সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

শেয়ারবাজারের টানা মন্দা ও ডে ট্রেডিং চালুর বাস্তবতা—সুযোগ না নতুন ঝুঁকি?


আনোয়ার আলমগীর
আনোয়ার আলমগীর
| ফটো কার্ড

শেয়ারবাজারের টানা মন্দা ও ডে ট্রেডিং চালুর বাস্তবতা—সুযোগ না নতুন ঝুঁকি?
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পার হতে চললেও বাজারের কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন বা স্থায়ী স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি। আমেরিকা, ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উদীয়মান শেয়ারবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেনদেন হয় ‘ডে ট্রেডিং’ বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিংয়ের (একই দিনে শেয়ার কেনাবেচা) মাধ্যমে। বর্তমানে দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা তারল্য সংকট ও দরপতনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—আমাদের বাজারেও কি ডে ট্রেডিং পুরোদমে শুরু হওয়া উচিত?

​শেয়ারবাজারের ৭২ বছরের পথচলা ও বর্তমান সংকট  

​১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর সাত দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজও মূলত রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অপশাসন, ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার আস্থা হারিয়েছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতা যেমন গড়ে ওঠেনি, তেমনি বাজারে প্রয়োজনীয় গতিশীলতারও অভাব রয়ে গেছে।  

​ডে ট্রেডিং চালুর ভালো ও খারাপ দিক

​আমেরিকা বা ভারতের মতো দেশগুলোতে প্রতিদিনের মোট লেনদেনের একটি বড় অংশ আসে ডে ট্রেডিং থেকে। আমাদের বাজারে এই ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হলে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাবই পড়বে:  

​সুযোগ বা ভালো দিক:

​তারল্য বৃদ্ধি: ডে ট্রেডারদের ঘন ঘন কেনাবেচার ফলে বাজারে প্রতিদিন ক্যাশ ফ্লো বা লেনদেনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

​দ্রুত মুনাফার সুযোগ: সঠিক টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস (যেমন RSI, সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স) ও চার্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে দক্ষ ট্রেডাররা খুব অল্প সময়ে মূলধন ঘুরিয়ে মুনাফা নিতে পারেন।  

​আন্তর্জাতিক মান অর্জন: বাজার অটোমেশন ও আধুনিক ডেরিভেটিভস প্রোডাক্টের দিকে এগোতে হলে ডে ট্রেডিং গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।  

​ঝুঁকি বা খারাপ দিক:

​অত্যধিক অস্থিরতা: একই দিনে বিপুল শেয়ার বেচাকেনা হলে বাজারে হঠাৎ তীব্র ওঠানামা দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্যানিক বা ভীতি তৈরি করতে পারে।  

​গুজব ও মেনিপুলেশন: পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও কঠোর আইন না থাকলে জুয়াড়ি বা কারসাজিকারীরা রিউমার ছড়িয়ে কৃত্রিম প্রাইস হাইপ তৈরি করতে পারে।  

​ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব: টেকনিক্যাল জ্ঞান ছাড়া আবেগ বা ধারণার ওপর নির্ভর করে ট্রেড করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূলধন দ্রুত হারানোর ঝুঁকি শতভাগ থাকে।  

​আমাদের দেশে কি এখনই ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া উচিত?  

​আমাদের দেশের বর্তমান অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত মূল্যায়নে পৌঁছানো সম্ভব।

​যাচাই ও সিদ্ধান্ত:  

​অবকাঠামোগত প্রস্তুতি: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-কে প্রথমে টি+০ (Same-day Settlement) এবং শক্তিশালী আইটি নেটওয়ার্ক শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।  

​শিক্ষিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী: শুধুমাত্র ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসে অভিজ্ঞ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রেডারদেরই এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা রয়েছে।  

​নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি: ভারতে ‘SEBI’ যেভাবে অ্যালগরিদম ও ডে ট্রেডিং নিয়ন্ত্রণ করে, BSEC-কেও সেভাবে রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স বজায় রাখতে হবে।

​চূড়ান্ত মন্তব্য: ডে ট্রেডিং কোনো ম্যাজিক নয়, এটি একটি আধুনিক আর্থিক হাতিয়ার। শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের মন্দা কাটাতে তারল্য ফেরা অত্যন্ত জরুরি, আর সেটির জন্য ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে তা হতে হবে শক্ত রেগুলেশন, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শেয়ারবাজারের টানা মন্দা ও ডে ট্রেডিং চালুর বাস্তবতা—সুযোগ না নতুন ঝুঁকি?

প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পার হতে চললেও বাজারের কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন বা স্থায়ী স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি। আমেরিকা, ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উদীয়মান শেয়ারবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেনদেন হয় ‘ডে ট্রেডিং’ বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিংয়ের (একই দিনে শেয়ার কেনাবেচা) মাধ্যমে। বর্তমানে দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা তারল্য সংকট ও দরপতনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—আমাদের বাজারেও কি ডে ট্রেডিং পুরোদমে শুরু হওয়া উচিত?

​শেয়ারবাজারের ৭২ বছরের পথচলা ও বর্তমান সংকট  

​১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর সাত দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজও মূলত রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অপশাসন, ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার আস্থা হারিয়েছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতা যেমন গড়ে ওঠেনি, তেমনি বাজারে প্রয়োজনীয় গতিশীলতারও অভাব রয়ে গেছে।  

​ডে ট্রেডিং চালুর ভালো ও খারাপ দিক

​আমেরিকা বা ভারতের মতো দেশগুলোতে প্রতিদিনের মোট লেনদেনের একটি বড় অংশ আসে ডে ট্রেডিং থেকে। আমাদের বাজারে এই ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হলে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাবই পড়বে:  

​সুযোগ বা ভালো দিক:

​তারল্য বৃদ্ধি: ডে ট্রেডারদের ঘন ঘন কেনাবেচার ফলে বাজারে প্রতিদিন ক্যাশ ফ্লো বা লেনদেনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

​দ্রুত মুনাফার সুযোগ: সঠিক টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস (যেমন RSI, সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স) ও চার্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে দক্ষ ট্রেডাররা খুব অল্প সময়ে মূলধন ঘুরিয়ে মুনাফা নিতে পারেন।  

​আন্তর্জাতিক মান অর্জন: বাজার অটোমেশন ও আধুনিক ডেরিভেটিভস প্রোডাক্টের দিকে এগোতে হলে ডে ট্রেডিং গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।  

​ঝুঁকি বা খারাপ দিক:

​অত্যধিক অস্থিরতা: একই দিনে বিপুল শেয়ার বেচাকেনা হলে বাজারে হঠাৎ তীব্র ওঠানামা দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্যানিক বা ভীতি তৈরি করতে পারে।  

​গুজব ও মেনিপুলেশন: পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও কঠোর আইন না থাকলে জুয়াড়ি বা কারসাজিকারীরা রিউমার ছড়িয়ে কৃত্রিম প্রাইস হাইপ তৈরি করতে পারে।  

​ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব: টেকনিক্যাল জ্ঞান ছাড়া আবেগ বা ধারণার ওপর নির্ভর করে ট্রেড করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূলধন দ্রুত হারানোর ঝুঁকি শতভাগ থাকে।  

​আমাদের দেশে কি এখনই ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া উচিত?  

​আমাদের দেশের বর্তমান অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত মূল্যায়নে পৌঁছানো সম্ভব।

​যাচাই ও সিদ্ধান্ত:  

​অবকাঠামোগত প্রস্তুতি: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-কে প্রথমে টি+০ (Same-day Settlement) এবং শক্তিশালী আইটি নেটওয়ার্ক শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।  

​শিক্ষিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী: শুধুমাত্র ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসে অভিজ্ঞ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রেডারদেরই এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা রয়েছে।  

​নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি: ভারতে ‘SEBI’ যেভাবে অ্যালগরিদম ও ডে ট্রেডিং নিয়ন্ত্রণ করে, BSEC-কেও সেভাবে রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স বজায় রাখতে হবে।

​চূড়ান্ত মন্তব্য: ডে ট্রেডিং কোনো ম্যাজিক নয়, এটি একটি আধুনিক আর্থিক হাতিয়ার। শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের মন্দা কাটাতে তারল্য ফেরা অত্যন্ত জরুরি, আর সেটির জন্য ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে তা হতে হবে শক্ত রেগুলেশন, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream