যুক্তরাষ্ট্রে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করে তোলা এবং তাদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন। আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মেটার হুইসেলব্লোয়ার আর্তুরো বেজার দাবি করেছেন, কিশোরদের গ্রাফিক ও সহিংস কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার হার মেটার প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়ে ১০০ থেকে ৪০০ গুণ বেশি ছিল।
মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হয়ে বেজার বলেন, মেটার প্রকাশিত ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডস রিপোর্টে’ কিশোরদের গ্রাফিক বা সহিংস কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি মাত্র ০.০১ থেকে ০.০২ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবহারকারী জরিপে এ ধরনের কনটেন্টের উপস্থিতি প্রকাশিত সংখ্যার তুলনায় ১০০ থেকে ৪০০ গুণ বেশি পাওয়া যায়। তার দাবি, এসব জরিপের ফলাফল মেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি।
বেজারের ভাষ্য, মেটা ক্ষতিকর কনটেন্টের ‘prevalence’ বা উপস্থিতির হারকে ক্ষতির পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু তার মতে, এই পদ্ধতি ব্যবহারকারীরা বাস্তবে কী ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।
আদালতে তিনি বলেন, কোনো কনটেন্ট কতবার দেখা যাচ্ছে, সেটি আর একজন ব্যবহারকারী ওই কনটেন্টের কারণে কী ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন—দুটি বিষয় এক নয়। বিশেষ করে কোনো কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে শুধু কনটেন্টের পরিসংখ্যান দিয়ে সেই ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
মেয়ের অভিজ্ঞতায় মেটায় ফিরে আসেন বেজার
আদালতে নিজের মেয়ের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন বেজার। তিনি জানান, ১৪ বছর বয়সে মেয়েকে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পর অচেনা ব্যক্তিদের কাছ থেকে যৌন সম্পর্কিত বার্তা এবং ব্যক্তিগত অঙ্গের ছবি পাঠানোর অনুরোধ পেতে শুরু করেন সে।
বেজারের দাবি, তার মেয়ে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুঁজে পাননি। ফলে অচেনা ব্যক্তিদের ব্লক করেই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে হতো তাকে।
মেয়ের এই অভিজ্ঞতা বেজারকে নতুন করে মেটায় ফিরতে উদ্বুদ্ধ করে। তার ভাষায়, তিনি মনে করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোথাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না এবং বাইরে থেকে সমালোচনা করার পরিবর্তে ভেতরে থেকেই সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ছিল ‘পরবর্তী বিষয়’
২০১৯ থেকে ২০২১ সালের সময়ে মেটার কর্মপরিবেশ নিয়েও আদালতে কথা বলেন বেজার। তার দাবি, সে সময় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘Move Fast and Break Things’ ধরনের সংস্কৃতি চালু ছিল। দ্রুত নতুন পণ্য ও ফিচার ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও সুরক্ষা অনেক সময় পরবর্তী বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো।
তিনি আরও দাবি করেন, মেটার নিজস্ব গবেষণায় তরুণদের ওপর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও সেসব ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়নি।
বেজার জানান, মেটার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে তিনি এসব উদ্বেগ একাধিকবার তুলে ধরেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে তার অন্তত ১০০ বার যোগাযোগ হয়েছিল বলেও আদালতে উল্লেখ করেন তিনি।
মেটার বিরুদ্ধে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগ
মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মেটা শিশু ও কিশোরদের আকৃষ্ট করতে এবং তাদের দীর্ঘসময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে এমন কিছু ফিচার ও ডিজাইন ব্যবহার করেছে, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা আদালতে অভিযোগ করেন, মেটা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সঙ্গে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, আত্মহানি এবং খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার সম্পর্কের বিষয়ে অবগত ছিল। এমনকি ‘লাইক’ বাটনের মতো কিছু ফিচার কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ও বাধ্যতামূলক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে পারে—মেটা বিষয়টি জানত বলেও দাবি করেন তিনি।
বন্টার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে মেটা এবং প্রতিষ্ঠানটি তার পণ্যের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করেনি।
মেটার পাল্টা দাবি
তবে আদালতে মেটার আইনজীবীরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে কিশোরদের জন্য আসক্তিকর করে তৈরি করা হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
মেটার পক্ষ আরও বলা হয়, ১৩ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অপসারণে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত পদক্ষেপ নেয়। আইনজীবীর দাবি, গত তিন মাসেই ১৩ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের তৈরি প্রায় ৬ লাখ অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেছে মেটা।
মেটা আরও বলেছে, তরুণদের নিরাপত্তা ও সুস্থতার বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ফিচার ও টুল চালু করা হয়েছে।
রায়ের প্রভাব পড়তে পারে পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
মেটার বিরুদ্ধে চলমান এই মামলাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য অন্যতম বড় আইনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত যদি অভিযোগের পক্ষে রায় দেন, তাহলে মেটাকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মের নকশা ও কার্যপ্রণালিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটির প্রভাব শুধু মেটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিচার ও ডিজাইনের কারণে শিশু-কিশোরদের ক্ষতি হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করার পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে।
মামলার বিচার কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার কথা। এতে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গসহ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন বলে জানা গেছে। এই মামলার রায় কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
মতামত