বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

সনদ নয়, মানুষ গড়ার শিক্ষা: জ্ঞান, বিশ্বাস ও নৈতিকতার সমন্বয়


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

সনদ নয়, মানুষ গড়ার শিক্ষা: জ্ঞান, বিশ্বাস ও নৈতিকতার সমন্বয়

অধ্যাপক ড. দিপু সিদ্দিকী

অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ

ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ

শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, সনদধারী ও কর্মসংস্থানযোগ্য মানুষ তৈরি করা, নাকি জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা? বাংলাদেশের প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে এই প্রবন্ধে নাওয়াল এল সাদাউইয়ের শিক্ষাভাবনা, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষাদর্শ এবং ইসমাইল রাজী আল-ফারুকির Islamization of Knowledge  পরবর্তীতে Islamization of Education ধারণার আলোকে একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য হলো, জ্ঞানকে নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তা জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন, কর্মদক্ষতা, নৈতিক জবাবদিহি ও মানবিক বিকাশের সমন্বিত কেন্দ্রে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

মূল শব্দ: শিক্ষার উদ্দেশ্য, প্রকৃত জ্ঞান, বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা, নৈতিকতা, ইসলামাইজেশন অব নলেজ,ইসলামাইজেশন অব এডুকেশন ,গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার।

১. শিক্ষার সংকট: প্রকৃত জ্ঞানের পরিবর্তে ছদ্মজ্ঞান

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা যখন নতুন কোনো তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করার পরিবর্তে লেকচার শিট, সংক্ষিপ্ত নোট ও পরীক্ষার সাজেশনের অপেক্ষায় থাকে, তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পরীক্ষায় ভালো ফল করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই যদি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণার মানসিকতা সংকুচিত হয়।

মিশরীয় চিকিৎসক, লেখক ও চিন্তাবিদ নাওয়াল এল সাদাউই শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকটকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রদত্ত ইংরেজি প্রতিলিপিতে তিনি বলেন:

“We receive pseudo-knowledge and not real knowledge.”

অর্থাৎ, আমরা প্রকৃত জ্ঞানের পরিবর্তে ছদ্মজ্ঞান গ্রহণ করি।

সাদাউইয়ের ব্যাখ্যায় প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে আরও ভালো চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও পেশাজীবী হতে সাহায্য করবে—শুধু কারিগরি দক্ষতায় নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পেশাগত শিক্ষা লাভের পরও কেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ অন্য মানুষের অসহায়ত্বকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে?

তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

“I cannot teach creativity, because creativity is not taught. It’s something you have to live, from birth to death.”

এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, সৃজনশীলতা কেবল শ্রেণিকক্ষে একটি বিষয় পড়িয়ে তৈরি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, নতুন অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, কল্পনা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুই এই বিকাশে ভূমিকা রাখে।

সাদাউইয়ের সমালোচনা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, শিক্ষার্থীকে শুধু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো নয়; বরং প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, সমস্যাটির সামাজিক প্রেক্ষাপট কী এবং তার সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে, তা অনুসন্ধান করতে শেখাতে হবে।

২. জ্ঞান ও নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতা: দক্ষতা কার কল্যাণে?

একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করতে পারেন, একজন আইনজীবী আইনের জটিল ব্যাখ্যা দিতে পারেন এবং একজন প্রকৌশলী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে সততা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা যুক্ত না থাকলে সেই দক্ষতার অপব্যবহারও সম্ভব।

অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পরীক্ষা, অযৌক্তিক পেশাগত ব্যয়, আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার কিংবা নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের মতো ঘটনা এই সমস্যার উদাহরণ হতে পারে। তবে এসব উদাহরণ দিয়ে কোনো পেশার সব সদস্যকে অভিযুক্ত করা উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষাব্যবস্থা কি পেশাজীবীকে শুধু কাজ করার দক্ষতা দিচ্ছে, নাকি কাজটির নৈতিকতা ও সামাজিক পরিণতি বিচার করার ক্ষমতাও তৈরি করছে?

দক্ষতা মানুষকে কাজ করতে শেখায়; নৈতিকতা শেখায় সেই কাজটি কীভাবে ন্যায়সংগতভাবে করতে হবে।

এই দুইয়ের সমন্বয়ই প্রকৃত শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর অধিকার, আইনে ন্যায়বিচার, প্রকৌশলে জননিরাপত্তা, ব্যবসায় ভোক্তার স্বার্থ এবং শিক্ষায় ন্যায্য মূল্যায়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেশাগত নৈতিকতাকে বাস্তব পাঠ্যক্রমের অংশ করতে হবে।

নৈতিকতার শিক্ষা কেবল বইয়ের অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষক, প্রশাসক, গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আচরণেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব আচরণ থেকেও শেখে।

৩. অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফ: বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষার দর্শন

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বিশ্বাসভিত্তিক ও নৈতিক শিক্ষার আলোচনায় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের অবদান বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি এমন শিক্ষাদর্শের পক্ষে কাজ করেছেন, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিক বিকাশ এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে বলা হয়েছে, এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের লক্ষ্য ছিল Revealed Knowledge বা প্রত্যাদেশভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে Acquired Knowledge বা অর্জিত জ্ঞানের অর্থবহ সংযোগ তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘোষিত দর্শনে আধুনিক মানবিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তির সমন্বয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এই দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, জ্ঞান অর্জনের পর একজন মানুষ কী উদ্দেশ্যে সেই জ্ঞান ব্যবহার করবেন?

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ তার কর্মের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে। এই বিশ্বাস একজন মানুষের মধ্যে এমন অভ্যন্তরীণ নৈতিক প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে, যা বাহ্যিক তদারকি না থাকলেও তাকে সততা, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।

একজন চিকিৎসক যদি বিশ্বাস করেন যে রোগীর সঙ্গে তাঁর আচরণের জন্য তাঁকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, একজন প্রকৌশলী যদি জননিরাপত্তার সঙ্গে আপস করাকে নৈতিক দায়বদ্ধতার পরিপন্থী মনে করেন, কিংবা একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে অন্যায় করাকে নিজের বিশ্বাসের বিরোধী বলে বিবেচনা করেন, তাহলে বিশ্বাস তাঁর পেশাগত নৈতিকতার সহায়ক হতে পারে।

তবে বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা বলতে শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মীয় বিষয় পড়ানো বোঝায় না। এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো, বিশ্বাসের সঙ্গে সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, দায়িত্ববোধ ও বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে বহুধর্মীয় সমাজে সব মানুষের মর্যাদা, বিবেকের স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

৪. ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি ও ইসলামাইজেশন অব নলেজ

অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের শিক্ষাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ হলো Islamization of Knowledge বা জ্ঞানকে ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির আলোকে পুনর্বিবেচনা করার ধারণা।

ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan গ্রন্থে এই উদ্যোগের একটি সুসংবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেখানে আধুনিক জ্ঞানশাখাগুলোর ভিত্তি, পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুকে ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত করে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এই ধারণার তাৎপর্য শুধু শিক্ষাক্রমে ধর্মীয় বিষয় যুক্ত করা নয়। বরং জ্ঞানের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ, মানবজীবন সম্পর্কে ধারণা এবং জ্ঞানের সামাজিক ব্যবহারের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসা কিংবা প্রকৌশল—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞান কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, সে প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এর একটি কেন্দ্রীয় দিক।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: ইসলামাইজেশন অব নলেজ কোনো গবেষণার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বা যৌক্তিক বিশ্লেষণের বিকল্প নয়। বরং বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষার একটি সুসংহত রূপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, প্রমাণ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় থাকা উচিত।

সুতরাং, এই ধারণার কার্যকর প্রয়োগ হবে তখনই, যখন শিক্ষার্থী একদিকে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, অন্যদিকে সেই জ্ঞানের ব্যবহার নিয়ে নৈতিকভাবে চিন্তা করতে শিখবে।

৫. বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার: পরীক্ষার্থী থেকে জ্ঞানস্রষ্টা

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নৈতিক বিকাশের কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রথমত, মূল্যায়নব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বিশ্লেষণ, গবেষণা, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। লেকচার শিট ও সাজেশন সহায়ক উপকরণ হিসেবে থাকবে, কিন্তু সেগুলো যেন স্বাধীন চিন্তার বিকল্প না হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় শিল্পের সমস্যা, কৃষির উৎপাদনশীলতা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং গবেষণার ফল বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতার সংযোগ স্থাপন করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, ল্যাবরেটরি, বাস্তব প্রকল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রশিক্ষণ শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

চতুর্থত, শিক্ষাবাজেটকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধির সূচকে বিচার করা যাবে না। গবেষণা অনুদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং গবেষণার মান যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও ফলাফলের স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, শিক্ষার সামাজিক ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কতটা কর্মদক্ষ হয়েছে, কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেছে, কতটা নৈতিক আচরণ অনুশীলন করছে এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা অবদান রাখছে—এসব সূচক শিক্ষার মান নির্ধারণে বিবেচ্য হওয়া উচিত।

জাপানের শিক্ষায় দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতা এবং নরওয়ের শিক্ষাক্রমে সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে শিক্ষণীয়। তবে কোনো দেশের সামাজিক উন্নয়নকে শুধু শিক্ষার একটি উপাদানের ফল বলা যায় না; কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার: জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানবকল্যাণের সমন্বয়

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল সনদ অর্জন বা জীবিকা নির্বাহ নয়; বরং জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার সামর্থ্য অর্জন। নাওয়াল এল সাদাউইয়ের ছদ্মজ্ঞানবিরোধী সমালোচনা, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষাদর্শ এবং ইসমাইল রাজী আল-ফারুকির ইসলামাইজেশন অব নলেজ ধারণা—তিনটি ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে একই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: জ্ঞান অর্জনের পর মানুষ কেমন হবে এবং সেই জ্ঞান কাদের কল্যাণে ব্যবহার করবে?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন মানুষ তৈরি করতে হবে, যিনি দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়নিষ্ঠ, সৃজনশীলতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণে আগ্রহী। বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা এই নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তা বাস্তব আচরণ, মানবিকতা, যুক্তি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু পরীক্ষার ফল, সনদ কিংবা সমাবর্তনের জাঁকজমকে নয়; বরং তার শিক্ষার্থীদের চিন্তা, গবেষণা, পেশাগত সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

পরীক্ষার্থী নয়, জ্ঞানস্রষ্টা; শুধু দক্ষ পেশাজীবী নয়, নৈতিক মানুষ—এই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের যাত্রা শুরু হওয়া প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র ও পাঠ-সহায়িকা

১. El Saadawi, Nawal. শিক্ষাব্যবস্থা, ছদ্মজ্ঞান ও সৃজনশীলতা বিষয়ে বক্তব্য। 

২. Ashraf, Syed Ali. অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের শিক্ষাদর্শ, ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা-সংক্রান্ত প্রকাশনা ।

৩. Al-Faruqi, Isma’il Raji. Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan. International Institute of Islamic Thought, 1982.

৪. Darul Ihsan University. History এবং The Founder—প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাদর্শবিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ।

৫. North South University. A Brief History—বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ইতিহাস ও ১৯৯২ সালের আইনসংক্রান্ত বিবরণ।

লেখক: ডক্টর দিপু সিদ্দিকী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ,পরিচালক

আইকিউএসি,

ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ,রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা ।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


সনদ নয়, মানুষ গড়ার শিক্ষা: জ্ঞান, বিশ্বাস ও নৈতিকতার সমন্বয়

প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

অধ্যাপক ড. দিপু সিদ্দিকী

অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ

ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ


শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, সনদধারী ও কর্মসংস্থানযোগ্য মানুষ তৈরি করা, নাকি জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা? বাংলাদেশের প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে এই প্রবন্ধে নাওয়াল এল সাদাউইয়ের শিক্ষাভাবনা, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষাদর্শ এবং ইসমাইল রাজী আল-ফারুকির Islamization of Knowledge  পরবর্তীতে Islamization of Education ধারণার আলোকে একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য হলো, জ্ঞানকে নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তা জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন, কর্মদক্ষতা, নৈতিক জবাবদিহি ও মানবিক বিকাশের সমন্বিত কেন্দ্রে রূপান্তর করা প্রয়োজন।


মূল শব্দ: শিক্ষার উদ্দেশ্য, প্রকৃত জ্ঞান, বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা, নৈতিকতা, ইসলামাইজেশন অব নলেজ,ইসলামাইজেশন অব এডুকেশন ,গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার।


১. শিক্ষার সংকট: প্রকৃত জ্ঞানের পরিবর্তে ছদ্মজ্ঞান

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা যখন নতুন কোনো তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করার পরিবর্তে লেকচার শিট, সংক্ষিপ্ত নোট ও পরীক্ষার সাজেশনের অপেক্ষায় থাকে, তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পরীক্ষায় ভালো ফল করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই যদি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণার মানসিকতা সংকুচিত হয়।


মিশরীয় চিকিৎসক, লেখক ও চিন্তাবিদ নাওয়াল এল সাদাউই শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকটকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রদত্ত ইংরেজি প্রতিলিপিতে তিনি বলেন:


“We receive pseudo-knowledge and not real knowledge.”


অর্থাৎ, আমরা প্রকৃত জ্ঞানের পরিবর্তে ছদ্মজ্ঞান গ্রহণ করি।


সাদাউইয়ের ব্যাখ্যায় প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে আরও ভালো চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও পেশাজীবী হতে সাহায্য করবে—শুধু কারিগরি দক্ষতায় নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পেশাগত শিক্ষা লাভের পরও কেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ অন্য মানুষের অসহায়ত্বকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে?


তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:


“I cannot teach creativity, because creativity is not taught. It’s something you have to live, from birth to death.”


এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, সৃজনশীলতা কেবল শ্রেণিকক্ষে একটি বিষয় পড়িয়ে তৈরি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, নতুন অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, কল্পনা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুই এই বিকাশে ভূমিকা রাখে।


সাদাউইয়ের সমালোচনা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, শিক্ষার্থীকে শুধু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো নয়; বরং প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, সমস্যাটির সামাজিক প্রেক্ষাপট কী এবং তার সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে, তা অনুসন্ধান করতে শেখাতে হবে।


২. জ্ঞান ও নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতা: দক্ষতা কার কল্যাণে?

একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করতে পারেন, একজন আইনজীবী আইনের জটিল ব্যাখ্যা দিতে পারেন এবং একজন প্রকৌশলী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে সততা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা যুক্ত না থাকলে সেই দক্ষতার অপব্যবহারও সম্ভব।


অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পরীক্ষা, অযৌক্তিক পেশাগত ব্যয়, আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার কিংবা নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের মতো ঘটনা এই সমস্যার উদাহরণ হতে পারে। তবে এসব উদাহরণ দিয়ে কোনো পেশার সব সদস্যকে অভিযুক্ত করা উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষাব্যবস্থা কি পেশাজীবীকে শুধু কাজ করার দক্ষতা দিচ্ছে, নাকি কাজটির নৈতিকতা ও সামাজিক পরিণতি বিচার করার ক্ষমতাও তৈরি করছে?


দক্ষতা মানুষকে কাজ করতে শেখায়; নৈতিকতা শেখায় সেই কাজটি কীভাবে ন্যায়সংগতভাবে করতে হবে।


এই দুইয়ের সমন্বয়ই প্রকৃত শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর অধিকার, আইনে ন্যায়বিচার, প্রকৌশলে জননিরাপত্তা, ব্যবসায় ভোক্তার স্বার্থ এবং শিক্ষায় ন্যায্য মূল্যায়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেশাগত নৈতিকতাকে বাস্তব পাঠ্যক্রমের অংশ করতে হবে।


নৈতিকতার শিক্ষা কেবল বইয়ের অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষক, প্রশাসক, গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আচরণেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব আচরণ থেকেও শেখে।


৩. অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফ: বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষার দর্শন

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বিশ্বাসভিত্তিক ও নৈতিক শিক্ষার আলোচনায় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের অবদান বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি এমন শিক্ষাদর্শের পক্ষে কাজ করেছেন, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিক বিকাশ এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়।


দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে বলা হয়েছে, এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের লক্ষ্য ছিল Revealed Knowledge বা প্রত্যাদেশভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে Acquired Knowledge বা অর্জিত জ্ঞানের অর্থবহ সংযোগ তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘোষিত দর্শনে আধুনিক মানবিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তির সমন্বয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।


এই দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, জ্ঞান অর্জনের পর একজন মানুষ কী উদ্দেশ্যে সেই জ্ঞান ব্যবহার করবেন?


ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ তার কর্মের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে। এই বিশ্বাস একজন মানুষের মধ্যে এমন অভ্যন্তরীণ নৈতিক প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে, যা বাহ্যিক তদারকি না থাকলেও তাকে সততা, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।


একজন চিকিৎসক যদি বিশ্বাস করেন যে রোগীর সঙ্গে তাঁর আচরণের জন্য তাঁকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, একজন প্রকৌশলী যদি জননিরাপত্তার সঙ্গে আপস করাকে নৈতিক দায়বদ্ধতার পরিপন্থী মনে করেন, কিংবা একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে অন্যায় করাকে নিজের বিশ্বাসের বিরোধী বলে বিবেচনা করেন, তাহলে বিশ্বাস তাঁর পেশাগত নৈতিকতার সহায়ক হতে পারে।


তবে বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা বলতে শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মীয় বিষয় পড়ানো বোঝায় না। এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো, বিশ্বাসের সঙ্গে সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, দায়িত্ববোধ ও বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে বহুধর্মীয় সমাজে সব মানুষের মর্যাদা, বিবেকের স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।


৪. ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি ও ইসলামাইজেশন অব নলেজ

অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের শিক্ষাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ হলো Islamization of Knowledge বা জ্ঞানকে ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির আলোকে পুনর্বিবেচনা করার ধারণা।


ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan গ্রন্থে এই উদ্যোগের একটি সুসংবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেখানে আধুনিক জ্ঞানশাখাগুলোর ভিত্তি, পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুকে ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত করে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।


এই ধারণার তাৎপর্য শুধু শিক্ষাক্রমে ধর্মীয় বিষয় যুক্ত করা নয়। বরং জ্ঞানের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ, মানবজীবন সম্পর্কে ধারণা এবং জ্ঞানের সামাজিক ব্যবহারের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসা কিংবা প্রকৌশল—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞান কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, সে প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এর একটি কেন্দ্রীয় দিক।


এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: ইসলামাইজেশন অব নলেজ কোনো গবেষণার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বা যৌক্তিক বিশ্লেষণের বিকল্প নয়। বরং বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষার একটি সুসংহত রূপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, প্রমাণ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় থাকা উচিত।


সুতরাং, এই ধারণার কার্যকর প্রয়োগ হবে তখনই, যখন শিক্ষার্থী একদিকে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, অন্যদিকে সেই জ্ঞানের ব্যবহার নিয়ে নৈতিকভাবে চিন্তা করতে শিখবে।


৫. বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার: পরীক্ষার্থী থেকে জ্ঞানস্রষ্টা

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নৈতিক বিকাশের কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।


প্রথমত, মূল্যায়নব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বিশ্লেষণ, গবেষণা, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। লেকচার শিট ও সাজেশন সহায়ক উপকরণ হিসেবে থাকবে, কিন্তু সেগুলো যেন স্বাধীন চিন্তার বিকল্প না হয়ে ওঠে।


দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় শিল্পের সমস্যা, কৃষির উৎপাদনশীলতা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং গবেষণার ফল বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।


তৃতীয়ত, কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতার সংযোগ স্থাপন করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, ল্যাবরেটরি, বাস্তব প্রকল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রশিক্ষণ শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।


চতুর্থত, শিক্ষাবাজেটকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধির সূচকে বিচার করা যাবে না। গবেষণা অনুদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং গবেষণার মান যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও ফলাফলের স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।


পঞ্চমত, শিক্ষার সামাজিক ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কতটা কর্মদক্ষ হয়েছে, কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেছে, কতটা নৈতিক আচরণ অনুশীলন করছে এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা অবদান রাখছে—এসব সূচক শিক্ষার মান নির্ধারণে বিবেচ্য হওয়া উচিত।


জাপানের শিক্ষায় দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতা এবং নরওয়ের শিক্ষাক্রমে সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে শিক্ষণীয়। তবে কোনো দেশের সামাজিক উন্নয়নকে শুধু শিক্ষার একটি উপাদানের ফল বলা যায় না; কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।


উপসংহার: জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানবকল্যাণের সমন্বয়

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল সনদ অর্জন বা জীবিকা নির্বাহ নয়; বরং জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার সামর্থ্য অর্জন। নাওয়াল এল সাদাউইয়ের ছদ্মজ্ঞানবিরোধী সমালোচনা, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষাদর্শ এবং ইসমাইল রাজী আল-ফারুকির ইসলামাইজেশন অব নলেজ ধারণা—তিনটি ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে একই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: জ্ঞান অর্জনের পর মানুষ কেমন হবে এবং সেই জ্ঞান কাদের কল্যাণে ব্যবহার করবে?


বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন মানুষ তৈরি করতে হবে, যিনি দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়নিষ্ঠ, সৃজনশীলতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণে আগ্রহী। বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা এই নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তা বাস্তব আচরণ, মানবিকতা, যুক্তি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত হয়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু পরীক্ষার ফল, সনদ কিংবা সমাবর্তনের জাঁকজমকে নয়; বরং তার শিক্ষার্থীদের চিন্তা, গবেষণা, পেশাগত সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।


পরীক্ষার্থী নয়, জ্ঞানস্রষ্টা; শুধু দক্ষ পেশাজীবী নয়, নৈতিক মানুষ—এই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের যাত্রা শুরু হওয়া প্রয়োজন।


তথ্যসূত্র ও পাঠ-সহায়িকা

১. El Saadawi, Nawal. শিক্ষাব্যবস্থা, ছদ্মজ্ঞান ও সৃজনশীলতা বিষয়ে বক্তব্য। 


২. Ashraf, Syed Ali. অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের শিক্ষাদর্শ, ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা-সংক্রান্ত প্রকাশনা ।


৩. Al-Faruqi, Isma’il Raji. Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan. International Institute of Islamic Thought, 1982.


৪. Darul Ihsan University. History এবং The Founder—প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাদর্শবিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ।


৫. North South University. A Brief History—বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ইতিহাস ও ১৯৯২ সালের আইনসংক্রান্ত বিবরণ।


লেখক: ডক্টর দিপু সিদ্দিকী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ,পরিচালক

আইকিউএসি,

ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ,রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা ।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream