৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও জনবল কাঠামো এখনো ৩১ শয্যার। অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বড় একটি অংশ শূন্য। প্রয়োজনের তুলনায় নেই গাইনি ও ইএনটি বিশেষজ্ঞসহ কয়েকজন চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল। এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। এত সংকটের মধ্যেও থেমে নেই চিকিৎসাসেবা। বিশেষ করে প্রসূতি সেবায় ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখিয়ে চলেছে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে,উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডা. সিনথিয়া তাসমিন ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রসূতি সেবার মানোন্নয়ন,নিয়মিত তদারকি এবং চিকিৎসক,নার্স ও মিডওয়াইফদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর দায়িত্বকালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে হাসপাতালে ২ হাজার ৭২৬টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে জটিল প্রসূতিদের প্রয়োজন অনুযায়ী ১১৩টি সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান,২০২৫ সালের আগস্টে এক মাসে ২২০টি স্বাভাবিক প্রসব হয়, যা হাসপাতালটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ। চলতি ২০২৬ সালের আগস্টেও ২১৫টি স্বাভাবিক প্রসবের বিপরীতে ৮টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০২২ সালে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা ছিল ৪১০টি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩২৮টি প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে,গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ,প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি চিকিৎসক,নার্স ও মিডওয়াইফদের সমন্বিত কাজের কারণে প্রসূতি সেবায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
মাতৃসেবা নিতে আসা শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৬ নম্বর আশীদ্রোন ইউনিয়নের কাকিয়ার পুল এলাকার সুমাইয়া আক্তার বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসকদের ব্যবহার ও সেবায় আমি সন্তুষ্ট।”
হরিণছড়া চা-বাগানের কৃষ্ণা রাণী বলেন, চা-বাগান এলাকার নারীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে মাতৃসেবা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাচ্ছেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (RMO) ডা. আকাশ নুনিয়া বলেন,প্রসূতি সেবায় চিকিৎসক,নার্স,মিডওয়াইফসহ সংশ্লিষ্ট সব স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বিত দায়িত্ব পালন গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত জনবল দিয়েও রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ও নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ্বজিৎ দেব জানান,প্রসবের পর নবজাতকের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থাপনা প্রসূতি সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসপাতালের প্রসূতি সেবায় এ বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি অ্যান্ড অবস.) ফারজানা হক পর্ণা বলেন,গর্ভবতী নারীর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ,ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সপ্তাহে একদিন শ্রীমঙ্গল হাসপাতালে ডা. সিনথিয়া তাসমিনের পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতায় স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি জটিল রোগীদেরও সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স হাছিনা আক্তার বলেন,ডা. সিনথিয়া তাসমিনের দিকনির্দেশনায় প্রসূতি ও নবজাতকের সেবায় নার্স ও মিডওয়াইফরা দায়িত্ব পালন করছেন। প্রসবের আগে,প্রসবের সময় এবং প্রসবের পর মা ও শিশুর পর্যবেক্ষণেও নিয়মিত নজর দেওয়া হচ্ছে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চা-শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা এবং সিন্দুরখান ও ভূনবীর ইউনিয়নের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীদের জন্য নিয়মিত ‘মা সমাবেশ’ ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে গর্ভবতী নারীদের প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে পরামর্শ, জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
প্রসূতি সেবার পাশাপাশি জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রমেও অগ্রগতি হয়েছে। জনসংখ্যাভিত্তিক VIA পরীক্ষা এবং ইলেকট্রনিক ডাটা ট্র্যাকিং কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়,এসব কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের মে মাসের অর্জনের পর আগস্টে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় ও মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে ডা. সিনথিয়া তাসমিন ও তাঁর টিমকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমেও নজরদারি করা হচ্ছে। সম্প্রতি উপজেলার একাধিক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক পরিদর্শন করেন ডা. সিনথিয়া তাসমিন। এ সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স,ল্যাবরেটরির কার্যক্রম,রিএজেন্ট সংরক্ষণ ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি হাসপাতালটির বড় চ্যালেঞ্জ জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও হাসপাতালটি এখনো ৩১ শয্যার জনবল কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী,অনুমোদিত ২৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১০ জন। গাইনি ও ইএনটি বিশেষজ্ঞসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে। এক্স-রে টেকনোলজিস্ট ও সনোলজিস্ট না থাকায় অ্যানালগ এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
আবাসিক চিকিৎসক (RMO) ডা. আকাশ নুনিয়া বলেন,"জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত রোগীর চাপ সামলে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সীমিত জনবল নিয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবায় অগ্রগতি হয়েছে।"
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন,ডা. সিনথিয়া তাসমিন যোগদানের পর থেকে নানা সংকটের মধ্যেও হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবায় অগ্রগতি হয়েছে। জনবল ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় পদ পূরণের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, “চিকিৎসক,নার্স ও মিডওয়াইফদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা প্রসূতি সেবায় এই অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছি। তবে হাসপাতালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি আছে।”
তিনি জানান,শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ও শ্রীমঙ্গলের সচেতন নাগরিকদের মতে,জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট দূর করা গেলে প্রসূতি সেবার পাশাপাশি হাসপাতালটির অন্যান্য চিকিৎসাসেবার পরিধিও আরও বাড়ানো সম্ভব। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান কার্যক্রম তাই একদিকে সংকটের চিত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ধারাবাহিক উন্নতির সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে।
মতামত