শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

গয়না ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় স্বর্ণ


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

গয়না ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় স্বর্ণ
ছবি: সংগৃহীত

স্বর্ণের কথা বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা ধরনের অলংকার। যুগের পর যুগ গয়না তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মূল্যবান এই ধাতু। পাশাপাশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। তাই স্বর্ণের বার ও কয়েন কিনে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।

তবে স্বর্ণের ব্যবহার কেবল অলংকার ও বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা এমনকি খাবার সাজানোর ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই ধাতু।

স্বর্ণ সহজে ক্ষয় হয় না, বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং খুব পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে পরিণত করা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যই গয়নার বাইরেও স্বর্ণের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

খাবার সাজাতেও ব্যবহৃত হয় স্বর্ণ

স্বর্ণ খাওয়ার কথাটি অবাক করার মতো হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ কিছু খাবারে এটি ব্যবহার করা হয়। ২২ থেকে ২৪ ক্যারেটের অত্যন্ত বিশুদ্ধ স্বর্ণের পাত সাধারণত এ কাজে ব্যবহৃত হয়।

সুশি, মিষ্টি, চকলেট, কেক ও আইসক্রিমের মতো বিলাসবহুল খাবারের ওপর এসব পাত দেওয়া হয়। ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ নামে পরিচিত এই স্বর্ণের পাত খাবারের সৌন্দর্য ও আভিজাত্য বাড়াতেই মূলত ব্যবহার করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণ ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত খাদ্য সংযোজক। তবে স্বর্ণ খেলে শরীরের কোনো বিশেষ পুষ্টি বা স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায়—এমন প্রমাণ নেই। ধাতব স্বর্ণ শরীরে খুব কম দ্রবীভূত হওয়ায় সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে শোষিত হয় না।

দামি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবার বা পানীয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে স্বর্ণের পাত, ছোট টুকরা কিংবা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মিষ্টির ওপর স্বর্ণ ও রুপার পাত ব্যবহারের পুরোনো রীতিও রয়েছে। এসব পাত ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।

স্বর্ণযুক্ত খাবারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘পার্টিকলস অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি’তে প্রকাশিত ৯০ দিনের একটি ইঁদুরের গবেষণায় ই১৭৫ গ্রহণের পর যকৃৎ, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অন্ত্রের জীবাণু ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। বেশি মাত্রায় স্বর্ণ গ্রহণ করা স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে সামান্য প্রদাহও লক্ষ্য করা হয়েছিল।

স্মার্টফোন-কম্পিউটারেও রয়েছে স্বর্ণ

আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনের ভেতরেও অল্প পরিমাণ স্বর্ণ থাকতে পারে। একইভাবে কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ নানা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সার্কিট বোর্ড, সুইচ, সংযোগকারী এবং বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।

এর অন্যতম কারণ হলো, স্বর্ণ বিদ্যুৎ ভালোভাবে পরিবহন করতে পারে এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ফলে বৈদ্যুতিক সংযোগকে দীর্ঘদিন কার্যকর রাখতে এই ধাতু বেশ উপযোগী।

একেকটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রে স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মোবাইল, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরি হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এই খাতে স্বর্ণের ব্যবহার কম নয়।

পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য থেকেও স্বর্ণ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু আলাদা করে পুনর্ব্যবহার করলে স্বর্ণের অপচয় কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সুবিধা হয়।

মহাকাশ প্রযুক্তিতে স্বর্ণের ভূমিকা

মহাকাশ গবেষণাতেও স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আলো ও তাপ প্রতিফলনের ক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন উজ্জ্বলতা ধরে রাখার বৈশিষ্ট্যের কারণে মহাকাশ প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার রয়েছে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নায় অত্যন্ত পাতলা স্বর্ণের আবরণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ কার্যকর হওয়ায় এই ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথসহ মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

মহাকাশচারীদের হেলমেটেও স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশে থাকা এই আবরণ সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষায় সহায়তা করে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবহন ও ক্ষয় প্রতিরোধের বৈশিষ্ট্যের কারণে মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং বৈদ্যুতিক সংযোগেও স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় স্বর্ণ

চিকিৎসাক্ষেত্রেও স্বর্ণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো বাতজনিত রোগের চিকিৎসায় ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত স্বর্ণের কিছু যৌগ ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে তুলনামূলক কার্যকর বিভিন্ন ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় এই চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার কমে গেছে।

এখন স্বর্ণের অতি ক্ষুদ্র কণা বা ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা চলছে। রোগ শনাক্তকরণ, নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসায় এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে এসব ব্যবহারের অনেকগুলো এখনো গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে।

কিছু দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার কিটেও স্বর্ণের ক্ষুদ্র কণা ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার ফল বোঝাতে কিটে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, সেটি তৈরিতে এসব কণার ভূমিকা থাকতে পারে।

দাঁতের চিকিৎসাতেও স্বর্ণের ব্যবহার বেশ পুরোনো। সহজে ক্ষয় না হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাঁত মেরামত এবং পুনর্গঠনে স্বর্ণ ও এর সংকর ধাতু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বেশি দাম এবং বিকল্প উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে এর ব্যবহার তুলনামূলক কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টেও কেন থাকে স্বর্ণ?

স্বর্ণ শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভেরও একটি অংশ। বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বহু দেশ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুত করে রাখে।

এর সঙ্গে ইতিহাসেরও যোগ রয়েছে। একসময় অনেক দেশের মুদ্রাব্যবস্থা স্বর্ণের মজুতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা নেই। তারপরও বৈদেশিক সম্পদে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ সংরক্ষণ করে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুত প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন স্বর্ণ ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ৭০ শতাংশের বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশটির স্বর্ণের মজুত প্রায় ২ হাজার ২৭৯ টনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কেনে দেশটি। এর আগের বছর ২০২৩ সালেও চীন প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল।

তবে স্বর্ণের বাজারমূল্য স্থির নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পরিবর্তনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মজুত করা স্বর্ণের মূল্যও ওঠানামা করতে পারে।

অর্থাৎ, গয়না তৈরির পরিচিত ব্যবহার ছাড়িয়ে প্রযুক্তি, মহাকাশ, চিকিৎসা, খাদ্য এবং বৈদেশিক রিজার্ভ—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই স্বর্ণের উপস্থিতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


গয়না ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় স্বর্ণ

প্রকাশের তারিখ : ০২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

স্বর্ণের কথা বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা ধরনের অলংকার। যুগের পর যুগ গয়না তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মূল্যবান এই ধাতু। পাশাপাশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। তাই স্বর্ণের বার ও কয়েন কিনে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।

তবে স্বর্ণের ব্যবহার কেবল অলংকার ও বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা এমনকি খাবার সাজানোর ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই ধাতু।

স্বর্ণ সহজে ক্ষয় হয় না, বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং খুব পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে পরিণত করা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যই গয়নার বাইরেও স্বর্ণের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

খাবার সাজাতেও ব্যবহৃত হয় স্বর্ণ

স্বর্ণ খাওয়ার কথাটি অবাক করার মতো হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ কিছু খাবারে এটি ব্যবহার করা হয়। ২২ থেকে ২৪ ক্যারেটের অত্যন্ত বিশুদ্ধ স্বর্ণের পাত সাধারণত এ কাজে ব্যবহৃত হয়।

সুশি, মিষ্টি, চকলেট, কেক ও আইসক্রিমের মতো বিলাসবহুল খাবারের ওপর এসব পাত দেওয়া হয়। ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ নামে পরিচিত এই স্বর্ণের পাত খাবারের সৌন্দর্য ও আভিজাত্য বাড়াতেই মূলত ব্যবহার করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণ ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত খাদ্য সংযোজক। তবে স্বর্ণ খেলে শরীরের কোনো বিশেষ পুষ্টি বা স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায়—এমন প্রমাণ নেই। ধাতব স্বর্ণ শরীরে খুব কম দ্রবীভূত হওয়ায় সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে শোষিত হয় না।

দামি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবার বা পানীয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে স্বর্ণের পাত, ছোট টুকরা কিংবা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মিষ্টির ওপর স্বর্ণ ও রুপার পাত ব্যবহারের পুরোনো রীতিও রয়েছে। এসব পাত ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।

স্বর্ণযুক্ত খাবারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘পার্টিকলস অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি’তে প্রকাশিত ৯০ দিনের একটি ইঁদুরের গবেষণায় ই১৭৫ গ্রহণের পর যকৃৎ, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অন্ত্রের জীবাণু ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। বেশি মাত্রায় স্বর্ণ গ্রহণ করা স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে সামান্য প্রদাহও লক্ষ্য করা হয়েছিল।

স্মার্টফোন-কম্পিউটারেও রয়েছে স্বর্ণ

আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনের ভেতরেও অল্প পরিমাণ স্বর্ণ থাকতে পারে। একইভাবে কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ নানা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সার্কিট বোর্ড, সুইচ, সংযোগকারী এবং বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।

এর অন্যতম কারণ হলো, স্বর্ণ বিদ্যুৎ ভালোভাবে পরিবহন করতে পারে এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ফলে বৈদ্যুতিক সংযোগকে দীর্ঘদিন কার্যকর রাখতে এই ধাতু বেশ উপযোগী।

একেকটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রে স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মোবাইল, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরি হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এই খাতে স্বর্ণের ব্যবহার কম নয়।

পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য থেকেও স্বর্ণ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু আলাদা করে পুনর্ব্যবহার করলে স্বর্ণের অপচয় কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সুবিধা হয়।

মহাকাশ প্রযুক্তিতে স্বর্ণের ভূমিকা

মহাকাশ গবেষণাতেও স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আলো ও তাপ প্রতিফলনের ক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন উজ্জ্বলতা ধরে রাখার বৈশিষ্ট্যের কারণে মহাকাশ প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার রয়েছে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নায় অত্যন্ত পাতলা স্বর্ণের আবরণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ কার্যকর হওয়ায় এই ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথসহ মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

মহাকাশচারীদের হেলমেটেও স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশে থাকা এই আবরণ সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষায় সহায়তা করে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবহন ও ক্ষয় প্রতিরোধের বৈশিষ্ট্যের কারণে মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং বৈদ্যুতিক সংযোগেও স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় স্বর্ণ

চিকিৎসাক্ষেত্রেও স্বর্ণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো বাতজনিত রোগের চিকিৎসায় ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত স্বর্ণের কিছু যৌগ ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে তুলনামূলক কার্যকর বিভিন্ন ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় এই চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার কমে গেছে।

এখন স্বর্ণের অতি ক্ষুদ্র কণা বা ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা চলছে। রোগ শনাক্তকরণ, নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসায় এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে এসব ব্যবহারের অনেকগুলো এখনো গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে।

কিছু দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার কিটেও স্বর্ণের ক্ষুদ্র কণা ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার ফল বোঝাতে কিটে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, সেটি তৈরিতে এসব কণার ভূমিকা থাকতে পারে।

দাঁতের চিকিৎসাতেও স্বর্ণের ব্যবহার বেশ পুরোনো। সহজে ক্ষয় না হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাঁত মেরামত এবং পুনর্গঠনে স্বর্ণ ও এর সংকর ধাতু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বেশি দাম এবং বিকল্প উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে এর ব্যবহার তুলনামূলক কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টেও কেন থাকে স্বর্ণ?

স্বর্ণ শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভেরও একটি অংশ। বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বহু দেশ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুত করে রাখে।

এর সঙ্গে ইতিহাসেরও যোগ রয়েছে। একসময় অনেক দেশের মুদ্রাব্যবস্থা স্বর্ণের মজুতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা নেই। তারপরও বৈদেশিক সম্পদে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ সংরক্ষণ করে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুত প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন স্বর্ণ ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ৭০ শতাংশের বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশটির স্বর্ণের মজুত প্রায় ২ হাজার ২৭৯ টনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কেনে দেশটি। এর আগের বছর ২০২৩ সালেও চীন প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল।

তবে স্বর্ণের বাজারমূল্য স্থির নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পরিবর্তনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মজুত করা স্বর্ণের মূল্যও ওঠানামা করতে পারে।

অর্থাৎ, গয়না তৈরির পরিচিত ব্যবহার ছাড়িয়ে প্রযুক্তি, মহাকাশ, চিকিৎসা, খাদ্য এবং বৈদেশিক রিজার্ভ—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই স্বর্ণের উপস্থিতি রয়েছে।


তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream