হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শৈলেন্দ্র কুমার দাস আর নেই। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নিজ বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর ৯ মাস ৪ দিন। তাঁর মৃত্যুতে হবিগঞ্জের আইন অঙ্গন,সামাজিক ও ধর্মীয় মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৪৮ সালের ১৬ নভেম্বর হবিগঞ্জ শহরের মাস্টার কোয়ার্টার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন শৈলেন্দ্র কুমার দাস। তাঁর পিতা ছিলেন শশীভূষণ দাস। শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬৪ সালে এসএসসি,১৯৬৬ সালে এইচএসসি,১৯৬৮ সালে স্নাতক এবং ১৯৭২ সালে এলএলবি সম্পন্ন করেন।
১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হন তিনি। একই বছর ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলা বারে আইন পেশা শুরু করেন। বাংলাদেশ বিচার বিভাগের আইনজীবী বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী,২২ মার্চ ১৯৭৫ তারিখে হবিগঞ্জ বারে তাঁর যোগদানের তথ্যও রয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে তাঁর সদস্য আইডি ছিল ১০০৭। দীর্ঘ ৫১ বছর ৩ মাস ২৪ দিনের পেশাজীবনে তিনি হবিগঞ্জ জেলা জজ আদালত,চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত,অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে আইন পেশা পরিচালনা করেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি ইংরেজিতে সাবমিশন ও শুনানিতেও তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল।
দীর্ঘ পেশাজীবনের কারণে তিনি হবিগঞ্জ বারের অন্যতম প্রবীণ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ,শান্ত স্বভাবের এবং পরামর্শদাতা একজন সিনিয়র আইনজীবী। বিশেষ করে নবীন আইনজীবীদের আদালতের কার্যক্রম, মামলা প্রস্তুতি ও পেশাগত নৈতিকতা বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
আইন পেশার পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। হবিগঞ্জের রামকৃষ্ণ মিশন ও রামকৃষ্ণ আশ্রমের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান,সেবামূলক কার্যক্রম এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথি উদযাপনেও তিনি সহযোগিতা করতেন।
স্থানীয় বিভিন্ন মন্দির,পূজা উদযাপন কমিটি ও সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডেও তিনি যুক্ত ছিলেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা,দাতব্য চিকিৎসাসেবা,দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দরিদ্র ও অসহায় বিচারপ্রার্থীদের প্রতিও তাঁর বিশেষ সহমর্মিতা ছিল। অর্থের অভাবে কেউ যেন আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন,সে বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিতেন। অনেক বিচারপ্রার্থীকে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসায়ও ভূমিকা রাখতেন।
প্রচারবিমুখ ও সাদাসিধে জীবনযাপনের কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তাঁর ছিল সহজ-স্বাভাবিক সম্পর্ক। দীর্ঘদিন আইন পেশায় দায়িত্ব পালন করলেও তিনি ছিলেন অনেকটাই নীরব ও অন্তরালে থাকা একজন সমাজসেবী। হবিগঞ্জের সনাতন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তিনি নীরবে সহযোগিতা করে গেছেন।
প্রয়াত আইনজীবীর ভাগ্নে (বোনের ছেলে) এবং শ্রীমঙ্গল রামকৃষ্ণ মিশনের সক্রিয় সদস্য শ্রীযুক্ত রুপক দাস তার মামার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,“শৈলেন্দ্র কুমার দাস শুধু আমাদের পরিবারের একজন অভিভাবক ছিলেন না, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে থাকা একজন সৎ,সরল ও মানবিক মানুষ ছিলেন। আইন পেশায় তিনি যেমন নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন,তেমনি সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও নীরবে অবদান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের পরিবারের পাশাপাশি পরিচিতজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি।”
হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রয়াত এই প্রবীণ আইনজীবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনার আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছে। সহকর্মীরা তাঁর মৃত্যুতে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী,পরামর্শদাতা ও অভিভাবককে হারানোর কথা উল্লেখ করেছেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রীসহ স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে হবিগঞ্জের আইন অঙ্গনে দীর্ঘ ৫১ বছরের একটি কর্মময় অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। আইন পেশায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নবীন আইনজীবীদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা এবং সামাজিক-ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মতামত