তুচ্ছ বিরোধ থেকে পারিবারিক কলহ—বাড়ছে হত্যার ঘটনা, উদ্বেগে সাধারণ মানুষ
সিলেটে যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে খুনোখুনির ঘটনা। সামান্য বিরোধ, পারিবারিক কলহ, জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় কখনো প্রতিবেশী, কখনো পরিচিতজন, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বজনের বিরুদ্ধেই উঠছে হত্যার অভিযোগ।
গত ২০ দিনে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা সচেতন ব্যক্তিদের মতে, অপরাধের পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা, সহনশীলতার অভাব, নৈতিক অবক্ষয় এবং বিরোধ মীমাংসার পরিবর্তে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা দায়ী। এর সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়টিও হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তারা।
রায়নগরে একই বাড়িতে তিনজন খুন
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১২ আগস্ট সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায়। মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় খুন হন এম এ সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা।
এম এ সাত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা ও সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক ছিলেন। তিনজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া নামে এক শ্রমজীবীকে আটক করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, গৃহকর্মীর সঙ্গে কথিত প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। তবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের এ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হত্যাকাণ্ডের ধরন ও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
দুই শিশুর মৃত্যুতে গ্রেপ্তার বাবা
একই দিনে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে কামরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, পারিবারিক বিরোধের জেরে ওই ব্যক্তি দুই সন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
অভিযোগ করায় প্রাণ গেল, ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
১৫ আগস্ট গোয়াইনঘাটের লাফনাউট দিঘিরপাড় গ্রামে কলিম উল্লাহ (৫৩) নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের একটি ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার কারণে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ছয়ফুল্লাহর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। একই দিনে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পূর্ব শংকরপুরে ইউপি সদস্য আবদুল হক (৫০) হত্যার শিকার হন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরেও ওই দিন ঘটে আরেকটি হত্যাকাণ্ড। বালিয়াঘাট এলাকায় শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে আল আমিন (৩৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
বাবাকে হত্যায় ছেলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
১৪ আগস্ট দোয়ারাবাজারের সোনাপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে খুন হন ৭৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা তার ছেলে ইসমাইল মিয়া স্ত্রীকে ব্যবহার করে ভাড়াটে লোকের মাধ্যমে বাবাকে হত্যা করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনায় নিহতের পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর বিরোধেও রক্তপাত
১১ আগস্ট জৈন্তাপুরের নয়াগাত্তি গ্রামে ২৩ বছর বয়সী জেসমিন বেগম নিহত হন। তাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামী গোলাম রফিকের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ২৮ জুলাই দক্ষিণ সুরমার সিলাম মুক্তারপুরে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বাতির আলী (৩০) নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে।
এর আগের দিন ২৭ জুলাই রাতে সিলেট নগরের কাজিরবাজার সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রাণ হারায় স্কুলছাত্র রিফাত আহমেদ (১৫)। একই দিনে সদর উপজেলার হাটখোলায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আবদুল্লাহ (২৫) নামে এক যুবক নিহত হন।
বিশ্বনাথ উপজেলার পাঠানেরগাঁও এলাকায়ও ওই সময় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গ্রামের মকরম আলী (৬৮) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ বাড়ির কাছের ধানখেত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
সহিংসতার এই প্রবণতা কেন?
অল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিলেটে নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কয়েকটি ঘটনায় হত্যার অভিযোগ উঠেছে পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে।
সচেতন মহলের মতে, আগে যেখানে পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই উত্তেজনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ঘাটতি এবং মাদকসহ নানা সামাজিক সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
তাদের মতে, শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক বিরোধ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে হত্যাকাণ্ডের কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
মতামত