বরিশালের উজিরপুরে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু সংযোগ সড়কের অভাবে দেড় বছর ধরে কার্যত অকেজো পড়ে আছে। সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও দুই পাশে পূর্ণাঙ্গ সংযোগ সড়ক না থাকায় এখনো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। সংযোগ সড়কের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে আটকে আছে নির্মাণকাজ। এতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটি জনগণের কোনো কাজে আসছে না।
উপজেলার ধামুরা-শোলক-বাটাজোর সড়কে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত ৪৪ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতুটির চুক্তিমূল্য ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ সেতু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার নির্ধারিত তারিখ ছিল ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প গ্রহণের আগে সংযোগ সড়কের জমির মালিকানা, দাগ-খতিয়ান ও আইনগত অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই করা হলে সেতু নির্মাণের পর এ ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। তাঁদের প্রশ্ন—সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নিশ্চিত না করেই কেন প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলো?
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সেতুটির সঙ্গে সংযোগ সড়কের পথ প্রকল্পের নকশায় নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সেতুর দুই পাশে ঢাল নামানোর (অ্যাপ্রোচ) কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় যানবাহন চলাচল সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায়ের দাবি, সেতুর ঢাল নামানোর জন্য প্রায় ৩৪ ফুট সরকারি খাসজমি রয়েছে। তবে ওই জমি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হওয়ায় সংযোগ সড়কের কাজ আটকে আছে।সেতুটি চালু হলে ধামুরা, শোলকসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও সেতুটি ব্যবহার করতে না পারায় এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী।
সেতুর দুই পাশে রত্নপুর সড়ক ও শোলক বাজারমুখী সড়রের জমির মালিকানা দাবি করা আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, তিনি এসএ খতিয়ানের মালিক। সেতু নির্মাণের সময় তাঁর জমির ওপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তাঁর দাবি, তখন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর জমি ব্যবহারের বিষয়ে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না করেই জমি ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আপত্তি জানালে মামলা দেওয়ার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করেন আব্দুর রব। তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নথি বা প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।
তাঁর ছেলে মাসুম হাওলাদার বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। একই সঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে।
স্থানীয় সমাজসেবক মোহাম্মদ এনায়েত শরীফ বলেন, এটি উপজেলা পরিষদের নিবন্ধিত সড়ক। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সড়কের জমি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেই নকশা করা হয়েছে। এরপরই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
তিনি বলেন, একটি পক্ষ ব্যক্তিস্বার্থে মালিকানা দাবি করে সংযোগ সড়কের কাজে বাধা সৃষ্টি করায় প্রকল্পটি আটকে আছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করে সেতুটি চালু করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা লিটু মিয়া বলেন, তাঁর জানা মতে, সেতুর দুই পাশে কিছু জমি সরকারি খাস সম্পত্তির আওতাভুক্ত। সেখানে সরকারি রাস্তা থাকার কথা। কোন জমি সরকারি এবং কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন—ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই করলেই তা পরিষ্কার হবে।
তিনি বলেন, সরকারি জমি হলে সেখানে রাস্তা নির্মাণে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের প্রশ্ন আসে না। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিষয়টি পরিষ্কার না করে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু দীর্ঘদিন ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মন্ডল বলেন, উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বর্তমান বিএস জরিপে রাস্তার নামে রেকর্ড ও নকশা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে তাঁর পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্টদের আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে উজিরপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত সেতুটির বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁর দপ্তরের। প্রকল্প গ্রহণের আগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি ও স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জমির মালিকানা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এরপর নকশা তৈরি করে চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হয় এবং দরপত্রের মাধ্যমে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় কিছু মানুষের অযৌক্তিক বাধার কারণে সংযোগ সড়কের কাজ স্থগিত রয়েছে। এতে স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়েছে। বর্তমান বিএস জরিপ ও নকশায় রাস্তা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, সেতুটির নির্মাণকাজের ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছিল যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম/এস বসুন্ধরা ও সুপ্তি।
প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণের পরও যদি সংযোগ সড়কের জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে প্রকল্প গ্রহণের আগে ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কতটা যাচাই করা হয়েছিল—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, দাগ-খতিয়ান, এসএ ও বিএস রেকর্ড, রাস্তার শ্রেণি, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত নথি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি যাচাই করলে বিরোধের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে এলজিইডির দাবি অনুযায়ী সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমির অংশ সরকারি খাস হলে সেই জমির বর্তমান রেকর্ড ও ব্যবহারিক অবস্থাও যাচাই করা জরুরি।
এলাকাবাসীর দাবি, জেলা প্রশাসন, এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ভূমি প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা ও ভূমি-সংক্রান্ত সব নথি যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করা হোক।
তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তাহলে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি অবশেষে জনগণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং ধামুরা-শোলকসহ আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।
মতামত