রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

জয়পুরহাটে ১৩ বছর ধরে বেতনহীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা



জয়পুরহাটে ১৩ বছর ধরে বেতনহীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
জয়পুরহাটে ১৩ বছর ধরে বেতনহীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা

কারও হাতে বই, কেউ ব্যস্ত খাতায় লিখতে। শারীরিক ও মানসিক নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। তাদের এই পথচলাকে সহজ করতে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। তবে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা জোটেনি তাদের ভাগ্যে।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এভাবেই চলছে পাঠদান কার্যক্রম। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী, ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী রয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিপা জাহান বলেন, আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে যাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।

আরেক সহকারী শিক্ষক রিমা বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের সম্পদ। এই শিশুদের গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু আমরা কোনো বেতন পাই না। অনেক সময় নিজের সংসারের প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে বিদ্যালয়ে আসি। আমরা চাই সরকার বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার ব্যবস্থা করুক।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে শিক্ষকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী সংসারের খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

শুধু শিক্ষক-কর্মচারীরাই নন, বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের মা লাবিজা খাতুন বলেন, আমার প্রতিবন্ধী বাচ্চা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। ভ্যান ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসি, আবার নিয়ে যাই। লেখাপড়াও ঠিকমতো হয়। আমি চাই এই স্কুলের উন্নতি হোক, আমাদের বাচ্চাদেরও উন্নতি হোক।

শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নওফেল আলী।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের কোনো বোঝা নয়, তারা দেশের সম্পদ। এই সম্পদকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করছেন। শিক্ষকরা বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের যেমন উপকার হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশও আরও উন্নত হবে। 

 বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জামাল উদ্দিন বদির বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরবস্থা দেখে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যয় বহন করছেন। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষক ও কর্মচারীরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমি নিজে যতটুকু পারছি বহন করছি। এমনকি জমি বিক্রি করেও স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্কুলটির স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির জন্য সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।

এদিকে বিদ্যালয়টি সরকারি কোনো অনুদানের আওতায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়।

কালাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সাদিকুর রহমান মণ্ডল বলেন, নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল সম্পর্কে এইমাত্র আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমি এখানে নতুন। স্কুলটি সরকারি অনুদানের আওতায় আছে কি না, তা আমার জানা নেই। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এবং সরকার এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিয়ে থাকলে, বিদ্যালয়ের যেসব বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টা করব।”

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেবে। এতে তাদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬


জয়পুরহাটে ১৩ বছর ধরে বেতনহীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কারও হাতে বই, কেউ ব্যস্ত খাতায় লিখতে। শারীরিক ও মানসিক নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। তাদের এই পথচলাকে সহজ করতে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। তবে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা জোটেনি তাদের ভাগ্যে।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এভাবেই চলছে পাঠদান কার্যক্রম। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী, ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী রয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিপা জাহান বলেন, আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে যাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।

আরেক সহকারী শিক্ষক রিমা বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের সম্পদ। এই শিশুদের গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু আমরা কোনো বেতন পাই না। অনেক সময় নিজের সংসারের প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে বিদ্যালয়ে আসি। আমরা চাই সরকার বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার ব্যবস্থা করুক।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে শিক্ষকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী সংসারের খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

শুধু শিক্ষক-কর্মচারীরাই নন, বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের মা লাবিজা খাতুন বলেন, আমার প্রতিবন্ধী বাচ্চা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। ভ্যান ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসি, আবার নিয়ে যাই। লেখাপড়াও ঠিকমতো হয়। আমি চাই এই স্কুলের উন্নতি হোক, আমাদের বাচ্চাদেরও উন্নতি হোক।

শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নওফেল আলী।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের কোনো বোঝা নয়, তারা দেশের সম্পদ। এই সম্পদকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করছেন। শিক্ষকরা বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের যেমন উপকার হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশও আরও উন্নত হবে। 

 বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জামাল উদ্দিন বদির বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরবস্থা দেখে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যয় বহন করছেন। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষক ও কর্মচারীরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমি নিজে যতটুকু পারছি বহন করছি। এমনকি জমি বিক্রি করেও স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্কুলটির স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির জন্য সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।

এদিকে বিদ্যালয়টি সরকারি কোনো অনুদানের আওতায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়।

কালাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সাদিকুর রহমান মণ্ডল বলেন, নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল সম্পর্কে এইমাত্র আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমি এখানে নতুন। স্কুলটি সরকারি অনুদানের আওতায় আছে কি না, তা আমার জানা নেই। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এবং সরকার এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিয়ে থাকলে, বিদ্যালয়ের যেসব বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টা করব।”

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেবে। এতে তাদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream