ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগে সর্বনিম্ন একাডেমিক ফলধারী এক প্রার্থী নিয়োগ পাচ্ছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে। নিয়োগ বোর্ডে অংশগ্রহণকারী ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৭ প্রার্থীর মধ্যে সর্বনিম্ন ফলধারী প্রার্থীর নাম ফিরোজা নাজনীন। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের সাহিত্য, সাংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং একই বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক আইসিটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ৭ প্রার্থী আবেদন করেন। পরে তারা সবাই নিয়োগ বোর্ডে অংশগ্রহণ করেন এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে সবাইকে ভাইভা থেকে বাদ দিয়ে একাডেমিক বিষয়ে সর্বনিম্ন ফলধারী প্রার্থী ফিরোজা নাজনীনকে গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭৪তম সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নিউজ হলে এক সিন্ডিকেট সদস্যের আপত্তির প্রেক্ষিতে ঘটনা খতিয়ে দেখতে চায় ইবি উপাচার্য। এরপর প্রার্থীর বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে বেশকিছু গণমধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ওই প্রার্থীর পূর্ববর্তী একাডেমিক ফলাফল যাচাইয়ে তিন সদস্যের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে। পরে কমিটি যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে গুঞ্জন উঠেছে রবিবার (১ নভেম্বর) সিন্ডিকেটে বিতর্কিত ও সর্বনিম্ন ফলধারী ওই প্রার্থী নিয়োগ পেতে চলেছে।
রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ওঠা প্রার্থী ফিরোজা নাজনীন ৭ প্রার্থীর মধ্যে সর্বনিম্ন ফলধারী। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থী ফিরোজা নাজনীন ১টি রিটেক ও ৩টি মানোন্নয়ন পরীক্ষার পর স্নাতকে ৩.৫৯ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৬৪ সিজিপিএ পান। তার এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০ এবং এসএসসিতে জিপিএ ৫.০০ ছিল। আরেক প্রার্থী আবু রোম্মান রিফাত ইবির আইসিটি বিভাগ থেকে স্নাতকে ৩.৭৮ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৯১ সিজিপিএ অর্জন করেন। এছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় তিনি জিপিএ ৫ লাভ করেন।
আরেক প্রার্থী খন্দকার তাসনিয়া হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকে ৩.৯২ এবং স্নাতকোত্তরে ৪.০০ সিজিপিএ অর্জন করেছেন। এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় তার ফলাফল জিপিএ ৫।
প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম-(১) ইবির আইসিটি বিভাগ থেকে স্নাতকে ৩.৬৯ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৭৯ সিজিপিএ অর্জন করেছেন। এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় তারও ফলাফল জিপিএ ৫। অন্য প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম-২ একই বিভাগ থেকে স্নাতকে ৩.৯৫ সিজিপিএ পেয়ে অনুষদে প্রথম স্থান অর্জন করেন। স্নাতকোত্তরে তার সিজিপিএ ৩.৮৮। এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় তিনিও জিপিএ ৫ পেয়েছেন।
আইসিটি বিভাগের আরেক সাবেক শিক্ষার্থী শারমীন তাজরিয়া অনন্যা স্নাতকে ৩.৬৪ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৭৯ সিজিপিএ অর্জন করেছেন। তারও এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষার ফলাফল জিপিএ ৫। এছাড়া মাসুদ রানা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি স্নাতকে ৩.৭২ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৭৯ সিজিপিএ অর্জন করেছেন। তার এসএসসিতে জিপিএ ৪.৬৯ এবং এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৫০।
৭ প্রার্থীর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব প্রার্থীর থেকে একাডেমিক ফলাফলে সবথেকে নিম্নে অবস্থান করছেন ফিরোজা নাজনীন। এছাড়া বাকি প্রার্থীর থিসিস থাকলেও, নন থিসিসের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর সময়ে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি ফিরোজা নাজনীন। ওই পরীক্ষায় ১০ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের প্রশাসনের প্রথম নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আইসিটি বিভাগে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ভিন্ন দুটি বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় তার ফলাফলের এই পার্থক্য নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। তবে রবিবার (১ নভেম্বর) সিন্ডিকেট সভায় ৪ মাসের অধিক সময় থেকে ঝুলে থাকা নিয়োগের ফাইনাল সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. রোকসানা মিলি বলেন, “আমরা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিবেন।”
এ বিষয়ে জানতে চাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানকে একাধিকবার কল করলেও পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সাহিত্য, সাংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও আইসিটি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফিরোজা নাজনীনকে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভাগে টেম্পারিং করে স্ত্রীর ফলাফল বৃদ্ধি, পরপর দুইবার পরীক্ষা কমিটির সভাপতি, নিয়োগ বোর্ডের আগে এক্সপার্টের সঙ্গে আবাসিক হোটেলে স্বামীর সাক্ষাৎ ও সাংবাদিক ম্যানেজসহ নানা অভিযোগ উঠে।
সর্বনিম্ন রেজাল্টধারী বিএনপি শিক্ষক নেতার স্ত্রীকে শিক্ষক বানাচ্ছে ইবি!
মতামত