধিমালা প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ তে কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব প্রেরণ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮ প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ প্রস্তাব প্রেরণ।৯। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণে “গামকা” এক মারাত্মক হয়রানির নাম। গামকা কর্তৃক নির্ধারিত ২৫টি প্যাথলোজি বা ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট গ্রহন করা হয় না। এই কারণে প্রবাসে গমনেচ্ছু শ্রমিকরা মারাত্মক হরানির স্বীকার হয়ে থাকেন প্রতিনিয়ত। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া রিপোর্ট দেয়া হয় না। এই গামকা সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে সারা দেশে ভাল ভাল হাসপাতাল বা ক্লিনিককে মধ্যপ্রাচ্যে গমনেচ্ছু শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।১০। দেশে ফ্রি ল্যান্সারদের সুবিধা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয় গেটওয়ে “পেপাল” চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।১১। শিশু নির্যাতনের ধরণে পৈশাচিকতা ও বর্বরতা ভয়ানক বেড়ে যাওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধন করে আরও কঠিন শাস্তির বিধান করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।১২। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক এবং নিন্ম-মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে একটি যুগোপযোগী এবং কল্যাণকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।১৩। কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত এলাকায় নেটিং/ফেন্সিং করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।১৪। বাসে চলাচলরত নারীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে জরুরি সার্ভিসের (৯৯৯) সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রতিটি গণপরিবহনের (বাস/রাইডার ইত্যাদি) অভ্যন্তরে চার পাশে গাড়ির নাম্বার বড় হরফে স্পষ্টাক্ষরে লিখা বাধ্যতামূলক করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সচিব এবং চেয়ারম্যান, বিআরটিএ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।১৫। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে চাকুরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করা প্রাথমিক আবেদনে, সার্টিফিকেট এবং ফটো সত্যায়ন ব্যবস্থা তুলে দেয়ার প্রয়জোনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে সচিব, সমন্বয় ও সংস্কার, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।১৬. কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য অবশ্যই প্রতি বছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ধান ক্রয় শুরু করার ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানিয়ে খাদ্য সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ। কারণ এপ্রিলের মধ্যভাগ থেকেই বোরো ধান কাটা শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আদেশ দিয়ে তা সব উপজেলায় প্রেরণ এবং ধান ক্রয় শুরু করতে জুন মাস নাগাদ লেগে যায়। ততদিনে প্রান্তিক চাষিরা মাঠ থেকেই দালাল ফড়িয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিকট কম মূল্যে ধান বিক্রি করে দেয়। ফলে সরকারি মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক।১৭। দেশে আমদানী হয়ে আসা কীটনাশক বন্দরে আসার পর কোন প্রকার ল্যাব পরীক্ষা ছাড়াই খালাস হয়ে থাকে। কোন কোন আমদানিকারক নিষিদ্ধ কীটনাশক নিয়ে আসলে বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে আসলে তা ধরার কোন উপায় নেই। এছাড়া কীটনাশকের লাইসেন্স নেয়ার সময় আবেদনকারীর আবেদনে উল্লেখিত সবগুলো ঘোষণার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা কৃষি বিভাগের নেই। মাঠ পর্যায়ে কৃষক সকালে কীটনাশক স্প্রে করে বিকালে বাজারে বিক্রি করে, রাতে তা আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে থাকি। এই প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভেল মেনে না চলার জন্য কীটনাশকের রেসিডিউ যাচ্ছে খাদ্যের সাথে আমাদের শরীরে। দেখা দিচ্ছে নানান জটিল রোগ। এসব কিছু থেকে উত্তরণের উপায় সহ ১০টি আন্তর্জাতিক মানের প্রটোকল আমি তৈরি করে তা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে কৃষি সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ করি।১৮। টঙ্গী ভৈরব, লাকসাম চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন চালুর পর ঢাকা চট্টগ্রাম ননস্টপ ট্রেন ৬.৩০ ঘন্টা থেকে বর্তমানে পাঁচ ঘন্টা দশ মিনিট করা, বায়োটয়লেট চালু করা, প্রতিটি কোচের ছাদে অপ্রয়োজনীয় এসিপি সিস্টেম তুলে দেয়া, ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে আনা নতুন কোচের অসংখ্য ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া হতে আনা ২৫০টি কোচে সেসব ত্রুটি দূর করে ডিজাইন কনফার্ম করা, ট্রেনের ইঞ্জিন হতে তেল চুরি বন্ধে তেলের ট্যাংকে আধুনিক জিপিএস ডিভাইস স্থাপন, নতুন ক্রয় করা সব লোকোতে চালকদের জন্য ক্যাবে এসি সিস্টেম চালু করা, যাত্রী টিকেটে যাত্রীর নাম ও মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করা, ইঞ্জিন এবং ছাদে অবৈধ যাত্রী তোলা বন্ধে কমলাপুর এবং বিমানবন্দর স্টেশনে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে তাঁর মনিটর রেল মন্ত্রী, সচিব এবং ডিজি মহোদয়ের অফিস কক্ষে স্থাপন সহ রেলের অসংখ্য উন্নয়ন ও অনিয়ম দূরীকরণে আমার সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।১৯। আবুল কালাম আজাদ স্যার ( প্রাক্তন এসডিজি মূখ্য সমন্বয়ক) তখন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব। আমি কাজ করছি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক, চট্টগ্রাম। দেশে চলছে মারাত্মক লোড শেডিং। জনগণকে অন্ধকারে (শেডিং) রেখে পিডিবি নিয়ম ভঙ্গ করে অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। চট্টগ্রাম থেকে বিদ্যুৎ সচিব বরাবর করা এমন একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হল আমাকে। কমিটির সভাপতি হলেন বর্তমান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, তৎকালীন যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন), বিদ্যুৎ বিভাগ। মাঠ পর্যায়ে ইনটেন্সিভ তদন্তের ভার পড়ল আমার উপর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্ক্যাডা কন্ট্রোল রুম, চট্টগ্রাম পিডিবি প্রধান প্রকৌশলী সহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ঢাকাস্থ ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাস সেন্টার (এনএলডিসি) পরিদর্শন করে তাঁদের সবার বক্তব্য নেয়া হল।এই তদন্ত করতে গিয়ে একটি ভয়াবহ বিষয় উদ্ঘাটন করলাম আমি। সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। সারা দেশে লোড শেডিং চালু রেখে, সবচেয়ে কম খরচে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, সেই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরেও এনএলডিসি থেকে ক্যারিয়ারের মাধ্যমে (সরাসরি ফোন) মৌখিক নির্দেশে দৈনিক প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে রাখা হচ্ছিল। সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া যায়। তারমানে শুধু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে সরকারের ক্ষতি হচ্ছিল দৈনিক ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের আয়। হাজার হাজার মেগাওয়াট লোড শেডিং রেখে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদিত দিনে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন শাট ডাউন করে রাখ হত, তার সদুত্তোর দিতে পারেনি এনএলডিসি বা পিডিবির অন্য কেউ।তদন্তে অনিয়ম করে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বেশি বিদ্যুৎ প্রদানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। লোড শেডিং চালু রেখে এভাবে সক্ষমতা থাকা সত্বেও কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্র সহ অন্যান্য কেন্দ্রে উৎপাদন কমিয়ে রাখা বা শাট ডাউন করে রাখা বন্ধ হয়ে যায়, তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার পর। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হতে রক্ষা পায় সরকার। আমি ইঞ্জিনিয়ার নই বা বিদ্যুতে কখনো চাকুরিও করিনি। ঘটোনাচক্রে সেই তদন্ত কমিটির সদস্য হতে হয়েছিল আমাকে। এ তদন্ত করতে গিয়ে বিদ্যুতের অসংখ্য অনিয়ম এবং চুরি বা দুর্নীতির ঘটনা জানতে পেরেছিলাম।২০। স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন ইপিআর (বিজিবি) এর একটি দল দিনাজপুর ক্যাম্প থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসে দিনাজপুর দশ মাইল নামক এলাকার বাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের সামনে খানসেনাদের প্রতিহত করতে অবস্থা নেয়। সাথে ছিল এলাকার কিছু লোকজন। দিনাজপুর থেকে পাকসেনারা এগিয়ে আসলে শুরু হয় গোলাগুলি। চলতে থাকে প্রচন্ড যুদ্ধ। ইপিআর এর বীর দুই যোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন চালাচ্ছিলেন সিক্স পাউন্ডার গান (মর্টার)। ইতিমধ্যে নিলফামারীর সৈয়দপুর (বিমানবন্দর) হয়ে খান সেনাদের আর একটি দল এসে অন্য পাশ থেকে আক্রমণ চালায় ইপিআর বাহিনীর উপর। দুই দিক হতে প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে ইপিআর এর বীর যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে, পিছিয়ে যায় জনগণ। কিন্তু জান বাজী রেখে সিক্স পাউন্ডার গান থেকে ফায়ার করতে থাকেন ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন। পিছু হটা সঙ্গী সাথীরা সবাই যখন চিৎকার করে তাঁদের পিছু হটতে বলছিলেন, তখনও নিজ অবস্থান থেকে এক ইঞ্চি সরেননি মোস্তাফিজুর রহমান এবং মিয়াঁ হোসেন। তাঁরা উভয়ে চিৎকার করে উত্তর দেন, “দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকতে দেশের এক ইঞ্চি মাটি ছাড়ব না শ্ত্রুদের কাছে।“ মাটি ছাড়েননি তাঁরা। খানসেনাদের গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁদের দেহ। এক সময় চলে যায় খানসেনারা। পড়ে থাকে দুই শহীদের লাশ।এলাকার জনগণ পরে একত্রিত হয়ে দশ মাইল বাজারের এক দোকানের পিছনে একটি কবর খুড়ে তাঁদের দুই জনের লাশ দাফন করে একই কবরে।বেঁচে থেকে এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েননি, সেই শহীদ বীর দুইজনের ঠিকানা, পরিবার রয়ে যায় অজানা। কোন রেকর্ডে তাঁদের হদিস ছিল না। দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতি বছর ১২ এপ্রিল এলাকায় জড় হয়ে তাঁদের মৃত্যু দিবস পালন করে থাকেন।আমি এই খবর দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানার পর তাঁদের দুই পরিবারের সন্ধানে নেমে পড়ি। দিনাজপুর বিজিবি সেক্টর কামান্ড এবং রংপুর সেক্টর কমান্ড অফিসে খোঁজ করে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সেদিনের যুদ্ধে সাথে ছিলেন এমন একজন যোদ্ধা পরে মৃত্যু বরণ করায় সমুদ্রে পড়তে হয় আমাকে। দিনাজপুরের জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলেছি। তাঁদের অনেকেই বিভিন জেলার নাম বলছিলেন।অনেকদিন ধরে আমি প্রায় ২০টি জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও নাম নেই তাঁদের দুই জনের। বিজিবি হেড কোয়াটারে খোঁজ করেও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বারবার ফোনে অনুরোধ করতে থাকি বিজিবি হেড কোয়াটারে রেকর্ড রুমের দায়িত্বে থাকা মেজর সাহেবের সাথে। তিনি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে একদিন সেই সুসংবাদ দিলেন। পাওয়া গেল তাঁদের ঠিকানা, তবে শুধু উপজেলা এবং জেলার নাম।ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এর বাড়ি ভোলার বোরহান উদ্দিন উপজেলা এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেনের বাড়ী নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলা। ইউনিয়ন এবং গ্রামের ঠিকানা নেই। ফোন দিলাম দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে। বললাম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে নিয়ে এই দুই শহীদের বাড়ী এবং পরিবারের হদিস বের করতে। এসে গেল সেই ক্ষণ। ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এঁর বাবা মা মারা গিয়েছে অনেক আগেই। বেঁচে আছেন তাঁর এক বোন আর এক ভাই। অপরদিকে হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন এঁর স্ত্রী এবং একমাত্র ছেলে আছেন।সবার সাথে মোবাইলে কথা বলে নিজে কাঁদলাম, কাঁদালাম তাঁদের। স্বাধীনতার প্রায় ৪৪ বছর পর স্বজনেরা খোঁজ পেলেন তাঁদের দুই বীর শহীদের কবর। এঁরা সবাই গিয়েছিলেন দিনাজপুর দশ মাইল বাজারে, যেখানে শুয়ে আছেন দুই শহীদ। এই কাহিনী ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসের কথা।২১। হাজেরা খাতুন। স্বামী শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার। পুলিশ সদস্য কনস্টেবল আঃ ছাত্তার শহীদ হন ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। কুষ্টিয়া সদর থানা পাহারত অবস্থায় পাক হানাদার বাহিনী থানা আক্রমন করে। আঃ ছাত্তার সাথের তিনজন কনস্টেবল সহ জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁরা কেউ এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি। সবাই শহীদ হন। পরে জনগণ থানার পাশে এক কবরে দাফন করেন তাঁদের। আজও কেউ জানে না কোথায় তাঁরা শুয়ে আছেন।স্বাধীনতার পরে হাজেরা বেগম স্বামী মৃত্যুর খবর পান। এক মেয়ে ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে চেষ্টা করেও হাজেরা খাতুন তাঁর স্বামী যে কনস্টেবল ছিল এবং যুদ্ধ করে থানায় শহীদ হয়েছিলেন, তার কোন প্রমাণ বা কাগজ বের করতে পারেন নি। যার ফলে বিধবা শহীদ পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি আজ পর্যন্ত ভাতা পাননি।৩ বছর আগে জানতে পারি সে দুঃখজনক ঘটনার কথা। শুরু করলাম তালাশ। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, এসপি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহোদয় এবং কয়েকজন পুলিশ ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। এসপি সাহেব এবং পুলিশ রেকর্ড রুম থেকে জানালেন, এর আগেও তাঁরা হাজেরা খাতুনের আবেদনের ভিত্তিতে অনেক খুঁজেও আঃ সাত্তার এঁর কোন তথ্য পাননি তাঁরা। আমি আবার নতুন করে খুঁজতে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানালাম। শুরু হল আবার সেই মহৎ উদ্যোগ। তাঁদের সবার ঐকান্তিক আগ্রহ, আন্তরিকতা এবং অনেক চেষ্টার পরে খুঁজে পাওয়া গেল শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার এঁর তথ্য। হাজেরা খাতুন পান তাঁর স্বামী শহীদ হবার স্বীকৃতি, কাগজে কলমে।মৃতপ্রায় হাজেরা খাতুন বিছানায় শুয়ে কাঁদেন তাঁর শহীদ স্বামীর সেই স্বীকৃতি পত্র নিয়ে, যা পেতে তাঁর ৪৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যে শহীদেরা এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি, জীবন দিয়েছেন।২২। লিভার ব্রাদার্সের “ফেয়ার এন্ড লাভ্লি” ক্রিমের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, “বিশ্ব জয় করে এবং দুবাই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সকল ক্রিমকে হারিয়ে দেয়ার বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।উপরের সবগুলো কাজ (১-২২) করেছি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত, যখন আমি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক (উপ সচিব/যুগ্ম সচিব) হিসেবে কর্মরত ছিলাম এবং এই সব কাজ ছিল আমার নিজ দাপ্তরিক কাজের বাইরে, আউট অব মাই ডেস্ক।২৪ আগস্ট ২০১৭ সালে আমি সদস্য (আইন ও নীতি) হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে যোগদান করি। পরের সব কাজগুলোতে সবার সাহায্য পেয়েছি এবং তা সব ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড।২৩। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫। আমি এখানে যোগদান করার আগ পর্যন্ত একটি খাদ্য পণ্য বা খাদ্য উপকরণ ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়নি। জয়েন করেই হাতে নেই খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করার প্রোগ্রাম। একই খাদ্য এক বা একাধিক ল্যাবে পাঠানো শুরু হয়। বর্তমান পর্যন্ত এমন কোন খাদ্য নেই যা পরীক্ষা করা হয়নি। যেগুলোতে সমস্যা পাওয়া যায়, সব কোম্পানিকে ডেকে মোটিভেশন, সতর্ক করা সহ তাঁদের সবাইকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এসবের পুরো দায়িত্ব ছিল আমার উপর।২৪। জানতে পারি বিভিন্নন কোম্পানি এনার্জি ড্রিঙ্কস বানাচ্ছে বিএসটিআই থেকে কার্বোনেটেড বেভারেজের (কোক, সেভেন আপ, ফান্টা মিরিন্ডা ইত্যাদি) লাইসেন্স নিয়ে। যা একেবারেই অবৈধ। কারণ এনার্জি ড্রিংক এবং কার্বোনেটেড বেভারেজ আলাদা পণ্য। এনার্জি ড্রিংকস এ উচ্চমাত্রায় ক্ষতিকর ক্যাফেইন থাকে। বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স বানাবার অনুমতি দেয় না বা স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) নেই তাদের। সারা দেশে বাচ্চাদের অতি প্রিয় ড্রিংক হচ্ছে এই এনার্জি ড্রিংক্স। সব কোম্পানির এনার্জি ড্রিংক কয়েকটি ল্যাবে পরীক্ষা করে উচ্চ মাত্রায় (একটিতে ৭৫০ এমজি/লিটার) ক্যাফেইন পাওয়া যায়। যেহেতু এনার্জি ড্রিংকস এর লাইসেন্স নেই, এবং ক্ষতিকর মাত্রায় ক্যাফেইন পাওয়া গিয়েছে, বিষয়টি আমি বিএসটিআই এর কাউন্সিল কমিটির মিটিং এ (অযাচিতভাবে উপস্থিত ছিলাম) সভাপতি শিল্প মন্ত্রী জনাব আমীর হোসেন আমু মহোদয়ের নজরে নিয়ে আসি। সভায় আলোচনা শেষে এনার্জি ড্রিংস উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।পরবর্তিতে বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স এর স্ট্যান্ডার্ড তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহন করে, যেখানে উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন এর অনুমতি দেবার কথা বলা আছে। আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাতে বাধা প্রদান করি। এরপর জনগণের মতামত নেয়া হয়। সেখানেও এনার্জি ড্রিংক্স এর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করা হয়। অতঃপর বিএসটিআই এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে যে, এনার্জি ড্রিংক্স এর উৎপাদন, বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না। যারা কার্বোনেটেড বেভারেজের নামে লাইসেন্স নিয়েছে তারা সেই নামেই সফট ড্রিংস উৎপাদন এবং বাজারজাত করতে পারবে এবং ক্যাফেইন এর সর্বোচ্চ মাত্রা হবে ১৪৫ এমজি/লিটার।বিএসটিআই এর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে আদেশ জারি করা হয় যে, পণ্যে এনার্জি শব্দ লিখা বা বিজ্ঞাপনে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং ১৪৫ এমজি/লিটার ক্যাফেইন এর বেশি ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় করা যাবে না। এরফলে রেড বুল এনার্জি ড্রিংকের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, যেহেতু রেড বুলে ক্যাফেইন এর পরিমাণ ৩২০ এমজি/লিটার। এখন দেশে ক্ষতিকর (বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য) উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইনযুক্ত ড্রিঙ্কস বাজারে নেই।২৫। দেশি এবং বিদেশি আমদানি করা সব মাছ পরীক্ষা করালাম। দেশি প্রায় সব মাছে হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেল। বিদেশি আমদানি করা সব মাছেও তাই। সব কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে আমদানি করা সব মাছের চালানের হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল। আমদানি করা মাছের চালানের প্রায় সবগুলোতে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছিল বেশি। এরপর সব ধরণের মাছের আমদানির সময় মাছ সরবরাহকারী দেশের এক্রিডেটেড ল্যাব থেকে ঐ মাছের হেভি মেটাল পরীক্ষা করে সেখানে কোন হেভি মেটাল মেটাল নেই মর্মে হেলথ সার্টীফিকেট দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হল।২৬। এবার দেশি মাছে হেভি মেটাল। হেভি মেটাল কেউ মেশায় না। এটা দুষণ। পরিবেশ বা খাদ্য থেকে আসে। মুরগী পরীক্ষা করেও হেভি মেটাল পাওয়া গেল মাত্রার অনেক বেশি। মাছ এবং মুরগীতে হেভি মেটাল এর উৎস একই। আমরা এদের ফিড বা খাদ্যের দিকে নজর দিলাম। ফিডের একটি উপাদান এমবিএম (মিট এন্ড বোন মিল) আসে বিদেশ থেকে। যত মরা প্রাণির হাড় মাংস গুঁড়া করে বানানো হয় এমবিএম। মারাত্মক সব রোগের আধার এই এমবিএম। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ অনেক আগেই প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যে এমবিএম এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে শুধু আমরা ছাড়া। শত শত কোটি টাকার হাজার হাজার মেঃটন এমবিএম আমদানি করে আনা হয়। এই এমবিএম আমদানি করার পর ল্যাব পরীক্ষা করে মাল ছাড় করার জন্য প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর পত্র দিয়েছিলাম প্রায় ৪ বছর আগে, যখন বিনিয়োগ বোর্ডে ছিলাম। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে সদস্য হিসেবে জয়েন করার পর এসে গেল সেই সুযোগ। প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে কয়েকটি মিটিং করে তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে এমবিএম আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পূর্ণ্রুপে নিষিদ্ধ করা হল। এটা ছিল আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগ। এমবিএম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর প্রায় ৪৫টি এমবিএম এর চালান  অন্য নামে আমদানি হয়ে আসলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার (বর্তমান) মহোদয়ের সার্বিক সহায়তায় তা খালাস বন্ধ করে দেয়া হয়, যা বর্তমানে বন্দরে বাজেয়াপ্ত অবস্থায় আছে।২৭। এরপর প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যের দ্বিতীয় অভিশাপ ট্যানারি বর্জ্য। সাভার ট্যানারি পল্লী একাধিকবার ভিজিট করে সেখানে প্রচুর অ-ব্যবস্থাপনা দেখতে পাই আমরা। সেখানে ট্যানারি বর্জ্য, যা মুরগীর খাদ্যে ব্যবহার করা হয়, সেই ড্রাই পার্টের কোন ইটিপি প্ল্যান্ট করা হয়নি ট্যানারি পল্লীতে। পল্লীর কোন সিকিউরিটি প্ল্যান বা প্রোটেকশন নেই। দেয়াল চার ফিট। একদিকে সম্পূর্ণ খোলা মাঠ, দেয়াল নেই। সিসি ক্যামেরা নেই। মেইন গেট নেই। প্রতিদিন প্রায় ১২৫ মেঃটন ড্রাই বর্জ্য জমা হয়, যা পাচার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং মুরগী ও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মুরগী, ডিম, মাছ হচ্ছে হেভি মেটালের আধার।আমরা সুপারিশ পাঠিয়েছি শিল্প মন্ত্রণালয়ে তিন মাস সময় দিয়ে। যাতে কোনভাবেই সামান্যতম ট্যানারি বর্জ্য, ট্যানারি পল্লী হতে পাচার হয়ে বাইরে যেতে না পারে। এটা দূর হলেই আমাদের মাছ, মুরগী এবং ডিম হেভি মেটাল মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।২৮। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় জেল জরিমানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান সীলগালা করার সিস্টেম চালু করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান খুব খারাপ অবস্থায় পাওয়া যেত সেগুলো সীল করে দেয়া হত। এতে খুব ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছিল। মালিকরা অঙ্গীকারনামা দিয়ে তাদের কিচেন সহ খাবার জায়গা বা কারখানার প্রভূত উন্নয়ন করে, তারপর তারা জনগণের জন্য তা খুলে দিত।২৯। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহের হাইজিন অনুযায়ী স্কোর বেজড গ্রেডিং পদ্ধতিতে সবুজ, নীল, হলুদ এবং কমলা স্টিকার দেয়া শুরু করা হয় আমার উদ্যোগে। সবুজ ৯০+ নাম্বার, নীল ৮০+, হলুদ ৪০-৭৯ এবং কমলা ৪০- নাম্বার। হলুদ স্টিকার তিন মাস এবং কমলা স্টিকার এক মাস সময়ের মধ্যে নীল বা সবুজ স্টীকারে উন্নীত করতে হয়, নাহলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এ পর্যন্ত ঢাকা শহরে পাইলটিং ভিত্তিতে মোট ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে স্টিকার দেয়া হয়েছে। এগুলো রেগুলার মনিটরিং করা হচ্ছে। আরো ১০০টির মত প্রতিষ্ঠান রেডি করা হচ্ছে।৩০। সকল কোম্পানির উৎপাদিত সকল প্রকার খাদ্য পণ্যের সেলফ লাইফ বা মেয়াদ উত্তীর্ণের স্টাডি রিপোর্ট/রিসার্চ পেপার বা বৈজ্ঞানিক দলিল বা প্রমাণক বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রায় সবাই পণ্য ভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট দাখিল করেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেলফ লাইফ কি স্টাডি করে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে দেয়া হয়েছে, নাকি আন্দাজে দেয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা আন্দাজে দিচ্ছেন, কোন রিসার্চ নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।৩১। হৃদরোগের ঝুঁকির বড় একটি কারণ ভোজ্য তেল, ডালডা এবং বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিড। এর আন্তর্জাতিক সহনীয় মাত্রা ২ এমজি/১০০ গ্রাম। আমরা ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতি ল্যাব পরীক্ষা করে পাই, সব ভোজ্য তেলে ২এমজি/১০০গ্রাম এর নিচে এবং ডালডা, বনস্পতিতে ১০/১২ এমজি/১০০গ্রাম, যা অনেক বেশি ক্ষতিকর মাত্রায়। এর প্রেক্ষিতে সব কোম্পানির সাথে বৈঠক করে ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিডের সর্বোচ্চ মাত্রা ২এমজি/১০০গ্রাম (আন্তর্জাতিক) নির্ধারণ করে দেয়া হয়। অচিরেই তা কার্যকর হবে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।৩২। টি-ব্যাগ এবং চাপাতা পরীক্ষা করে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান এপিক্লোরোহাইড্রিন এবং কীটনাশক পাওয়া যায়নি। ব্রেড পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদান পটাসিয়াম ব্রোমেট পাওয়া যায়নি। ঢাকা শহরের সব বাজারের বিভিন্ন মাছ এবং ফল পরীক্ষা করে ফরমালিন পাওয়া যায়নি। পাউডার দুধ এবং পাস্তুরিত সব দুধ পরীক্ষা করে ভাল পাওয়া গিয়েছে। এগুলো কিছুদিন পরপর পরীক্ষা করা হয়। খাবার লবণ ভাল পাওয়া গেছে। কনডেন্সড মিল্কে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি। চিনি পরীক্ষা করে সোডিয়াম সাইক্লামেট পাওয়া যায়নি। হোটেলে পরাটা, রুটি, জিলাপীতে ব্যবহৃত “সাল্টু” পরীক্ষা করে তা এমোনিয়াম বাই কার্বোনেট হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফুড গ্রেড খাদ্য উপাদান।৩৩। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ দেশবাসী খেয়ে থাকেন এমন একটি খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করে মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রায় প্রিজার্ভেটিভ সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া গিয়েছে দেশে এবং বিদেশের ল্যাব পরীক্ষায়। একই রকম আরও দুটি পণ্য পরীক্ষা করে উভয়টিতেই ক্ষতিকর মাত্রায় সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া যায়। এই তিনটি খাদ্য পণ্যের লেবেল এবং বিজ্ঞাপনে প্রতারণা এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার জন্য তাদের সবার বিরুদ্ধে খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রথম কোম্পানিকে সাড়ে তিন লাখ এবং অপর দুই কোম্পানিকে সাড়ে এগারো লাখ টাকা করে জরিমানা করে আদালত।  এদের সবাইক চুড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। প্রথম কোম্পানি পরবর্তীতে তাদের রেসিপি সম্পূর্ণ্রুপে পরিবর্তন করে নতুনভাবে উৎপাদন শুরু করে। স্যাকারিন একেবারে বাদ দিয়ে দেয় এবং সোডিয়াম বেঞ্জয়েট নিয়ে আসে ১০০ গ্রাম/লিটারের নিচে (বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড)। এর আগে সোডিয়াম বেঞ্জয়েট ছিল ৬০০ এমজি’র উপরে এবং স্যাকারিন ছিল প্রায় ১২৫০ এমজি। যা শরিরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।সর্বশেষ পরীক্ষায় প্রথম কোম্পানির খাদ্য পণ্য ভাল পাওয়া গিয়েছে। এই পণ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাকে মারাত্মক প্রতিকূল পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়েছিল। অপদস্ত হতে হয়েছিল মারাত্মকভাবে। তবুও দমে যাইনি। যেহেতু এই পণ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেয়ে থাকেন, তাই তা ঠিক করা ছিল আমার ব্যাক্তিগত একটি চ্যালেঞ্জ। ৩৪। বাজারের গুঁড়া হলুদ মশলা পরীক্ষা করে ক্ষতিকর মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা পাওয়া গিয়েছে। হার্ট ফাউন্ডেশন এবং ডিজি হেলথ যৌথভাবে এক পরীক্ষায় তারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, গুঁড়া হলুদে একটি রাসায়নিক পাউডার লেড ক্রোমেট মেশানো হয়। অসাধু ব্যবসায়িরা হলুদের রঙকে আরও উজ্জ্বল করতে এই লেড ক্রোমেট পাউডার মিশিয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার আমদানি হয়ে থাকে শিল্পে ব্যবহারের জন্য। অনেক দেশেই এই লেড দূষণের জন্য লেড ক্রোমেট পাউডারকে দায়ি করা হয়ে থাকে এবং লেড ক্রোমেট পাউডার ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে খুব কঠোরভাবে। আমাদের দেশে লেড ক্রোমেট পাউডার অবাধ আমদানি করা হয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার শুধু শিল্পে আমদানির জন্য অনুমতি প্রদান বা আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিল্পে আমদানির অনুমতি দেয়া হলে বাণিজ্যিক আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে। শিল্প শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজনে আমদানি করবে।৩৫। শতভাগ ফেয়ার এবং দুর্নীতিমুক্ত ২০৮ জন কর্মকর্তা এবং কর্মচারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে খুব অল্প সময়ে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলাম আমি।৩৬। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইনকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায় আইনকে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। আইনের খসড়া চুড়ান্ত হয়েছে, যা অতি সত্বর মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।৩৭। ক্ষতিকর স্পর্শক হিসেবে খাদ্যে ওয়ান টাইম নন ফুডগ্রেড প্লাস্টিকের কাপ, খবরের কাগজ এবং প্যাকেটে স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সহসাই এসবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, অভিযান এবং মামলা দায়ের শুরু হবে।৩৮। বাজার হতে ৪৭টি বহুল প্রচলিত আমদানিকৃত কীটনাশক ল্যাব পরীক্ষা করে প্রায় সবগুলোতে অত্যাধিক মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। কীটনাশকে সামান্য মাত্রায় হেভি মেটাল গ্রহনযোগ্য নয় বিধায় বিশ্বে কোথাও এর মাত্রা নিররাধারণ করা হয়নি। আমাদের দেশেও তা গ্রহনযোগ্য নয়। কীটনাশক অবশ্যই পিওর হতে হবে। তাই আগামী ১ জুলাই হতে আমদানি হয়ে আসা প্রত্যেক কীটনাশকের চালান বন্দরে আসার পর ঢাকার দুটি ল্যাবে হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে এনবিআর এবং কাস্টমসকে পত্র দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশে কোন কীটনাশক বানানো হয় না। জমির মাটিকে হেভি মেটালের দুষণে দুষিত করার বড় একটি কারণ এই হেভি মেটালযুক্ত কীটনাশক।৩৯। জর্দা গুল এবং খয়ের পরীক্ষা করে অতি উচ্চ মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়েছে। এর উতস্য খুঁজতে গিয়ে আমরা সাদা তামাক পাতা, বিড়ির তামাক এবং দেশে বানানো সিগারেটের তামাক পাতা পরীক্ষা করি। সব তামাক পাতাতেই উচ্চ মাত্রায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। সব তামাক পাতায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়ায় এটা ধরে নেয়া যায় যে, তা মাটি এবং হয়ত কীটনাশকের দুষণ থেকে হচ্ছে। এই একই কারণে বিভিন্ন ফসলেও মাঝে মাঝে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছে, যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন ট্রেসিবিলিটি নির্ধারণ।৪০। ২০১৯ সালে ঢাকা শহরের বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে র্যানব ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত অভিযানে দেখা গিয়েছে যে, সেখানে নস্ট হয়ে যাওয়া ২০০৯ সালের খেজুর এবং ২০১৩ সালের আমদানি করা মাংস রক্ষিত আছে, যা মেয়াদের তারিখ পরিবর্তন করে বাজারে বিক্রি করা হত। কোল্ড স্টোরেজগুলোর সহযোগিতায় তা করা হচ্ছিল এবং তারা মালামালের কোন রেকর্ড বা ইনভেন্ট্রি লিস্ট মেইন্টেইন করত না। এই বছর আমরা সব কোল্ড স্টোরেজ এবং খেজুর ও মাংস আমদানীকারকদের নিকট হালনাগাদ মালামালের মেয়াদ সহ কোল্ড স্টোরেজে রক্ষিত খেজুর ও মাংসের পরিমাণ এবং আমদানির তারিখ এবং কাগজপত্র দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। এখন থেকে প্রতি মাসে তা দাখিল করা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। এতে করে আশা করা যায়, আমদানি করা খেজুর এবং মাংসের অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে।৪১। আমরা আমদানি করা সকল খাদ্য এবং খাদ্য উপকরণে স্টিকারযুক্ত উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি। উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ হতে হবে স্পষ্টাক্ষরে অমোচনীয় কালি দ্বারা ছাপার অক্ষরে এবং আমদানি করা চালানের সাথে যেন খুচরা পর্যায়ে বিক্রির সময় সেই পণ্যের মিল বা সামঞ্জস্য থাকে, সে জন্য প্রতিটি চালান আমদানির সময় এলসি নাম্বার, আমদানি করা পণ্যের প্রতিটি কার্টুন বা বক্সে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছি। এতে করে খোলা বাজারে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের উৎস্য সনাক্ত করা অতি সহজ হবে এবং ইচ্ছাকৃত ম্যানুপুলেশন বন্ধ হয়ে যাবে।নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে আমি ছিলাম সদস্য (ইন-সি-টু অতিরিক্ত সচিব) এবং প্রায় আড়াই মাস ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। উপরে বর্ণিত সব কাজ ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড। দেশ থেকে খদায় ভেজাল দূর করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেছিলাম। সেখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাই রেলে। ৪২। বিকাশ একাউন্ট হতে প্রতারকদের প্রতারণা বন্ধ করা। বিকাশের মাল্টি ডিভাইস লগ ইন সিস্টেমের কারণে প্রতারকরা বিকাশ গ্রাহকদের কাছ থেকে চালাকি, প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কিংবা লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের পিন নাম্বার এবং ওটিপি নিয়ে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে সব টাকা হাতিয়ে নিত। মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে নীতিমালা অনুযায়ী সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালুর জন্য বিকাশ কর্তৃপক্ষের সাথে বারংবার যোগাযোগ সব বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দাখিল করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে বিকাশ মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালু করেছে।অর্থাৎ একটি একাউন্ট থেকেই আপনি এখন ট্রানজেকশন করতে হবে। ওটিপি পিন নাম্বার দিয়েও আর অন্য ডিভাইস থেকে একাউন্ট চালানো যাবে না।আপাতত বন্ধ হয়ে গেল প্রতারকদের রাস্তা। রক্ষা পেল গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ প্রতারকদের কবল থেকে।৪৩। হরলিক্স এর বিতর্কিত বিজ্ঞাপন “Taller Stronger Sharper” বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া।৪৪। এছাড়া রেলের শতভাগ অনলাইন/অফ-লাইন (কাউন্টার) টিকিট চালু , ইন্টারসিটি ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি বন্ধ, অনলাইন রিফান্ড সিস্টেম চালু, টিকিট কালোবাজারি সম্পুর্ণ দূর করণে রিয়েলটাইম এনআইডি ভেরিফিকেশন করে অনবোর্ড "টিকিট যার, ভ্রমণ তার" নিশ্চিত করার সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহন। রেলের যাত্রীসেবা বৃদ্ধিতে আমি ২০১৫ সাল থেকেই রেল সচিব জনাব ফিরোজ সালাউদ্দিন স্যারের সাথে কাজ শুরু করি। আমি তখন পরিচালক, বিনিয়োগ বোর্ড চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলাম। তখন থেকেই প্রতি তিনমাস অন্তর রেলের অংশীজন সভায় যাত্রী প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। এটাই ছিল রেলের কল্যাণে আমাদের একটি সক্রিয় ফোরাম। যা অব্যাহত ছিল প্রাক্তন রেল সচিব জনাব মোফাজ্জল হোসেন স্যারের শেষ সময় পর্যন্ত। এরপর রেলে আমার পোস্টিং হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে।

একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনের অনন্য দলিল

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুলদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে নয়, জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়। একজন নাগরিক রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন তার নিজের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা কিংবা পৌর এলাকার সেবা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, স্থানীয় বাজার, নাগরিক সেবা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পথচারী নিরাপত্তা কিংবা স্থানীয় অবকাঠামো, এসব বিষয় সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। আর এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা যত বেশি, জনগণের কাছে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতাও তত বেশি।ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।  নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হতে পারে। পরবর্তী ধাপগুলোও পর্যায়ক্রমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের পর সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।নির্বাচন আয়োজনের এই উদ্যোগ শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সক্রিয় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ একটি ইউনিয়ন পরিষদ কেবল চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গ্রামীণ জনগণের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ত প্রশাসনের অন্যতম প্রধান স্তর। তাই এই নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভোট দেওয়ার জন্য, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যকর, সৎ, দায়িত্বশীল ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য।তবে নির্বাচন হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সুষ্ঠু নির্বাচন একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারের প্রথম শর্ত মাত্র। নির্বাচনের আগে যেমন প্রার্থীদের আচরণ, প্রচার ও অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভোটের দিন ভোটারের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রার্থী যাতে ভয়ভীতি, প্রভাব, অর্থবল, পেশিশক্তি কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারেন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো ভোটার যেন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কারণে হয়রানি বা চাপের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব।ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। জাতীয় রাজনীতির বাইরে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সবচেয়ে কাছের জায়গাগুলোর একটি হলো স্থানীয় সরকার। এখানে একজন ভোটার তার এলাকার রাস্তা, পানি, ড্রেনেজ, বাজার, সড়ক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা সামাজিক সমস্যার বিষয়ে যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, তাকে নির্বাচিত করেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা বা সাময়িক আবেগের পাশাপাশি প্রার্থীর সততা, দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, দায়িত্বশীলতা এবং এলাকার উন্নয়ন সম্পর্কে বাস্তব ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।এখানেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু নির্বাচন চাই, নাকি কার্যকর স্থানীয় সরকারও চাই? যদি দ্বিতীয়টি চাই, তাহলে নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বাস্তব পরিধি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হলো দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল, কারিগরি সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে নেই।একটি ইউনিয়ন পরিষদকে রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অবকাঠামো কিংবা নাগরিক সেবা নিয়ে কাজ করতে বলা হলো। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ নেই, কারিগরি জনবল সীমিত, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য দপ্তরের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। তখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ জনপ্রতিনিধিরাও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও স্থানীয় সরকারের সক্ষমতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি জবাবদিহির কাঠামোগত সংকট। কারণ জনগণ যার কাছে অভিযোগ করছেন, তার হাতে যদি সমস্যার সমাধানের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকে, তাহলে জবাবদিহির কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদ দিতে হবে।কেন্দ্রীয় সরকারের সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে নেওয়া সম্ভব নয়, আবার বাস্তবসম্মতও নয়। একটি ইউনিয়নের সমস্যা আর একটি মহানগরের সমস্যা এক নয়। নদীভাঙন প্রবণ এলাকার পরিকল্পনা, উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা এবং শহরের জলাবদ্ধতা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক পদ্ধতিতে পরিচালনা করা যায় না। স্থানীয় মানুষের সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে ভালোভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। তাই জাতীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় পর্যায়ে দিতে হবে। তবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ মানেই জবাবদিহি কমে যাওয়া নয়। বরং ক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত শক্তিশালী হতে হবে। স্থানীয় সরকারকে অর্থ দেওয়া হবে, কিন্তু সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হলো, কাজের মান কেমন হলো, জনগণ কী পেল এবং কোনো অনিয়ম হলে দায় কার, তার স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট, প্রকল্প, বরাদ্দ, ব্যয়, কাজের সময়সীমা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রকল্পের তথ্য স্থানীয় কার্যালয় ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। শুধু হিসাবের খাতায় অর্থ ব্যয়ের তথ্য থাকলে হবে না। জনগণকে জানতে হবে তাদের এলাকার উন্নয়নে কত টাকা এসেছে, কোথায় খরচ হয়েছে এবং সেই ব্যয়ের বিনিময়ে কী অর্জিত হয়েছে। কারণ ‘অর্থ বরাদ্দ হয়েছে’ কোনো উন্নয়নের সাফল্যের প্রমাণ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সেই অর্থের বিনিময়ে জনগণ কী পেলেন। একটি রাস্তা নির্মাণ করে কয়েক মাস পর সেটি নষ্ট হয়ে গেলে সেটি উন্নয়ন নয়। একটি ড্রেন নির্মাণ করে সেটি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকেই যাবে। তাই স্থানীয় সরকারের কর্মদক্ষতা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়েছে তা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও নিজেদের ভূমিকা নতুনভাবে দেখতে হবে। চেয়ারম্যান বা সদস্য হওয়া কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়, এটি জনগণের দেওয়া একটি দায়িত্ব। নির্বাচনের পর যারা জয়ী হবেন, তাদের কাছে দল-মত, আত্মীয়তা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে সব নাগরিক সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখেন। কোনো ইউনিয়ন পরিষদ যেন নির্বাচিত কয়েকজনের ব্যক্তিগত প্রভাবের কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।নির্বাচনের পর  পরাজিত প্রার্থীদেরও নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনস্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে, কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জনগণের স্বার্থে সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি নির্বাচনের পরও বিভাজন, প্রতিহিংসা ও বিরোধে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ইউনিয়নের মানুষ।এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে পারস্পরিক সৌহার্দতার  সংস্কৃতি চর্চার  সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। কে কী করবেন, কীভাবে করবেন, কত সময়ে করবেন এবং সেই কাজের জন্য কী ধরনের সম্পদের প্রয়োজন, প্রার্থীদের কাছ থেকে এসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য আশা করা স্বাভাবিক। জনগণেরও উচিত শুধু প্রতিশ্রুতি শোনা নয়, প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, সামাজিক ভূমিকা, সততা ও সক্ষমতা বিবেচনা করা।অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের মাঠ প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে।আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। স্থানীয় নির্বাচন অনেক সময় ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।তবে নিরাপত্তা মানে শুধু ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন নয়। ভোটার যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারেন, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটার যাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান, ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন এবং ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা থাকে, সবকিছুই নিরাপদ নির্বাচনের অংশ।একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গুজব, মিথ্যা তথ্য বা উসকানিমূলক প্রচারণা যেন নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও থাকতে হবে।স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা। একটি ইউনিয়নে কোথায় রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় জলাবদ্ধতা হয়, কোথায় নিরাপদ পানির সংকট, কোথায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল, কোথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার থাকলে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা সহজ হবে।সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও ইউনিয়ন পর্যায়ে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। গ্রামের বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, অপর্যাপ্ত আলো, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, অবৈধ দখল কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সরকার এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সমন্বয় করতে পারে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু চালকের দায়িত্ব নয়; রাস্তার নকশা, ব্যবস্থাপনা, পথচারী নিরাপত্তা এবং স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধেও স্থানীয় পর্যায়ে নতুন সংস্কৃতি প্রয়োজন। শুধু দুর্নীতির অভিযোগ তুলে লাভ নেই, এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে অনিয়ম করা কঠিন হয়। ডিজিটাল দরপত্র, প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ, কাজের মান যাচাই, নিয়মিত নিরীক্ষা, নাগরিক পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি কার্যকর করা প্রয়োজন। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায় নির্ধারণ ও শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি যদি শুধু কাগজে থাকে, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।সবচেয়ে বড় কথা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু ভোটের দিন হিসেবে দেখা যাবে না। ভোটের দিন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পর্কই প্রকৃত স্থানীয় গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করবে। নির্বাচনের আগে প্রার্থী জনগণের কাছে যাবেন, নির্বাচনের সময় ভোটার তার মতামত দেবেন, আর নির্বাচনের পরে নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের কাছে হিসাব দেবেন, এই ধারাবাহিকতাই স্থানীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি।এ কারণে নির্বাচন কমিশনের বর্তমান উদ্যোগকে শুধু নির্বাচন আয়োজনের প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা দরকার। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হলে জনগণের আস্থা বাড়বে। জনগণের আস্থা বাড়লে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বও বাড়বে। আর দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতা, অর্থ, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় সরকার বাস্তব অর্থেই শক্তিশালী হবে।আমরা এমন নির্বাচন চাই, যেখানে ভোটার ভয় ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যাবেন, প্রার্থী অন্যায় প্রভাব ছাড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ফলাফল নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কমিশনের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, প্রতিটি ধাপে আইন ও বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, তারা কোনো পক্ষের নয়, রাষ্ট্র ও ভোটারের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করবে।একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদেরও মনে রাখতে হবে, একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন কোনো ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়। এটি একটি এলাকার আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হলো জনগণের অধিকার এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাই প্রথম প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এরপর প্রয়োজন যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত অর্থ, বাস্তব ক্ষমতা, দক্ষ জনবল, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং কঠোর জবাবদিহি। এই ধারাবাহিকতা ছাড়া শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন করলে স্থানীয় সরকারের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।উন্নয়নকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে স্থানীয় সরকারকে আর দুর্বল, নির্ভরশীল ও প্রকল্পনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা যাবে না। এটিকে হতে হবে জনগণের সবচেয়ে কাছের কার্যকর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, এই নির্বাচন হবে জনগণের ভোটাধিকার, অংশগ্রহণ ও আস্থার একটি বাস্তব পরীক্ষা। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। কারণ একটি ভোট শুধু একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করে না, সেই ভোট একটি ইউনিয়নের আগামী দিনের নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও জবাবদিহির পথও নির্ধারণ করে।জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া স্থানীয় সরকারই পারে উন্নয়নকে বাস্তব অর্থে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে, যদি নির্বাচনটি হয় সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। তাই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া শক্তিশালী জনসেবা সম্ভব নয়, আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া শক্তিশালী স্থানীয় সরকারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।শক্তিশালী স্থানীয় সরকারই একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তাই কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি যোগ্য, সৎ, দক্ষ ও জনবান্ধব নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণের স্বাধীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই নির্বাচনকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। জনগণকে সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আসুন, দল-মত ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচিত করে  শক্তিশালী ইউনিয়ন পরিষদ গড়ে তুলি—গড়ে তুলি উন্নত, স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী শক্তিশালী স্থানীয় সরকার।লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও  ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

অনুবাদের নতুন বাস্তবতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনুবাদকের বিচারবোধ

সৈয়দ আমিরুজ্জামানসাহিত্য অনুবাদকে একসময় অনেকেই মূল সাহিত্যের তুলনায় গৌণ একটি সৃজনশীল কাজ হিসেবে দেখতেন। অনুবাদক যেন লেখকের ছায়াসঙ্গী—মূল রচনার ভাষা বদলে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর কাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনুবাদ সম্পর্কে সেই ধারণা বদলেছে। এখন অনুবাদকে কেবল এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় প্রতিস্থাপনের কাজ হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড। একটি সাহিত্যকর্মের ভাষা, সংস্কৃতি, রসবোধ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং লেখকের নিজস্ব শৈলী অন্য ভাষায় পুনর্নির্মাণ করা নিঃসন্দেহে সৃজনশীলতারই অংশ।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনুবাদ জগতে যুক্ত হয়েছে নতুন এক শক্তি—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। অনুবাদের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। যন্ত্রনির্ভর অনুবাদ থেকে শুরু করে জেনারেটিভ এআই—প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি অনুবাদ প্রক্রিয়াকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সামনে এনেছে নতুন কিছু প্রশ্নও। বিশেষত সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু ‘এআই কতটা ভালো অনুবাদ করতে পারে’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, এআই-সহায়িত অনুবাদে অনুবাদকের ভূমিকা কী হবে, সম্পাদকের দায়িত্ব কোথায়, এবং পাঠক কীভাবে জানবেন যে একটি অনুবাদ কতটা মানবনির্ভর আর কতটা যন্ত্রনির্ভর?বিশিষ্ট লেখক, অনুবাদক ও শিক্ষাবিদ গোলাম হোসাইন (জি. এইচ.) হাবিবের আলোচনায় এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উঠে এসেছে। তাঁর নিজের অনুবাদকর্মের পরিসরও এই আলোচনাকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। উমবের্তো একো, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ইতালো কালভিনো ও আইজ্যাক আসিমভের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের রচনা ও সাহিত্যতত্ত্ব বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। অনুবাদ সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছেন। ফলে এআই ও অনুবাদ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের আলোচনা নয়; এটি একজন দীর্ঘদিনের অনুবাদক ও সাহিত্যকর্মীর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও।শব্দান্তর নয়, অর্থ ও অভিজ্ঞতার পুনর্নির্মাণঅনুবাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শব্দের অর্থ নয়, অর্থের ভেতরের অর্থকে ধারণ করা। একটি বাক্য অভিধান অনুসরণ করে অনুবাদ করা সম্ভব; কিন্তু সেই বাক্যের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, ব্যঙ্গ, রসবোধ কিংবা চরিত্রের অন্তর্নিহিত অনুভূতি যথাযথভাবে অন্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।ধরা যাক, কোনো উপন্যাসে একটি চরিত্র এমন একটি প্রবাদ ব্যবহার করল, যার আক্ষরিক অর্থ একরকম কিন্তু সাংস্কৃতিক অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি যন্ত্র আক্ষরিক অর্থ শনাক্ত করতে পারে, সম্ভাব্য সমার্থক বাক্যও দিতে পারে; কিন্তু কোন বাংলা অভিব্যক্তিটি সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্বাভাবিক, তা নির্ধারণ করতে প্রয়োজন ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর বোধ।সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে এই মানবিক বিচারবোধই অনুবাদকের বড় শক্তি।কারণ সাহিত্য শুধু তথ্য বহন করে না, অনুভূতিও বহন করে। একটি কবিতার ছন্দ, একটি উপন্যাসের বাক্যপ্রবাহ, একটি চরিত্রের কথার ভঙ্গি কিংবা লেখকের ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা—এসবের সবকিছুকে কেবল তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো সাহিত্যের নান্দনিক কাঠামোর অংশ।এআই অনুবাদকের প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি সহকারী?এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে আতঙ্কের একটি বড় কারণ হলো—এটি দ্রুত অনুবাদ করতে পারে, বিপুল পরিমাণ লেখা প্রক্রিয়াজাত করতে পারে এবং ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, অনুবাদকের প্রয়োজন কি একদিন ফুরিয়ে যাবে?সম্ভবত বাস্তব চিত্রটি এত সরল নয়বরং এআই অনুবাদকের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে। একজন অনুবাদককে হয়তো ভবিষ্যতে প্রতিটি বাক্যের প্রাথমিক অনুবাদ নিজ হাতে তৈরি করতে হবে না। এআই একটি খসড়া অনুবাদ তৈরি করতে পারে, কঠিন শব্দের সম্ভাব্য অর্থ দিতে পারে, দীর্ঘ টেক্সটের কাঠামো বিশ্লেষণ করতে পারে কিংবা একই অংশের একাধিক অনুবাদ-সম্ভাবনা হাজির করতে পারে। কিন্তু সেখানেই অনুবাদের কাজ শেষ হবে না। বরং শুরু হবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ—যাচাই, পরিমার্জন, পুনর্লিখন এবং সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ।অর্থাৎ ভবিষ্যতের অনুবাদক হয়তো শুধু ‘translator’ থাকবেন না; তিনি একই সঙ্গে হবেন সম্পাদক, ভাষাবিশেষজ্ঞ, সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাকার এবং এআই-উৎপাদিত পাঠের সমালোচক। এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি: দ্রুত অনুবাদ আর ভালো অনুবাদ এক জিনিস নয়।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: স্বচ্ছতাএআই-সহায়িত অনুবাদ যত বাড়বে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। একটি অনুবাদ যদি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এআই ব্যবহার করে তৈরি হয়, পাঠকের কি তা জানার অধিকার আছে? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।সাহিত্যকর্মের পাঠক শুধু অনুবাদিত ভাষার অর্থ গ্রহণ করেন না; তিনি অনুবাদকের একটি সৃজনশীল সিদ্ধান্তের ওপরও আস্থা রাখেন। অনুবাদক কীভাবে মূল রচনার একটি শব্দের অর্থ নির্ধারণ করেছেন, কোন সাংস্কৃতিক উপমার কী প্রতিস্থাপন করেছেন, কোন বাক্যের ভঙ্গি কীভাবে পুনর্গঠন করেছেন—এসবের পেছনে থাকে তাঁর নিজস্ব সাহিত্যিক বিচার।সুতরাং এআইয়ের ভূমিকা গোপন রেখে একটি অনুবাদকে পুরোপুরি মানবসৃষ্ট অনুবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা নৈতিকভাবেও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, সম্পাদক এবং অনুবাদকদের তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন। কোথায় এআই ব্যবহার করা হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত পাঠের দায়িত্ব কার—এসব বিষয়ে অন্তত একটি সাধারণ নীতিগত কাঠামো থাকা জরুরি।এটি শুধু অনুবাদের ক্ষেত্রে নয়; সাংবাদিকতা, একাডেমিক লেখা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রেও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।সম্পাদক কি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন?এআইয়ের প্রসঙ্গে অনুবাদকের পাশাপাশি সম্পাদকের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে।এআই একটি অনুবাদ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই অনুবাদ নির্ভুল কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য মানুষের প্রয়োজন হবে। এমনকি ব্যাকরণগতভাবে একটি বাক্য নিখুঁত হলেও সেটি সাহিত্যিকভাবে ভুল হতে পারে। কোনো শব্দের অভিধানগত অর্থ সঠিক হলেও প্রসঙ্গের বিচারে সেটি ভুল নির্বাচন হতে পারে। একটি চরিত্রের ভাষা যদি তার সামাজিক অবস্থান, বয়স কিংবা মানসিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে অনুবাদটি ভাষাগতভাবে চমৎকার হলেও সাহিত্যিকভাবে ব্যর্থ হতে পারে। এখানেই সম্পাদকের ভূমিকা।ভবিষ্যতে হয়তো এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হবে, যেখানে এআই-উৎপাদিত অনুবাদের পরিমাণ বাড়বে, কিন্তু সেই অনুবাদকে পাঠযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও সাহিত্যসম্মত করে তোলার জন্য দক্ষ সম্পাদকদের প্রয়োজন আরও বাড়বে।অর্থাৎ প্রযুক্তি হয়তো অনুবাদ তৈরির গতি বাড়াবে; কিন্তু মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব মানুষের কাঁধেই থাকবে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন নীতিমালাবাংলা ভাষায় বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদের প্রয়োজন আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যও বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। এআই এই বিনিময়কে অনেক দ্রুত ও সহজ করে দিতে পারে।কিন্তু সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে।বাংলা ভাষার নিজস্ব বাগধারা, উপভাষা, সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে যান্ত্রিকভাবে অন্য ভাষায় রূপান্তর করলে অনুবাদ হয়তো ‘বোধ্য’ হবে, কিন্তু তার সাহিত্যিক স্বর হারিয়ে যেতে পারে। একইভাবে বিদেশি সাহিত্য বাংলায় আনার সময়ও কেবল আক্ষরিক অর্থ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন।তাই বাংলাদেশে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, অনুবাদ সংগঠন ও সাহিত্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এআই-সহায়িত অনুবাদ নিয়ে আলোচনা শুরু করা। কী ধরনের ব্যবহারে এআই গ্রহণযোগ্য, কোথায় মানবসম্পাদনা বাধ্যতামূলক, এআই ব্যবহারের মাত্রা কীভাবে প্রকাশ করা হবে এবং অনুবাদের দায়ভার কে নেবেন—এসব বিষয়ে নীতিগত নির্দেশনা তৈরি করা দরকার।প্রযুক্তি বদলাবে, মানুষের প্রয়োজন শেষ হবে নাপ্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দেয়—নতুন প্রযুক্তি অনেক কাজের ধরন বদলে দেয়, কিন্তু মানুষের প্রয়োজন সবসময় একইভাবে শেষ করে দেয় না। ছাপাখানা লেখকের প্রয়োজন শেষ করেনি, কম্পিউটার সম্পাদকের প্রয়োজন শেষ করেনি, অনলাইন প্রকাশনা সাংবাদিকতার প্রয়োজন শেষ করেনি। বরং কাজের প্রকৃতি বদলেছে।এআইও সম্ভবত অনুবাদকের ক্ষেত্রে তেমনই একটি পরিবর্তন আনবে।ভবিষ্যতের সবচেয়ে সফল অনুবাদক হয়তো তিনি নন, যিনি এআই ব্যবহার করেন না; আবার তিনিও নন, যিনি এআইয়ের তৈরি পাঠ হুবহু গ্রহণ করেন। সফল অনুবাদক সম্ভবত সেই ব্যক্তি, যিনি প্রযুক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন এবং একই সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সতর্ক। যিনি জানেন কোথায় যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং কোথায় নিজের সাহিত্যিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিতে হবে।শেষ পর্যন্ত অনুবাদ হলো মানুষের ভাষা থেকে মানুষের ভাষায় যাওয়ার একটি সেতু। সেই সেতু নির্মাণে প্রযুক্তি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু সেতুটি কোথায় স্থাপন করা হবে, কোন পথ ধরে যাবে এবং তার ওপারে পৌঁছে পাঠক কী অনুভব করবেন—এই সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের।সাহিত্যিক অনুবাদের ভবিষ্যৎ তাই মানুষ বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লড়াই নয়। বরং এটি মানুষ ও প্রযুক্তির সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি সময়। আর এই নতুন সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠবে তিনটি বিষয়—স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক বিচারবোধ।কারণ একটি ভালো অনুবাদ শুধু ভাষা বদলায় না; একটি ভালো অনুবাদ এক সংস্কৃতির অনুভূতিকে আরেক সংস্কৃতির পাঠকের কাছে জীবন্ত করে তোলে। সেই জীবন্ততার জায়গাটিই হয়তো ভবিষ্যতেও মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকবে।সৈয়দ আমিরুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

অনুবাদের নতুন বাস্তবতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনুবাদকের বিচারবোধ

সেনাবাহিনী, নাগরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমাজ

প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকীএকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সার্বভৌমত্ব। সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং দেশ সম্পর্কে সচেতনতা। একটি দেশের সেনাবাহিনী এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ইতিহাস ও বিকাশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব দায়িত্বের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও এর ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহু মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন সংকট ও দুর্যোগে সেনাসদস্যদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা বা সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। আবার কোনো প্রশ্ন তোলাও অবিশ্বাস বা বিরোধিতার সমার্থক নয়। একটি পরিণত সমাজে সম্মান, প্রশ্ন এবং জবাবদিহিতা—এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি চলতে পারে।তথ্যের যুগে নতুন বাস্তবতাআমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকে মত প্রকাশের যে সুযোগ দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও বাড়িয়েছে।পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, সম্পাদিত ভিডিওকে পূর্ণাঙ্গ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা, কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হিসেবে প্রচার করা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া—এসবের ফলে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে মানুষের প্রতিক্রিয়া দ্রুত তৈরি হয়। তাই কোনো খবর দেখেই শেয়ার করার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে যাওয়া প্রয়োজন। উৎস কোথায়? তথ্যটি নতুন, নাকি পুরোনো? অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম কি একই তথ্য নিশ্চিত করেছে? বক্তব্যটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট কী?এই কয়েকটি প্রশ্ন অনেক অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে।স্বাধীনতা মানেই দায়িত্ববাংলাদেশের সংবিধান চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই মত প্রকাশের সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক শক্তি।কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকে।আমি মনে করি, আমাদের “Self-Censorship”-এর চেয়ে “Self-Responsibility”-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ নিজের মত প্রকাশের আগে নিজের কাছেই কয়েকটি প্রশ্ন করা—আমি যা বলছি তা কি সত্য? আমার তথ্যের উৎস কী? আমি কি একটি তথ্য জানাচ্ছি, নাকি যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিচ্ছি?সমালোচনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। বরং যুক্তিসংগত ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা প্রতিষ্ঠানকে আরও সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।তবে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানকে বিচার করাও যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীকে নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করাও স্বাস্থ্যকর নাগরিক সংস্কৃতি নয়।আমাদের প্রয়োজন মাঝামাঝি একটি পরিণত পথ—যেখানে সম্মান থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, তথ্য থাকবে এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতাও থাকবে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী করতে পারেডিজিটাল যুগে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার কাজটি শুধু পরিবার বা গণমাধ্যমের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই শিক্ষার অংশ হতে হবে।শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে—শেয়ার করার আগে যাচাই করো।
বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন করো।
সমালোচনা করার আগে তথ্য জানো। এটি শুধু সেনাবাহিনী বা কোনো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নয়; বরং সমাজের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Digital Literacy, Media Literacy এবং Responsible Citizenship বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা, কর্মশালা ও ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে একটি ছবির উৎস যাচাই করতে হয়, একটি ভিডিওর প্রেক্ষাপট বুঝতে হয় এবং একটি সংবাদ ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।এ শিক্ষা ভবিষ্যতের নাগরিককে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করবে না; তাকে দায়িত্বশীলও করে তুলবে।গণমাধ্যমের ভূমিকাডিজিটাল যুগে পেশাদার গণমাধ্যমের গুরুত্ব বরং আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যের বিপরীতে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত যাচাই, প্রেক্ষাপট এবং ভারসাম্য।একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করা নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং পাঠককে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট দেওয়া।একইভাবে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও আইনসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ বা প্রতারণা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বৈধ মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।সেনাবাহিনী ও জনগণের আস্থাএকটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার সাংগঠনিক সক্ষমতায় নয়; মানুষের আস্থার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখতে হবে। সেখানে কর্মরত প্রতিটি সদস্য একজন মানুষ—যার দায়িত্ব আছে, কর্তব্য আছে এবং পেশাগত জবাবদিহিতাও আছে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন।একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের পেশাগত দায়িত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, দুর্যোগে সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদানকেও সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অংশগ্রহণ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাই একপাক্ষিক না হয়ে বাস্তবভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।আজকের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা। সেনাবাহিনী, প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জায়গা থেকে এই আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রয়েছে।গুজবের পরিবর্তে তথ্য, উত্তেজনার পরিবর্তে যুক্তি, বিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে দায়িত্বশীল মূল্যায়ন—এগুলোই একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য।রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নাগরিকের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের দায়িত্ববোধও অপরিহার্য।বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা স্বাভাবিক। সেই শ্রদ্ধাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন জনগণের আস্থা, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতার সমন্বয়।অন্যদিকে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশ করা এবং কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা।দেশপ্রেম শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বেরও বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শেয়ার, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ভিডিও প্রকাশের মধ্য দিয়েও আমরা দায়িত্বশীল অথবা দায়িত্বহীন নাগরিক আচরণের পরিচয় দিতে পারি।তাই আমাদের প্রত্যয় হতে পারে খুব সরল—গুজব নয়, তথ্য;
উত্তেজনা নয়, যুক্তি;
বিভাজন নয়, সংলাপ;
অন্ধ সমর্থন নয়, দায়িত্বশীল প্রশ্ন;
এবং সর্বোপরি—দেশের প্রতি দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি সম্মান।একটি শক্তিশালী ও পেশাদার সেনাবাহিনী যেমন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সচেতন, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা যত গভীর হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তত বেশি স্থিতিশীল ও মানবিক হবে।লেখক —প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকীঅধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিকডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদরয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলা এফএমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

সেনাবাহিনী, নাগরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমাজ

কার্ল মার্কস কর্তৃক রচিত গ্রন্থ ‘ডাস ক্যাপিটাল’ প্রকাশের ১৫৯ বছর

সমগ্র দুনিয়ার আধুনিক সর্বহারা শ্রেণির মহান যোদ্ধা, মহত্তম মনীষী ও শিক্ষক, বিশ্ব মানব মুক্তির পথ প্রদর্শক, সমাজবিপ্লবের আলোকবর্তিকা মহামতি কমরেড কার্ল মার্কস কর্তৃক রচিত যুগান্তকারী বই জার্মান ভাষায় ‘ডাস ক্যাপিটাল’, ইংরেজিতে ‘Capital’, বাংলায় ‘পুঁজি’ এই সেপ্টেম্বর মাসেই ১৫৯ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক পুঁজিবাদকে উৎখাত করে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতি, উৎপাদন পদ্ধতি, অতি উৎপাদনশীলতা, উদ্বৃত্ত মূল্যের অর্থনৈতিক তত্ত্বায়নকে মার্কস সূত্রায়িত করেন তাঁর ‘ডাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে। মার্কসই প্রথম দেখিয়েছিলেন নিরন্তর শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যদিয়েই মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে।মার্কসের আগে অনেক দার্শনিক মানুষের দুঃখ, দুর্দশাকে বর্ণনা করলেও মার্কসই প্রথম বলেন দুনিয়াকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে কাজের কথায় কীভাবে দুনিয়াকে পরিবর্তন করা যায়। মার্কসের দর্শন ছিল বস্তুবাদী। বস্তুই চেতনার নিয়ন্ত্রক। মার্কস তাঁর বস্তুবাদী দ্বন্দ্বতত্ত্বেই ব্যাখ্যা করেছেন সমাজের সব কিছুই উৎপাদনের উপর ও তার চালিকাশক্তির উপর নির্ভরশীল। শ্রম চুরি করেই পুঁজির উদ্ভব, পুঁজির ফুলে ফেঁপে ওঠা। উদ্বৃত্ত শ্রমের মাধ্যমে শ্রম চুরি করেই পুঁজির অতি মুনাফা থেকে জন্ম নেয় সামাজিক সংকট। বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির গভীর সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে ভ্যাটিকান সিটির স্বয়ং পোপ বাইবেল নয়, মার্কস রচিত ডাস ক্যাপিটালের তত্বের মধ্যদিয়ে সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন। বর্তমান দুনিয়ায় লগ্নিপুঁজির দাপটে শিল্প পুঁজি উধাও হয়েছে। বাড়ছে বৈষম্য। বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা।পৃথিবীকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে যে বই, সেই গ্রন্থ এখনো প্রাসঙ্গিকই থেকে গেছে। উইকিপিডিয়া বলছে, সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বই হলো ডাস ক্যাপিটাল। এমনকি অন্তর্জাল ঘাঁটলেও দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মানুষ নাম শুনেছে কিন্তু পড়েনি, এমন বইয়ের তালিকা করলেও ওপরের দিকেই থাকবে ডাস ক্যাপিটাল।উনিশ শতকের জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস ডাস ক্যাপিটাল লিখতে শুরু করেছিলেন ১৮৫৭ সালে। যে বছর বইটি লিখতে শুরু করেন তিনি, ওই বছরই মারা যায় তাঁর এক সন্তান। বইটি লিখতে তাঁর সময় লেগেছিল ১০ বছর। এই ১০ বছরই দারিদ্র্যের তীব্র কশাঘাতে জর্জরিত হয়েছেন তিনি।মার্কসের জীবৎকালে কেবল ডাস ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ডই প্রকাশিত হয় ১৮৬৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যুর পর তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় বাকি দুই খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৮৫ সালে এবং তৃতীয় খণ্ড ১৮৯৪ সালে।সবকিছুর পরও পুঁজি, পুঁজির চরিত্র ও বিকাশসংক্রান্ত আলোচনায় ১৫৯ বছর ধরে অবিরাম উচ্চারিত হয়ে আসছে বইটির নাম। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষও বলেছেন একই কথা। ১৫৯ বছরে বিরামহীনভাবে অসংখ্যবার এই বইয়ের মুদ্রণ হতে থাকা রীতিমতো বিস্ময়কর। ছোট হরফেও দুই হাজার পৃষ্ঠার তিন খণ্ডের বইটি এতদিন ধরে পড়া হয়ে আসছে। অর্থনীতির গবেষকদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।পুঁজি ও পুঁজির চরিত্র বোঝার জন্য এই গ্রন্থের বিকল্প নেই। উপরন্তু এখানে (এবং কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতেও) এমন অনেক অংশ আছে, যার মধ্যে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের উত্থান ছাড়াও সামন্ত প্রথার বিলোপসম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন মার্কস। সেই হিসেবে বলা যায়, মার্কস প্রথম তাত্ত্বিক, যিনি বিশ্বায়নসম্পর্কিত ধারণা দিয়েছেন। ‘বিশ্ববাজার’ ধারণাটিও তাঁর উদ্ভাবিত। বর্তমানে আলোচিত বিভিন্ন প্রকরণ বা প্রকরণের বীজ পাওয়া যাবে এই বইয়ে। যেমন ‘কমোডিটি ফেটিশিজম’ (পণ্যপূজা) বলতে যা বোঝায়, মানুষের সব কার্যক্রম ও লেনদেনকে মূল্যায়ন করা বা বিক্রয়যোগ্য করে তোলার মাধ্যমে যেভাবে কাজ করে পুঁজিবাদ, সেটিও দেখিয়েছেন মার্কস। আবার ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের কথাও এখানে প্রথম বলেছেন মার্কস। কাজেই পুঁজির চরিত্রের বিভিন্ন দিক আলোকপাতের জন্য এই মহাগ্রন্থই মূলত পুঁজিকে বুঝতে সাহায্য করে।কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস–একই চিন্তাধারার অধিকারী এই দুই ব্যক্তিত্ব যেদিন ঘটনাচক্রে পরস্পর মিলিত হয়েছিলেন, সেদিন থেকেই অভিন্ন এক লক্ষ্যে অটুট বন্ধুত্বে এঁদের আজীবন অবিচল যাত্রার সূচনা হয়েছিল৷ এবং সেজন্যই সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি আন্দোলনে কমরেড ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের অবদান সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে সমসাময়িক কালের শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের বিকাশে কমরেড মার্কসের শিক্ষা ও কর্মধারার তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের একটা পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে৷মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম দেখান যে, প্রচলিত বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবেই শ্রমিক শ্রেণি ও তাদের দাবিদাওয়াগুলির জন্ম হয়েছে, এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই অনিবার্যভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির জন্ম দেওয়ার সাথে সাথে সর্বহারা শ্রেণিরও জন্ম দেয় ও তাকে শিল্পভিত্তিতে একত্রিত করে দেয়৷ তাঁরা দেখান যে, কিছু মহৎ হৃদয় মানুষের শুভ কর্মপ্রচেষ্টা মানবসমাজকে বর্তমান শোষণ–নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত করতে পারে না– সংগঠিত সর্বহারা শ্রেণির শ্রেণিসংগ্রামই একমাত্র এই মুক্তি সুনিশ্চিত করতে পারে৷মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম তাঁদের বিজ্ঞানভিত্তিক বিচারধারার মাধ্যমে দেখালেন যে, সমাজতন্ত্র স্বপ্নবিলাসীদের কোনও কাল্পনিক উদ্ভাবন নয়, আধুনিক সমাজের উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশের চূড়ান্ত ও অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতিই হল সমাজতন্ত্র৷আমাদের জানা (রেকর্ডেড) মানসবসমাজের এযাবৎকালের সমগ্র ইতিহাসই হল শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস–পর্যায়ক্রমে সমাজে কিছু শ্রেণির শাসন এবং তার বিরুদ্ধে শাসিত অপর কিছু শ্রেণির সংগ্রাম ও জয়লাভের ইতিহাস৷ এই সামাজিক প্রক্রিয়া ততদিন চলতে থাকবে, যতদিন সমাজের বুক থেকে শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণিপ্রভুত্বের মূলভিত্তি ব্যক্তিসম্পত্তি ও বিশৃঙ্খল নৈরাজ্যমূলক সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান না ঘটবে৷ শোষণ–নিপীড়নের এই সামাজিক ভিত্তিগুলির ধ্বংস ছাড়া সর্বহারা শ্রেণির স্বার্থ পূরিত হতে পারে না এবং সে কারণেই সংগঠিত সর্বহারা শ্রেণির সচেতন শ্রেণিসংগ্রামকে এই লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে৷ এবং প্রতিটি শ্রেণিসংগ্রামই হল রাজনৈতিক সংগ্রাম৷বিশ্বব্যাপী যে সর্বহারা শ্রেণি মুক্তির জন্য লড়ছে, তারা সকলেই মার্কস ও এঙ্গেলসের এই বিচারধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে তাদের লড়াইয়ের মূল আদর্শগত ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে৷ কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে যখন এই দুই বন্ধু তৎকালীন সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দর্শন ও তত্ত্বগত রূপরেখাটি রচনার সংগ্রামে লিপ্ত হন, তখন তাঁদের অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় সকলের কাছেই আশ্চর্য রকমের নতুন বলে মনে হয়েছিল৷ সেদিন রাজার স্বৈরশাসন, পুলিশ ও পুরোহিতদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে বহু মানুষই লিপ্ত হয়েছিলেন৷ তাঁদের মধ্যে সাধারণ মেধার মানুষ যেমন ছিলেন, অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষও ছিলেন৷ সৎ, ন্যায়পরায়ণ মানুষের পাশাপাশি অসৎ–মতলববাজরাও ছিল৷ কিন্তু তাঁদের কেউই, বুর্জোয়া শ্রেণি ও সর্বহারা শ্রেণির পারস্পরিক স্বার্থের মধ্যে বিরোধাত্মক দ্বন্দ্বের সত্যটি ধরতে পারেননি৷ এঁরা ভাবতেই পারতেন না যে, শ্রমিকরা একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি হিসাবে সমাজে কোনও ভূমিকা পালন করতে পারে৷ বরং এঁদের মধ্যে এমন অনেক কল্পনাবিলাসী ছিলেন– যাঁদের কেউ কেউ প্রতিভাধর বলেও খ্যাত– যাঁরা মনে করতেন প্রচলিত সমাজের অন্যায় বৈষম্য সম্পর্কে ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণিগুলিকে বুঝিয়ে তাদের হৃদয় পরিবর্তন করাই আসল কাজ, তাহলেই পৃথিবীর বুকে শান্তি ও সর্বজনীন কল্যাণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে৷ এঁরা এমন এক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা সংগ্রাম ছাড়াই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব৷ সেই সময় সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক শ্রেণির বন্ধু বলে যাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় সকলেই সাধারণভাবে সর্বহারাদের সমাজের ‘ক্ষত’ বলেই মনে করলেন এবং শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কী করে যে সর্বহারাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে যাচ্ছে, তা ভেবেই তাঁরা উদ্বিগ্ন ও সন্ত্রস্ত হলেন৷ ফলে, কীভাবে শিল্পের ও সর্বহারার বিকাশ বন্ধ করা যায়, প্রায় সকলেই তার উপায় খুঁজতে লাগলেন৷ ‘ইতিহাসের চাকা’ কীভাবে থামিয়ে দেওয়া যায় এই ভাবনা তাঁদের পেয়ে বসল৷ মার্কস ও এঙ্গেলস কিন্তু এই উদ্বেগ ও আতঙ্কের আদৌ শরিক হলেন না, বরং সর্বহারা শ্রেণির নিরন্তর বিকাশের উপরই তাঁদের সকল আশা–ভরসা তাঁরা ন্যস্ত করলেন৷শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিসংগ্রামে মার্কস ও এঙ্গেলসের মহান অবদান ও ভূমিকাকে এক কথায় এইভাবে রাখা যায় : তাঁরা শ্রমিকদের শ্রেণি হিসাবে নিজেদের চিনতে ও নিজেদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে শিখিয়েছেন৷ স্বপ্ন ও কল্পনার জায়গায় তাঁরা বিজ্ঞানকে স্থাপন করেছেন৷ এ কারণেই এঙ্গেলসের নাম ও জীবনের সঙ্গে প্রতিটি শ্রমিকের পরিচিত হওয়া অবশ্যপ্রয়োজন৷ তাই এই নিবন্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আধুনিক সর্বহারা শ্রেণির মহান দুই শিক্ষকের একজন– এঙ্গেলসের জীবন ও কর্মের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করব৷ আমাদের সকল প্রকাশনার মতোই এই নিবন্ধেরও উদ্দেশ্য– রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা জাগ্রত করা৷এঙ্গেলসের জন্ম ১৮২০ সালে প্রুশিয়ার রাইনে প্রদেশের বারমেনে৷ তাঁর বাবা ছিলেন একজন ম্যানুফ্যাকচারার৷ ১৮৩৮ সালে, হাইস্কুলের পড়া শেষ করার আগেই এঙ্গেলসকে পারিবারিক অবস্থার চাপে ব্রেমেনে একটি সওদাগরি প্রতিষ্ঠানে কেরানির চাকরি নিতে হয়৷ কিন্তু সওদাগরি অফিসের কাজকর্ম এঙ্গেলসের কাছে বিজ্ঞান ও রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও বাধা হতে পারেনি৷ হাইস্কুলের ছাত্রাবস্থাতেই এঙ্গেলসের মনে স্বৈরতান্ত্রিক রাজশাসন ও আমলাতন্ত্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঘৃণা জন্মেছিল৷ দর্শনগত অধ্যয়ন তাঁর রাজতন্ত্রবিরোধিতাক আরও গভীর করল৷ ওই সময় জার্মানিতে দর্শনচর্চার জগতে হেগেলের চিন্তার প্রভাব ছিল প্রবল৷ এঙ্গেলস ওই হেগেলরই অনুগামী হলেন৷ হেগেল নিজে যদিও প্রুশীয় স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন উৎসাহী সমর্থক ছিলেন এবং বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রূপে প্রুশীয় রাষ্ট্রেরই কর্মচারী ছিলেন, তথাপি হেগেলের শিক্ষাগুলি ছিল বৈপ্লবিক উপাদানে সমৃদ্ধ৷ মানুষের যুক্তিবাদী মননশীলতার প্রতি হেগেলের আস্থা, যুক্তি দিয়ে সমস্ত বিষয় বুঝে নেওয়ার মানুষের অধিকারের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা এবং হেগেলীয় দর্শনের যেটা মূল সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বজগৎ পরিবর্তন ও বিকাশের এক নিরন্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে– এই সমস্ত কিছুই হেগেলের কতিপয় অনুগামীকে– যাঁরা কোনওভাবেই প্রচলিত অবস্থাকে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না– এক নতুন ভাবনায় পৌঁছে দিল৷ হেগেলের দর্শনগত মূল সিদ্ধান্তকে ধরেই তাঁরা বললেন, সমগ্র বিশ্বজগৎ অনন্তকাল ধরে পরিবর্তিত ও বিকশিত হচ্ছে– এ সার্বজনীন নিয়মের মধ্যেই তো নিহিত আছে বর্তমানে বিরাজমান অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার, প্রচলিত সমাজের অন্যায়–অবিচার–অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সার্বজনীন সত্যটি৷ এই বিশ্বের সমস্ত কিছুরই পরিবর্তন ও বিকাশ হচ্ছে, এটাই যখন সার্বজনীন নিয়ম, এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে বিকাশের ধারাবাহিকতায় এক সময়ে এসে অন্য এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়– এই যখন পরিবর্তনের বিশ্বজনীন প্রক্রিয়া, তখন প্রুশিয়ার রাজা বা রাশিয়ার জারের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চিরকাল বহাল থাকবে কেন? গরিষ্ঠ জনসমষ্টির স্বার্থকে বিকিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কেন মুষ্টিমেয় নগণ্য সংখ্যক মানুষ বিত্তশালী হবে অথবা জনসাধারণের উপর চিরকাল বুর্জোয়া শ্রেণির প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকবে কেন?হেগেলের দর্শন মানুষের মননের ও তার বিভিন্ন ভাবনা–ধারণার (আইডিয়া) বিকাশের ধারা সম্পর্কেও ব্যাখ্যা ও মতামত দিয়েছে, কিন্তু তা ভাববাদী ব্যাখ্যা৷ মনন ও ভাবের বিকাশের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে, তাকেই নিয়ামক ধরে হেগেলীয় দর্শন প্রকৃতিজগৎ, মানুষ এবং মানবিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলির বিকাশ সম্পর্কে বিচার ও সিদ্ধান্ত করেছে৷ মার্কস ও এঙ্গেলস, হেগেলীয় দর্শনের চিরন্তন বিকাশের নিরন্তর প্রক্রিয়ার ধারণাকে গ্রহণ করলেন৷ কিন্তু হেগেলের পূর্বধারণাভিত্তিক ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত (অর্থাৎ, ভাবের নিয়ামক ভূমিকাকে– অনুবাদক) বর্জন করলেন, বাস্তব জীবনের দিকে তাকিয়ে তাঁরা দেখলেন, মনন বা ভাবের বিকাশ দিয়ে প্রকৃতিজগতের বিকাশের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, বরং প্রকৃতিজগৎ তথা বাস্তবজগতের বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই একমাত্র মননের বা ভাবের বিকাশ ও গতিপ্রকৃতির ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে৷ হেগেল ও অন্যান্য হেগেলপন্থীরা ছিলেন ভাববাদী, মার্কস ও এঙ্গেলস হলেন বস্তুবাদী৷ তাঁরা বিশ্ব ও মানবসমাজকে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেন এবং এই সিদ্ধান্তে এলেন যে, সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাবলির পিছনে যেমন বস্তুগত কারণ কাজ করছে, ঠিক তেমনভাবেই মানবসমাজের বিকাশও বস্তুগত নানা শক্তি তথা উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের উপর নির্ভরশীল (কন্ডিশন্ড)৷ মানুষ তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি উৎপাদন করতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে, অর্থাৎ মানুষ মানুষের সঙ্গে কী সম্পর্কে আবদ্ধ হবে, তা উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশের উপর নির্ভরশীল৷ এবং উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষে–মানুষে এই যে সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে, তার মধ্যেই নিহিত থাকে মানুষের সামাজিক জীবন, মানবিক আশা–আকাঙক্ষা, ভাবনা–ধারণা ও রাষ্ট্রীয় আইন–কানুন সংক্রান্ত তাবৎ বিষয়ের যাবতীয় ব্যাখ্যা৷ এখন সমাজে ব্যক্তিসম্পত্তির ভিত্তির উপর যেসব সামাজিক সম্পর্কগুলি আমরা দেখছি, তা উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে, উৎপাদিকা শক্তির একই বিকাশ আবার সমাজের গরিষ্ঠ জনসমষ্টিকে তাদের নিজ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করছে এবং সেই সম্পত্তিকে কুক্ষিগত করছে নগণ্য সংখ্যক মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে৷ উৎপাদিকা শক্তির এই বিকাশই আধুনিক সমাজব্যবস্থার মূলভিত্তি– ব্যক্তিসম্পত্তিকে অবলুপ্ত করবে, এই বিকাশই সম্পত্তি–বিলোপের সেই অবশ্যম্ভাবী লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চাইছে– যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসাধনে সমাজতন্ত্রীরা তাদের সকল কর্মপ্রচেষ্টা নিয়োজিত করেছে৷ এখন সমাজতন্ত্রীদের সর্বপ্রথম যেটা বুঝে নিতে হবে, তা হল, কারা সেই সামাজিক শক্তি, যারা আধুনিক সমাজে তাদের বিশেষ অবস্থানের জন্যই সমাজতন্ত্র কায়েম করতে আগ্রহী৷ এরপর যা করতে হবে তা হল, এই বিশেষ সামাজিক শক্তির মধ্যে তাদের নিজ শ্রেণিস্বার্থবোধ সম্পর্কে, তাদের ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব–কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা জাগ্রত করতে হবে৷ সর্বহারা শ্রেণিই হল এই সামাজিক শক্তি৷ইংল্যান্ডের সর্বহারা শ্রেণিকে এঙ্গেলস খোদ ম্যাঞ্চেস্টারে, ব্রিটিশ শিল্পের প্রাণকেন্দ্রে বসবাস করে খুব কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পান৷ ম্যাঞ্চেস্টারে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তাঁর বাবার কিছু শেয়ার ছিল৷ সেখানেই চাকরি নিয়ে ১৮৪২ সাল থেকে এঙ্গেলস বসবাস শুরু করেন৷ ওখানে এঙ্গেলস শুধু কারখানা–ফিসের কাজ নিয়েই থাকতেন না৷ সেই সমস্ত বস্তিতে ঘুরতেন যেখানে শ্রমিকরা ঘিঞ্জি ঝুপড়িতে অত্যন্ত দুর্বিষহ দিনযাপন করত৷ তিনি নিজের চোখে শ্রমিকদের দারিদ্র ও দুর্দশা দেখেছেন৷ কিন্তু শুধু নিজের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার মধ্যেই তিনি নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি৷ ব্রিটিশ শ্রমিক শ্রেণির জীবনযাপনের যা কিছু তাঁর চোখে পড়ত, তা তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, কিন্তু সাথে সাথে এই বিষয়ে সরকারি নথিপত্র যেখানে যতটুকু দেখার সুযোগ পেতেন, তাও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে অধ্যয়ন করতেন৷ এঙ্গেলসের এই পড়াশোনা ও পর্যবেক্ষণের ফল হিসাবেই ১৮৪৫ সালে তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ প্রকাশিত হয়৷ এই বইটি লেখার মধ্য দিয়ে এঙ্গেলস শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি আন্দোলনে কী অবদান রেখেছিলেন, সে বিষয়ে আমরা আগেই বলেছি৷ এঙ্গেলসের আগেও বহু মানুষ সর্বহারা শ্রেণির দুর্দশার কথা লিখেছিলেন এবং এ–ও বলেছিলেন যে, সর্বহারাদের সাহায্য করা দরকার৷ কিন্তু এঙ্গেলসই প্রথম, যিনি বললেন সর্বহারা শ্রেণি নিছক দুর্দশাভোগী একটি শ্রেণিমাত্র নয়৷ তিনি দেখালেন, এই শোচনীয় আর্থিক অবস্থাই বাস্তবে, সর্বহারা শ্রেণিকে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার পথে নিয়ে যাবে এবং শ্রেণি হিসাবে নিজেদের চূড়ান্ত মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রাম করতে তাদের বাধ্য করবে৷ এবং এই লড়াকু সর্বহারা শ্রেণি নিজেরাই নিজেদের সব থেকে বড় সহায়ক হবে৷ শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক আন্দোলনই শ্রমিকদের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে এই উপলব্ধি ও চেতনা সঞ্চার করবে যে, তাদের মুক্তি একমাত্র সমাজতন্ত্রের মধ্যেই সম্ভব৷ অন্যদিকে, শ্রমিকদের এই উপলব্ধির ভিত্তিতে যখন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হবে, তখন সমাজতন্ত্র একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে৷ এটাই হল ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ বিষয়ে এঙ্গেলসের বইটির মূল চিন্তাধারা৷ এই চিন্তাধারা আজ সমগ্র বিশ্বের চিন্তাশীল ও সংগ্রামী সর্বহারারা তাদের সংগ্রামের মূল আদর্শগত হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে৷ কিন্তু যেদিন এঙ্গেলস এই বই লেখেন সেদিন এই চিন্তাধারা ছিল একেবারেই নতুন৷ অত্যন্ত আকর্ষণীয় রচনাশৈলীতে ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির জ্বালা–যন্ত্রণার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও মর্মস্পর্শী বর্ণনার মধ্য দিয়ে এই বইটিতে এঙ্গেলস এই চিন্তাধারা তুলে ধরেন৷ এ বই ছিল পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে মানবতার দরবারে প্রকাশ্য অভিযোগের ভয়াবহ একটি দলিল এবং এর প্রভাবও পড়ল অত্যন্ত গভীরে৷আধুনিক বাস্তব জীবনাবস্থার সব থেকে প্রামাণ্য দলিল হিসাবে সর্বত্রই এঙ্গেলসের বইটি উদ্ধৃত হতে লাগল৷ বস্তুত, শ্রমিক শ্রেণির দুঃখ–যন্ত্রণাময় জীবনের এমন হৃদয়স্পর্শী ও বাস্তবনিষ্ঠ ছবি– ১৮৪৪ সালের আগে ও পরে আর কোনও রচনাতেই পাওয়া যায়নি৷এঙ্গেলস ইংল্যান্ডে আসার আগে পর্যন্ত সমাজতন্ত্রী হননি৷ ম্যাঞ্চেস্টারে বসবাসের সময় তিনি ইংল্যান্ডের তৎকালীন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত মানুষদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ব্রিটিশ সমাজতান্ত্রিক পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন৷ ১৮৪৪ সালে প্যারিসে ফিরবার পথে মার্কসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটল, যদিও ইতিমধ্যেই মার্কসের সঙ্গে চিঠির আদান–প্রদান তাঁর চলছিল৷ মার্কসও ওই সময় প্যারিস থেকে ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের প্রভাবে ও ফরাসি জীবনের সংস্পর্শে এসে একজন সমাজতন্ত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন৷ এখানে দুই বন্ধু যৌথভাবে একটি বই লিখলেন, নাম দিলেন– ‘পবিত্র পরিবার’ অথবা ‘সমালোচনামূলক সমালোচনার সমালোচনা’ (হোলি ফ্যামিলি বা ক্রিটিক অফ ক্রিটিক্যাল ক্রিটিক)৷ এই বইটি এঙ্গেলসের ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ শীর্ষক বইয়ের আগে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এর বেশিরভাগ অংশই মার্কসের লেখা৷ বৈপ্লবিক বস্তুবাদী সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তিগুলি সম্পর্কেই এই বইয়ে আলোচনা করা হয়, যা উপরের আলোচনায় আমরা আগেই ব্যাখ্যা করেছি৷ ‘পবিত্র পরিবার’ নামটি আসলে দার্শনিক বলে খ্যাত বাওয়ার ভ্রাতৃদ্বয় ও তাদের অনুগামীদের উদ্দেশ্য করে মার্কস ও এঙ্গেলসের দেওয়া একটা মজার নাম৷ এই ভদ্রোমহোদয়রা বাস্তবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন, দল ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে এমন এক সমালোচনা প্রচার করছিলেন– যার মধ্যে বাস্তব কর্মপ্রচেষ্টার কোনও স্থানই ছিল না৷ এরা চারপাশের জগৎ ও জাগতিক ঘটনাবলিকে কল্পলোকের উপাদান হিসাবেই ‘খুঁটিয়ে’ বিচার করছিলেন৷ এই বাওয়ার ভদ্রমহোদয়রা সর্বহারাদের যুক্তি–বুদ্ধি বিবর্জিত একটি জনসমষ্টি মনে করে অত্যন্ত অবজ্ঞার চোখে দেখতেন৷ এই অবাস্তব ও ক্ষতিকারক চিন্তার বিরুদ্ধে মার্কস ও এঙ্গেলস তীব্র প্রতিবাদ জানালেন৷ শাসক শ্রেণি ও রাষ্ট্রের দ্বারা অত্যাচারিত পদদলিত শ্রমিকদের এই সমাজেরই মানুষ হিসাবে দেখিযে তাঁরা বললেন, ভাববিলাস নয় এক উন্নততর সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চাই৷ সাথে সাথে তাঁরা এও অবশ্যই বললেন যে, সর্বহারা শ্রেণিই এই সংগ্রাম গড়ে তুলতে চায় এবং তা গড়ে তোলার ক্ষমতাও তারা রাখে৷ এঙ্গেলস কিন্তু ‘হোলি ফ্যামিলি’ প্রকাশ হওয়ার আগেই মার্কস ও রুগে সম্পাদিত ‘জার্মান–ফরাসি বর্ষ পত্রিকায়’ তাঁর ‘ক্রিটিক্যাল এসেস অন পলিটিক্যাল ইকনমি’ নামে একটি লেখা প্রকাশ করেন৷ ওই নিবন্ধে এঙ্গেলস সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক নানা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি বিচার–বিশ্লেষণ করেন এবং ওই সব ঘটনাকে ব্যক্তিসম্পত্তি ভিত্তিক প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল রূপেই দেখান৷ এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পলিটিক্যাল ইকনমি (রাজনীতি ও অর্থনীতির পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সংযোগের আলোচনাত্মক বিজ্ঞান– অনুবাদক) বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য মার্কস যে সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে এঙ্গেলসের সঙ্গে মার্কসের যোগাযোগের একটা ভূমিকা ছিল৷ পরবর্তী সময়ে পলিটিক্যাল ইকনমি বিষয়ে মার্কসের অবদান এই বিজ্ঞানে যথার্থই বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিল৷১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত এঙ্গেলস ব্রুসেলস ও প্যারিস শহরে বাস করেন৷ এই সময় বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার সাথে সাথে ব্রুসেলস ও প্যারিসের জার্মান শ্রমিকদের মধ্যে সাংগঠনিক কাজকর্মও তিনি চালাতে থাকেন৷ এখানেই মার্কস ও এঙ্গেলস জার্মান কমিউনিস্ট লিগের গুপ্ত সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ এই গুপ্ত লিগ তাঁদের বলে যে, সমাজতন্ত্রের মূলনীতি ও আদর্শ বিষয়ে তাঁদের চিন্তাধারা তাঁরা লিখিতভাবে পেশ করুন৷ এরই ফলশ্রুতিতে রচিত হয় মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত বই ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার’, যা ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়৷ এই ছোট্ট বইটি বিশাল রচনা সম্ভারের সমতুল্য৷ এই বইয়ের অমূল্য সত্য আজও গোটা সভ্য দুনিয়ার সংগঠিত ও সংগ্রামী সর্বহারা শ্রেণিকে প্রেরণা দেয়, পথ দেখায়৷১৮৪৮ সালে প্রথমে ফ্রান্সে যে বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার দেখা দেয়, এবং পরে যা পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে, তা দেখে মার্কস ও এঙ্গেলস নিজেদের দেশে ফিরে যান৷ এখানে, অর্থাৎ, রাইনিশে প্রুশিয়ায় বাস করে, তাঁরা কোলন থেকে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক পত্রিকা ‘নিউ রাইনিশে জাইটুং’–এর দায়িত্বভার নেন৷ রাইনিশে প্রুশিয়ার জনগণের সকল বিপ্লবী–গণতান্ত্রিক আশা–আকাঙ্খার সঙ্গে এই দুই বন্ধুর সমস্ত মন–প্রাণ একাত্ম হয়ে গিয়েছিল৷ জনগণের স্বাধীনতা ও স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে এই দুই বন্ধু প্রতিক্রিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে লড়াই করেছিলেন৷ কিন্তু আমরা জানি, শেষপর্যন্ত প্রতিক্রিয়াই জয়ী হয়৷ নিউ রাইনিশে জাইটুং–এর কণ্ঠরোধ করা হয়৷ মার্কস নির্বাসিত অবস্থায় তাঁর প্রুশীয় নাগরিকত্ব হারান এবং তাঁকে প্রুশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়৷ এঙ্গেলস জনতার সশস্ত্র অভ্যুত্থানে অংশ নেন এবং তিনটি যুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেন৷ বিদ্রোহীদের পরাজয়ের পর তিনি গোপনে সুইজারল্যান্ড হয়ে লন্ডনে চলে যান৷মার্কস ওই সময় লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন৷ এঙ্গেলস অতি শীঘ্রই ম্যাঞ্চেস্টারের সেই প্রতিষ্ঠানে, যেখানে ৪০–এর দশকে তিনি কাজ করেছিলেন, আবার চাকরি নেন, পরে ওই প্রতিষ্ঠানেরই শেয়ারহোল্ডার হন৷ ১৮৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যাঞ্চেস্টারেই ছিলেন৷ এই সময় মার্কস থাকতেন লন্ডনে৷ কিন্তু বাইরের এই ব্যবধান দুই বন্ধুর মধ্যে আন্তরিক ও প্রাণবন্ত ভাববিনিময়ে কোনও বাধা হতে পারেনি৷ প্রায় প্রতিদিনই তাঁরা একে অপরকে চিঠি লিখতেন৷ এই সমস্ত চিঠিপত্রে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পরস্পরের বিশ্লেষণ, গবেষণা, সত্যোপলব্ধি ও আনুষঙ্গিক মতামতের আদানপ্রদান চলত৷ এইভাবেই দুই বন্ধু বৈজ্ঞানিক সমজতন্ত্রের দর্শন ও তত্ত্বগত বুনিয়াদ রচনায় এক নিরলস যৌথ সংগ্রাম চালিয়ে যান৷ ১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লন্ডনে চলে যান– শুরু হয় দুই বন্ধুর সম্মিলিত জ্ঞানসাধনার এক সংকল্পদৃঢ়, কষ্টসাধ্য ও অধ্যবসায়ী জীবন৷ ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই যৌথ রাজনৈতিক জীবনে কোনও ছেদ ঘটেনি৷ মার্কসের দিক থেকে বিচার করলে এই যৌথ সংগ্রামের ফসল হল ক্যাপিটাল, যা পলিটিক্যাল ইকনমিতে আমাদের যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান রূপে ভাস্বর হয়ে আছে৷ আর, এঙ্গেলসের দিক থেকে ওই সময়কার তাঁর ছোট–বড় বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা ছিল ওই যৌথ সংগ্রামের ফসল৷ মার্কস পুঁজিবাদী অর্থনীতির নানা জটিল দিকগুলি বিশ্লেষণ করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন৷ আর, এঙ্গেলস ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ও মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বিজ্ঞানের নানা জটিল প্রশ্ন, অতীত ও বর্তমানের নানা বিচিত্র ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে সহজ সাবলীল ভাষায় নানা রচনা লিখলেন– যার অধিকাংশই ছিল মতবাদিক সংঘর্ষমূলক৷ এঙ্গেলসের রচনাবলির মধ্যে অন্যতম হল ডুরিং–এর বিরুদ্ধে মতবাদিক বিতর্কমূলক আলোচনা (যেখানে তিনি দর্শন, প্রকৃতিবিজ্ঞানের ও সমাজবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে বিশ্লেষণ করেন), ‘পরিবার, ব্যক্তিসম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’, ‘লুডউইগ ফুয়েরবাখ’ রাশিয়ার সরকারের বিদেশনীতি সম্পর্কে একটি নিবন্ধ, আবাসন সমস্যার ওপর অসাধারণ কিছু প্রবন্ধ এবং সর্বশেষে বলব, রাশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশের ওপর এঙ্গেলসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান দুটি প্রবন্ধের কথা৷ মার্কস পুঁজি সংক্রান্ত তাঁর সুবিশাল রচনায় শেষ আঁচড়টি দিয়ে যেতে পারেননি, আগেই তাঁর মৃত্যু হয়৷ অবশ্য ক্যাপিটাল–এর খসড়া মার্কস সম্পূর্ণ করে গিয়েছিলেন৷ ওই খসড়াকে প্রকাশের যোগ্য করে তোলা ও তা প্রকাশ করার কঠিন কাজ, বন্ধুর মৃত্যুর পর এঙ্গেলসই কাঁধে তুলে নেন এবং ক্যাপিটালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন৷ দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন ১৮৮৫ সালে এবং তৃতীয় খণ্ড ১৮৯৪ সালে৷ চতুর্থ খণ্ড প্রকাশে তাঁর মৃত্যু বাধা হয়ে দাঁড়ায়৷ দুটি খণ্ড সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেই এঙ্গেলসকে অসাধারণ পরিশ্রম করতে হয়৷ অস্ট্রিয়ার সমাজতন্ত্রী (সোস্যাল ডেমোক্রাট) আডলার ঠিকই বলেছেন যে, ক্যাপিটালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করে এঙ্গেলস অনন্য প্রতিভাধর বন্ধুর প্রতি মর্যাদার এক বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছেন এবং ওই স্মৃতিস্তম্ভে নিজের অজ্ঞাতেই নিজের নামটিও তিনি অম্লান অক্ষরে খোদিত করে গিয়েছেন৷ বাস্তবিক ক্যাপিটালের এই দুই খণ্ডের রচয়িতা হলেন দু’জন– মার্কস ও এঙ্গেলস৷ পুরাকাহিনীতে বন্ধুত্বের বহু হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায়৷ ইউরোপের সর্বহারা শ্রেণি বলতে পারে– মুক্তিসংগ্রামে যে বিজ্ঞান তাদের হাতিয়ার, তা সৃষ্টি করেছিলেন এমন দুজন জ্ঞানী ও মহান যোদ্ধা– যাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক পুরাণ কাহিনীর সর্বাপেক্ষা সুন্দরতম বন্ধুত্বের নিদর্শনকে ছাপিয়ে গেছে৷ এঙ্গেলস সবসময়ই নিজেকে মার্কসের পরে স্থাপন করেছেন৷ সামগ্রিক বিচারে তিনি নিঃসন্দেহে ঠিকই করেছেন৷ পুরানো এক বন্ধুকে চিঠিতে এঙ্গেলস লিখেছিলেন– ‘‘মার্কসের জীবিতকালে আমি সর্বদাই তাঁর পাশে থেকে সহায়কের ভূমিকাই পালন করেছি৷’’ জীবিত মার্কসের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও প্রয়াত মার্কসের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ছিল অপরিমেয়৷ এই ইস্পাতদৃঢ় সংগ্রামী ও প্রজ্ঞাদীপ্ত চিন্তানায়কের হৃদয়ের আধারে ছিল গভীর মমতা ও ভালবাসা৷১৮৪৮–৪৯ সালের আন্দোলনের পর নির্বাসিত অবস্থায় মার্কস ও এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজেই কেবল নিজেদের আবদ্ধ রাখেননি৷ ১৮৬৪ সালে মার্কস ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন এবং এক দশক ধরে এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন৷ মার্কসের চিন্তাধারায় বিশ্বের সর্বহারাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ওই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেয়৷ বস্তুত শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন গড়ে তোলার ইতিহাসে এই আন্তর্জাতিকের ভূমিকা ও তাৎপর্য ছিল অপরিসীম৷ সত্তরের দশকে এই আন্তর্জাতিক বন্ধ হয়ে যায়৷ কিন্তু এর ফলে শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রশ্নে মার্কস ও এঙ্গেলসের ভূমিকা শেষ তো হলই না, বরং বলা যায়, বিশ্ব সর্বহারার পথপ্রদর্শক রূপে তাঁদের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পেল৷ কারণ সর্বহারা শ্রেণির আন্দোলন তখন দেশে দেশে অপ্রতিরোধ্য গতিতে গড়ে উঠেছিল৷ মার্কসের মৃত্যুর পর একা এঙ্গেলসই ইউরোপের সর্বহারা শ্রেণির নেতা ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেন৷ তাঁর শিক্ষা ও নির্দেশকে পাথেয় করেই সমগ্র দুনিয়ার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরা এগিয়ে চললেন৷ জার্মানিতে তখন সরকারি উৎপীড়ন সত্ত্বেও, সমাজতন্ত্রীদের শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল৷ আবার স্পেন, রুমানিয়া ও রাশিয়ার মতো পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতেও তখন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ছড়িয়েছে, ধাপে ধাপে আন্দোলনের সূচনাও ঘটেছে৷ এই সমস্ত দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা তখন পথনির্দেশের জন্য এঙ্গেলসের কাছেই গেলেন৷ পরিণত বয়সে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত এঙ্গেলস তখন দুনিয়ার সকল সমাজতন্ত্রীদের কাছেই এক প্রবল আকর্ষণ৷মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই রুশ ভাষা জানতেন ও রুশ বই–পত্র পড়তেন৷ এই দেশ সম্পর্কে তাঁদের দুজনেরই আন্তরিক আগ্রহ ছিল৷ রুশ দেশের বিপ্লবী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি তাঁরা অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে লক্ষ করতেন এবং রুশ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন৷ রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের পথ ধরেই এই দুই মনীষী সমাজতন্ত্রী হয়েছিলেন৷ রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক বোধ তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত তীব্র ছিল৷ একদিকে এই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অনুভূতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের পারস্পরিক অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক বিষয়ে সুগভীর তত্ত্বগত উপলব্ধি ও তার সঙ্গে জীবনের অমূল্য অভিজ্ঞতার সমন্বয় মার্কস ও এঙ্গেলস উভয়কেই অনন্যসাধারণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার অধিকারী করেছিল৷ এ কারণেই প্রবল শক্তিধর জারের বিরুদ্ধে রুশ বিপ্লবীদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম এই দুই পরীক্ষিত বিপ্লবীর মহান হৃদয়ে গভীর আশা ও সহানুভূতির সৃষ্টি করেছিল৷ অন্যদিকে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের আশু যে কাজটি রুশ বিপ্লবীদের সামনে রয়েছে, কিছু আর্থিক সুযোগ–সুবিধা আদায় করার মিথ্যা মোহে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সেই সংগ্রামকে অবহেলা করার যে প্রবণতা, তাকে তাঁরা স্বভাবতই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন এবং এই প্রবণতাকে তাঁরা সমাজবিপ্লবের মহান উদ্দেশ্যের প্রতি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা বলে চিহ্ণিত করেছিলেন৷ মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের সমগ্র জীবন ধরে বারবার আমাদের শিখিয়েছেন যে, ‘‘শ্রমিকদের মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই সংগ্রাম করে অর্জন করতে হবে– অপরে তাদের মুক্তি এনে দেবে না৷’’ কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শোষণের জোয়াল থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য সংগ্রাম করার প্রয়োজনেই সর্বহারা শ্রেণিকে কিছু রাজনৈতিক অধিকার জয় করে নিতে হবে৷ আমাদের আরও জানা দরকার যে, রুশ দেশের মাটিতে রাজনৈতিক বিপ্লব পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির শ্রমিক আন্দোলনে কী তাৎপর্যময় প্রভাব ফেলবে–মার্কস ও এঙ্গেলস তাও অত্যন্ত পরিষ্কার উপলব্ধি করেছিলেন৷ স্বৈরতান্ত্রিক রাশিয়া হল সাধারণভাবে সমগ্র ইউরোপের প্রতিক্রিয়ার দুর্গ৷ ১৮০৭ সালের যুদ্ধের ফলে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে দীর্ঘ বিরোধের সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়া অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থা পেয়ে যায়– যা প্রতিক্রিয়ার শিবিরে স্বৈরতান্ত্রিক রাশিয়ার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে৷ ফলে ইউরোপে প্রতিক্রিয়ার শৃঙ্খল ভাঙতে হলে চাই মুক্ত রাশিয়া৷ এই মুক্ত রাশিয়া – যে কোনও কারণেই পোলিশ, ফিনিশ, জার্মান, আর্মেনিয়ান বা অন্য কোনও ক্ষুদ্র জাতির ওপর নিপীড়ন চালাবে না– এই ধরনের পীড়ন চালানোর অথবা জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে সর্বদা বিরোধ বাধিয়ে রাখার কোনও প্রয়োজনই যে রাশিয়ার হবে না, একমাত্র সেই রাশিয়াই আধুনিক ইউরোপকে যুদ্ধের দুঃসহ বোঝা থেকে মুক্ত করে এই শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ দূর করতে পারে৷ একমাত্র মুক্ত রাশিয়াই পারে ইউরোপের সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মদমত্ততাকে খর্ব করে ইউরোপীয় সর্বহারা শ্রেণির আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে৷ সমগ্র পশ্চিমে শ্রমিক আন্দোলনের এই অগ্রগতির স্বার্থেই এঙ্গেলস রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা এত আন্তরিকভাবে কামনা করেছেন৷ তাঁদের মৃত্যুতে রুশ বিপ্লবীরা তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুদ্বয়কে হারাল৷"দাস ক্যাপিটাল"শত ঊনষাট বছর পেরিয়ে আজও জ্বলে আলো,‘পুঁজি’র পাতায় পাতায় জাগে প্রশ্ন—কারই ভালো?কার ঘামে গড়ে ওঠে নগর, কার হাতে সোনার ধন,কার অন্নে কার প্রাসাদ—কার কপালে ক্ষুধার ক্ষণ?কারখানার কালো ধোঁয়া আকাশ ঢাকে প্রতিদিন,শ্রমিক ঘামে সিক্ত মাটি, পুঁজির মুনাফা রঙিন।একজনের হাতে পুঁজি, অগণিতের শূন্য হাত,এই বৈষম্যের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে দিন ও রাত।মার্কস দেখালেন—শ্রমের মাঝে মানুষের যে শক্তি,সেই শ্রমেই গড়ে ওঠে সভ্যতার সব ভক্তি।শ্রম যদি হয় মানুষের, ফল কেন যায় অন্য ঘরে?ঘামের দামে অট্টালিকা ওঠে কারা, কারই তরে?উদ্বৃত্ত শ্রমের অঙ্ক কষে দেখালেন যে সত্য,শোষণেরই ভিতের ওপর পুঁজির যত মহত্ত্ব।পণ্য শুধু পণ্য নয়—মানুষ হারায় আপন সত্তা,বাজার যখন নিয়ন্ত্রণ করে জীবনেরই প্রতিটি কথা।বিচ্ছিন্ন মানুষ নিজের শ্রমে নিজের কাছেই পর,মানবিকতা বন্দী থাকে মুনাফারই ঘোর।পণ্যের মোহ, দামের খেলা, বাজারেরই রাজত্ব,মানুষ তখন পণ্যে নামে—হারায় তার মানবত্ব।ইতিহাসের পথটি কেবল রাজাদের নয়,শ্রমজীবী মানুষের রক্তে তার অক্ষয় পরিচয়।শ্রেণির সাথে শ্রেণির দ্বন্দ্ব, সংঘাতেরই ধারা,শোষিত যখন জেগে ওঠে—কাঁপে শোষকের কারা!মার্কস বললেন—দুনিয়াকে শুধু ব্যাখ্যা করে কী হবে?মানুষ যদি বদল না আনে, মুক্তি তবে কোথা রবে?চিন্তা হোক কর্মের সাথী, জ্ঞান হোক সংগ্রামের হাত,অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠুক মানুষেরই প্রতিবাদ।এঙ্গেলস এলেন পাশে—দুই হৃদয়ে একই গান,শ্রমিকেরই মুক্তির তরে জীবনভর অভিযান।ম্যানচেস্টারের বস্তিতে দেখলেন শ্রমিকের ক্ষত,সেই বেদনা লিখে দিলেন ইতিহাসেরই পত্র।কারখানার যন্ত্রের পাশে ক্ষুধার্ত শিশুর মুখ,শ্রমিকজীবন দেখিয়ে দিল সভ্যতারই অসুখ।‘শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ হয়ে উঠল জ্বলন্ত দলিল,পুঁজির মুখোশ খুলে দিল নির্মম সত্যের কিল।মার্কস-এঙ্গেলস বলেছিলেন—স্বপ্ন দিয়ে হবে না,শোষণের এই শিকল ভাঙা সংগঠন ছাড়া হবে না।নিজের মুক্তি নিজেকেই যে সংগ্রাম করে নিতে হয়,শ্রমিক যখন ঐক্য গড়ে, ইতিহাস তখন বদলায়।‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ উঠল ঝড়ের মতো কণ্ঠে,শ্রমিকের ঐক্যের ডাক ছড়িয়ে গেল পৃথিবীর প্রান্তে।“দুনিয়ার মজদুর এক হও”—জাগল নতুন গান,সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে গেল মুক্তির আহ্বান।লন্ডনের ঘরে মার্কস তখন রাত জেগে লেখেন,ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নির্বাসন—সবকিছুকে পেছনে রাখেন।পাতার পরে পাতা জুড়ে পুঁজির রহস্য খোলেন,মানুষেরই মুক্তির স্বপ্ন ভবিষ্যতের বুকে তোলেন।এক খণ্ড তাঁর জীবদ্দশায় পেল পৃথিবীর আলো,বাকি খণ্ড এঙ্গেলস দিলেন—বন্ধুত্ব যার ভালো।মৃত বন্ধুর অসমাপ্ত কাজ কাঁধে নিলেন শেষে,দুই মহীরুহ পাশাপাশি আজও দাঁড়িয়ে দেশে-দেশে।কত যুগ গেল, কত রাজ্য ভাঙল, বদলাল কত মানচিত্র,তবু কেন ‘পুঁজি’ আজও হয়ে থাকে অমর চিত্র?কারণ পুঁজির চরিত্র কি বদলেছে সত্যিই আজ?শ্রমিকের ঘামে মুনাফা—এখনও কি শেষ সেই সাজ?লগ্নিপুঁজির দাপট বাড়ে, কারখানা যায় বন্ধ,একদিকে সম্পদের পাহাড়, অন্যদিকে ক্ষুধা অশেষ দ্বন্দ্ব।বাজার জুড়ে পণ্যের মেলা, মানুষ থাকে ঋণে,সমৃদ্ধির বিজ্ঞাপন ঝোলে বেকার তরুণের চীনে।ডিজিটাল এই বিশ্বজুড়েও বদলায়নি মূল খেলা,নতুন যন্ত্র, নতুন বাজার—পুরোনো শোষণমেলা।শ্রমের রূপটি বদলে গেছে, বদলায়নি তার দাম,মুনাফার কাছে মানুষেরই কত সহজে অবসান!বিশ্ববাজারের যে স্বপ্ন একদিন করেছিলেন পাঠ,আজ সে বাজার পৃথিবীজুড়ে করেছে আপন ঘাট।দেশের সীমানা পেরিয়ে পুঁজি ছুটে যায় বহুদূর,তবু শ্রমিকের ভাগ্যে কেন অনিশ্চয়তার সুর?মার্কস তাই কেবল অতীত নন—বর্তমানেরও প্রশ্ন,‘পুঁজি’ তাই শুধু বই নয়—সময়ের কাছে অস্ত্র।যেখানে শোষণ, সেখানেই তার বিশ্লেষণের দর্পণ,যেখানে বৈষম্য, সেখানেই জাগে নতুন তর্কণ।তাঁর দর্শন মানে শুধু মুখস্থ করা কিছু বাণী নয়,বাস্তবতার গভীর পাঠে সত্যকে চিনে নেওয়া হয়।জ্ঞান যদি না জাগায় মানুষ, তবে সে জ্ঞান অন্ধ,চিন্তা যদি কর্মে না নামে, তবে সে কেবল ছন্দ।তাই পাঠচক্র হোক আবার, খুলুক জ্ঞানের দ্বার,মার্কস-এঙ্গেলসের চিন্তা হোক প্রশ্নেরই হাতিয়ার।তর্ক হোক, বিতর্ক হোক, মুক্ত হোক মন,ইতিহাসের পাঠে জাগুক নতুন প্রজন্মের পণ।গণতন্ত্রের অসমাপ্ত পথ, মানুষের অধিকার,শ্রমের মর্যাদা, সমতার স্বপ্ন—হোক আমাদের অঙ্গীকার।বুর্জোয়া ব্যবস্থার সীমা পেরিয়ে কোন পথে যাবে কাল,সেই প্রশ্নেই জেগে থাকুক বিবেক, যুক্তি, জিজ্ঞাসা নিরন্তরকাল।‘পুঁজি’র পাতায় তাই আজও শুনি শ্রমিকের ডাক,অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ হোক সংগঠিত, হোক ঐক্যবদ্ধ পাক।শোষণ যদি থাকে পৃথিবীতে, প্রশ্নও থাকবে জাগ্রত,মানুষ যতদিন মুক্তি চায়—মার্কস ততদিন প্রাসঙ্গিক।একশত ঊনষাট বছর শেষে আবার উঠুক সেই আওয়াজ—মানুষ হবে মানুষের তরে, শ্রম পাবে ন্যায্য সাজ।পুঁজি নয়, মানুষের জীবন হোক পৃথিবীর মূল,শ্রমের ঘামে ফুটুক তবে সাম্যের অনন্ত ফুল।অন্ধকার যত ঘন হোক, জ্বলুক জ্ঞানের বাতি,মার্কসের পাঠে মানুষ খুঁজুক মুক্তির নতুন গতি।ইতিহাস থেমে থাকে না—চলবে পরিবর্তনের রথ,শ্রমজীবী মানুষের হাতে খুলুক আগামী দিনের পথ।—(দাস ক্যাপিটাল, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)প্রকাশের ১৫৯ বছর পূর্ণ হলেও দাস ক্যাপিটাল এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ পুঁজিবাদ সংকট থেকে মুক্ত হতে পারেনি, বরং সংকট ঘনীভূ হয়েছে। তাই পুঁজিবাদের গভীর সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে স্বয়ং ভ্যাটিকান সিটির পোপকে দাস ক্যাপিটালের আশ্রয় নিতে হয়। হ্যাঁ এখানেই মার্কসবাদ ও তাঁর দাস ক্যাপিটালের প্রাসঙ্গিকতা। এবছর মার্কসের দ্বিশত আটতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠিত হচ্ছে ও হবে কমিউনিস্ট ইশতেহার বিষয়ক পাঠচক্র। চর্চা চলুক, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বর্তমান স্তর অতিক্রম করে পরবর্তী স্তরে উন্নীত হবার বিরামহীন সংগ্রামের সাথে সাথে জ্ঞানের পরিধিও বিস্তৃত হউক।সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

কার্ল মার্কস কর্তৃক রচিত গ্রন্থ ‘ডাস ক্যাপিটাল’ প্রকাশের ১৫৯ বছর

সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান, কিন্তু লেখক সম্মানী কী একটি ঐচ্ছিক বিষয়

লেখক পান কী? কলমের দাম কোথায়? লেখক সম্মানী কি বিলাসিতা, নাকি সৃজনশীল শ্রমের ন্যায্য মূল্য?একটি পত্রিকার সাহিত্যপাতা প্রকাশের দিন পাঠকের চোখে প্রথমে যে বিষয়টি ধরা পড়ে, তা হলো লেখার শিরোনাম, লেখকের নাম এবং পত্রিকার পরিচিতি। কিন্তু এই কয়েকটি শব্দের আড়ালে যে দীর্ঘ শ্রম, চিন্তা, পাঠ, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার সমন্বয় থাকে, তার আর্থিক মূল্য নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের জগতে লেখকের সম্মানী এখনো যেন একটি ঐচ্ছিক বিষয়। কোথাও সম্মানী দেওয়া হয়, কোথাও সামান্য; আবার বহু ক্ষেত্রেই লেখককে জানিয়ে দেওয়া হয়—‘আপনার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এটিই তো বড় সম্মান।’কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকাশিত হওয়াই কি লেখকের শ্রমের একমাত্র মূল্য?একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লেখা সংগ্রহ করেন, বাছাই করেন, সম্পাদনা করেন, লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, পৃষ্ঠা পরিকল্পনা করেন, বিভাগ পরিচালনা করেন। এসব কাজের বিনিময়ে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক পান—এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর শ্রমকে প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দেয়।তাহলে যে লেখক তাঁর সময়, মেধা, অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও সৃষ্টিশীল শ্রম দিয়ে সেই সাহিত্যপাতার মূল উপাদান তৈরি করেন, তাঁর প্রাপ্য কী?এই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ও প্রকাশনা-চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।লেখার মূল্য নেই, নাকি লেখকের শ্রমের মূল্য নেই? প্রকাশিত হওয়াই কি লেখকের সম্মানী?বাংলাদেশে এখনো এমন একটি ধারণা প্রচলিত—কোনো জাতীয় দৈনিক বা প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হওয়াই লেখকের জন্য যথেষ্ট সম্মান। লেখক তাঁর লেখা প্রকাশিত দেখে আনন্দিত হবেন, নিজের নাম ছাপা দেখে গর্বিত হবেন, আর্থিক পারিশ্রমিকের কথা তুলবেন না—এমন একটি অলিখিত প্রত্যাশা যেন অনেক জায়গায় কাজ করে।কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা আছে।একজন লেখক একটি নিবন্ধ লিখতে হয়তো কয়েক ঘণ্টা সময় দেন। কোনো কোনো লেখা তৈরির পেছনে লাগে কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, কখনো মাসের পর মাস। তথ্য সংগ্রহ, বই পড়া, সাক্ষাৎকার নেওয়া, নথি যাচাই, বিষয় নিয়ে চিন্তা করা, খসড়া তৈরি, পুনর্লিখন, ভাষা সম্পাদনা—সব মিলিয়ে একটি ভালো লেখা তৈরি করা মোটেই বিনা শ্রমের কাজ নয়।একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদনের জন্য যদি প্রতিষ্ঠান পারিশ্রমিক দেয়, একজন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রীর ছবির জন্য যদি অর্থ দেওয়া হয়, একজন ডিজাইনারের নকশার মূল্য নির্ধারিত হয়, একজন অনুবাদকের অনুবাদকে পারিশ্রমিকযোগ্য কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে একজন লেখকের সৃষ্টিশীল শ্রমকে কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনামূল্যের শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হবে?সৃষ্টিশীল শ্রমেরও মূল্য আছে। শুধু শ্রমটি শারীরিক নয় বলে তার মূল্য শূন্য হতে পারে না।একটি লেখা তৈরি হয় কীভাবে?আমরা যখন পত্রিকার পাতায় একটি লেখা পড়ি, তখন সাধারণত শুধু কয়েক হাজার শব্দ দেখি। কিন্তু লেখক সেই শব্দগুলোর পেছনে নিজের সময়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করেছেন।একজন লেখকের পুঁজি তাঁর কলম, কিন্তু কলমের পেছনে রয়েছে তাঁর জীবনভর অর্জিত জ্ঞান।একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে লেখক হয়তো অসংখ্য বই পড়েছেন। বহু পুরোনো তথ্য খুঁজে বের করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তথ্যের মিল খুঁজেছেন। এরপর সেই সবকিছুকে একটি সুসংহত ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।একজন কথাসাহিত্যিক একটি গল্প লিখতে গিয়ে যে কল্পনার জগৎ নির্মাণ করেন, সেটিও হঠাৎ করে তৈরি হয় না। তাঁর পাঠ, জীবনবোধ, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সৃজনশীল অনুশীলন সেই গল্পের ভিত তৈরি করে।একজন কবির কয়েকটি পঙ্‌ক্তির পেছনেও থাকতে পারে দীর্ঘ সাধনা।পাঠক হয়তো একটি কবিতা পড়তে পাঁচ মিনিট সময় দেন। কিন্তু কবিতাটি লিখতে কবির পাঁচ মাসও লেগে থাকতে পারে।তাই কোনো লেখার শব্দসংখ্যা দিয়ে তার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো—চূড়ান্ত ফলাফলটি ছোট হতে পারে, কিন্তু তার পেছনের প্রস্তুতি দীর্ঘ হতে পারে।পত্রিকা কি শুধু কাগজ বিক্রি করে?সংবাদপত্রের অর্থনীতি বদলে গেছে। মুদ্রিত পত্রিকার পাশাপাশি এখন অনলাইন সংস্করণ, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে সংবাদ ও কনটেন্টের একটি বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।পাঠক সংবাদপত্র কেনেন মূলত তথ্য, বিশ্লেষণ, মতামত ও বিনোদনের জন্য। আর এসব কনটেন্টের বড় অংশ তৈরি করেন লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক, অনুবাদক, আলোকচিত্রী ও অন্যান্য সৃজনশীল মানুষ।অর্থাৎ কনটেন্টই সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান সম্পদ।তাহলে সেই কনটেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের শ্রমকে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ ধরে নেওয়ার সংস্কৃতি কতটা যৌক্তিক?অবশ্যই সব লেখার জন্য একই হারে সম্মানী দেওয়া সম্ভব নয়। ছোট পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, সাংস্কৃতিক সংগঠন বা সীমিত বাজেটের প্রকাশনার বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক সম্পাদক ব্যক্তিগত উদ্যোগে পত্রিকা প্রকাশ করেন, নিজের পকেট থেকে খরচ চালান। তাঁদের সীমাবদ্ধতাও বাস্তব।কিন্তু সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অবস্থান এক বিষয় নয়।কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই সম্মানী দিতে না পারে, তাহলে লেখকের সঙ্গে সেটি স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে। লেখক তখন নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু ‘প্রকাশিত হওয়াই সম্মানী’—এই ধারণাকে একটি সার্বজনীন নীতি বানানো সমস্যাজনক।সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান—এ প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান—এটি কোনো অন্যায় নয়। বরং তিনি যদি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর যথাযথ পারিশ্রমিক পাওয়া সম্পূর্ণ ন্যায্য।প্রশ্নটি হলো, একটি সাহিত্যপাতা পরিচালনার জন্য যদি প্রতিষ্ঠানের বাজেট থাকে, তাহলে সেই পাতার মৌলিক উপাদান—লেখা—তৈরির জন্য লেখকের জন্য কোনো বাজেট থাকবে না কেন?একজন সম্পাদক লেখা সম্পাদনা করেন, কিন্তু লেখাটি তো আগে কাউকে লিখতে হয়।সম্পাদক প্রয়োজনীয়। লেখকও প্রয়োজনীয়।একজন পৃষ্ঠা সাজান, অন্যজন পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু তৈরি করেন। একজন প্রকাশনার কাঠামো পরিচালনা করেন, অন্যজন সেই কাঠামোর প্রাণ জোগান।তাহলে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে এত বৈষম্য কেন?এখানে বিষয়টি ‘সম্পাদক বনাম লেখক’ নয়। বরং প্রতিষ্ঠান এবং সৃজনশীল শ্রমের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন।যে শ্রম প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ, তার মূল্য স্বীকার করা উচিত।‘নাম ছাপা হয়েছে’—এই যুক্তির সমস্যা কোথায়?লেখকদের প্রায়ই বলা হয়, ‘আপনার লেখা তো জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে আপনার পরিচিতি বাড়বে। এটাই আপনার লাভ।’পরিচিতি অবশ্যই একটি মূল্যবান বিষয়। একজন লেখকের জন্য পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলে লেখকের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতি বাড়তে পারে।কিন্তু পরিচিতি এবং পারিশ্রমিক একে অপরের বিকল্প নয়।একজন কর্মীকে যদি বলা হয়, ‘আপনার কাজের বিনিময়ে টাকা দিতে পারব না, তবে আপনার নাম অফিসের ওয়েবসাইটে থাকবে’—তাহলে বিষয়টি কেমন শোনাবে?একজন আলোকচিত্রীকে যদি বলা হয়, ‘আপনার ছবি আমরা প্রকাশ করব, আপনার নামও দেব, তাই টাকা লাগবে না’—এটি কি স্বাভাবিক বলে মনে হবে?একজন অনুবাদককে যদি বলা হয়, ‘আপনার অনুবাদ বইয়ে ছাপা হবে—এটাই আপনার সম্মান’—তাহলে কি তাঁর শ্রমের মূল্য পরিশোধ করা হয়ে যায়?তাহলে লেখকের ক্ষেত্রে এই যুক্তি এত সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় কেন?লেখকের পরিচিতি তাঁর অধিকার হতে পারে, কিন্তু তাঁর শ্রমের মূল্য নয়।সম্মানী শব্দটির গুরুত্ব‘পারিশ্রমিক’ শব্দটির পাশাপাশি সাহিত্যে ‘সম্মানী’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়। শব্দটি সুন্দর। এর মধ্যে সম্মানের একটি অনুভূতি আছে।কিন্তু সম্মানীকে শুধু সৌজন্য হিসেবে দেখলে চলবে না।সম্মানী আসলে লেখককে একটি বার্তা দেয়—‘আপনার শ্রমের মূল্য আছে।’অর্থের পরিমাণ সব সময় বড় হতে হবে, এমন নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিক যে পরিমাণ দিতে পারে, একটি ছোট সাহিত্যপত্র হয়তো তা পারবে না। কিন্তু নিয়মিত ও স্বচ্ছ একটি সম্মানী নীতি থাকলে লেখক বুঝতে পারেন, তাঁর কাজকে প্রতিষ্ঠান মূল্য দেয়।অনেক সময় অল্প পরিমাণ সম্মানীও লেখকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সেটি অর্থের অঙ্কের চেয়েও বড় একটি স্বীকৃতি বহন করে।একটি খাম, একটি ব্যাংক ট্রান্সফার কিংবা একটি সম্মানী বার্তা লেখককে জানিয়ে দেয়—তাঁর কলমকে বিনামূল্যের শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।লেখালেখি কি পেশা হতে পারে না?বাংলাদেশে লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন—এ কথা সত্য। অধিকাংশ লেখকেরই লেখালেখির বাইরে অন্য পেশা রয়েছে।কিন্তু এই বাস্তবতা তৈরি হয়েছে আংশিকভাবে আমাদের প্রকাশনা-সংস্কৃতির কারণেও।যেখানে লেখকের লেখা নিয়মিত বিনা পারিশ্রমিকে প্রকাশিত হয়, সেখানে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সংকুচিত হয়।অন্যদিকে, যদি পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ওয়েবসাইট ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে লেখার জন্য সম্মানী দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তাহলে লেখকের সৃজনশীল শ্রমও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করবে।এর ফলে তরুণ লেখকরাও উৎসাহিত হবেন।আজ একজন তরুণ লেখক যদি তাঁর একটি ভালো নিবন্ধ লিখে কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকা সম্মানী পান, সেটি হয়তো তাঁকে পরবর্তী লেখা লিখতে অনুপ্রাণিত করবে। কয়েক বছর পর সেই লেখক আরও ভালো লিখবেন, আরও বেশি পাঠক তৈরি করবেন, আর প্রকাশনাও লাভবান হবে।অর্থাৎ লেখককে সম্মানী দেওয়া শুধু লেখকের জন্য নয়; এটি প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যতের জন্যও বিনিয়োগ।‘লেখক তো শখে লেখেন’—এই ধারণা বদলাতে হবেলেখককে বিনা পারিশ্রমিকে লেখানোর পেছনে আরেকটি প্রচলিত যুক্তি হলো—‘লেখকরা তো শখে লেখেন।’অনেক লেখক সত্যিই ভালোবাসা থেকে লেখেন। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে আবেগ, আনন্দ এবং আত্মতৃপ্তি জড়িয়ে থাকে।কিন্তু কোনো কাজ ভালোবাসা থেকে করা হয় বলেই তার শ্রমমূল্য থাকবে না—এমন যুক্তি পৃথিবীর অন্য কোনো পেশায় আমরা গ্রহণ করি না।একজন সংগীতশিল্পী গান ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর পারিশ্রমিক থাকবে না?একজন আলোকচিত্রী ছবি তুলতে ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর কাজ বিনামূল্যে নেওয়া হবে?একজন শিক্ষক পড়াতে ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর বেতন থাকবে না?তাহলে লেখককে কেন বলা হবে—‘আপনি তো লিখতে ভালোবাসেন’?ভালোবাসা শ্রমের মূল্য বাতিল করে না।বরং একজন লেখক ভালোবাসা থেকেই লিখছেন বলেই তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমের প্রতি আরও বেশি সম্মান থাকা উচিত।সম্মানীর অভাবে কী হয়?লেখকের সম্মানী না দেওয়ার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু লেখকের পকেটে হয় না; ক্ষতি হয় পুরো সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে।যে লেখক দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে লিখতে বাধ্য হন, একসময় তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা লেখালেখিকে পেশা বা আংশিক পেশা হিসেবে নিতে চান, তাঁদের জন্য এটি বড় প্রতিবন্ধকতা।এর ফলে ভালো লেখক অন্যত্র চলে যেতে পারেন। অনেকে নিয়মিত লেখা বন্ধ করে দিতে পারেন। কেউ কেউ কেবল এমন প্ল্যাটফর্মে লিখবেন যেখানে অন্তত কিছু পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল মানুষ লেখালেখিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় দিতে পারেন; কিন্তু মেধাবী অথচ আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণ লেখকের জন্য এই ক্ষেত্রটি কঠিন হয়ে পড়ে।ফলে সৃজনশীল জগতে বৈচিত্র্যও কমে যেতে পারে।লেখক সম্মানী তাই শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; এটি সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও।জাতীয় পত্রিকার দায়িত্বজাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্রের ভূমিকা শুধু সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা সমাজের রুচি গঠন করে, মতামতের ক্ষেত্র তৈরি করে, নতুন লেখককে পাঠকের সামনে তুলে ধরে এবং সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে ভূমিকা রাখে।তাই তাদের কাছ থেকে একটি ন্যূনতম পেশাদার নীতি প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক নয়।প্রতিটি পত্রিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা আছে। কিন্তু তারা চাইলে একটি স্বচ্ছ সম্মানী কাঠামো তৈরি করতে পারে।যেমন—- নিবন্ধের জন্য নির্দিষ্ট সম্মানী;- গল্প ও কবিতার জন্য আলাদা সম্মানী কাঠামো;- অনুবাদের জন্য আলাদা হার;- বিশেষ সংখ্যা বা দীর্ঘ গবেষণাধর্মী লেখার জন্য অতিরিক্ত সম্মানী;- অনলাইন ও মুদ্রিত সংস্করণের ব্যবহারের নীতিমালা;- লেখকের অনুমতি ছাড়া পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতি;- সম্মানী প্রদানের সময়সীমা ও পদ্ধতি নির্ধারণ।এসব ব্যবস্থা রাতারাতি সব প্রতিষ্ঠানে চালু করা সম্ভব নয়। কিন্তু আলোচনা শুরু করা সম্ভব।আর আলোচনা শুরু করার জন্যই প্রশ্নটি তুলতে হবে।লেখকেরও কিছু দায়িত্ব আছেলেখকের অধিকার নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি লেখকের দায়িত্বের কথাও বলা দরকার।একজন লেখককে অবশ্যই মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য লেখা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তথ্যভুল, চৌর্যবৃত্তি, অনুমতিহীন অনুবাদ, অন্যের লেখা নিজের নামে প্রকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো উৎস থেকে নেওয়া বিষয় গোপন করা—এসবের বিরুদ্ধে লেখককেও নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।সম্মানী দাবি করার অর্থ এই নয় যে লেখক তাঁর দায় থেকে মুক্ত। বরং সম্পর্কটি হওয়া উচিত পারস্পরিক।পত্রিকা লেখকের শ্রমকে সম্মান করবে; লেখকও পত্রিকার পেশাদার মান, সময়সীমা ও সম্পাদকীয় নীতি সম্মান করবেন।এই পারস্পরিক সম্মানই একটি সুস্থ প্রকাশনা সংস্কৃতির ভিত্তি।সম্মানী নির্ধারণে স্বচ্ছতা দরকারঅনেক সময় লেখক জানেনই না তাঁর লেখা প্রকাশের জন্য কোনো সম্মানী আছে কি না। প্রকাশের পরও তাঁকে আলাদা করে জানতে হয়। কোথাও সম্মানী আছে, কিন্তু কত—তা পরিষ্কার নয়। কোথাও কয়েক মাস পর অর্থ দেওয়া হয়। কোথাও লেখককে বারবার যোগাযোগ করতে হয়।এ ধরনের অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি।একটি পত্রিকা তার ওয়েবসাইট বা লেখক নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে জানাতে পারে—কোন ধরনের লেখার জন্য তারা সম্মানী দেয় এবং কীভাবে দেয়।এতে লেখকও তাঁর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। স্বচ্ছতা পেশাদারিত্বের অন্যতম শর্ত। সম্মানী কত হবে—সেটিই কি মূল প্রশ্ন?এখানে কেউ বলতে পারেন, ‘সম্মানী দেব, কিন্তু কত দেব?’এই প্রশ্নের সহজ কোনো একক উত্তর নেই।পত্রিকার আকার, প্রচারসংখ্যা, বিজ্ঞাপন আয়, ডিজিটাল আয়, লেখার ধরন, দৈর্ঘ্য, গবেষণার মাত্রা—বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।তবে ‘কত’ প্রশ্নটির আগে আসা উচিত ‘দেব কি না’ প্রশ্নটি।কারণ সম্মানীর পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষি হতে পারে; কিন্তু লেখকের শ্রমের মূল্য স্বীকার করা হবে কি না—এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন।আজ হয়তো সম্মানী কম। আগামী দিনে তা বাড়তে পারে। কিন্তু যদি শুরুতেই বলা হয়—‘লেখার কোনো মূল্য নেই’, তাহলে উন্নতির পথটিই বন্ধ হয়ে যায়।পাঠকেরও ভূমিকা আছেআমরা পাঠকরাও এই ব্যবস্থার অংশ। আমরা যখন একটি পত্রিকা কিনি, ওয়েবসাইটে যাই, বিজ্ঞাপন দেখি, সাবস্ক্রিপশন করি কিংবা কোনো লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করি, তখন আমরা সেই কনটেন্টের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হই।তাই পাঠকেরও প্রশ্ন করা উচিত—যে লেখাটি আমি পড়ছি, তার লেখক কি তাঁর শ্রমের মূল্য পেয়েছেন?শুধু লেখকের নাম দেখে প্রশংসা করা যথেষ্ট নয়। একটি সুস্থ সাহিত্য ও প্রকাশনা সংস্কৃতির জন্য লেখকের শ্রমের সামাজিক মূল্যও স্বীকার করতে হবে।‘কলমের দাম’ বলতে কী বোঝায়?কলমের দাম বলতে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বোঝানো হচ্ছে না।কলমের দাম মানে হলো—লেখকের সময়ের দাম আছে। তাঁর চিন্তার দাম আছে। তাঁর গবেষণার দাম আছে। তাঁর অভিজ্ঞতার দাম আছে। তাঁর কল্পনার দাম আছে। তাঁর ভাষা নির্মাণের শ্রমের দাম আছে।এবং সর্বোপরি, তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি সমাজের দায় আছে।একজন লেখক যখন একটি লেখা প্রকাশের জন্য পত্রিকার কাছে পাঠান, তখন তিনি শুধু কয়েকটি শব্দ পাঠান না। তিনি তাঁর চিন্তার একটি অংশ পাঠকের হাতে তুলে দেন।সেই চিন্তা যদি পত্রিকার পাঠকসংখ্যা বাড়ায়, ওয়েবসাইটের ভিজিট বাড়ায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করে, পত্রিকার সাহিত্যপাতাকে সমৃদ্ধ করে—তাহলে সেই সৃষ্টিশীল শ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না কেন?লেখককে দয়া নয়, অধিকার দিতে হবেলেখক সম্মানীর দাবি কোনো দয়ার আবেদন নয়।এটি করুণার বিষয়ও নয়।এটি লেখকের অধিকার নিয়ে আলোচনার বিষয়।অবশ্যই প্রত্যেক লেখার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। সাহিত্য ও শিল্পের মূল্যকে পুরোপুরি টাকায় মাপাও সম্ভব নয়। একটি কবিতা হয়তো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, একটি গল্প হয়তো একটি প্রজন্মকে ভাবতে শেখাতে পারে, একটি প্রবন্ধ হয়তো সমাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনতে পারে।এসবের মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।কিন্তু অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না বলেই অর্থনৈতিক মূল্য শূন্য হবে—এই যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়।একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি লেখা কনটেন্ট; একজন লেখকের জন্য সেটি শ্রম।এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে স্বীকার করেই একটি ন্যায্য সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।একটি সম্মানী-সংস্কৃতি গড়ে উঠুকবাংলাদেশে লেখক সম্মানী নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। সাহিত্য সংগঠন, লেখকসমাজ, সম্পাদক, প্রকাশক, সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এবং পাঠকদের এই বিষয়ে কথা বলতে হবে।প্রতিটি পত্রিকা হয়তো একই হারে সম্মানী দিতে পারবে না। কিন্তু অন্তত একটি নীতিগত অবস্থান নেওয়া সম্ভব—লেখা বিনামূল্যের কনটেন্ট নয়।যে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করে, তার বাজেটে লেখকের জন্যও একটি নির্দিষ্ট অংশ থাকা উচিত।হয়তো আজ সেই অর্থ খুব বেশি নয়। কিন্তু নিয়মিত সম্মানী দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে ধীরে ধীরে লেখকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানও বদলাবে।তরুণ লেখক বুঝবেন, তাঁর লেখার মূল্য আছে।প্রবীণ লেখক বুঝবেন, তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনের শ্রমকে প্রতিষ্ঠান সম্মান করছে।আর পাঠক বুঝবেন, একটি লেখা পত্রিকার পাতায় পৌঁছানোর পেছনে একজন মানুষের শ্রম রয়েছে।শেষ কথাএকটি পত্রিকার সাহিত্যপাতা শুধু কাগজের কিছু পৃষ্ঠা নয়। সেখানে একটি সমাজের চিন্তা, স্বপ্ন, বিতর্ক, কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন প্রতিফলিত হয়।সেই পাতার সম্পাদক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, লেখকও তেমন গুরুত্বপূর্ণ।সম্পাদককে বেতন দেওয়া হলে তাঁর শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লেখককে সম্মানী দেওয়া হলে তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।এখানে কাউকে ছোট বা বড় করার প্রশ্ন নেই।প্রশ্ন হলো—শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন হবে কি না।আমরা যদি সত্যিই সাহিত্যকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলে মনে করি, তাহলে সাহিত্য সৃষ্টিকারী মানুষটির শ্রমকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করতে হবে।কারণ একজন লেখক শুধু শব্দ লেখেন না; তিনি তাঁর সময় দেন, মেধা দেন, জীবন থেকে অভিজ্ঞতা দেন, চিন্তা দেন। সেই চিন্তা যখন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজারো পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন লেখকের শ্রমকে ‘প্রকাশিত হয়েছে—এটাই সম্মান’ বলে শেষ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়।লেখকের নাম ছাপা অবশ্যই সম্মানের।কিন্তু নাম ছাপার সঙ্গে তাঁর শ্রমের মূল্যও স্বীকার করা হোক।সাহিত্য সম্পাদক তাঁর কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাবেন—এটাই স্বাভাবিক।লেখকও তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমের জন্য সম্মানী পাবেন—এটিও যেন একদিন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।"কলমেরও দাম আছে"কলম শুধু কলম নয়, তার ভেতরে প্রাণ,জীবনভরা সাধনা আর স্বপ্নেরই গান।একটি লেখা জন্ম নিতে কত রাত যে যায়,কত দিনের সঞ্চিত কথা শব্দ হয়ে গায়।কাগজ জুড়ে নামটি থাকে, থাকে কয়েক লাইন,কেউ কি দেখে শব্দগুলোর পেছনে কত ঋণ?কত বইয়ের পাতায় খোঁজা, কত তথ্যভার,কত রাতের নির্ঘুম চোখ, কত ভাবনার পার।কবির একটি পঙ্‌ক্তিতে কত যুগের সাধ,গল্পকারের গল্পে থাকে মানুষেরই স্বাদ।প্রবন্ধকার তথ্য কুড়িয়ে গড়েন যুক্তিজাল,শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন সত্যেরই মশাল।সম্পাদকও শ্রম দেন, তাঁর প্রাপ্য বেতন,সযত্ন হাতে সাজান তিনি সাহিত্যেরই ক্ষণ।পাতা বাছেন, লেখা কাটেন, গড়েন নতুন রূপ,তাঁর শ্রমের স্বীকৃতিতে কেন থাকবে ক্ষোভ?তবু যে জন লেখে আগে, প্রাণের কথা ঢালে,তারই শ্রমের মূল্য কেন হারায় কাগজ-জালে?সম্পাদক যদি পান তাঁর শ্রমের বিনিময়,লেখকেরই শ্রমের বেলায় কেন অন্য নিয়ম হয়?‘নাম ছাপানোই সম্মান’—শুনতে ভালো কথা,তবু তাতে মেটে কি আর শ্রমিক মনের ব্যথা?নামটি থাকে, খ্যাতি আসে, পাঠক চেনে মুখ,তাই বলে কি শ্রমের দামটি হয়ে যাবে অসুখ?শিল্পী যদি গান গেয়ে পান তাঁর প্রাপ্য মূল্য,চিত্রকরও ছবির বিনিময়ে পান সম্মান-মূল্য;অনুবাদক শব্দ বুনে পান যদি সম্মান,লেখকেরই কলম কেন থাকবে বিনামূল্যে দান?‘শখে লেখেন’—এই কথাটি বড় সহজ ছল,ভালোবাসা থাকলেই কি শ্রমের মূল্য শূন্য বল?শিক্ষক যদি ভালোবেসে জ্ঞান বিলান নিরন্তর,তাঁর কি তবে বেতন নেবে না কোনো প্রতিষ্ঠান?ভালোবাসা শ্রমের শত্রু—এ কথা সত্য নয়,ভালোবাসার কাজেও তো শ্রমের মূল্য রয়।যে হৃদয় দিয়ে সৃষ্টি করে নতুন কোনো ভুবন,তারও তো আছে অধিকার, তারও আছে স্বপন।সম্মানী শুধু টাকার অঙ্ক—এমন নয় তো মোটে,এটি বলে—‘তোমার শ্রমের মূল্য আছে বটে।’অল্প হলেও স্বীকৃতিটুকু শক্তি জোগায় প্রাণে,আরও ভালো লেখার তাগিদ জাগে লেখক-মনে।যে পত্রিকা কনটেন্ট দিয়ে পাঠক ধরে রাখে,লেখকেরই সৃষ্টিশ্রম সে কিসের তরে ঢাকে?সংবাদ, মত, গল্প, কবিতা—সবই তো সম্পদ,সেই সম্পদের স্রষ্টার কেন থাকবে না মজুর?সব পত্রিকার সামর্থ্য সমান—এ কথা সত্য নয়,ছোট কাগজের সীমাবদ্ধতা অস্বীকারও নয়।তবু যদি দিতে না পারে, বলুক স্পষ্ট ভাষায়,লেখক তখন সিদ্ধান্ত নেবেন নিজের অধিকার চায়।কিন্তু ‘লেখা বিনামূল্যে’—এ যেন নীতি না হয়,সৃষ্টিশ্রমের অবমূল্যায়ন সংস্কৃতিতে না রয়।আজকে যদি অল্প থাকে, কালকে বাড়ুক দাম,ন্যায্যতারই পথে গড়ে উঠুক নতুন নাম।লেখকেরও দায়িত্ব আছে—সত্য লিখুক তিনি,তথ্য যাচাই, মৌলিকতা—হোক তাঁর অঙ্গীকারখানি।চৌর্যবৃত্তি, মিথ্যা তথ্য দূরে থাকুক সব,শব্দ হোক বিবেকের কাছে সত্যেরই উৎসব।পত্রিকা দিক ন্যায্য মূল্য, লেখক রাখুক মান,দুজন মিলে গড়ে উঠুক সুস্থ প্রকাশন-জ্ঞান।শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলুক পথের রথ,সাহিত্যেরই ভবিষ্যতের এ হোক শুভ শপথ।তরুণ যে আজ কলম ধরে, স্বপ্ন চোখে রাখে,তারও যেন শ্রমের মূল্য পৌঁছে যায় তার হাতে।শুধু পরিচিতি নয় যে তার, শুধু নাম নয়,তার সৃষ্টিরও অর্থ আছে—এই সত্য যেন রয়।অর্থের কাছে সাহিত্য নয়, সাহিত্যও নয় পণ্য,তবু স্রষ্টার শ্রমকে বলা যায় না কি ‘অমূল্য’?অমূল্য তার মানবিকতা, অমূল্য তার বাণী,তবু শ্রমের স্বীকৃতিটুকু হোক তারই সম্মানী।একটি কবিতা পাঁচ মিনিটে পাঠকের মনে যায়,কবির পেছনে কত মাসের সাধনা লুকায়।কয়েকটি শব্দ—তবু তারই পেছনে জীবন,শব্দ ছোট, শ্রমটি কিন্তু নয় তো কোনো ক্ষণ।কলম মানে সময় দেওয়া, কলম মানে ধ্যান,কলম মানে রাত জাগা আর সত্যের সন্ধান।কলম মানে বুকের ভেতর জমে থাকা কথা,কলম মানে মানুষেরই আনন্দ এবং ব্যথা।তাই তো বলি—কলমেরও একটি মূল্য আছে,লেখকেরও শ্রমের অধিকার পৃথিবীরই কাছে।নাম ছাপানোর আনন্দ থাক, থাকুক তারই মান,তার পাশাপাশি লেখক পাক প্রাপ্য সম্মানী-দান।সাহিত্য যদি সমাজ গড়ে, চিন্তার দুয়ার খোলে,লেখকেরই শব্দ তবে আলো জ্বালায় বলে।সম্পাদক তাঁর শ্রমের দাম নেবেন—এ স্বাভাবিক,লেখকও তাঁর শ্রমের মূল্য পাবেন—হোক ন্যায্য অধিক।কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়—শ্রমই আসল কথা,সৃষ্টির প্রতি সম্মান হোক আমাদের প্রথা।সাহিত্যেরই পাতায় যেন এই সত্যটি রয়—লেখক শুধু নাম নন, তাঁর কলমও শ্রমময়।প্রকাশিত নাম সম্মানের—সত্য, এতে দ্বিধা নেই,কিন্তু শুধু নাম ছাপালেই ঋণ শোধ হয় কি সেই?সাহিত্য সম্পাদনার যেমন স্বীকৃতির মান,সাহিত্য সৃষ্টিরও তেমনি প্রাপ্য সম্মান।তাই আজকের প্রশ্ন থাকুক পাঠকেরই দ্বারে—যে কলমে আলো জ্বলে, তার মূল্য কে মারে?সাহিত্যের মূল্য যদি সত্যিই মানি আমরা,লেখকেরও শ্রমের মূল্য দিই—এই হোক অঙ্গীকার আমাদের।কলম থামুক ন্যায়ের ভাষায় নয়, জেগে থাকুক গান,সৃষ্টিশ্রমের মর্যাদা পাক মানুষের সম্মান।সাহিত্য বাঁচুক, লেখক বাঁচুক, বাঁচুক সৃজনপ্রাণ—কলমেরও দাম আছে—এ হোক সময়ের গান।—( কলমেরও দাম আছে, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল—সাহিত্যের মূল্য আছে। সাহিত্য সম্পাদনার মূল্য আছে।তাহলে সাহিত্য সৃষ্টির মূল্য থাকবে না কেন?কলমের দাম কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান, কিন্তু লেখক সম্মানী কী একটি ঐচ্ছিক বিষয়

অপতথ্যের অ্যালগরিদম ও জাতীয় নিরাপত্তা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত প্রতিরোধ

প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকীসারসংক্ষেপডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে যেমন গণতান্ত্রিক করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন ধরনের নিরাপত্তা-ঝুঁকি। Misinformation, Disinformation এবং Malinformation—এই তিন ধরনের তথ্য-বিকৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক বিস্তারব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংহতি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।জাতীয় নিরাপত্তার আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিগত নজরদারি বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির মধ্যে আস্থাভিত্তিক সহযোগিতা এবং দেশব্যাপী Media and Information Literacy বা গণমাধ্যম ও তথ্য-সাক্ষরতার একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি।UNESCO misinformation-কে অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য এবং disinformation-কে প্রতারণা বা প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য হিসেবে পৃথক করে। Malinformation হলো বাস্তব বা সত্য তথ্যকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। ১. ভূমিকা: নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছেএকসময় জাতীয় নিরাপত্তা বলতে মূলত সীমান্ত, সামরিক শক্তি, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বোঝানো হতো। কিন্তু ডিজিটাল যুগে নিরাপত্তার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে।আজ একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—তথ্য নিরাপত্তা, জনমত, সামাজিক আস্থা, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার সক্ষমতা এবং তথ্যের সত্যতা।একটি মিথ্যা তথ্য যদি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গোলা ছোড়া না হলেও তার সামাজিক প্রভাব হতে পারে ব্যাপক।এখানেই তথ্যযুদ্ধের গুরুত্ব।২. Misinformation, Disinformation ও Malinformation: পার্থক্য কোথায়?এই তিনটি ধারণাকে এক করে দেখা ভুল।Misinformationমিথ্যা বা ভুল তথ্য, যা একজন ব্যক্তি সত্য মনে করে অনিচ্ছাকৃতভাবে শেয়ার করেন।উদাহরণস্বরূপ, কেউ একটি পুরোনো ছবি নতুন ঘটনা মনে করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করলেন। তার উদ্দেশ্য ক্ষতি করা নয়, কিন্তু ফলাফল বিভ্রান্তিকর হতে পারে।Disinformationমিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা জেনে-বুঝে মানুষকে বিভ্রান্ত, প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি বা প্রচার করা হয়। Malinformationএখানে তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা নাও হতে পারে; বরং সত্য বা বাস্তব তথ্যকে এমনভাবে ব্যবহার, প্রকাশ বা প্রসঙ্গচ্যুত করা হয় যার উদ্দেশ্য ক্ষতি করা। UNESCO-র উপকরণেও বাস্তব তথ্যকে ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিষয়টি এ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অতএব—সব ভুল তথ্য ষড়যন্ত্র নয়; কিন্তু সব তথ্য নিরীহও নয়।এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাই প্রথম প্রতিরোধ।৩. অ্যালগরিদম কীভাবে ঝুঁকি বাড়ায়?সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত ব্যবহারকারীর আগ্রহ, আচরণ, engagement এবং পূর্ববর্তী interaction-এর ভিত্তিতে কনটেন্টের দৃশ্যমানতা বাড়ায়।ফলে একটি উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট যদি বেশি মানুষ দেখে, মন্তব্য করে বা শেয়ার করে, সেটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করে।এখানে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হতে পারে—ভুল তথ্য → আবেগ → শেয়ার → engagement → algorithmic amplification → আরও দর্শক → আরও শেয়ার।অর্থাৎ একটি ছোট ভুল তথ্য কখনো কখনো একটি বৃহৎ সামাজিক narrative-এ পরিণত হতে পারে।আর যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কনটেন্ট তৈরি করে, যার উদ্দেশ্য মানুষের ভয়, ক্ষোভ, অবিশ্বাস বা বিভাজন বাড়ানো, তাহলে অ্যালগরিদমিক পরিবেশ তার বিস্তারে সহায়ক হতে পারে।UNESCO উল্লেখ করেছে যে misinformation ও disinformation মোকাবিলায় Media and Information Literacy নাগরিকদের তথ্যকে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়নের সক্ষমতা তৈরি করে। ৪. কখন তথ্য-বিকৃতি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে ওঠে?প্রতিটি ভুল পোস্ট জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়।কিন্তু যখন তথ্য-বিকৃতি—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যাপক অবিশ্বাস তৈরি করে;জনগণকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভক্ত করে;সংকটের সময় আতঙ্ক বাড়ায়;সামরিক বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য বিকৃত করে;ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে সামাজিক সংঘাত উসকে দেয়;অথবা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় করে,তখন বিষয়টি জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন।সেনাবাহিনীকে নিয়ে তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন বা সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু মিথ্যা, বিকৃত বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা জাতীয় আস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।৫. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সিভিল সোসাইটির সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?জাতীয় নিরাপত্তা কেবল সামরিক বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়।সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং তরুণ প্রজন্মও জাতীয় স্থিতিশীলতার অংশীদার।তাই প্রয়োজন Civil-Military Trust, অর্থাৎ সামরিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক।এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত—সংবিধান → আইন → পেশাদারিত্ব → স্বচ্ছতা → আস্থা → সহযোগিতা।এখানে কোনো পক্ষের ওপর অন্য পক্ষের আধিপত্য নয়; বরং নিজ নিজ সাংবিধানিক ও সামাজিক ভূমিকা বজায় রেখে সহযোগিতা প্রয়োজন।৬. বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে “National Digital Resilience Hub”এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা, জ্ঞান, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সামাজিক নেতৃত্বের কেন্দ্র।বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে প্রতিটি ক্যাম্পাসে একটি—“Media, Information and National Resilience Lab”গড়ে তুলতে পারে।এর দায়িত্ব হতে পারে—১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য-বিকৃতির ধরণ নিয়ে গবেষণা;২. তরুণদের Media Literacy প্রশিক্ষণ;৩. Fact-checking সক্ষমতা তৈরি;৪. AI-generated misinformation ও deepfake নিয়ে গবেষণা;৫. জাতীয় সংকটে তথ্যপ্রবাহের আচরণ বিশ্লেষণ;৬. সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের সঙ্গে যৌথ গবেষণা;৭. নিরাপত্তা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইন ও প্রযুক্তি বিভাগের আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা।UNESCO ইতিমধ্যে Media and Information Literacy-কে তথ্য-পরিবেশে আস্থা ও ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠনকে এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত করছে। ৭. সেনাবাহিনী–বিশ্ববিদ্যালয়–সিভিল সোসাইটি: একটি “Three-Pillar Model”বাংলাদেশে একটি কার্যকর কাঠামো হতে পারে—Pillar 1 — Bangladesh Armyজাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে পেশাগত জ্ঞান এবং প্রয়োজনীয় জনসচেতনতা।Pillar 2 — Universitiesগবেষণা, তথ্য যাচাই, Media Literacy, প্রযুক্তি বিশ্লেষণ এবং তরুণ নেতৃত্ব।Pillar 3 — Civil Societyসামাজিক যোগাযোগ, জনসচেতনতা, মানবাধিকার, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যায়ের নাগরিক অংশগ্রহণ।এই তিনটি স্তম্ভ পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং পরস্পরের সহযোগী।৮. বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরনের সেমিনার ও প্রশিক্ষণ হতে পারে?প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে অন্তত একবার নয়, বরং নিয়মিতভাবে আয়োজন করা যেতে পারে—“Digital Security and Responsible Citizenship Week”এর অধীনে থাকতে পারে—Misinformation Identification Workshop;Fact-checking Training;Deepfake Detection Seminar;Cyber Ethics;National Security and Digital Media;Responsible Journalism;Social Media Psychology;AI and Information Integrity।বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেখানো উচিত—কীভাবে একটি ছবি যাচাই করতে হয়, ভিডিওর উৎস কীভাবে খুঁজতে হয়, তারিখ ও প্রেক্ষাপট কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে কী প্রশ্ন করতে হয়।UNESCO-র Media and Information Literacy curriculum-এ fact-checking এবং information disorder মোকাবিলার দক্ষতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৯. সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা কেমন হবে?এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো institutional neutrality।বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারযন্ত্র হওয়া নয়।আবার সেনাবাহিনীর কাজও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব বিস্তার করা নয়।বরং যৌথভাবে আয়োজন করা যেতে পারে—Open Academic Dialogueযেখানে আলোচনার বিষয় হবে—জাতীয় নিরাপত্তা;তথ্যযুদ্ধ;সাইবার নিরাপত্তা;নাগরিক দায়িত্ব;ডিজিটাল নৈতিকতা;misinformation response;crisis communication।এই আলোচনায় শিক্ষক, সামরিক বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন।১০. “National Information Resilience Network” গড়ে তোলাবাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।এর সদস্য হতে পারে—বিশ্ববিদ্যালয় + গবেষণা প্রতিষ্ঠান + সাংবাদিক সংগঠন + প্রযুক্তিবিদ + সিভিল সোসাইটি + সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য হবে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ প্রচার করা নয়; বরং তথ্যের সত্যতা, ডিজিটাল নাগরিকত্ব এবং সংকটকালীন তথ্য-সচেতনতা বৃদ্ধি করা।বাংলাদেশে UNESCO-র Media and Information Literacy উদ্যোগেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন, সিভিল সোসাইটি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১১. পাঁচ ধাপের নাগরিক প্রতিরোধপ্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সহজ মডেল চালু করতে পারে:STOPতৎক্ষণাৎ শেয়ার করবেন না।CHECKউৎস যাচাই করুন।COMPAREঅন্য নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।CONTEXTতথ্যটি সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপটে দেখুন।SHARE RESPONSIBLYতারপর দায়িত্ব নিয়ে শেয়ার করুন।এই পাঁচটি ধাপ একটি সাধারণ সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হলে misinformation-এর বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব।১২. জাতীয় নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্যএই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন এখানেই।তথ্য-বিকৃতি মোকাবিলার নামে যেন বৈধ মতপ্রকাশ বন্ধ না হয়।কারণ—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য ভিত্তি।তাই নীতি হওয়া উচিত—“Counter disinformation, not dissent.”অর্থাৎ অপতথ্য মোকাবিলা করা হবে; কিন্তু ভিন্নমতকে অপতথ্য বলে দমন করা হবে না।এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন গবেষণা ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অপরিহার্য।১৩. ভবিষ্যতের কৌশল: Reactive নয়, Preventiveবাংলাদেশকে শুধু কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর তার জবাব দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।প্রয়োজন Preventive Information Resilience।অর্থাৎ জনগণ আগে থেকেই জানবে—কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে deepfake চিনতে হয়, কীভাবে সন্দেহজনক উৎস শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে হয়।এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা।উপসংহার: আস্থার সেতু নির্মাণই ভবিষ্যতের নিরাপত্তাআজকের তথ্যযুদ্ধের যুগে একটি দেশের নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে পাহারা দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। মানুষের চিন্তা, তথ্যের পরিবেশ এবং সামাজিক আস্থাও নিরাপত্তার অংশ।বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি তথ্যসচেতন জনগোষ্ঠী।এই দুইয়ের মধ্যে সেতু নির্মাণ করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়।বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করবে।সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তার পেশাগত অভিজ্ঞতা ভাগ করবে।সিভিল সোসাইটি নাগরিক সমাজকে যুক্ত করবে।গণমাধ্যম সত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি শক্তিশালী করবে।আর তরুণ প্রজন্ম হবে তথ্য-সচেতন ডিজিটাল নাগরিক।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নাতীত করা নয়; বরং প্রশ্ন, তথ্য, জবাবদিহিতা ও আস্থার একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা।কারণ—অপতথ্যকে পরাজিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র সেন্সরশিপ নয়—সচেতন নাগরিক।আর সেই সচেতন নাগরিক তৈরি করার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়।অতএব বাংলাদেশে প্রয়োজন—সেনাবাহিনী + বিশ্ববিদ্যালয় + সিভিল সোসাইটি + গণমাধ্যম + প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ = National Information Resilience.এই সমন্বিত শক্তিই পারে misinformation, disinformation ও malinformation-এর বিস্তারকে মোকাবিলা করতে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সামাজিক সংহতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে আরও শক্তিশালী করতে।আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মূলনীতি হোক—“Protect the nation by protecting the truth;
protect the truth by educating the citizen;
and protect the citizen by strengthening trust.”প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকীঅধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিকডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদরয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলা এফএমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

অপতথ্যের অ্যালগরিদম ও জাতীয় নিরাপত্তা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত প্রতিরোধ

২৫ বছর পরও ১১ সেপ্টেম্বর: ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যে শিক্ষা

রক্তাক্ত এক সকাল বদলে দিয়েছিল বিশ্বকেসময় কখনো থেমে থাকে না। কিন্তু কিছু দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে ইতিহাস হয়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তেমনই এক দিন—যে দিন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা শুধু হাজারো মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিমান চলাচল, যুদ্ধনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বৈশ্বিক কাঠামো।আজ সেই ভয়াবহ ঘটনার ২৫ বছর। এক প্রজন্মের কাছে ৯/১১ এখন ইতিহাসের অধ্যায়; আর যারা সেদিনের দৃশ্য দেখেছেন, তাঁদের কাছে এটি এখনো এক জীবন্ত স্মৃতি—আগুনে জ্বলতে থাকা ভবন, আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষ এবং অবশেষে নিউইয়র্কের আকাশরেখা থেকে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের দুই প্রতীকী টাওয়ারের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সমন্বিত আত্মঘাতী হামলা চালায়। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ও দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। তৃতীয় বিমানটি আঘাত হানে ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। চারটি বিমানেই থাকা যাত্রী ও ক্রুসহ বহু মানুষ নিহত হন।কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই টাওয়ার কেন ধসে পড়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘বিমান আঘাত করেছিল’ বললে সম্পূর্ণ হয় না। এর পেছনে ছিল একাধিক কাঠামোগত ও অগ্নিকাণ্ডজনিত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (NIST)-এর দীর্ঘ তদন্তে সেই প্রক্রিয়ার একটি বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।আঘাত ছিল প্রথম ধাক্কা, শেষ কারণ নয়দুটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান অত্যন্ত উচ্চগতিতে টাওয়ার দুটির সঙ্গে সংঘর্ষ করে। বিমানের আঘাতে ভবনের বহির্ভাগের বহু কলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরের কাঠামোরও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে ভবনের বেশ কয়েকটি তলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিমান আঘাতের পরপরই টাওয়ার দুটি ধসে পড়েনি। বরং উভয় ভবনই কিছু সময় দাঁড়িয়ে ছিল। এর অর্থ, প্রাথমিক আঘাত ভবনের কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও সেটিই এককভাবে ধসের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল না।বিমান সংঘর্ষের পর শুরু হয় দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়—আগুন।আগুনের ভয়াবহতাবিমান দুটিতে বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল ছিল। সংঘর্ষের মুহূর্তে এর একটি বড় অংশ ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুন দ্রুত ভবনের একাধিক তলায় ছড়িয়ে দেয়। বিমানটির জ্বালানি অত্যন্ত তীব্র আগুন সৃষ্টি করলেও এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা সংশোধন করা প্রয়োজন: আগুনে টাওয়ারের ইস্পাত সরাসরি গলে যায়নি।ইস্পাত গলতে যে তাপমাত্রা প্রয়োজন, ভবনের আগুন সাধারণত সেখানে পৌঁছায়নি। কিন্তু কোনো ধাতুকে গলিয়ে ফেলাই তার কাঠামোগত ব্যর্থতার একমাত্র পথ নয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাতের শক্তি ও দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র তাপের সংস্পর্শে থাকলে কাঠামোগত সদস্যগুলো বিকৃত হতে পারে এবং তারা যে ভার বহন করার জন্য নকশা করা হয়েছিল, সেই সক্ষমতাও হারাতে পারে।৯/১১-এর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাপ্রবাহটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ফায়ারপ্রুফিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভূমিকাওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ইস্পাত কাঠামোর ওপর অগ্নিরোধী আবরণ বা ফায়ারপ্রুফিং ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আগুনের তাপে ইস্পাতের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া ঠেকানো এবং ভবনকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাঠামোগত স্থিতিশীলতা দেওয়া।বিমানের সংঘর্ষের প্রবল অভিঘাতে বিভিন্ন স্থানে এই ফায়ারপ্রুফিং ক্ষতিগ্রস্ত বা খসে পড়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ইস্পাত কাঠামো আগুনের তাপের কাছে আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।এখানে বিমানের আঘাত ও অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। সংঘর্ষ শুধু কলাম ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; একই সঙ্গে ভবনের অগ্নিনিরোধী সুরক্ষাকেও দুর্বল করে দিয়েছিল।মেঝের কাঠামোতে তাপের প্রভাবভবনের মেঝেগুলো ছিল বিস্তৃত কাঠামোগত ব্যবস্থার অংশ। তীব্র আগুনে মেঝের ইস্পাত ট্রাসগুলো উত্তপ্ত হয়ে দুর্বল ও বিকৃত হতে থাকে। উত্তপ্ত মেঝের কাঠামো নিচের দিকে বেঁকে যেতে থাকে এবং এর সঙ্গে যুক্ত বহির্ভাগের কলামগুলোর ওপরও টান সৃষ্টি করে।অন্যদিকে, বিমান আঘাতে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কলামগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। ফলে কাঠামোর বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভারবহন ও ভার পুনর্বণ্টনের যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি ক্রমশ সংকটের মুখে পড়ে।একটি বহুতল ভবনের শক্তি শুধু একটি কলাম বা একটি বিমের ওপর নির্ভর করে না। বহু উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে। কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য অংশগুলো সাময়িকভাবে সেই অতিরিক্ত ভার বহন করতে পারে। কিন্তু ক্ষতির মাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে সেই ভার পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থাও ব্যর্থ হতে শুরু করে।শুরু হয় ধসের ধারাবাহিকতাতদন্ত অনুযায়ী, আগুন ও কাঠামোগত ক্ষতির সম্মিলিত প্রভাবে টাওয়ারের নির্দিষ্ট তলায় কাঠামোগত ব্যর্থতা শুরু হয়। যখন ওপরের বিশাল ভর নিচের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশের ওপর পতিত হতে শুরু করে, তখন সেই গতিশীল ভার অত্যন্ত দ্রুত বাড়তে থাকে।এখানেই ‘প্রগ্রেসিভ কলাপ্স’ বা ধারাবাহিক ধসের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।সহজ ভাষায় বলা যায়, একটি তলার ওপরের বিশাল কাঠামো যখন নিচের অংশের ওপর পতিত হয়, তখন নিচের অংশকে শুধু স্থির অবস্থায় থাকা ভবনের ওজনই বহন করতে হয় না; পতনশীল ভরের গতিশক্তিও সামলাতে হয়। এক পর্যায়ে নিচের কাঠামো সেই ভার ধারণ করতে না পারলে ধস আরও নিচে ছড়িয়ে পড়ে।এভাবে একটি স্থানীয় কাঠামোগত ব্যর্থতা দ্রুত বৃহত্তর ধসে রূপ নিতে পারে।তাই টুইন টাওয়ারের পতনকে শুধু ‘বিমান ধাক্কা দিয়ে ভবন ফেলে দিয়েছে’—এভাবে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্পূর্ণ। আবার শুধু ‘আগুনেই ভবন ধসে পড়েছে’ বলাও যথেষ্ট নয়। বরং বিমান আঘাত, কাঠামোগত ক্ষতি, ফায়ারপ্রুফিংয়ের ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী তীব্র অগ্নিকাণ্ড, উত্তপ্ত ইস্পাতের দুর্বলতা ও বিকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ কলাপ্স—সবগুলো পরস্পর সম্পর্কিত ধাপ হিসেবে কাজ করেছে।আগুনে ইস্পাত গলেনি, কিন্তু ভবন হারাল স্থিতিশীলতা৯/১১ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্ত একটি ভুল ধারণা হলো—‘জেট ফুয়েল ইস্পাত গলিয়ে দিয়েছিল।’ বাস্তবে ঘটনাটি এভাবে ঘটেনি।ইস্পাত গলানোর মতো তাপমাত্রায় পৌঁছানোর প্রয়োজনই ছিল না। প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চ তাপমাত্রায় ইস্পাতের শক্তি ও দৃঢ়তা কমে যায় এবং কাঠামোগত উপাদানগুলো বিকৃত হতে পারে।একটি ইস্পাতের ভবন আগুনে টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করে শুধু আগুনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ওপর নয়; বরং কতক্ষণ আগুন চলেছে, অগ্নিরোধী সুরক্ষা কতটা অক্ষত ছিল, কোন কাঠামোগত অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেই সময় ভবনের ভার কীভাবে বিভিন্ন অংশে বণ্টিত হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর।৯/১১-এর টাওয়ারগুলোর ক্ষেত্রে এসব কারণ একই সময়ে কাজ করেছিল।উদ্ধারকর্মীদের জন্য ছিল অকল্পনীয় বিপর্যয়ভবন ধসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি ১১ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় হলো মানুষের জীবনহানি।বিমান আঘাতের পর হাজারো মানুষ ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, জরুরি চিকিৎসাকর্মী এবং অন্যান্য উদ্ধারকর্মীরা বিপদের মাত্রা জেনেও মানুষের জীবন বাঁচাতে ভবনের দিকে এগিয়ে যান।অনেক উদ্ধারকর্মী শেষ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।সেদিনের ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি স্থাপত্যের পতনের প্রতীক নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধেরও এক গভীর স্মারক।৯/১১-এর পর বদলে যায় বিশ্ব১১ সেপ্টেম্বরের প্রভাব নিউইয়র্কের সীমানায় আটকে থাকেনি। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, পরবর্তী সময়ে ইরাক যুদ্ধ, বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার বিস্তার—সবকিছুই ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।বিমানযাত্রার অভিজ্ঞতাও বদলে যায়। যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি, ককপিটের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের প্রবেশব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়।তবে এই পরিবর্তনের মূল্য নিয়েও বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক স্বাধীনতা, যুদ্ধের বৈধতা এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানি—এসব প্রশ্নও ৯/১১-পরবর্তী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।স্মৃতি যেন ঘৃণার নয়, শিক্ষার হয়২৫ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বরের দিকে ফিরে তাকানোর অর্থ শুধু পুরোনো ক্ষতকে স্মরণ করা নয়। বরং এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অগ্রসর একটি আধুনিক সমাজও কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।এটি আরও শেখায় যে বড় বিপর্যয় সাধারণত একটি মাত্র কারণে ঘটে না। অনেক সময় একাধিক দুর্বলতা একই সময়ে একত্রিত হয়ে বিপর্যয়কে ভয়াবহ করে তোলে। প্রকৌশল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি যোগাযোগ এবং মানবিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাই একটি ছোট ভুলও কখনো কখনো বড় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।আজকের বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ আগের রূপে নেই—এমনটা বলা যায় না। এর চরিত্র বদলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বদলেছে, হুমকির ধরন বদলেছে। কিন্তু ৯/১১-এর শিক্ষা এখনো প্রাসঙ্গিক: নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র বা নজরদারি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয়, নিরাপদ অবকাঠামো, মানবিক মূল্যবোধ এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি।২৫ বছর পরওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সেই দুই টাওয়ার আজ আর নেই। কিন্তু তাদের পতনের ছবি, ধোঁয়ায় ঢাকা নিউইয়র্কের আকাশ এবং সেদিনের মানুষের আর্তনাদ ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি।২৫ বছর পরও ১১ সেপ্টেম্বর তাই কেবল আমেরিকার ইতিহাসের একটি দিন নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী স্থাপনাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানবিক উন্মাদনা তার অপব্যবহার করতে পারে। আবার বিপর্যয়ের মুহূর্তে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে—যেমন দাঁড়িয়েছিলেন সেদিনের অগণিত উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ।ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর একটি স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় সম্ভবত প্রতিশোধের আগুনকে দীর্ঘায়িত করা নয়; বরং সেই ইতিহাস থেকে এমন শিক্ষা নেওয়া, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।১১ সেপ্টেম্বরের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে কেবল তাঁদের নাম স্মরণ করা নয়—মানবজীবনের মূল্য, শান্তির প্রয়োজন এবং সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতিকে স্মরণ করা।"টুইন টাওয়ার"পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেল, তবু সে দিন যায়নি,ধোঁয়ার কালো মেঘের নিচে সকাল থেমে রইল যেনই।নিউইয়র্কের আকাশজুড়ে আগুন জ্বলার ক্ষণ,মানুষ তখন বুঝেছিল—কত ভঙ্গুর জীবন।দুটি টাওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল স্বপ্নের মতো উঁচু,বিশ্ববাণিজ্যের প্রতীক যেন আকাশ ছুঁতে পিছু।হঠাৎ এসে লোহার পাখি ছিন্ন করল বুক,শহরজুড়ে আতঙ্ক নামে, স্তব্ধ হলো সুখ।একটি আঘাত—তারপর আগুন, ধোঁয়া, আর্তনাদ,ভেঙে গেল নিরাপত্তার অহংকারের বাঁধ।ইস্পাত গলেনি আগুনে, তবু দুর্বল হলো প্রাণ,ক্ষত-বিক্ষত কাঠামো বলল—শেষ নয় আঘাতের গান।বিমানের সেই অভিঘাতে ক্ষত হলো স্তম্ভ,ফায়ারপ্রুফিং খসে গিয়ে বাড়ল আগুনের দম্ভ।উত্তপ্ত হলো মেঝে, বাঁকল ইস্পাতের শরীর,ভারবণ্টনের সীমা পেরিয়ে নড়ল স্থাপত্যের নীর।একটি তলার ব্যর্থতা যে নামল নিচের তলায়,পতন তখন বজ্রের মতো ছড়িয়ে গেল ছায়ায়।ওপর থেকে নিচে নেমে ধসের কালো ঢেউ,মানুষ তখন জীবন বাঁচায়—নিজের কথা ভোলে কেউ।সিঁড়ি বেয়ে নামছে মানুষ, চোখে ভয়ের জল,উঠছে উল্টো দিকেই কেউ—বাঁচাতে জীবন শতশত দল।অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ, চিকিৎসকের সারি,মৃত্যু জেনে ছুটে গেল তারা—মানুষ বাঁচাবার ভারী।কেউ ফিরেছে, কেউ বা ফেরেনি আপন ঘরের দ্বারে,কারও নামটি পাথর হয়ে আজও লেখা স্মৃতিধারে।ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে কত স্বপ্ন, কত গান,কত মায়ের বুকের ধন, কত শিশুর প্রাণ।শুধু কি তবে একটি নগর হারিয়েছিল তার মুখ?না—সেদিন কেঁপে উঠেছিল পৃথিবীর নিরাপত্তার সুখ।সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে গেল আতঙ্কেরই ছায়া,যুদ্ধের নামে বহু দেশে জ্বলল নতুন মায়া।আফগান পাহাড়, মরুপ্রান্তর দেখল যুদ্ধের ক্ষত,প্রতিশোধের আগুনে কত জীবন হলো নিঃস্ব, হত।সন্ত্রাস রুখতে গড়ে উঠল নজরদারির জাল,নিরাপত্তার নামে কখনো স্বাধীনতারও কাল।বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি, কঠোর হলো দ্বার,গোপন তথ্য, গোয়েন্দা চোখ—বদলে গেল সংসার।প্রশ্ন উঠল—নিরাপত্তা কতদূর, আর ভয় কত?মানবাধিকারের পাল্লায় কে রাখবে মানুষের মত?ইতিহাস তাই একরৈখিক কোনো কাহিনি নয়,একটি দিনের অগ্নিকাণ্ডে বহু দিনের ক্ষয়।আতঙ্ক যেমন সত্য ছিল, তেমনি সত্য ক্ষত,যুদ্ধের ভেতর নিরীহ মানুষের কান্নাও অবিরত।তবু সেই দিন শুধু কি অন্ধকারের নাম?না, অন্ধকার ভেদ করে উঠেছিল মানবতার দাম।ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষ মানুষকে ধরেছে,অচেনা হাত অচেনা প্রাণ বাঁচাতে এগিয়েছে।আগুনের ভেতর যে মানুষ অন্যের হাত ধরে,তারই কাছে মানবসভ্যতা আজও মাথা নত করে।মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যারা দেখিয়েছে সাহস,তাদের স্মৃতি শেখায়—মানুষের হৃদয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়।পঁচিশ বছর পর আজ তাই প্রশ্ন জাগে মনে—কী পেল বিশ্ব প্রতিশোধের দীর্ঘ অগ্নিক্ষণে?কত শহর ছাই হয়েছে, কত চোখ হয়েছে শূন্য,কত শিশুর শৈশব গেল যুদ্ধের কাছে ঋণী?সন্ত্রাস যদি অন্ধকার হয়, যুদ্ধ কি তার ঔষধ?নিরীহ প্রাণের রক্ত দিয়ে মুছে কি যায় ক্ষত?ঘৃণার বীজ ঘৃণাই আনে—ইতিহাস তার সাক্ষী,শান্তির পথে ফিরতে হলে মানুষকেই হতে হবে রক্ষী।প্রযুক্তি যত শক্তিশালী, তত বাড়ে দায়,জ্ঞান যদি বিবেকহীন হয়, ধ্বংস নেমে যায়।আকাশচুম্বী অট্টালিকা, পারমাণবিক শক্তি,মানবতার কাছে হেরে যায় যদি হারায় নৈতিক ভক্তি।ভবন শেখায়—কাঠামো চাই শক্ত, নিরাপদ, দৃঢ়,আগুন এলে প্রস্তুতি চাই, চাই ব্যবস্থাপনা নির্ভুল।রাষ্ট্র শেখায়—গোয়েন্দা জ্ঞান, সহযোগিতা, সংহতি,মানুষ শেখায়—দুঃসময়ে মানবতাই মহাশক্তি।স্মরণ মানে প্রতিশোধ নয়, স্মরণ মানে শপথ—আর যেন কোনো শিশুর চোখে না নামে যুদ্ধরাত্রির ক্ষত।আর যেন কোনো মা না হারায় সন্তানের উষ্ণ হাত,আর যেন কোনো শহর না শোনে মৃত্যুর উন্মত্ত রাত।নিউইয়র্কের সেই আকাশ আজও সাক্ষী হয়ে রয়,ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন মরে না কোনোদিনই ক্ষয়।টাওয়ার নেই, তবু আছে মানুষের অমর স্মৃতি,ধ্বংসের বুক চিরে জাগে শান্তির নতুন গীতি।পঁচিশ বছর—সময় বয়ে যায়, ইতিহাস থাকে জেগে,পুরোনো ক্ষত শেখায় মানুষ কেমন থাকবে বেঁচে।শক্তির চেয়ে বিবেক বড়, ঘৃণার চেয়ে প্রেম,মানুষ যদি মানুষ থাকে—সুন্দর হবে হেম।তাই এসো আজ স্মরণ করি অশ্রুভেজা প্রাতে,নিহত সকল মানুষের নাম শ্রদ্ধার সাথে।ধর্ম-বর্ণ-দেশের ঊর্ধ্বে একটাই হোক মান—মানুষের চেয়ে বড় নয় কোনো রাষ্ট্র, কোনো প্রাণ।ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যে শিক্ষা আজও রয়—সহিংসতার শেষ ঠিকানা কখনো শান্তি নয়।ইতিহাস শুধু মনে রাখি—এই হোক অঙ্গীকার,ঘৃণার বদলে মানবতায় গড়ব পৃথিবী আবার।পঁচিশ বছর পরও তাই প্রশ্নটি যায় জেগে—শুধু কি স্মৃতি বয়ে যাব, নাকি শিক্ষা নেব বুকে?যদি সত্যিই শিখি তবে সার্থক হবে স্মরণ—মানুষ বাঁচুক, শান্তি জাগুক—এই হোক শেষ উচ্চারণ।—(টুইন টাওয়ার, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)২৫ বছর পরও তাই ১১ সেপ্টেম্বর আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করব, নাকি ইতিহাস থেকে সত্যিই শিখব?#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

২৫ বছর পরও ১১ সেপ্টেম্বর: ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যে শিক্ষা

চীন বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড মাও সেতুং লাল সালাম

“আমরা কমিউনিস্টরা বীজের মতো এবং মানুষরা পৃথিবীর মতো। আমরা যেখানেই যাই মানুষের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, মানুষের মাঝে শিকড় ও উন্নতি করতে হবে।” – মাও সেতুংকিংবদন্তি বিপ্লবী রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক ও নিজস্ব মতবাদিক চিন্তাধারার প্রবক্তা, চীন বিপ্লবের মহানায়ক, আধুনিক ও নয়া গণতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মাও সেতুংয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।কমরেড লেনিন ও কমরেড স্ট্যালিন পরিচালিত ১৯১৭ সালের অক্টোবরে দুনিয়া কাঁপানো বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব চর্চায় চীনা বাস্তবতায় বৈজ্ঞানিক ও সৃজনশীল প্রয়োগে নতুন এক বৈপ্লবিক মতবাদিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়ে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।মহান বিপ্লবী নেতা কমরেড মাও সেতুংকে আধুনিক চীনের রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন চীনা বিপ্লব, বিশেষত আর্থ-সামাজিক আমূল পরিবর্তনের নতুন স্তর নির্ধারণ ও সমাজ বদল এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব, তার প্রভাবের কারণেই। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের চেয়ারম্যান এবং আমৃত্যু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বে বিবেচিত হন একজন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক হিসেবেও। এছাড়া অনেকগুলো বইয়ের লেখক ও কবি হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। তার দর্শনই মাও সেতুং চিন্তাধারা বা মাওবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। জীবদ্দশায়ও পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের আদর্শের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন।মৃত্যুর এত বছর পরও কমরেড মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারায় প্রবর্তিত সাম্যবাদ-সমাজতন্ত্র অভিমুখী নয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনো বিদ্যমান।ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ২৪ বছর বয়সে রাজধানী পিকিংয়ে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ও সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া কমরেড মাওয়ের নিরন্তর বিপ্লবী সংগ্রাম ও প্রচেষ্টায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। পরে সফলভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রনায়কও হন তিনি।উনিশ শতকের গোড়ার দিকে চীন কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসনে বুঁদ ছিল। জনসাধারণ রাজতন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সান ইয়াত সেনের সঙ্গে যোগ দেন কমরেড মাও সেতুং। গণআন্দোলনে সফল হন। চীন মুক্তি পায় কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসন থেকে।তিনি ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের শাং তান জেলার শাউ শাং চুং গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাও সেতুংয়ের বাবার নাম ছিল মাও জেন শেং (শুন সেন)। শুন শেং দরিদ্র কৃষক হলেও কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করে জমিজমা ক্রয় করে অবস্থার উন্নতি করেন এবং কাঁচামালের ব্যবসা করে রীতিমতো মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হয়ে ওঠেন। মাওয়ের অন্য দুই ভাইয়ের নাম ছিল সে সেন ও সে তান। মাওয়ের মা ছিলেন শিয়াং শিয়াং জেলার তং শিয়াতো গ্রামের বেন পরিবারের কন্যা। তিনি ছিলেন দয়ালু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগী। মাওয়ের বয়স যখন মাত্র সাত তখন থেকে ক্ষেতখামারের কাজে লেগে যান। ১৯০১ সালে আট বছর বয়সে মাও গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। এবং ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত ওই পাঠশালায় লেখাপড়া করেন। ১৯০৬ সালে মাওয়ের গ্রামের পড়াশোনা শেষ হয়। এরপর তার বাবা তাকে সৈন্য দলে ভর্তি করানোটাকে লাভজনক মনে করেন।তরুণ বয়স থেকেই মাও সেতুং বামপন্থী রাজনৈতিক ধ্যানধারণার অনুসারী হয়ে পড়েন। ১৯১৯ সালে চীনকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে চীনের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে একটি আন্দোলন চলছিল। সে আন্দোলনে তিনিও ভূমিকা রাখেন লেখনীর মাধ্যমে। ১৯২০ সালের দিকে তিনি একজন মার্কসবাদী হিসেবে চীনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ওই বছরই চীনের চাংশায় ফিরে যান এবং হুনান প্রদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য উদ্যোগী হন, যদিও তার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর ১৯২১ সালে সাংহাই যান তিনি। সে সময় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হচ্ছিল ওখানে। সেই গোপন মিটিংয়ে উপস্থিত হন কমরেড মাও। তারপর তিনি হুনান প্রদেশে ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির একটি আঞ্চলিক শাখার কাজ শুরু করেন। ১৯২৫ সালে জন্মগ্রাম শাওশানে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন মাও। ১৯২৭ সালের দিকে কৃষক আন্দোলন নিয়ে তার লেখনীতে তিনি কৃষকদের বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।কউমিঙটাঙ দলের নেতা কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল চিয়াং কাই সেক কমিউনিস্টবিরোধী দমননীতি শুরু করলে মাও সেতুং হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্য বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিলেও পরাজিত হন তিনি। পরে চীনের দক্ষিণের পার্বত্য এলাকা জিয়াংজি প্রদেশে চলে যান মাও। এ সময় অসংখ্য তরুণ দলে দলে মাও নিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করে। মাও সেতুং তাদের সশস্ত্র সংগঠিত করেন। ইতিহাসে এই সশস্ত্র দলটি রেড আর্মি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল কৃষকের মুক্তি। আর সে লক্ষ্য অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করেন তারা।১৯৩৪ সালে চিয়াং কাই শেক চীনের জিয়াংজি প্রদেশ ঘিরে ফেলে। বিস্ময়কর ও অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে সে বেড়াজাল ছিন্ন করে রেড আর্মিকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন কমরেড মাও সেতুং। এরপর তিনি শুরু করেন এক দীর্ঘ পদযাত্রা, যা ইতিহাসে লংমার্চ হিসেবে পরিচিত। চীনের উত্তরের ইয়ানান প্রদেশের উদ্দেশ্যে রেড আর্মির সঙ্গে ছয় হাজার মাইল দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে শুরু হয় এ পদযাত্রা।১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই শেকের ন্যাশনাল পার্টি এবং মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে আগ্রাসী জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯৪৫ সালে জাপান পরাজিত হয়। তারপর চীনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ গৃহযুদ্ধে জয়ী মাও সেতুং চীনের বিশাল ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর বিজয়ী কমিউনিস্ট মুক্তিফৌজের অগ্রগামী অংশ ক্যান্টনে প্রবেশ করলে চিয়াং কাই শেক সদলবলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পালিয়ে ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নেন। স্বৈরশাসক কাই শেককে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন কমরেড মাও। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন।১৯৪৯ সালে সমাজতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চীন শাসন করেন। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তার তাত্ত্বিক অবদান, সমর কৌশল এবং তার কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওসেতুং চিন্তাধারা বা মাওবাদ নামে পরিচিত। শাসনকালে তিনি চীনকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেন। তিনি চীনের শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনেন। ‘মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী’ পন্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় তিনি নিজের উদ্ভাবিত তত্ত্বের সৃজনশীল প্রয়োগে কাজে লাগান।দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে কমরেড মাও সেতুং পার্টি ও জনগণের মধ্যে সংগ্রাম পরিচালনা করে বিজয়ের মাধ্যমে চীনকে তিনি নিয়ে যেতে সক্ষম হন আধুনিক দেশের কাতারে। ১৯৪৯ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই সময় কমিউনিস্ট পার্টিকে একমাত্র শ্রমিক শ্রেণির দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভূমি সংস্কারের সংগ্রাম ও কাজে তাকে শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় ভূস্বামীদের। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিজ দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে এ ক্ষেত্রেও তিনি সফলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন। কিছুক্ষেত্রে তাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা হলেও তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা প্রসারের মতো আরো কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনকে এক সময় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত করেন। কমরেড মাও যখন চীনের ক্ষমতায় আসেন তখন সমগ্র বিশ্বে চীনের পরিচয় ছিল একটি অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবে। বিগত সময়ের যুদ্ধ-বিগ্রহে চীন তখন ক্ষত-বিক্ষতপ্রায়। পুঁজিবাদী ভগ্নপ্রায় চীনকে নতুনভাবে কমরেড মাও সেতুং নির্মাণ করতে শুরু করলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে।জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘ লড়াইয়ের সময় পার্টির ক্ষমতার প্রধান ভিত্তিই ছিল দেশটির গ্রামাঞ্চলে, ক্ষমতায় গিয়ে সে কথা ভুলে যাননি কমরেড মাও। চীনের কৃষিজীবী মানুষকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি পার্টির শাসন ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। কমরেড মাওয়ের রাষ্ট্রনীতি চীনকে বদলে দিয়েছিল। দেশটির সর্বজনীন আধুনিকায়ন, দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন এবং গণশিক্ষার ব্যাপক অগ্রগতিতে কমরেড মাও সেতুং বিশাল অবদান রেখেছেন নিঃসন্দেহে।জনগণ এবং কেবল জনগণই হচ্ছেন বিশ্ব ইতিাহাস সৃষ্টির চালিকা শক্তি এবং গণলাইনের এই ধারণাকে কমরেড মাও আরও বিকশিত করেন। তিনি বলেছেন, “জনগণের ধারণাকে সংগ্রহ করুন, সে সবকে সুসংবদ্ধ করুন এবং তারপর সেই সব ধারণা নিয়ে জনগণের কাছে যান।”কমরেড মাও সেতুংয়ের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার অন্যমত দিক ছিল উদারনৈতিকতা। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় অনুপ্রারিত কমরেড মাও সেতুং উদারনৈতিক মানসিকতার অধিকারী ছিলেন।মার্কসবাদে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মাও সেতুং বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়ে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় নতুন প্রাণস্পন্দন নিয়ে আসেন। মাও সেতুং তাই বলেন, “Let hundred flowers bloom, let diverse a school of thought contend”. মাও সেতুং-এর এই উদারনৈতিক মানসিকতা চীনের সমাজতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।কমরেড মাও সেতুং (মাও জে দং) চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা ও প্রাণপুরুষ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন আমৃত্যু। সেদেশে সমাজতন্ত্রের সাম্য প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয়। মাও সেতুং- কবি, সংস্কারক, শাসক, সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার মতো গুণাবলি তাকে ইতিহাস বিশিষ্ট স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে তিনি বিশ্বে কিংবদন্তি হিসেবেও পরিচিত হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী তিনি চেয়ারম্যান মাও নামে খ্যাত হন।"কমরেড মাও"রক্তাক্ত চীনের বুকে জ্বাললে বিপ্লবের দীপ,শোষণের অন্ধকারে উঠল বজ্রের মতো শপথ;কৃষকের কণ্ঠে দিলে মুক্তির দুরন্ত ডাক,মেহনতি মানুষের হাতে তুলে দিলে লাল পতাকাখানা।হুনানের মাটিতে জন্ম, কৃষকের ঘরে প্রাণ,শৈশবেই দেখলে তুমি দারিদ্র্যের দীর্ঘ হাহাকার;ক্ষেতের আল, কাদামাটি, শ্রমজীবনের ঘ্রাণ—সেখানেই গড়লে তুমি সংগ্রামের প্রথম অঙ্গীকার।অক্টোবরের বিপ্লব যখন কাঁপাল দুনিয়ার বুক,লেনিনের বজ্রবাণী ছড়াল নতুন দিনের গান,মার্কসের তত্ত্ব হাতে, বাস্তবতার দিকে চোখ—চীনের মাটিতে গড়লে বিপ্লবের নব অভিযান।নগর নয়, গ্রাম জাগে, জাগে কোটি কৃষকজন,লাঙলের ফলা হয়ে শাণিত হলো বিদ্রোহ;জনগণই ইতিহাসের নির্মাতা—এই দৃঢ় বচনশিখিয়ে দিলে সংগ্রামে, ভাঙলে পরাজয়ের মোহ।চিয়াংয়ের দমন নামে আগুনের মতো চারি পাশে,বন্দুকের নল তাক করা শ্রমজীবী মানুষের প্রাণে;তবু রেড আর্মি এগোয় পাহাড়-নদী পেরিয়ে হাসে,গেরিলা সংগ্রাম জাগে মুক্তির অগ্নিগানে।জিয়াংসির ঘেরাটোপ ভেঙে যে দুরন্ত যাত্রা,হাজার বিপদ পেরিয়ে লংমার্চের অমর পথ;বরফ, পর্বত, ক্ষুধা—তবু থামেনি সে মাত্রা,ছয় হাজার মাইল জুড়ে লিখলে সংগ্রামের মহাকাব্য।ইয়ানানের পথে পথে রক্তে লেখা ইতিহাস,মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এগিয়ে চলে লাল বাহিনী;পরাজয় যত আসে, তত দৃঢ় হয় প্রত্যয়-শ্বাস,জনতার শক্তিতেই জাগে বিজয়ের রক্তিম ঋণী।জাপানি আগ্রাসনে যখন জ্বলছে চীনের দেশ,জাতীয় ঐক্যের ডাক উঠল প্রতিরোধের তরে;দখলদার হটিয়ে শেষে বদলে গেল যুদ্ধের রেশ,স্বাধীনতার সূর্য উঠল লাল পতাকার ঘরে।উনিশশো ঊনপঞ্চাশ—বেজে উঠল বিজয়-ঢাক,তিয়েনআনমেন চত্বরে নতুন রাষ্ট্রের ঘোষণা;গণপ্রজাতন্ত্রী চীন পেল নতুন দিনের ডাক,ইতিহাসে অমর হলো বিপ্লবের সেই ক্ষণ।ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে এলো ভূমির অধিকার,কারখানায় উঠল শ্রমের নতুন মর্যাদার গান;শিক্ষার আলো ছড়াল, নারীর খুলল অধিকার,ধ্বংসস্তূপের চীন পেল নির্মাণের নতুন প্রাণ।“জনগণ, জনগণ”—তোমার রাজনীতির মূলমন্ত্র,জনতার মাঝেই খুঁজলে বিপ্লবের প্রাণশক্তি;তাদের কাছ থেকে নিয়ে আবার তাদেরই কাছে ফের—গণলাইনের পথে গড়লে সংগ্রামের যুক্তি।“শত ফুল ফুটুক”—দিলে চিন্তার স্বাধীন আহ্বান,বহু মতের সংঘাতে জাগুক জ্ঞানের দীপ্তি;বিতর্কের আগুনে হোক সত্যেরই সন্ধান,সমাজের গতিপথে আসুক নব সৃষ্টির শক্তি।তোমার পথে ভুল ছিল না—এ কথা ইতিহাস বলে না,তোমার পথও প্রশ্নহীন—এমন দাবিও নয়;বিপ্লবের ইতিহাসে আলো যেমন, ছায়াও তেমনি থাকে,তবু কোটি মানুষের স্বপ্নে তোমার নাম আজও রয়।মহান নেতা, কবি তুমি, তাত্ত্বিক, সংগঠক,যুদ্ধের ময়দানে যেমন, চিন্তায় তেমনি দৃঢ়;সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে ছিলে অগ্রণায়ক,নিপীড়িতের স্বপ্নে তাই তোমার প্রতিচ্ছবি স্থির।তোমার মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে আজ,সময়ের স্রোত মুছে দিতে পারেনি সেই নাম;যেখানে শোষিত মানুষ তোলে মুক্তির আওয়াজ,সেখানেই প্রতিধ্বনিত হয়—মাও, তোমায় লাল সালাম।যেখানে কৃষকের চোখে জমে অন্যায়ের জল,যেখানে শ্রমিকের ঘামে অন্যের প্রাসাদ গড়ে,যেখানে মানুষের অধিকার হয় পুঁজির কাছে জিম্মি—সেখানেই বিপ্লবের প্রশ্ন নতুন করে জেগে ওঠে।মাও, তুমি ইতিহাসের এক জ্বলন্ত অধ্যায়,তোমার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকুক যত;শোষণহীন পৃথিবীর স্বপ্ন যে আজও মরে নাই,মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তেমনি অমর, অবিরত।লাল পতাকা উড়ুক আজ শ্রমজীবী মানুষের হাতে,কৃষকের ঘামে ফুটুক ন্যায়ের নতুন ভোর;বঞ্চিতের অধিকার ফিরুক সংগ্রামের প্রভাতে,মানুষের পৃথিবী হোক মানুষেরই ঘর।পঞ্চাশতম মৃত্যুদিনে তাই উচ্চারিত হোক নাম—চীনের বিপ্লবী নেতা, জনতার প্রিয় মাও;ইতিহাসের পাতায় তুমি জাগ্রত অবিরাম—নিপীড়িতের মুক্তিস্বপ্নে আজও তুমি দাও ডাক।বিপ্লবের লাল সূর্য অস্ত যায়, আলো যায় না,সংগ্রামের রক্তস্রোত থেমে থাকে না কোনো কাল;মানুষের মুক্তির স্বপ্ন কখনো মরে যায় না—কমরেড মাও সেতুং, তোমায় জানাই লাল সালাম।লাল সালাম!লাল সালাম!শোষিত মানুষের সংগ্রামে—কমরেড মাও, তোমায় লাল সালাম।—(কমরেড মাও,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবী ও মহান নেতা কমরেড মাও সে তুংয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

চীন বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড মাও সেতুং লাল সালাম

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষক ও শিক্ষামন্ত্রীর করণীয় ভূমিকা

গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা মানুষকে সুন্দর ও মানবিক মানুষ হতে সাহায্য করে। মানুষকে বিবেকবান করে তোলে। ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণের সক্ষমতা দান করে। মনুষত্ববোধ জাগ্রত করে। জাতিকে আলোকিত করে। শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা। শিক্ষা যেখানে অনুপস্থিত, জ্ঞান ও মূল্যবোধ সেখানে খুবই দুর্বল। এজন্য শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হয়। শিক্ষা এবং সংস্কৃতি একটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। শিক্ষা এবং সংস্কৃতি নষ্ট হলে দেশ ধ্বংস হয়ে যায়। জাতিকে মেধা এবং মননশীলতা তৈরিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিহার করে কারিকুলাম পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। যাতে ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা পরিহার করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মানানসই হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বহির্বিশ্বের সিলেবাসের সাথে আমাদের সিলেবাসের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। যাতে করে আমাদের সন্তানেরা যখন বহির্বিশ্বে কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে যাবে তারা যেন সেখানে সামঞ্জস্য বিধান করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। শিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে ক্ষুধার্ত শিক্ষক দিয়ে তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়। শিক্ষকদের পারিশ্রমিক যেমন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমনি শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে মান-সম্মত শিক্ষা দানের জন্য জবাবদিহিতারও ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাঙ্গনে এবং শ্রেণীকক্ষে উত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের স্টাডি করে যথাসময়ে শ্রেণীকক্ষে লেকচার শীট নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করতে হবে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দুজনই উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে একজন সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তার সময় নকল বন্ধ হয়েছিল। এবার ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোকে সিসি টিভি ক্যামেরার আওতায় এনে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে একটা সচেতনতার বীজ রোপন করেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যেমন দেখাদেখির প্রবণতা কমে গেছে, তেমনি শিক্ষকরা প্রকৃত অর্থে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমালোচনা যে যাই করুক শিক্ষামন্ত্রী জাতির বিবেক তৈরি করার জন্য সঠিক কাজটি করেছেন। আমরা লাখ লাখ এ প্লাস পাইনি বটে তবে প্রকৃত অর্থে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার হলে লেখনীর মাধ্যমে মেধার পরিচয়ের সাক্ষ্য রেখেছেন। আমরা অটোপাস থেকে মুক্ত হয়েছি। যদিও বর্ষায় কোমর পানিতে ভিজে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়াটা সমীচীন মনে হয়নি। এহেন পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় এবং মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষ আগামীতে পরীক্ষা গুলো এগিয়ে এনেছেন যা প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী মেনে নিবেন এটাই জাতির বিবেক, বা বাতিঘর শিক্ষক সমাজ প্রত্যাশা করেন। ইতোমধ্যে অনেক কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে। নবম পে স্কেল ঘোষিত হয়েছে। এতে করে সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং কর্মচারীরা উপকৃত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন একজন জনদরদি ব্যক্তিত্ব। ভঙ্গুর অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে তিনি ইতোমধ্যে যেসব কাজ হাতে নিয়েছেন তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং তিনি ইতিমধ্যে চমক সৃষ্টি করেছেন। এত দাবি না করে তাকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। তার শাসনামলে বাংলার জনপদ হবে শান্তিময়। প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীকে সমান চোখে দেখে তাদের মানসিক প্রশান্তির বিস্তার ঘটাবেন এটাই হবে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র সমুন্নত করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক আইনগুলো সন্নিবেশিত করতে হবে। যাতে তারা অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে। আইসিটি ও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। ছাত্র ছাত্রীদের মনোযোগ বৃদ্ধিকরণের জন্য ক্লাসে আলোচনার পর ফিডব্যাক গ্রহণ করতে হবে। হোমওয়ার্কের উপর জোর দিতে হবে এবং ড্রপআউট ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করে তাদের লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে। নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের আচার-আচরণ এবং পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়গুলো জানাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ যদি তাদের সহকর্মীদের নিয়ে এ ধরনের কাজগুলো অব্যাহত রাখেন তাহলে অবশ্যই ছাত্রছাত্রীরা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং জাতিকে ভালো কিছু উপহার দিতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্য মহোদয় শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করে ভূয়সি প্রশংসা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। যা জাতির জন্য সুখকরও বটে। শিক্ষকদের দাবি চাকুরীর বয়সসীমা ৬৫ করতে হবে। কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধার ফান্ড লুটপাট করে নষ্ট করলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মানিত কোন শিক্ষককে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। পর্যায়ক্রমে সকলকে প্রাপ্য টাকা তিনি বুঝিয়ে দিবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যদি নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থেকে নিষ্ঠার সাথে সময়োপযোগী জ্ঞান দান করতে পারেন তাহলে শিক্ষিত জাতি তৈরি হবে। এক্ষেত্রে দুজন মন্ত্রী মহোদয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। তবেই আমাদের সন্তানরা হবে ভাগ্যবান এবং ভাগ্যবতী। এক্ষেত্রে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে মাস্তুলটা সোজা করে ধরে রাখতে হবে। শিক্ষকদেরকে উপযুক্ত ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে পাঠদানে উপযোগী করে শ্রেণীকক্ষে পাঠাতে হবে। শিক্ষিত জাতি তৈরির মাধ্যমে আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। মোঃ আব্দুর রাজ্জাকলেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। সমাজকর্ম বিভাগ। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা। 

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষক ও শিক্ষামন্ত্রীর করণীয় ভূমিকা

সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

মিখাইল সের্গেইয়েভিচ গর্বাচভ মারা গেছেন ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর আজ যখন আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন গর্বাচভকে কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁকে বিচার করতে হবে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে—যে প্রক্রিয়ার পরিণতিতে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন আসে।একজন কমিউনিস্ট হিসেবে গর্বাচভের মৃত্যুতে আমার কোনো ব্যক্তিগত শোক নেই। কারণ, আমার বিবেচনায় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতির রক্ষক ছিলেন না; বরং সেই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন।তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে শুধু ঘৃণা প্রকাশের দিকে নিয়ে যায় না; বরং ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। কীভাবে একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের ভিত দুর্বল করা হলো? কীভাবে সংশোধনবাদের বিভিন্ন ধারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার নীতিতে পরিণত হলো? কীভাবে সমাজতন্ত্রের নামে এমন সব সংস্কার আনা হলো, যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলল?নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে একই ধরনের বিপর্যয় অন্য সময়, অন্য নামে, অন্য স্লোগানে আবারও ফিরে আসতে পারে।কমরেড স্তালিন-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন: পরিবর্তনের সূচনাসোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ইতিহাসকে বুঝতে হলে কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পরবর্তী সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। ১৯৫৩ সালে কমরেড জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত পার্টি ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৫৬ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ব্যক্তিপূজার বিরোধিতা’র নামে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচার সোভিয়েত রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় অংশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।এরপর কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত অর্থনীতিতে আমলাতান্ত্রিকতা, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া, ভোক্তা পণ্যের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা জমতে থাকে। একই সঙ্গে পার্টির ভেতরে আদর্শিক দৃঢ়তার জায়গায় আপস ও সুবিধাবাদ প্রবেশ করে।এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল; কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমস্যা। বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হওয়া, আমলাতান্ত্রিক বিশেষ সুবিধার বিস্তার, পার্টির অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের বিকৃতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের নানা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বও সংকটকে গভীর করে।এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সুবিধাভোগী স্তর তৈরি হয়েছিল। তাদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের সঙ্গে এই স্তরেরই একটি অংশ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এবং রাশিয়ার নবগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘অলিগার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।গর্বাচভের আবির্ভাব১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। উৎপাদনশীলতা কমছিল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছিল, আফগানিস্তান যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছিল।এই পরিস্থিতিতে গর্বাচভ ‘পেরেস্ত্রইকা’—পুনর্গঠন—এবং ‘গ্লাসনস্ত’—উন্মুক্ততা—এর কথা বলেন।প্রথমদিকে তাঁর বক্তব্যে সমাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের কথাই বেশি শোনা যায়। তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েত ক্ষমতার মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করাই তাঁর লক্ষ্য।এই ভাষা শুধু সোভিয়েত জনগণকেই নয়, বিশ্বের বহু কমিউনিস্টকেও আশাবাদী করেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, গর্বাচভ হয়তো সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার দুর্বলতাগুলো দূর করতেই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংস্কারের দিক কোন দিকে যাচ্ছিল?এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।পেরেস্ত্রইকা থেকে ব্যবস্থার রূপান্তরগর্বাচভের সংস্কারের প্রথম পর্যায়ে অর্থনীতিকে অধিক কার্যকর করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ক্রমে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে থাকে এবং বাজারের ভূমিকা বাড়তে থাকে।১৯৮৭ সালের পর থেকে সংস্কারের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে বাজারের নানা উপাদানকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের আইনগুলোতে সমবায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে।এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বাজারকে কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নিয়ন্ত্রিত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি বাজার ধীরে ধীরে উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে?ইতিহাস দেখিয়েছে, দ্বিতীয় পথটিই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো উৎপাদনের প্রধান উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ক্ষমতা। যখন এই ভিত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফা এবং বাজারের স্বতন্ত্র শক্তি ক্রমে প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রও বদলাতে থাকে।‘অখণ্ড বিশ্ব’ এবং শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নগর্বাচভের রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রেণি-সংঘাতের গুরুত্বকে ক্রমশ কমিয়ে দেখা।তাঁর ‘নতুন রাজনৈতিক চিন্তা’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন এক ধারণা সামনে নিয়ে আসে, যেখানে মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থকে প্রধান করে দেখা হয় এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মৌলিক বিরোধকে তুলনামূলকভাবে গৌণ করে তোলা হয়।মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ অবশ্যই অস্বীকার করার বিষয় নয়। যুদ্ধবিরোধিতা, শান্তি, পরিবেশ রক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্ন। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ‘সার্বজনীন মানবিক স্বার্থ’ বলতে গিয়ে যদি শোষক ও শোষিতের স্বার্থের পার্থক্য অস্বীকার করা হয়, তখন তা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে না।মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো শ্রেণি-বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য না করা।সমাজে কে উৎপাদনের মালিক? কে শ্রম বিক্রি করে? কে মুনাফা অর্জন করে? রাষ্ট্রের নীতি কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়?—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু ‘মানবিক মূল্যবোধের’ কথা বললে সামাজিক সম্পর্কের বস্তুগত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।এই জায়গাতেই সংশোধনবাদের বিপদ।সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ‘নতুন’ ধারণাগর্বাচভের নতুন রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সংঘাতের চরিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা।শীতল যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমানো, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক বিষয় হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।পুঁজিবাদের বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শক্তির অসমতা, বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য, সম্পদ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক জোট এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপ—এসব বাস্তবতা রয়ে গিয়েছিল।ফলে সাম্রাজ্যবাদকে কেবল একটি সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি অনুধাবন করা যায় না।শ্রেণিসংগ্রামকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণাগর্বাচভীয় চিন্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি ছিল শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে কমিয়ে দেওয়া।‘শ্রেণির ঊর্ধ্বে’ উঠে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচার করার আহ্বান শুনতে মানবিক ও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমাজে শ্রেণি কি বিলুপ্ত হয়েছিল?সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনিক সুবিধাভোগী স্তরের পার্থক্য ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছিল। উৎপাদন ও বণ্টনের প্রশ্ন ছিল। শ্রমের ফল কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নও ছিল।অর্থাৎ শ্রেণি-প্রশ্ন বাস্তবেই ছিল।তাই শ্রেণিসংগ্রাম অপ্রাসঙ্গিক—এমন ধারণা বাস্তবতার পরিবর্তে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়।আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘শ্রেণির রাজনীতি পুরোনো’, ‘সবাই একই সমাজের মানুষ’, ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানবতা’—এই ধরনের বক্তব্য শোনা যায়। মানবতার কথা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু মানবতার নামে শ্রেণি-বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না।শ্রমিকের রাষ্ট্র থেকে বাজারের রাষ্ট্রগর্বাচভের সময় রাজনৈতিক সংস্কারও দ্রুত এগোতে থাকে। গ্লাসনস্তের ফলে দীর্ঘদিন চাপা থাকা নানা সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, অতীতের নানা ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক শুরু হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়।কিন্তু এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো যখন তার অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে।১৯৮৯ সালের নির্বাচনী পরিবর্তন, কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটিজের উত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।১৯৯০ সালে সোভিয়েত সংবিধান থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক ভূমিকার সাংবিধানিক ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়।এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মোড়।কারণ, যে রাজনৈতিক দল বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই পার্টিই যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারাতে শুরু করল, তখন রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনগর্বাচভের নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাবও ছিল গভীর।১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের একের পর এক সমাজতান্ত্রিক সরকার পতনের মুখে পড়ে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া—সর্বত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে।বার্লিন প্রাচীরের পতন শীতল যুদ্ধের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করে।সোভিয়েত নেতৃত্ব পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোর টিকে থাকার জন্য আগের মতো সামরিক হস্তক্ষেপের পথ গ্রহণ করেনি। এটি শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এর ফলে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ে।১৯৯০ সালে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ এবং ন্যাটোর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বিস্তারও পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেয়।সোভিয়েত অর্থনীতির সংকট ও পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। উৎপাদন কমে যায়, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, পণ্যের ঘাটতি বাড়ে এবং বাজেট সংকট তীব্র হয়।এখানে গর্বাচভের নীতির একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—পুরনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হলেও তার বিকল্প হিসেবে একটি কার্যকর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা।পরিকল্পনার শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কার্যকর বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমেছে, কিন্তু উৎপাদন ও বণ্টনের নতুন কাঠামো স্থিতিশীল হয়নি।এই শূন্যতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী।রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী রাশিয়ায় ‘অলিগার্ক’ নামে পরিচিত ধনী পুঁজিপতিদের উত্থানের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি এই রূপান্তরকালেই গড়ে ওঠে।১৯৯১: পতনের শেষ অধ্যায়১৯৯১ সালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শক্তিশালী হয়।আগস্ট ১৯৯১-এ গর্বাচভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং কমিউনিস্ট পার্টির ওপর আঘাত তীব্র হয়।ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের নেতারা বেলাভেজা চুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বিদ্যমান নেই। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্রও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।২৫ ডিসেম্বর গর্বাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১—সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।একটি রাষ্ট্রের পতন হলো। একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও অবসান ঘটল।কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে গেল—এই পতন কি অনিবার্য ছিল?পতন কি অনিবার্য ছিল?সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে শুধু একজন ব্যক্তি—গর্বাচভের—কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের গভীর শিক্ষা পাওয়া যাবে না।গর্বাচভ ছিলেন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে আবির্ভূত একজন নেতা। তাঁর আগে বহু দশক ধরে সোভিয়েত ব্যবস্থায় নানা সমস্যা জমা হয়েছিল। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র, পার্টির অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, জাতীয় প্রশ্নের জটিলতা, জনগণের অংশগ্রহণের সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ—সবকিছু মিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছিল।কিন্তু এটাও সত্য যে সংকটের সমাধান কোন পথে করা হবে, সেটিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।গর্বাচভের নেতৃত্বে যে পথ নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রকে পুনর্গঠন করার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।অতএব গর্বাচভকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না; আবার তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।‘সংশোধনবাদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সংশোধনবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়।মার্কসবাদকে সময়োপযোগী করার নামে তার মৌলিক শ্রেণিচরিত্রকে বাদ দেওয়া, শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণিসমঝোতাকে প্রাধান্য দেওয়া, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে অস্বীকার করা, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দেওয়া—এসবই বিভিন্ন সময়ে সংশোধনবাদের নানা রূপে দেখা গেছে।সমস্যা হলো, সংশোধনবাদ সাধারণত নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রবিরোধী’ বলে ঘোষণা করে না। বরং সে সমাজতন্ত্রকে আরও মানবিক, আরও আধুনিক, আরও গণতান্ত্রিক, আরও বাস্তবসম্মত করার কথা বলে।এই কারণেই সংশোধনবাদ বিপজ্জনক।কারণ, সে অনেক সময় শত্রুর ভাষায় কথা বলে না; বন্ধুর ভাষায় কথা বলে।গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্থান ও পরবর্তী নীতির মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।গর্বাচভের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারপশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ গর্বাচভকে গণতন্ত্র ও শান্তির নায়ক হিসেবে দেখে। শীতল যুদ্ধের অবসান, পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস এবং পূর্ব-পশ্চিম উত্তেজনা কমানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন।এই মূল্যায়নের ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্যই আছে।কিন্তু একজন কমিউনিস্টের মূল্যায়নের প্রশ্ন আলাদা।আমাদের প্রশ্ন হবে—তিনি কোন শ্রেণির স্বার্থকে শক্তিশালী করেছিলেন? তাঁর নীতির ফলে উৎপাদনের মালিকানার সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল? শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছিল, নাকি দুর্বল হয়েছিল? সমাজতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, নাকি পুঁজিবাদের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।ইতিহাসের শিক্ষাসোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবীর একাংশ ঘোষণা করেছিল—সমাজতন্ত্রের যুগ শেষ। কেউ কেউ বলেছিলেন, পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত ব্যবস্থা।কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের পৃথিবী সেই দাবিকে সরলভাবে সত্য প্রমাণ করেনি।বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বেড়েছে। বিপুল সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। শ্রমের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সম্পদের অসম বণ্টন আজও মানবসভ্যতার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে আছে।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাই সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি।বরং প্রশ্নটিকে আরও জটিল করেছে—কী ধরনের সমাজতন্ত্র? কীভাবে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে? কীভাবে আমলাতন্ত্র ও বিশেষ সুবিধাভোগী স্তরের বিকাশ ঠেকানো যাবে? কীভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক মালিকানার সমন্বয় ঘটানো যাবে? কীভাবে পার্টিকে জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কের মধ্যে রাখা যাবে?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে।গর্বাচভের মৃত্যু এবং আমাদের শপথগর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্ট হিসেবে আমার ব্যথিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাকে আত্মতুষ্টও করে না।বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।শুধু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই সমাজতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। শুধু বিপ্লবের ইতিহাসের গৌরবগাথা বললেই বিপ্লবী পার্টি বিপ্লবী থাকে না। শুধু মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের নাম উচ্চারণ করলেই মার্কসবাদী হওয়া যায় না।প্রয়োজন তত্ত্ব ও বাস্তবতার সৃজনশীল ঐক্য। প্রয়োজন শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক। প্রয়োজন পার্টির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সততা ও মতাদর্শগত দৃঢ়তা। প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান। এবং সর্বোপরি প্রয়োজন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর আদর্শিক সংগ্রাম।গর্বাচভের মৃত্যু তাই আমার কাছে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা মাত্র নয়। এটি ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আমাদের শিখিয়েছে—একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তার অভ্যন্তরে যদি শ্রেণিচেতনা দুর্বল হয়, যদি আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগী স্তর শক্তিশালী হয়, যদি বিপ্লবী পার্টির আদর্শিক দৃঢ়তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং যদি সংশোধনবাদ রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করে, তাহলে বিপ্লবের অর্জনও বিপন্ন হতে পারে।সুতরাং গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্টের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘৃণার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের সংগ্রামের অঙ্গীকার।সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী ভিত্তিকে ধারণ করে, সব ধরনের সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই হতে পারে এই ইতিহাসের প্রতি আমাদের যথার্থ জবাব।ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে শেষ করেনি।বরং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রামকে আরও গভীরভাবে বোঝার দায়িত্ব আমাদের ওপর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।#সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রদূত এম সাইফুর রহমান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন,সংস্কার ও আধুনিকায়নের ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে,তাঁদের অন্যতম সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আজ তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকী।রাজনীতির অঙ্গনে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও দৃঢ়চেতা। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কঠোর অবস্থান,হিসাব-নিকাশে সতর্কতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনমনীয়তার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কড়া মেজাজের অর্থমন্ত্রী’ হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ছিল একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ,দক্ষ সংস্কারক এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আধুনিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা।মৌলভীবাজারের এক প্রত্যন্ত এলাকায় জন্ম নেওয়া এম সাইফুর রহমান পেশাজীবনে ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অল্পসংখ্যক এফসিএ ডিগ্রিধারীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি চা-বাগানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিতে নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন।হিসাব,নিরীক্ষা ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়, রাজস্বনীতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর হিসাবনির্ভর ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমান ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। সে সময় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিসরেও ছিল নানা সমালোচনা ও চাপ।তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। সময়ের সঙ্গে ভ্যাট দেশের রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে সে সময়ের বিতর্কিত ও কঠিন সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এম সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংক,আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তিনি দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিতেন।তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল,উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে,কিন্তু দেশের বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতির আলোচনায় তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এম সাইফুর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত অর্জনগুলোর একটি হলো জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট উপস্থাপন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।তাঁর সময়ে করব্যবস্থা,আর্থিক খাত, বাণিজ্যনীতি ও বাজারব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে অধিকতর বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং একাধিক অপারেটরের জন্য সুযোগ তৈরি হওয়ার ফলে পরবর্তী সময়ে মোবাইল যোগাযোগ দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।এই পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের নীতিগত পরিবেশ তৈরিতে এম সাইফুর রহমানের সময়ের সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ মোবাইল ফোন যখন দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ,তখন সেই পরিবর্তনের শুরুর দিকের নীতিগত পদক্ষেপগুলোর কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন।অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমানের প্রকাশ্য ভাবমূর্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কঠোরতা। সংসদে কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও হিসাবের গুরুত্ব বেশি থাকত।তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই সাদাসিধে ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকা।মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করা হয়। সড়ক যোগাযোগ,শিক্ষা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে তাঁর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা এ অঞ্চলের উন্নয়ন-ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।একজন অর্থমন্ত্রীর মূল্যায়ন কেবল তিনি কতটি বাজেট দিয়েছেন,তা দিয়ে শেষ করা যায় না। তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে, অর্থনীতির কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আনে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের ভিত্তি তৈরি করে,সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এম সাইফুর রহমানের ক্ষেত্রেও সেই মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। রাজনীতির বাইরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি,রাজস্ব সংস্কারের প্রচেষ্টা,বাজারমুখী অর্থনীতির প্রতি আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে দরকষাকষির মানসিকতা ছিল,তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল,তা আজও অনুভূত হয়। সময়ের সঙ্গে মানুষ চলে যায়,কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম ও সিদ্ধান্ত ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়।এম সাইফুর রহমান তেমনই এক নাম। তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও আধুনিকায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা।এই দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রদূত এম সাইফুর রহমান

ভিয়েতনাম বিপ্লবের কিংবদন্তি মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সারাবিশ্বের মেহনতি মানুষ এবং নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ধ্রুব নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল ভিয়েতনাম বিপ্লবের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।কমিউনিস্ট বিপ্লবী এই নেতা পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার পেছনেও কমরেড হো-র উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। আজ তাঁর ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতৃত্ব কমরেড হো চি মিন। বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়জন নেতৃত্ব সামগ্রিক মুক্তির জন্য সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করে স্বাধীনতার দূত হয়ে উঠেছিলেন কমরেড হো চি মিন তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অসাধারণ ও একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠতে পারেন তারই বড় প্রমাণ হো চি মিন। এই আধুনিক বিশ্বেও তার কীর্তি পরিবর্তন অভিমুখী মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রাতঃস্মরণীয় ও অনুপ্রেরণীয়।কমরেড হো চি মিন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমৃত্যু ভিয়েত কং-এর নেতৃত্ব দান করেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছেন নতুন ভিয়েতনামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের। স্বপ্ন দেখেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করেছেন ফরাসি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা সাধারণ জনগণের জন্য। পড়াশোনা শেষ করেই জড়িয়ে পড়েন ফরাসি বিপ্লবে। তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন তার বাবা নগুয়েন সাক। পরিণতি হিসেবে শাসকগোষ্ঠী অন্যান্য আন্দোলনকারীর সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করে। পরে ফরাসি শাসকগোষ্ঠী সিন সাককে আটকে রাখে পৌলো বন্দর কারাদ্ব্বীপে। বাবা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল হো চি মিনের ছাত্রজীবন এবং শুরু হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামী জীবন। এ সময় তিনি হুয়েং শহর ত্যাগ করে ফ্যান থিয়েট শহরে চলে যান। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সময়টা ছিল ১৯০৭ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত। ইতিহাসবিদরা এটি তার আন্দোলনের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এদিকে হো চি মিনের বাবাকে পৌলো বন্দর কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলো। এ সময় বাবার সঙ্গে পুত্রের দেখা হয়। হো চি মিনের বাবা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন তার এ তরুণ সন্তানের মনে ব্যাপক ক্ষোভ আর যন্ত্রণা। তিনি অন্তরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করলেন এ সন্তান তার একার নয়। এ সন্তান এখন সারা ভিয়েতনামের সংগ্রামী মানুষের। তিনি হো চি মিনকে প্যারিস পাঠানোর চিন্তা করলেন। কিন্তু এ জন্য কারিগরি বিদ্যালয়ে পড়তে হবে তিন বছর। হো চি মিন তিন বছর সময় নষ্ট না করে একটি চাকরি জোগাড় করে ফেললেন। সায়গান আর ফ্রান্সের ভার্সাই বন্দরের মধ্যে যাতায়াতকারী এস এস লা তুচে ত্রিভেলি নামের এক জাহাজে চাকরি হলো তার। তিনি যাত্রা শুরু করলেন প্যারিসের পথে।ভার্সাই সম্মেলন এবং আট দফা দাবিপ্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ থেমে গেছে। কিন্তু সারা দুনিয়ার ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হয়নি। শেষ হয়নি বিভিন্ন জাতির ভাগ্য নির্ধারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর এ স্থানেই ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্রবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ভার্সাই চুক্তি নামে পরিচিত, নটরডেম প্যারিসে অবস্থিত। সাম্রাজ্যবাদী দস্যুরা সেই কাজ শেষ করার জন্য ১৯১৯ সালের বসন্তকালে সম্মিলিত হন ভার্সাইতে। উন্নত বিশ্বের নেতাদের যখন নিজেদের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বোমা ফাটান বিপ্লবী এই নেতা। বজ্রকণ্ঠে উত্থাপন করলেন আট দফা দাবি। ভিয়েতনামি জনগণের পক্ষ থেকে ‘জাতিসমূহের অধিকার’ শিরোনামে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কে এই প্রস্তাব উত্থাপনকারী যুবক? নগুয়েন ভ্যান কুং অর্থাৎ দেশপ্রেমিক নগুয়েন। শুরু হলো ছদ্মনাম গ্রহণের পালা। নাম হলো হো চি মিন, এর অর্থ আলোর দিশারী। ভার্সাইতে তার উপস্থাপিত মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, ফরাসি ও ভিয়েতনামিদের মধ্যে সমান অধিকার, জবরদস্তিমূলক শ্রম বিলোপ, লবণ কর রহিত এবং জবরদস্তিমূলক মদ্যপান ব্যবস্থার বাতিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রস্তাবই হলো সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের বিরুদ্ধে তার প্রথম আঘাত। ভিয়েতনামের ওপর কর্তৃত্বকারী ফ্রান্সের বুকে বসে ফরাসি উপনিবেশবাদবিরোধী তার পিতৃ-মাতৃভূমির মুক্তির সনদ দাখিল করলেন হো চি মিন। অবাক বিস্ময়ে দেখল বিশ্ব!দেশে দেশে বিপ্লবী ভাষণবিপ্লবী মহান এই নেতা ভিয়েতনামকে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন আন্দোলন করে গেছেন। ১৯২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের প্যারিস সফরে যান। সেখানে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির ১৮৩তম অধিবেশনে যোগ দেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের নিপীড়নের কথা। দেশের মানুষের ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমে বিপ্লব গড়ে তুলতে গঠন করেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ। অনেক সংগ্রামের পর ভিয়েতনামে শেষ হয় ফরাসি শাসন। ভিয়েতনামের আলোর দিশারি হো চি মিন তার ভাষণে বলেন, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, বিপ্লবের জন্য আপনাদের সাহায্য করার প্রয়োজনে আজ এখানে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে স্বীকার করছি যে, আমার জন্মভূমিতে যে ঘৃণ্য ও অবিচার সংঘটিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কমিউনিস্ট হিসেবে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা অবগত আছেন, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় হতে চলল ফরাসি পুঁজিবাদী শোষকগোষ্ঠী ইন্দোচীনে তার হিংস্র রূপ নিয়ে এ অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনে বেয়নেটের শক্তিতে তারা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। শুরু থেকে আজ অবধি আমাদের ওপর শুধু যে নির্যাতন ও শোষণ চলছে তাই নয়, চলছে অবাধ হত্যাকাণ্ড ও বিষ প্রয়োগও। পুঁজিবাদী লুটেরারা ইন্দোচীনের ওপর কী পরিমাণ কুৎসিত নিপীড়ন চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে তার বিশদ বর্ণনা সামান্য কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনাদের সামনে উপস্থিত করা সম্ভব নয়।’ এ ছাড়া ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হো চি মিন কমিন্টার্নের নির্দেশে চীনের ক্যান্টনে বলেন, ‘একজন মানুষ যা চাইবে ইন্দোচীনে তার সবই আছে। যেমন বন্দর, খনি, বিস্তীর্ণ শস্যখেত, বিরাট বনভূমি এবং যোগ্য ও কঠোর পরিশ্রমী শ্রেণি। কিন্তু আমাদের সংগঠন ও সংগঠকের বড্ড অভাব। সে কারণেই আমাদের শিল্প আর ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো মূল্য নেই। যদি তোমার যুবসমাজ জীবনের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।’না ফেরার দেশেমহান এই বিপ্লবী নেতা ১৯৬৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। হো চি মিন হয়তো তার জীবনকালে নিজ দেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। এখন নিশ্চয়ই মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল সেই মহান নেতা যখন দেখেন তার দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তখন তিনি নিশ্চয়ই আনন্দিত হন। কমরেড হো চি মিন আজও দুনিয়ার শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কাছে অসামান্য প্রেরণা।শৈশব থেকেই সংগ্রামীনগুয়েন ভ্যান কুং, নগুয়েন তাত থান, ভুয়ং সন নিহি, লিনভ এবং হো চি মিন প্রতিটি নাম একজন মানুষেরই। প্রথম দুটি ছদ্ম নাম হলেও শেষের নামটিতে তাকে সবাই চেনেন। ছেলেবেলায় আদর করে ‘আঙ্কেল হো’ বলে ডাকা হতো। ১৮৯০ সালের ১৯ মে তার জন্ম। ফরাসি আশ্রিত রাজ্য আন্নামের নগেয়ান প্রদেশের হোয়াংট্রু গ্রামটি তার জন্মস্থান হলেও শৈশব কাটে কিম লিয়েন গ্রামে। বাবার নাম নগুয়েন হুই ওরফে নগুয়েন সিন সাক ছিলেন ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান। দাসত্বের এ জীবন সিন সাকের ভালো লাগত না। তাই মুক্তির উপায় হিসেবে শিক্ষাকে বেছে নেন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পড়াশোনা করে হয়ে ওঠেন শিক্ষক। প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পণ্ডিত আন তার বড় মেয়ে হোয়াং আই লোয়ানের সঙ্গে তার বিয়ে দেন। হো চি মিনের মা হোয়াং আই লোয়ানও পরিশ্রমী নারী ছিলেন। বাবা-মায়ের মতো হো চি মিনের জীবন সংগ্রামও শুরু হয় শৈশব থেকেই। তার বাবার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন। তার যখন বয়স ১০ তখন তারা গ্রাম ছেড়ে বাবার শিক্ষকতা পেশা শুরু করার জন্য হুয়েং শহরে চলে আসেন। সংসারে তিন ভাই-বোনের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো হো চি মিনের বাবার। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হতো হো চি মিনের মায়ের। এভাবে মা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মারা যান হো চি মিনের মা। মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন তিনি। তার বাবাও হতাশায় পড়েন। ঠিক করা হলো হো চি মিনকে আবারও গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন। হুয়েং শহর ছেড়ে হো চি মিন আবারও চলে আসেন তার প্রিয় সবুজ ঘেরা গ্রামে।পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে১৯০৪ সালে তরুণ হো চি মিন দ্বিতীয়বারের মতো পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে। গ্রামে থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করেন তাকে আরও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাই পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তিনি নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষ এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে যান। তার একটাই উপলব্ধি ছিল, ‘শিখতে হবে মানুষের কাছ থেকে, জানতে হবে পৃথিবীকে।’ ১৯০৭ সালে হো চি মিন বিদ্যালয়ের পড়াশোনা বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই শেষ করেন। তার পড়াশোনা শেষ হতেই ভিয়েতনামজুড়ে চলতে থাকে খণ্ড খণ্ড ফরাসিবিরোধী বিক্ষোভ। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের মাটি থেকে বিদেশিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। শহরে এসেই বুঝতে পারলেন নিজেদের মাতৃভূমিতে তাদের কোনো অধিকার নেই। তাদের দেশ শাসন করছে ফরাসিরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফরাসি নাগরিক। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েতনামি হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারও কিছু বলার সাহস ছিল না। স্কুলেই এমন পরাধীনতা তাকে আরও বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত করে। সে সময় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আন্দোলন হলেও সুসংগঠিত কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ঠিক এ সময়ে হুয়েং শহরে গড়ে ওঠে এক গোপন বিপ্লবী সংগঠন। হো চি মিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে প্রচারপত্র বিলি করতেন এবং বোঝাতেন, অত্যাচারী ফরাসিদের দেশ থেকে বিতাড়িত না করলে দেশে শান্তি আসবে না। বিদেশি শাসন-শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ এ আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শেপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন, ঠিক তখনই তিনি ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শে। কীভাবে তিনি লেনিনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, তা নিজেই লিখেছেন- ‘গোড়ার দিকে, সাম্রাজ্যবাদ নয়, দেশপ্রেমই আমাকে লেনিন ও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রতি বিশ্বাসী করে তুলেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সংগ্রামে, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ অধ্যয়ন আর তার পাশাপাশি বাস্তব কার্যকলাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি যে, কেবল সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই সমস্ত বিশ্বের নিপীড়িত জাতি এবং শ্রমজীবী জনগণকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে পারে।’বিশ্ব ভ্রমণেহো চি মিন সুদীর্ঘকাল এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ আর আমেরিকার দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাহাজের রসুইখানায় বাবুর্চির সহকারী হিসেবে। প্যারিসে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন তা হলো নগরকেন্দ্রিক জীবনের পঙ্কিলতা। শিক্ষা সভ্যতার ছদ্মাবরণে বীভৎস ক্রিয়াকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত তার কাছে স্পষ্ট হয়। তার মনে হয় নগরীর ভদ্রজনেরা জরাগ্রস্ত পঙ্গু। সবাই মানসিক ব্যাধির ভুগন্ত রোগী। হো চি মিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাহাজের সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মিশতেন। আর নতুন করে পরিচিত হতেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে।"আলোর দিশারী"উনিশে মে জন্ম নিলেন সবুজ গ্রামের কোলে,দারিদ্র্যেরই কঠিন পাঠ নিলেন চোখের জলে।পরাধীনতার শিকল দেখে জ্বলে উঠল প্রাণ,মাটির মানুষ স্বপ্ন দেখল—মুক্ত হবে দেশ-প্রাণ।হুয়েং শহর, ছাত্রজীবন, শোষণেরই ছবি,ফরাসিদের ঔপনিবেশিক দম্ভ দেখেন কবি।মায়ের মৃত্যু, দুঃখ-বেদনা, নিঃস্ব ঘরের ক্ষয়,তবু তাঁরই হৃদয়জুড়ে মানুষেরই জয়।জানতে হবে বিশ্বটাকে, শিখতে হবে সবার,মানুষেরই মুখের ভাষায় খুঁজতে হবে ধার।জাহাজের সেই রসুইঘরে শ্রমের ঘ্রাণ মেখে,দেখলেন তিনি কত মানুষ বঞ্চনারই দেখে।এশিয়া আর আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকা,ঘুরে ঘুরে চিনলেন তিনি শোষণেরই লিখা।নগরীর ওই সভ্যতারও মুখোশ গেল খুলে,মানুষ তখন মানুষ খোঁজে পুঁজির ঘন কূলে।ভার্সাইয়ের সেই সভায় যখন বিশ্বনেতারা,ভাগের অঙ্কে ব্যস্ত তখন সাম্রাজ্যবাদীরা,তখন উঠে বজ্রকণ্ঠে এক তরুণের গান—জাতির অধিকার চাই, চাই মানুষের সম্মান।রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, চাই সমান অধিকার,জবরদস্তি শ্রমের অবসান, ভাঙুক শোষণ-কারাগার।লবণ করের বোঝা নামাও, মদের জুলুম থামাও,ভিয়েতনামের স্বাধীনতার দ্বারটি খুলে দাও।নগুয়েন নামে এলেন তিনি বিশ্বসভা-প্রাঙ্গণে,হো চি মিন নামটি পরে জ্বলে উঠল রণে।‘আলোর দিশারী’ নামটি যেন ইতিহাসের দীপ,অন্ধকারের বুক চিরে যায় তাঁর সংগ্রামের শিখা।লেনিনের সেই বাণী শুনে পেলেন নতুন পথ,মার্কসবাদে খুঁজে পেলেন মুক্তির অমোঘ রথ।দেশপ্রেম তাঁর পথ দেখালো বিশ্বমানবতার,শ্রমিক-কৃষক এক কাতারে—মুক্তি সবার।ক্যান্টনের সেই আহ্বান আজও বাজে কানে—সংগঠনহীন জাতি কভু জাগে না সংগ্রামে।যুবসমাজের শক্তি দিয়ে গড়তে হবে দেশ,নিপীড়নের প্রাচীর ভেঙে আনতে হবে রেশ।গড়লেন তিনি বিপ্লবী দল, জাগালেন জনতা,স্বাধীনতার স্বপ্ন হলো কোটি প্রাণের কথা।ফরাসি শাসন কাঁপল শেষে জনতারই রোষে,মুক্তির পতাকা উঠল তখন রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে।তারপর এলো নতুন শত্রু, সাম্রাজ্যবাদের ছায়া,মার্কিন বোমার আগুন নামে ভিয়েতনামের মায়া।ধানের ক্ষেতে, গ্রামের পথে, জ্বলল অগ্নিশিখা,তবু হো-র জনতা বলে—হারব না আর দীক্ষা।মৃত্যুও তাঁকে থামাতে পারেনি সংগ্রামেরই শেষে,তিন সেপ্টেম্বর উনিশশো ঊনসত্তর এল অবশেষে।উনআশি বছর বয়সে থামল তাঁর প্রাণ,কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে রইল মানুষেরই গান।তিনি নেই—তবু তাঁর পথে জাগে মুক্তিকামী,শোষিত মানুষের স্বপ্নজুড়ে আজও আছেন হো চি মিন।স্বাধীনতার অর্থ শুধু পতাকা ও ভূখণ্ড নয়,মানুষ যেন মর্যাদা পায়—সেই তো সত্য জয়।যেখানে কৃষক ঘামে ভেজে, শ্রমিক গড়ে ভোর,যেখানে ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে জমে অন্ধ ঘোর,সেখানে তাঁর ডাক শোনা যায়—ভাঙো বৈষম্য-জাল,মানুষেরই হাতে ফিরিয়ে দাও মানুষেরই কাল।বাংলার মাটিও দেখেছে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষণ,রক্ত দিয়ে স্বাধীন হলো প্রিয় স্বদেশভূমি তখন।সেই স্বাধীনতার পূর্ণতা কি বৈষম্যের মাঝে হয়?সমতা আর ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলাই জয়।হো চি মিনের জীবন তাই শুধু অতীত নয়,আজও শোষিত মানুষের প্রাণে তাঁরই পরিচয়।সাম্য, ন্যায়, অসাম্প্রদায়িক মুক্ত সমাজের গান—মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অমর তাঁর প্রাণ।লাল সালাম হে বিপ্লবী, আলোর দিশারী,তোমার পথে জাগুক আবার জনতারই সারি।শ্রমিক-কৃষক, মেহনতি জন এক হোক অবিরাম,বৈষম্যহীন পৃথিবীর তরে উঠুক মুক্তির নাম।হো চি মিন, তোমার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক প্রাণে,মুক্ত মানুষের নতুন ভোর ফুটুক বাংলার গানে।শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী হোক মহান—তোমার সংগ্রাম পথ দেখাক, জাগুক বিশ্বমানব প্রাণ।—( আলোর দিশারী,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই মহান এই নেতার জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।ভিয়েতনাম মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি মহানায়ক ও বিপ্লবী নেতা কমরেড হো চি মিন লাল সালাম ও বিপ্লবী অভিবাদন!সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

ভিয়েতনাম বিপ্লবের কিংবদন্তি মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream