বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় দশকের ইতিহাস এক জটিল ও বহুমুখী পরিক্রমা। একদফা গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। তাদের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে উন্নয়ন ও অনিয়মের এক বৈপরিত্যপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে, যা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর গভীর দাগ রেখে গেছে।
অবকাঠামোগত মাইলফলক: আওয়ামী লীগ আমলের ইতিবাচক দিক
ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের দৃশ্যমান যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামোয় অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল: প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা (২১০-২২০ বিলিয়ন টাকা) ব্যয়ে নির্মিত আন্তর্জাতিক মানের ৩য় টার্মিনাল প্রকল্প। এই আধুনিক টার্মিনালটি দেশের বিমান যোগাযোগ খাতকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
স্বপ্নের মেগা প্রজেক্টসমূহ: নিজেদের অর্থায়নে তৈরি 'পদ্মা বহুমুখী সেতু', ঢাকার যানজট নিরসনে 'মেট্রোরেল' ও 'এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে', চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম 'বঙ্গবন্ধু টানেল' এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বহুলাংশে প্রসারিত করেছে।
প্রযুক্তিগত ও বিদ্যুৎ খাতের বিপ্লব: 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ধারণার বাস্তবায়ন, সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রাথমিক সাফল্যগুলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি এনেছিল।
অপরিকল্পিত ব্যবস্থা ও দুর্নীতি: ক্ষয়ক্ষতির খেসারত
তবে বড় বড় অবকাঠামোগত অর্জনের আড়ালে নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া দুর্বলতাগুলো দেশের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল:
মেগা প্রকল্পে বিপুল দুর্নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধি: বিমানবন্দর টার্মিনাল, পাওয়ার প্ল্যান্টসহ প্রায় প্রতিটি বড় প্রকল্পের বাজেট বারবার বাড়ানো, অনুমোদনহীন ব্যয় এবং কেনাকাটায় অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ খাত ও একপাক্ষিক চুক্তি: ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে একপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়ে।
জবাবদিহিতাহীন শাসন ব্যবস্থা: সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, ব্যাংক খাতের লুটপাট এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর চরম দলীয়করণের ফলে জনরোষ চরম আকার ধারণ করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় সংগঠনকে অমার্জনীয়ভাবে বিদায় নিতে বাধ্য করে।
১৮ মাসের ক্রান্তিকাল ও ক্ষমতা পরিবর্তন
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর দেশে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘ ১৮ মাস দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। ক্রান্তিকালীন সময় হওয়ায় এই ১৮ মাসে নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা সামাল দিতে সাধারণ মানুষকে তীব্র ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতির পূর্ণ স্বাভাবিকতা না আসায় জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ ঘনীভূত হতে থাকে।
এরপর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনরায় পেয়ে ২১২টি আসন নিয়ে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন সরকারের ওপর এখন দেশ পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব।
নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও জনভাবনা
সরকার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখন অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও কঠোর:
১. সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরীক্ষা: বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রথম দায়িত্ব দুর্নীতি, সুবিধাভোগী, দখলদার ও চাঁদাবাজদের শক্ত হাতে দমন করা। যদি বিএনপির ভেতরে এসব অরাজকতা প্রশ্রয় পায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত হ্রাস পাবে।
২. অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা: দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এত শক্ত রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও জনরোষের মুখে আওয়ামী লীগ যেভাবে টিকে থাকতে পারল না—তা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির জন্য অনেক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সুশাসন ও জনগণের ট্রাস্টই টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
৩. ‘আগের দিনই ভালো ছিল’ মানসিকতার ঝুঁকি: বর্তমান অরাজকতা ও অর্থনৈতিক সংকট যদি বিএনপি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে ক্ষুব্ধ জনগণ পূর্বের আমলের প্রতি ভুল সহানুভূতি দেখাতে পারে। মানুষ কোনো রূপকথার পরিবর্তন চায় না—তারা দেখতে চায় দ্রুত বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ সড়ক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।
উপসংহার
রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনৈতিক শক্তিকে রাতারাতি পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু তারা জনগণের কাছে ফিরে আসতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের চালচলন ও কার্যকারিতার ওপর। অতীতকে কেবল দোষ না দিয়ে নতুন ক্ষমতাসীন বিএনপি যদি স্বচ্ছতা ও সঠিক নীতি নিয়ে এগিয়ে যায়, তবেই দেশ দীর্ঘদিনের সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে পারে।
মতামত