বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বাড়ার বিষয়টি বাস্তবতা হলেও এর পুরো চাপ একসঙ্গে জনগণের ওপর না দিয়ে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ ছিল বলে দাবি করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, জনস্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে সাত মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সরকারের ‘দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ’।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর ফলে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এর প্রভাব কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। তবে সেই চাপ একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তার ভাষায়, ‘আমাদের প্রয়োজন প্রাইস শক নয়, প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট।’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ কৃষিযন্ত্র পরিচালনার ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সামনে বোরো মৌসুম থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, আর জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানো মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।
মঞ্জুর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ে। পরে সেই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে। তাই শুধু প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ার বিষয়টি দিয়ে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, ফ্রেইট, ইনস্যুরেন্স, বিনিময় হার, কর, হ্যান্ডলিং, ডিস্ট্রিবিউশন কস্ট এবং বিপিসির প্রকৃত ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।
সংকটের সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, বিপিসির দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় ও জ্বালানি চুরি বন্ধের বিষয়েও গুরুত্ব দেন নোমান।
সরকারের কাছে ১১ দফা দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক মূল্যনীতি নিতে হবে। একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার, ফ্রেইট, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও করের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এ ছাড়া সংকটকালে আমদানি শুল্ক-কর সাময়িক সমন্বয়, প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ডিজেল সহায়তা, অযৌক্তিক পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিপিসির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ, প্রোকিউরমেন্ট, সিস্টেম লস ও জ্বালানি চুরির বিষয়ে স্বাধীন অডিটের দাবি জানানো হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সংকট মোকাবিলায় স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
ব্যারিস্টার নোমান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নীতি নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেও জনগণের ওপর এককালীন বড় মূল্য-শক এড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর ফাঁকি বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ এবং প্রগ্রেসিভ রেভিনিউ মোবিলাইজেশনের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
‘আমাদের প্রয়োজন প্রাইস শক নয়, প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট; প্রয়োজন এককালীন চাপ নয়, বরং স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায়সংগত জ্বালানি মূল্যনীতি’—বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খানসহ দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মতামত