পানি সংগ্রহ করা ছিল পাহাড়ের মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামগুলোর একটি। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাতের কাছে ছিল না নিরাপদ পানির কোনো উৎস। খাবার পানি, রান্না, গোসল কিংবা গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে এক থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হতো তাদের। কোথাও কোথাও পানি সংগ্রহের জন্য নামতে হতো হাজার ফুট নিচের পাহাড়ি ঢালে।
ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা পাহাড়ি ছড়ার ঘোলা, কাদাযুক্ত ও অনিরাপদ পানিই ছিল এসব দুর্গম জনপদে বসবাসকারী পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিনের এই পানির সংগ্রাম ছিল তাদের জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। যেখানে এক কলস নিরাপদ পানির জন্যও লড়াই করতে হতো দুর্গম পাহাড়ি পথ আর প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে।
আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ায় পানি থাকলেও তা থাকত মাটি, কাদা ও ময়লায় ভরা। আর শুষ্ক মৌসুম এলেই পানির সংকট হয়ে উঠত আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হতো শুধু পানি সংগ্রহে। দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে ভারী কলসি কাঁধে পানি বহন করতে গিয়ে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি নিতে হতো নানা ঝুঁকিও।
বছরের পর বছর ধরে চলা সেই দুর্ভোগের চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে।
জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত মানুষও ঘরের কাছেই পাচ্ছেন নিরাপদ পানি। গভীর নলকূূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে দুর্গম এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
এর ফলে বান্দরবানের অন্তত ৫০টি প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়ার লক্ষাধিক পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবনে এসেছে স্বস্তি। দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট ভুলে এখন তাদের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি।
মঙ্গলবার ও বুধবার সরেজমিনে বান্দরবান সদর উপজেলার কয়েকটি দুর্গম ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত বিভিন্ন পাড়ার মানুষ এখন বাড়ির পাশেই স্থাপিত পানির কল থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছেন।
কেউ সেই পানি দিয়ে রান্নার কাজ সারছেন, কেউ গোসল করছেন, কাপড় ধুচ্ছেন কিংবা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছেন। কোনো কোনো এলাকায় পানির সহজলভ্যতা বাড়ায় কৃষি ও সেচ কাজেও পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ‘বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের’ আওতায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গভীর নলকূপ, জিএফএস, রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পাল্টের দিয়েছে আগের কষ্ট ও সংকটের চিত্র।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি পানি প্রকল্প নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রামে একটি বড় পরিবর্তনের ভূমিকা রাখছেন।
বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি গ্রাম টিএনটি মারমা পাড়া। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৬০বছর বয়সী বৃদ্ধা মাচিং মারমা বাড়ির পাশের পানির কল থেকে গোসল ও কাপড় ধোয়া শেষে কলসিতে পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। এক বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল তাঁর কাছে কল্পনার বাইরে।
ভাঙা ভাঙা বাংলায় পুরোনো দিনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মাচিং মারমা বলেন, আগে খাবার পানি, গোসল কিংবা কাপড় ধোয়ার জন্য পাড়া থেকে প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। এই বয়সে পাহাড়ের নিচে পানি আনতে যাওয়া খুব কষ্টের ছিল। যে পানি আনতাম, সেটাও ভালো ছিল না। অনেক সময় পানি ময়লা ও কাদাযুক্ত থাকত। সেই পানিই খাবার ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে হতো।
বাড়ির পাশে এখন নিরাপদ পানির ব্যবস্থা হওয়ায় স্বস্তির হাসি ফুটেছে এই বয়োবৃদ্ধার মুখে। তিনি বলেন, এখন বাড়ির পাশেই পানি পাচ্ছি। গোসল, কাপড় ধোয়া, রান্নাসহ সব কাজে ব্যবহার করতে পারছি। আমি অনেক খুশি। আমাদের পাড়ার সবাইও এখন খুশি।
টিএনটি পাড়ার নারী নেত্রী উখ্যাই ম্যা মারমা বলেন, একসময় পাহাড়ের নিচ থেকে পানি সংগ্রহ করা ছিল গ্রামের নারীদের প্রতিদিনের নিয়মিত সংগ্রামের অংশ। দিনের বড় একটা সময় শুধু পানি সংগ্রহ করতেই চলে যেত। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন পুরো গ্রামের মানুষ পানির সুবিধা পাচ্ছি। আমরা সবাই অনেক খুশি।
আরেক নারী উয়ই চিং মারমা জানান, পানি সহজলভ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে নারীদের জীবনে। আগে যে সময়ের বড় একটি অংশ পানি সংগ্রহে ব্যয় হতো, এখন সেই সময় পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও আয়মূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
মারমা পাড়ার বাসিন্দা মং নু চিং জানান, এই এলাকার কয়েকটি পাড়ার মানুষের জন্য আগে পানির প্রধান উৎস ছিল পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ঝিরি। ঝিরিটির পানিও ছিল অনেক দূরে। আবার পানি ছিল অপরিষ্কার, নোংরা ও ময়লাযুক্ত। কিন্তু কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এলাকার কয়েকটি পাড়ার হাজারো মানুষকে সেই পানির ওপরই নির্ভর করতে হতো।
মানুচিং মারমা বলেন, ৫/৬মাসে আগে জনস্বাস্থ্য বিভাগ একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়ির পাশে পানির কল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ঘরে বসেই মানুষ সুপেয় খাবার পানি পাচ্ছেন।
পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, আগে তাদের এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল পানি। জনস্বাস্থ্য বিভাগের স্থাপিত একটি গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে এই এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবারের কয়েকশ মানুষ এখন বাড়ির কাছেই সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বান্দরবান শহরের পর্যটন মোটেল এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও কনক চাকমা জানান, একসময় এই এলাকার কয়েকটি পাড়ার মানুষ চরম পানি সংকটে ছিল। এখন সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। খুব সহজেই খাবার ও ঘরের নিত্যদিনের ব্যবহারের পানি পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বান্দরবান-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের লম্বা রাস্তা পাড়ার বাসিন্দা হামিদা বেগম, রোকসানা আকতার, বেল্লাল হোসেন, ফারুক আহমেদ ও হাসেম আহমেদ বলেন, তাদের পাড়ার প্রায় ১০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাবার পানি ও ব্যবহার্য পানির চরম সংকটে ছিল। শুষ্ক ও তীব্র গরমের মৌসুমে পানির সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করত।
তাঁরা জানান, কয়েক মাস আগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এলাকায় একটি রিংওয়েল স্থাপন করে দিয়েছে। এখন এই পরিবারগুলোর প্রায় ৩৫জন মানুষ সহজেই পানির সুবিধা পাচ্ছেন। এখন বাড়ির কাছেই পানি পাওয়ায় আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়েছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিহেডিসি ও ডিপিএইচই’র অর্থায়নে-‘স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প এর মাধ্যমে ৪৫কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রযুক্তি মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও সেনিটেশন প্রকল্পে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থ সালে বান্দরবানে ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন করে আরও ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ নির্মাণ, পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত ৩০টি টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম জানান, স্থানীয় লোকজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এব্যাপারে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে কালের কন্ঠকে বলেন, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহে একই ধরনের প্রযুক্তি সব জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয়।
তিনি জানান, ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার দুর্গম এলাকায় পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম মেরামতের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, গভীর নলকূপ এবং পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে আরও বলেন, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কিছু স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
মতামত