বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সূচক সাময়িক বৃদ্ধি পেলেও স্থায়ী ও টেকসই মন্দাভাব বা দীর্ঘমেয়াদী দরপতন এখানে সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে—কেন অন্যান্য দেশের অর্থনীতি বৃদ্ধির সঙ্গে বাজার এগোলেও বাংলাদেশের বাজারে উত্থান স্থায়ী হয় না?
১. ভালো ও মৌলিক শেয়ারের তীব্র অভাব (Low Quality IPOs)
বাজারে মানসম্মত কোম্পানির শেয়ারের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বহুজাতিক ও শক্ত ভিতের দেশীয় বড় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। বহু দুর্বল ও নামসর্বস্ব কোম্পানি ভুল এবং অতিরঞ্জিত আর্থিক বিবরণী জমা দিয়ে বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের চরম ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
২. কারসাজি ও সিন্ডিকেট (Market Manipulation)
বাজারে স্বাভাবিক লেনদেনের চেয়ে গুজোব ও সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক লেনদেন বেশি দেখা যায়। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা চক্র দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করে। পরবর্তীতে তারা লাভ তুলে নিয়ে কেটে পড়লে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হন।
৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার (BSEC) নীতিগত অস্থিতিশীলতা
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) নীতিমালায় ঘন ঘন পরিবর্তন বাজারের গতিশীলতা নষ্ট করে। যেমন: দীর্ঘ সময় ধরে 'ফ্লোর প্রাইস' (Floor Price) কার্যকর রাখার ফলে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের হস্তক্ষেপ প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দুর্বল ভূমিকা
একটি পরিপক্ক শেয়ারবাজারে ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো মূল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার বদলে নিজেরাও অনেক সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো জল্পনা-কল্পনানির্ভর (speculative) ট্রেডিংয়ে জড়িয়ে পড়ে।
৫. সুশাসনের অভাব ও দুর্বল তদারকি (Lack of Corporate Governance)
অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করে না। অনিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন এবং অর্জিত মুনাফা সঠিকভাবে বণ্টন না করার কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। একইসাথে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব রয়েছে।
৬. ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সাথে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট সরাসরি পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে।
কারও একক দোষ দিয়ে এই জটিল পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। DSE/CSE-র দুর্বল তদারকি, BSEC-র নীতিগত ভুল ও প্রয়োগের দুর্বলতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসনের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বহীনতা—সব মিলিয়েই আজকের এই অবস্থা।
পুঁজিবাজারকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ করা, অনিয়মকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদান এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
মতামত