বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

স্পেনের অভিবাসন নীতি ইইউর জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে : প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ


আনোয়ার মুরাদ
আনোয়ার মুরাদ প্রকাশক
| ফটো কার্ড

স্পেনের অভিবাসন নীতি ইইউর জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে : প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর নীতি গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে, তখন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মনে করেন, সঠিকভাবে পরিচালিত অভিবাসন শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাদ্রিদে স্পেনের রাষ্ট্রদূতদের এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সানচেজ বলেন, তার দেশের অভিবাসন নীতি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ চাইলে স্পেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

তার ভাষায়, অভিবাসীরা স্পেনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। শ্রমবাজারে যেসব খাতে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বিদেশি কর্মীরা সেই শূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখছেন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও তাদের অবদান রয়েছে।

অর্থনীতিতে অভিবাসীদের ভূমিকা

সানচেজের দাবি, গত কয়েক বছরে স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে অভিবাসীদের শ্রম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলেও তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।

ইউরোপের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে। জন্মহার কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেক দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

স্পেনের সরকার মনে করছে, পরিকল্পিত ও আইনসম্মত অভিবাসনের মাধ্যমে এই ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব।

‘পুল ইফেক্ট’ নিয়ে বিতর্ক

তবে সরকারের এই নীতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনাও রয়েছে। স্পেনের ডানপন্থি দলগুলোর অভিযোগ, তুলনামূলক উদার অভিবাসন নীতি অনিয়মিত অভিবাসীদের দেশটিতে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। রাজনৈতিক বিতর্কে এই ধারণাকে প্রায়ই ‘পুল ইফেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অবশ্য এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, স্পেনের অভিজ্ঞতা বরং দেখাচ্ছে যে মানবিক ও বাস্তবভিত্তিক অভিবাসন নীতির সঙ্গে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী আটলান্টিক রুটে আগমন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক সংখ্যায় বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

শুধু সীমান্ত পাহারা নয়

অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে স্পেনের কৌশল শুধু সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে মাদ্রিদ।

উৎস দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, নজরদারি এবং মানবপাচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে অনিয়মিত যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ স্পেনের নীতিতে একই সঙ্গে দুটি বিষয় দেখা যাচ্ছে—বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

অর্থনৈতিক সাফল্যও আলোচনায়

অভিবাসন নীতির বিতর্কের পাশাপাশি স্পেনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সও আলোচনায় এসেছে। সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

সানচেজ সরকার এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অভিবাসীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে অর্থনীতির সব সাফল্যকে কেবল অভিবাসনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পর্যটন, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিও স্পেনের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে অভিবাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

ইউরোপের জন্য স্পেন কি উদাহরণ হতে পারে?

ইউরোপে অভিবাসন এখন অন্যতম বিভাজনকারী রাজনৈতিক ইস্যু। একদিকে শ্রমিকের প্রয়োজন ও জনসংখ্যাগত সংকট, অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ে জনমতের উদ্বেগ—দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

স্পেনের অবস্থান হলো, অভিবাসনকে শুধু সংকট হিসেবে না দেখে অর্থনীতি ও জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে এই মডেল অন্য ইউরোপীয় দেশে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইউরোপ যখন অভিবাসন নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার পথে হাঁটছে, তখন স্পেন দেখাতে চাইছে নিয়ন্ত্রিত বৈধ অভিবাসন ও কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং সঠিক নীতি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব।

এই মডেল আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতির বিতর্কে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


স্পেনের অভিবাসন নীতি ইইউর জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে : প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image


আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর নীতি গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে, তখন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মনে করেন, সঠিকভাবে পরিচালিত অভিবাসন শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাদ্রিদে স্পেনের রাষ্ট্রদূতদের এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সানচেজ বলেন, তার দেশের অভিবাসন নীতি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ চাইলে স্পেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

তার ভাষায়, অভিবাসীরা স্পেনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। শ্রমবাজারে যেসব খাতে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বিদেশি কর্মীরা সেই শূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখছেন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও তাদের অবদান রয়েছে।

অর্থনীতিতে অভিবাসীদের ভূমিকা

সানচেজের দাবি, গত কয়েক বছরে স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে অভিবাসীদের শ্রম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলেও তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।

ইউরোপের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে। জন্মহার কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেক দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

স্পেনের সরকার মনে করছে, পরিকল্পিত ও আইনসম্মত অভিবাসনের মাধ্যমে এই ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব।

‘পুল ইফেক্ট’ নিয়ে বিতর্ক

তবে সরকারের এই নীতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনাও রয়েছে। স্পেনের ডানপন্থি দলগুলোর অভিযোগ, তুলনামূলক উদার অভিবাসন নীতি অনিয়মিত অভিবাসীদের দেশটিতে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। রাজনৈতিক বিতর্কে এই ধারণাকে প্রায়ই ‘পুল ইফেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অবশ্য এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, স্পেনের অভিজ্ঞতা বরং দেখাচ্ছে যে মানবিক ও বাস্তবভিত্তিক অভিবাসন নীতির সঙ্গে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী আটলান্টিক রুটে আগমন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক সংখ্যায় বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

শুধু সীমান্ত পাহারা নয়

অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে স্পেনের কৌশল শুধু সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে মাদ্রিদ।

উৎস দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, নজরদারি এবং মানবপাচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে অনিয়মিত যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ স্পেনের নীতিতে একই সঙ্গে দুটি বিষয় দেখা যাচ্ছে—বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

অর্থনৈতিক সাফল্যও আলোচনায়

অভিবাসন নীতির বিতর্কের পাশাপাশি স্পেনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সও আলোচনায় এসেছে। সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

সানচেজ সরকার এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অভিবাসীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে অর্থনীতির সব সাফল্যকে কেবল অভিবাসনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পর্যটন, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিও স্পেনের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে অভিবাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

ইউরোপের জন্য স্পেন কি উদাহরণ হতে পারে?

ইউরোপে অভিবাসন এখন অন্যতম বিভাজনকারী রাজনৈতিক ইস্যু। একদিকে শ্রমিকের প্রয়োজন ও জনসংখ্যাগত সংকট, অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ে জনমতের উদ্বেগ—দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

স্পেনের অবস্থান হলো, অভিবাসনকে শুধু সংকট হিসেবে না দেখে অর্থনীতি ও জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে এই মডেল অন্য ইউরোপীয় দেশে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইউরোপ যখন অভিবাসন নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার পথে হাঁটছে, তখন স্পেন দেখাতে চাইছে নিয়ন্ত্রিত বৈধ অভিবাসন ও কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং সঠিক নীতি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব।

এই মডেল আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতির বিতর্কে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream