রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তবে প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া গেলে আগামী ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।শনিবার (১৭ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা পাওয়ার পর এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ সংক্রান্ত তথ্য যাত্রীদের যথাসময়ে জানানো হবে।অন্যদিকে, সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা রুটে বিমানের ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা এ দুটি বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত করতে পারবেন।যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে মদিনা রুটে বেশি যাত্রী বহনে সক্ষম উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে বিমান। আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ ব্যবস্থা চালু থাকবে। এরপর ১৯ অক্টোবর থেকে এ রুটে আগের মতো বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ চলবে।এ ছাড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে জেদ্দা রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, ফ্লাইট চলাচল ও সময়সূচি নিয়ে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য যথাসময়ে জানানো হবে। টিকিট, বুকিং ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্যের জন্য যাত্রীদের নিকটস্থ বিমানের বিক্রয় কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ইনানীর ওই রিসোর্ট ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল গত জুনে: ফায়ার সার্ভিস
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ‘টুপটুপ রিসোর্ট’ ফায়ার সার্ভিসের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই চলছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তিনি বলেন, গত জুনেই পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেই রিসোর্টটি অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর কাজী আলাউদ্দীন রোডে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক এ তথ্য জানান। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক প্রস্তুতি তুলে ধরতে মূলত এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন কাঠের তৈরি ওই রিসোর্টে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বেলা দেড়টা পর্যন্ত রিসোর্টটি থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, তিনতলা কাঠের তৈরি এই রিসোর্টের নিচতলায় রেস্তোরাঁ ছিল। সেখানে খাবার তৈরি করা হতো। আর দোতলা ও তিনতলায় ছিল পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। তবে ফায়ার সার্ভিসের নজরদারি ও বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। সুলতানুল আফরীন জানান, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশনের দূরত্ব ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরে তা পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা ও বৈধতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নোটিশের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। সামনে শুষ্ক মৌসুমে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আগুনের সূত্রপাত প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি নোটিশ দেওয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চালু থাকা এবং দেশজুড়ে এ ধরনের রিসোর্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের বিদ্যমান আইন, নজরদারির সীমাবদ্ধতা ও করণীয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। পুরান ঢাকায় ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড, অনুমোদনহীন কারখানা, গুদাম ও বিস্ফোরক পদার্থের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সরু রাস্তা এবং ভবনগুলোর পারস্পরিক দূরত্বের অভাব ফায়ার সার্ভিসের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এর ফলে অগ্নিনির্বাপণকারী ভারী গাড়ি ও সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড ও সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। পুরোনো বসতিগুলোতে রাতারাতি সব নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। নতুন ভবনের ক্ষেত্রে নিয়ম মানতে বারবার সচেতন করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ঘিঞ্জি ও সরু রাস্তায় দ্রুত পৌঁছাতে বিশেষ ধরনের তিন চাকার যান ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলে করে হোস পাইপ নিয়ে গিয়ে আশপাশের ভবনের পানির আধারের (রিজার্ভার) সঙ্গে যুক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানো যায় কি না, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩ স্পট পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর
সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩টি স্পট আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা ছাড়াও মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাতও ঘুরে দেখেন তিনি। শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে পরিদর্শন শুরু করে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এরপর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে যান। পরিদর্শনের অংশ হিসেবে তিনি মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, পাইকপাড়া স্টাফ কোয়ার্টার এবং সরকারি বাংলা কলেজ ঘুরে দেখেন। পরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে যান তিনি। সেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন এবং পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও বেশি বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। এ ছাড়া ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়, কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার এবং আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিদর্শনকালে বিভিন্ন স্থানের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের সময় দেন। এর আগে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী পরিদর্শন করে হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় দেন তিনি। পরিদর্শনের একপর্যায়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ওই চিকিৎসকের কক্ষও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের চেয়ারম্যানকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এর বাইরে মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাথ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন উপস্থিত ছিলেন। আকস্মিক এই পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বিডি-প্রতিদিন/বিএম
চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান এবং সুশাসনের রূপরেখা
আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে শিকড় গেড়ে বসা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং অপরাধমূলক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকার ও দলের প্রধানের আসন থেকে যে নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশার মাঝে এক ফালি স্বস্তির আলো হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সুনির্দিষ্ট ও আপসহীন নির্দেশনা দিয়েছেন, তা কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার ঘোষণা নয়; এটি এক নতুন ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যে আর পার পাবে না এবং সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে কঠোর নজরদারি বজায় রাখবেন-এই বার্তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রবিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সদস্যদের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাড়ে তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা এবং সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বিএনপিতে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনো স্থান নেই। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গণমাধ্যমকে জানান যে, দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় করে কেউ পার পাবে না-এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্টভাবে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার চাঁদাবাজ ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণের কড়া নির্দেশ দেওয়া হলো। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, দলের কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান সার্বিক পরিস্থিতি ও জবাবদিহির বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী তিনি মুখে নয়, নিজের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করে চলেছেন যে, তিনি এ দেশকে ও দেশের মানুষকে কতটা ভালোবাসেন। এর আগেও তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ও জঞ্জালের পাহাড় জমেছে এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নের স্বার্থে তিনি সেই পাহাড় ভেঙে চুরমার করে দিতে চান। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন নারী সংসদ সদস্যকে সরাসরি পদ থেকে অপসারণ করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মুখের বুলি নয়, কাজের মাধ্যমেই জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করছেন। চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে হলে শুধু ‘লেজ ধরে টানাটানি’ করলে চলবে না, সোজা ‘মাথা ধরে টান’ দিতে হবে। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দু-একজন চুনোপুঁটি বা স্থানীয় মাস্তানকে গ্রেপ্তার করে কিংবা দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে দায়সারা কাজ করার সংস্কৃতি চলে আসছে। কিন্তু এই ছোট অপরাধীদের পেছনে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক তোষামোদির চক্র কাজ করে, তাদের গায়ে হাত না দিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনীতি যখন জনসেবার পরিবর্তে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা চাঁদাবাজিকে নিজেদের ‘অধিকার’ বলে মনে করতে শুরু করে। এই চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা অবৈধ ক্ষমতার নানা সিঁড়ি বেয়ে বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং ওপরতলা থেকে আসা সবুজ সংকেত মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার ঠিক সেই মূল শিকড় বা মাথাতেই হাত দিয়েছেন। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত ক্ষমতার মূল স্রোত থেকে অপরাধের উচ্ছিষ্টভোগীদের বিচ্ছিন্ন করার মহড়া শুরু করেছেন। সংসদ সদস্যরা যদি তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, তবে অপরাধীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়তে বাধ্য। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি-একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য এসব অপরাধই যথেষ্ট। সাধারণ মানুষ যখন নিজের উপার্জন, ব্যবসা, জমি কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, তখন উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতিও তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারবেন কি না, একজন কৃষক তাঁর জমি ও ফসলের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন কি না, একজন সাধারণ নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিরাপদ থাকতে পারবেন কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হয় একটি সরকার মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য। এমন বাস্তবতায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিঃসন্দেহে জনমনে স্বস্তি ও প্রত্যাশা জাগানোর মতো একটি বার্তা। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব করে পার পাবে না, বিএনপিতে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনো স্থান নেই-প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন। জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার প্রতি দায়িত্বশীলতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য কেবল আইন প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত হন না; তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশারও একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাঁর এলাকায় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তিনি নীরব থাকতে পারেন না। অপরাধী নিজের দলের লোক হলেও তাঁকে প্রশ্রয় না দেওয়া, অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা তাঁর দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দায়িত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা দাবি, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি দখল এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ সংঘটনের যে ঝুঁকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বারবার সামনে এসেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসবে। মানুষ শুধু নতুন মুখ বা নতুন নেতৃত্ব দেখতে চায় না; তারা চায় দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা, ব্যবসায় স্বস্তি, সম্পত্তির নিশ্চয়তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কোনো ব্যবসায়ীকে যদি দোকান চালাতে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কারও অন্যায় দাবির মুখোমুখি হতে হয়, কোনো জমির মালিক যদি প্রভাবশালীদের কারণে নিজের সম্পত্তি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, কিংবা কোনো সাধারণ মানুষ যদি অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কা করেন, তাহলে সেই বাস্তবতায় সুশাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে বলা যায় না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে অবস্থান ঘোষণা করেছেন, সেটিকে কেবল একটি দলীয় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপ, অপরাধের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের ওপর। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী হিসেবে তাঁর সামনে যেমন ঐতিহাসিক প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেই প্রত্যাশার যথার্থতা প্রমাণের দায়িত্বও। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য কিংবা নির্বাচনী বিজয় একজন নেতাকে মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু সেই আস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় কাজের মাধ্যমে, বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সাফল্য তাই শুধু সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর নেতৃত্ব কতটা কার্যকর, তার একটি বড় মাপকাঠি হবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেছেন-এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন দেখতে হবে, সেই সতর্কবার্তা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয় এবং অপরাধের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতারা কী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ করা কোনো সহজ কাজ নয়। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের মধ্যে কখনো কখনো এমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা অপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারকে জটিল করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। আবার কোথাও প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল মৌখিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান শাস্তি। এখানে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় নজর রাখতে বলেছেন। কিন্তু এই নজরদারির অর্থ হওয়া উচিত অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতা করা, প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং নাগরিকদের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনো সংসদ সদস্যের কাজ হবে না ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা প্রশাসনকে আইনবহির্ভূত নির্দেশ দেওয়া। একইভাবে, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়, আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় যেমন জরুরি, তেমনি একে অপরের বৈধ এখতিয়ার ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মানও অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী নিজেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয় ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়ার এবং স্বজনপ্রীতি পরিহারের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রকৃত অর্থে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা না থাকলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়; আর জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে পেশিশক্তি, অর্থের প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পেলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হবে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিকার অর্থে স্বজনপ্রীতিমুক্ত প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করা এবং জনগণের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারেন, তাহলে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের প্রার্থীরাও একই নিয়মের আওতায় থাকছেন কি না, তার ওপর। চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনীতি। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানমালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, নির্মাণ ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবা খাতের মানুষ যদি অবৈধ আর্থিক দাবির মুখে পড়েন, তাহলে তাঁদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম, সেবার মূল্য কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনাগ্রহী হতে পারেন, যেখানে সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিচালনার নিশ্চয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে আরও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজলভ্য ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর পর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা প্রত্যাহার, তদন্ত বাধাগ্রস্ত করা কিংবা অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কতগুলো অভিযোগ তদন্ত হলো, কতগুলো প্রমাণিত হলো এবং কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো-এসব বিষয়ে নিয়মিত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ করলে সরকারি অঙ্গীকারের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগের পর সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার যে তথ্য আলোচনায় এসেছে, সেটিও দলীয় জবাবদিহির প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তবে এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, অভিযোগের প্রকৃতি এবং গৃহীত ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিত। কোনো ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য তখনই স্থায়ী হয়, যখন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে নেওয়া ব্যবস্থা একটি ধারাবাহিক নীতিতে পরিণত হয় এবং একই ধরনের অভিযোগে অন্যদের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। আসন্ন দুর্গাপূজায় হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটিও নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদে ধর্ম পালন, উপাসনালয় রক্ষা এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে, তাদের সম্পত্তি দখল করে কিংবা উৎসব পালনে বাধা দিয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের; কোনো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা যেন কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থাকে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই আমরা রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে অপরাধীদের পুনর্বাসিত হতে দেখেছি। এক দলের আমলে কোণঠাসা হওয়া চাঁদাবাজ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দলের ব্যানার জড়িয়ে পুনরায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে-এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। অপরাধীকে যদি এক দল বহিষ্কার করে, তবে সে অন্য দলের ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করে। এই চক্রাকারে ঘুরতে থাকা অপরাধের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সাধারণ ইস্যুতে এক টেবিলে বসতে হবে এবং স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে-চাঁদাবাজ ও অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারবে না। চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য করা যাবে না এবং তাদের আজীবনের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, আপনি সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এক টেবিলে বসুন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সর্বসম্মত ‘জাতীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য’ গড়ে তুলুন এবং এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চূড়ান্ত জাতীয় অভিযান ঘোষণা করুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি নিজের দলের নেতাকর্মীদের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পারেন যে, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস কিংবা দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই সুরক্ষা দেবে না, তাহলে তাঁর ঘোষিত অবস্থান সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। এ জন্য সংসদ সদস্যদের শুধু সতর্ক করলেই হবে না; তাঁদের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে হবে, অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। তবে কোনো সরকার বা নেতার প্রতি আস্থা কেবল প্রশংসা কিংবা প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার ভিত্তি গড়ে ওঠে বাস্তব ফলাফলে। প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার প্রতিফলন যদি বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি-সম্পত্তি, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, তাহলেই এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না, অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পাবে না এবং ন্যায়বিচারের জন্য সাধারণ মানুষকে ক্ষমতাবান কারও দ্বারস্থ হতে হবে না। তারেক রহমানের ঘোষিত কঠোর অবস্থান সেই প্রত্যাশা পূরণের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলেই মনে হচ্ছে। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে কার্যকর নীতিতে,ধারাবাহিক পদক্ষেপে এবং দৃশ্যমান জনস্বস্তিতে রূপান্তর করা। সুতরাং আমি মনে করি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সাফল্যই হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সবচেয়ে বড় বিজয়। পরিশেষে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের এই যাত্রায় যদি আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করি, তবে অচিরেই বাংলাদেশ চাঁদাবাজ-দখলবাজমুক্ত একটি নিরাপদ, মানবিক ও উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে-ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবাহানাতালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: [email protected] বিডি-প্রতিদিন/বিএম
বিআইডিএসের মহাপরিচালক এনামুল হক বলেছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো না গেলে কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে এবং অনেকে কৃষি ছেড়ে দিতে পারেন। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?
চকবাজারে বহুতল ভবনে অ'গ্নি'কা'ণ্ড: ভবনের ভেতরে ব্যবসায়ী আটকে পড়ার লোমহর্ষক বর্ণনা
চকবাজারে বহুতল ভবনে অ'গ্নি'কা'ণ্ড: ভবনের ভেতরে ব্যবসায়ী আটকে পড়ার লোমহর্ষক বর্ণনা
করোনার মত ডেঙ্গু বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টে মানুষের জীবন ধ্বংস করছে, ডাঃ মারুফ শাহরিয়ার
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে ফুয়াদ
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মন্দির পাহারা দিয়েছে: রাশেদ খান
সেইদিন যারা গুপ্ত ছিলো, আজ তারা মুক্ত হয়েছে; এরাই ভারতীয় গুপ্ত: কর্নেল (অব.) মিয়া মশিউজ্জামান
সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে মাঠে বানিয়াজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মিরন মিয়া
আবরার ফাহাদ হত্যার পর ছাত্রলীগের মিছিলে সাদিক কায়েম: ছবি দেখিয়ে প্রমান দিলেন নুরুল হক নুর