সৈয়দপুরের এটিও এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন
নীলফামারীর সৈয়দপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মরিয়ম নেছার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি এটিও এবং অভিযোগকারী প্রধান শিক্ষক উভয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করবে। কারণ ইতোপূর্বে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ করেছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমিদাতা ও সাবেক সভাপতি। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।আদেশে বলা হয়, সৈয়দপুর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছার বিরুদ্ধে শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহানাজ আখতার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাছাড়া ইতোপূর্বে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ করেছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমিদাতা ও সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম পাটোয়ারী। এই উভয় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত কমিটিকে আগামী ১০ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে ডিমলা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বীরেন্দ নাথ রায়কে আহ্বায়ক করে ডোমার উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আফজালুল হক ও নীলফামারী সদর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাসকে সদস্য করা হয়েছে। জানা যায়, প্রায় ৪ বছর ধরে মরিয়ম নেছা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে সৈয়দপুর উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহানাজ আখতারের কাছে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি। অথচ এখনো সেই বরাদ্দ মেলেনি। এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের স্লিপের টাকা (উন্নয়ন বরাদ্দ) তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ইতোপূর্বে তিনি স্কুলের বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্পের মটর, আগুন নেভানোর যন্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করেছেন। প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ এসবের প্রতিবাদ করায় তিনি ক্ষিপ্ত। একারণে কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। ওই সহকারী শিক্ষকরা স্কুলে এসে ঘুমানোসহ নানা অশোভন কর্মকাণ্ড করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা জীবন অনিশ্চিত করে ফেলেছে। এসব নিয়ে কথা বললেই এটিও মরিয়ম নেছা বলেন, সচিব মন্ত্রীকে অভিযোগ দিলেও কিছু হবেনা বরং তিনি শিক্ষা কর্মকর্তা (টিও) হয়ে আসলে মজা দেখাবে। তাই প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এদিকে প্রায় এক বছর আগে স্কুলের জমিদাতা ও পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম পাটোয়ারী এই প্রধান শিক্ষক ও এটিও এর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ করেন। এব্যাপারে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রীর কাছেও লিখিত অভিযোগ পাঠান। কিন্তু সেসময় কেউ কর্ণপাত না করায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে স্কুলের সামনে মানববন্ধন করেন এবং প্রায় ৪১ জনের যৌথ স্বাক্ষরিত অভিযোগ প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। এসব বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার প্রেক্ষিতে তখন একটা তদন্ত কমিটি করা হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অভিযোগ রয়েছে এটিও এবং প্রধান শিক্ষক মিলে টাকার বিনিময়ে তৎকালীন ইউএনও এবং টিও কে ম্যানেজ করে ওই তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে তাদের অন্যায় ধামাচাপা দেয়। এক পর্যায়ে অভিযোগকারী সাবেক সভাপতি ও এলাকার ইউপি মেম্বার নুরনবী সরকার কে নতুন কমিটির সদস্য করার আশ্বাসে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় হঠাৎ করে প্রধান শিক্ষক এটিও এর বিরুদ্ধে টিও এর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ায় নতুন করে আলোচনায় আসে শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সূত্র মতে সম্প্রতি প্রধান শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সামনেই এটিও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এতে আত্মসম্মান বোধ থেকে প্রধান শিক্ষক এটিও এর জারিজুরি ফাঁস করে প্রতিশোধ নিতে এমন অভিযোগ তুলেছেন। তবে তা আত্মঘাতী হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ উভয় অভিযোগ তদন্তে দুইজনই ফেঁসে যাবেন বলে দাবি ওই সূত্রের। এবিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক শাহানাজ আখতার বলেন, এর আগে যে অপকর্ম হয়েছে তা এটিও মরিয়ম নেছার কারণেই হয়েছে। এতে আমার কোন দোষ নেই। বাধ্য হয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কথামতো কাজ করেছি মাত্র। অনেকটা ব্লাকমেল করেছেন তিনি। তাই আমি চাই তদন্ত হোক। কিন্তু এটিও মরিয়ম নেছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে সাংবাদিক উপস্থিতি টের পেয়ে সেখান থেকে সটকে পড়েন। পরে তার মুঠোফোনে কল দিলে বলেন ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে আসছেন। তারপরও না আসায় বিকাল ৪ টায় আবার কল দিলে বলেন, আমি একটা স্কুলে ব্যস্ত আছি। কিন্তু কোন স্কুলে আছেন তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং এরপরে আর কোন কল রিসিভ করেননি। ফলে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লাঞ্চের কথা বলে অফিস ত্যাগ করেন এবং আর ফেরেননি ও কলও রিসিভ করেননি। বাধ্য হয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রবিউল ইসলামকে কল দিলে মুঠোফোনে তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তদন্ত প্রতিদবেন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।