পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন আগামী ৬ অক্টোবর। এর আগে এক পুরোনো হত্যা মামলায় কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী গোষ্ঠী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআই—এর খবরে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের ঘটনায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, উপনির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা নির্বাচনে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এবং জয়ের প্রত্যয় জানিয়েছেন।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী বলেছেন, মিলন প্রধানের গ্রেপ্তার ‘কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়’, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেপ্তার কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়—এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গণতন্ত্রের হত্যা।’
তিনি বলেন, ‘বিজেপির অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে কোনো বিশ্বাস নেই। এ কারণেই তারা কখনো ভোট চুরি করে, কখনো সরকার চুরি করে এবং কখনো দল চুরি করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। তারা নির্বাচনে লড়তে চায় না; তারা পুরো নির্বাচনী লড়াইটাই শেষ করে দিতে চায়। কংগ্রেস ভয় পাবে না, মাথা নত করবে না। আমরা লড়ব এবং জিতব।’
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি গ্রেপ্তারকে ‘ভোট চুরি’ এবং ‘চুনাব (নির্বাচন) চুরি’র নির্লজ্জ চেষ্টা বলে মন্তব্য করেন। খাড়গে বলেন, ‘বিজেপি এতটাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে যে একটি উপনির্বাচনেও তারা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অপব্যবহার করে বিরোধী দলের একজন প্রার্থীকে নিশানা করে গ্রেপ্তার করছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতকে ‘গণতন্ত্রের মা’ বলে গর্ব করেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যা করছে, তা গণতন্ত্রের হত্যা। কংগ্রেসকে ভয় দেখানো বা চুপ করানো যাবে না। ঐক্যবদ্ধ ইন্ডিয়া জোট এর বিরুদ্ধে লড়াই করবে।’
কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীও গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আজ হঠাৎ করে, কোনো প্ররোচনা ছাড়াই, কোনো কারণ ছাড়াই স্থানীয় পুলিশ কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে।’ তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে প্রার্থিতা জমা দিয়েছেন এবং জেলার জেলা কালেক্টর তথা রিটার্নিং অফিসারের সামনে শপথ নিয়েছেন, তখন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সে সময় তিনি কোনো বাধা ছাড়াই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। যখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাকে সমর্থন করছে, তখন বিজেপি ভয় পেয়ে গেছে এবং হতাশা থেকে আমাদের সম্ভাবনা নষ্ট করতে তাকে গ্রেপ্তার করেছে।’
ভারতের নির্বাচন কমিশনের এক অন্তর্বর্তী আদেশের পরপরই মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই আদেশে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীকেই তাদের মূল নাম ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং ঐতিহ্যবাহী ‘ফুল ও ঘাস’ বা ‘জোড়া ফুল’ প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক দেওয়া হয়। অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে দেওয়া হয় ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘খাম’ প্রতীক। দলীয় সাংগঠনিক বিরোধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আসন্ন উপনির্বাচনগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
এই আদেশের এক দিন পর মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তারের সঙ্গে তাঁর দলের সমর্থন ঘোষণার সময়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এক্সে তিনি বলেন, ‘নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীকে আমরা সমর্থন করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হলো। এই সময় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। এটি বিজেপির চেনা ফর্মুলা—পুরোনো মামলা খুঁজে বের করা। কিন্তু এখন কেন? ঠিক তখনই কেন, যখন আমরা কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা করলাম?’
তবে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেস গোষ্ঠীর নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মিলন প্রধানের গ্রেপ্তারকে সমর্থন করেছেন। রাহুল গান্ধীর পোস্টের জবাবে তিনি এক্সে বলেন, ‘আমরা, ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস, মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছি। তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নির্বাচনের সময় পরোয়ানা কার্যকর করা বাধ্যতামূলক। রাজ্য কংগ্রেসের নেতৃত্ব সম্ভবত বিষয়টির প্রকৃত বিবরণ রাহুল গান্ধীকে জানায়নি।’
তৃণমূলের দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী গোষ্ঠীর নন্দীগ্রাম প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। এর আগে তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে জানা গেছে। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করেন। তিনি কংগ্রেসকে ‘সিস্টার পার্টি’ বা বোনের মতো দল বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে, বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক স্মৃতি ইরানি রাহুল গান্ধীর নির্বাচন কমিশনের সমালোচনার জবাব দেন। তিনি কংগ্রেসের শাসনামলের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপিকে কটাক্ষ করতে গিয়ে রাহুল গান্ধী আজ তাঁর নিজের দলের অন্ধকার ইতিহাসই তুলে ধরেছেন। এটা কি সত্য নয় যে ১৯৮০ সালে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে দেশের ৯টি রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করেছিল? এটা কি সত্য নয় যে ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকারের সময় কংগ্রেস সরকার বিহার বিধানসভা ভেঙে দিয়েছিল? এই কাজকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল। কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধী কেন বারবার নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করছেন? রাহুল গান্ধী কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন?’
বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্রও নির্বাচন কমিশনের আদেশ নিয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের জবাবে বলেন, ‘প্রথমত, রাহুল গান্ধী ভারতের বিচারব্যবস্থার প্রতি কোনো সম্মানই দেখান না। এখানে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে এবং তার ভিত্তিতে একটি রায় দেওয়া হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে ভবানীপুর আসন ধরে রাখেন। ফলে নন্দীগ্রাম আসনটি শূন্য হয়। নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী উভয়ের জন্যই দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আসন। ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন নন্দীগ্রামকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করে। উপনির্বাচনে বিজেপি হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে। কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধান। সিপিআই প্রার্থী করেছে শান্তি গোপাল গিরিকে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন এবং আসামের নগাঁও লোকসভা আসনের উপনির্বাচন ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা হবে ৯ অক্টোবর। ৬ অক্টোবরের ভোট যত এগিয়ে আসছে, নন্দীগ্রামের লড়াই ততই সাধারণ উপনির্বাচনের সীমা ছাড়িয়ে বড় রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হচ্ছে। দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধ, তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর সংঘাত, বিরোধী দলগুলোর ঐক্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেসের অপ্রত্যাশিত সমঝোতা এবং নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
মতামত