যুক্তরাজ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বা কল্যাণ ভাতা নেওয়া বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। দেশটির কর্ম ও পেনশন মন্ত্রণালয়ের (ডিডব্লিউপি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রায় ১৩ লাখ বিদেশি নাগরিক ‘ইউনিভার্সাল ক্রেডিট’ (ইউসি) দাবি করেছেন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার।
ইউনিভার্সাল ক্রেডিট যুক্তরাজ্যের প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাগুলোর একটি। এর সুবিধা নেওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাগরিক। বিদেশি নাগরিকদের নেওয়া বেকারত্ব-সংশ্লিষ্ট ভাতার প্রায় অর্ধেক দাবিদারই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিক বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ইউনিভার্সাল ক্রেডিট নেওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজারের ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) বা স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি রয়েছে। এ ধরনের অনেক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস ও কাজ করছেন।
সাধারণত বিদেশি নাগরিকেরা স্থায়ী বসবাসের অধিকার বা ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ পাওয়ার পর ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো নির্দিষ্ট শর্তে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হন। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও নির্দিষ্ট সরকারি সহায়তার জন্য যোগ্য হতে পারেন।
বেনিফিট ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব রিফর্ম ইউকের
নতুন এই পরিসংখ্যান প্রকাশের সময়েই বিদেশিদের বেনিফিট পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব দিয়েছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে পার্টি।
দলটির অর্থনীতি বিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বেনিফিট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের একটি প্যাকেজের কথা জানিয়েছেন। প্রস্তাবের মধ্যে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়া ইইউ নাগরিকদেরও কিছু সামাজিক ভাতা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
তবে এমন পদক্ষেপ কার্যকর করতে হলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ইনস্টিটিউট ফর ফিসকাল স্টাডিজের (আইএফএস) গবেষক টম ওয়াটার্স সতর্ক করে বলেছেন, অ-ব্রিটিশ নাগরিকদের বেনিফিট বন্ধ করা হলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। তাঁর মতে, এই গোষ্ঠীর অনেকেই বর্তমানে তাদের আয়ের একটি বড় অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে পরিচালনা করেন।
তবে এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হলে অনেক অভিবাসী দ্রুত ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
আইএফএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বেনিফিট দাবি করা বিদেশি নাগরিকদের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।
রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা ব্যবস্থা নিলে ব্রিটিশ প্রবাসীদের কেউ কেউ বেনিফিট পাওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য প্রায় ৫০ কোটি পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও তারা বিবেচনায় রেখেছে।
মোট বেনিফিট দাবিদারও রেকর্ডে
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে ইউনিভার্সাল ক্রেডিট নেওয়া মানুষের মোট সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ৮৩ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। এদের অর্ধেকের বেশি দাবিদারের ক্ষেত্রে কাজ খোঁজার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
অন্যদিকে, অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধিতাজনিত ভাতার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ২০৩০ সালের আগেই এই খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, গত নভেম্বরে অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সময় কম হতে পারে।
সরকারের ভাষ্য, দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস, কাজ এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রয়োজনের সময় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকারকে যোগ্যতার ভিত্তিতে অর্জিত করার লক্ষ্যেই এসব সংস্কার আনা হচ্ছে।
মতামত