জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসায় জাল সনদ তৈরি, প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
এছাড়া মাদ্রাসার স্বীকৃতির মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও অবৈধভাবে নিয়োগ বোর্ড গঠন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিজানুর রহমান ২০১১ সালে কালাই উপজেলার হারুঞ্জা দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। দাখিল সনদের জন্মতারিখ (০৯-০৫-১৯৯৫) অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স প্রায় ৩৬ বছর, যা দিয়ে এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ পাওয়া সম্ভব নয়।
বয়সের সীমা অতিক্রম করায় মিজানুর বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্যাডে ২০০৮ সালের একটি ভুয়া অষ্টম শ্রেণির সনদ দাখিল করেন, যেখানে তার জন্মতারিখ দেখানো হয় ০১-০৫-১৯৯৫ (বয়স ৩০ বছর)।
বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, মিজানুর কখনোই ওই স্কুলের ছাত্র ছিলেন না।
বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম সনদটি রেজিস্টার করার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু মিজানুর আমার স্কুলের ছাত্র ছিল না, তাই আমি তা প্রত্যাখ্যান করি। আমার স্বাক্ষর ও স্কুলের প্যাড জালিয়াতি করে কম্পিউটারে ভুয়া সনদটি তৈরি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মিজানুর রহমান স্বীকার করেন যে, তিনি চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে অষ্টম শ্রেণির সনদ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি আরও জানান, নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগের জন্য মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির কাছে ১০ লাখ টাকা প্রদান করেন এবং সুপারকে ৪ শতক জমি লিখে দিয়েছেন। এই ঘুষ লেনদেনের অডিও কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি হালনাগাদ না থাকলে নতুন কর্মী নিয়োগের আইনগত বৈধতা থাকে না। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তিনবার আবেদন করেও পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পায়নি।
তা সত্ত্বেও মাদ্রাসার স্বীকৃতি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর এ শেষ হওয়ার পর, স্থানীয় পর্যায়ে অপ্রচলিত দুটি পত্রিকায় গোপনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপর গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে শাহনাজ বেগম (আয়া) ও মিজানুর রহমানকে (নৈশপ্রহরী) নিয়োগ দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে যোগদান করানো হয়। এই দুটি পদে প্রায় ১৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সনদ জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম বলেন, নিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ। মিজানুর দাখিল ও আলিম পাস করেছে এবং মাদ্রাসার সনদ দিয়েই আবেদন করেছে ও বেতন হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি সোহাগ মণ্ডলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন। পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আজিজুল হাকিম বলেন, বিষয়টি আমরা জানতাম না, আপনার মাধ্যমে জানলাম। এ ধরনের জালিয়াতিকে আমরা কখনোই প্রশ্রয় দিব না৷ তদন্তপূর্বক সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপরোক্ত অভিযোগের সকল অডিও-ভিডিও ক্লিপ এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষণ রয়েছে৷
মতামত