বিশেষজ্ঞরা লাভের ওপর কমিশন না নিয়ে আয়ের ওপর কমিশন নিয়েছেন বলে সরকারি অডিটে ধরা পড়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (সাবেক পিজি হাসপাতাল) পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এ ব্যাপারে বাড়তি টাকা আদায় করার নির্দেশনা দিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। জাতীয় সংসদ ভবনের টানেলে সংবাদ ব্রিফিং করেন তিনি।
প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আটটি অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তাহের। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু আপত্তিকে আমরা সেটেল ডাউন করেছি, আর কিছু কিছু আপত্তিকে আরও খতিয়ে দেখার জন্য কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি করেছি। তাঁরা সরেজমিনে তদন্ত করবেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেবেন। তার ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। তদন্ত কমিটিতে কমিটির সদস্য ফজলে হুদা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও আছেন।’
সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে সরকারের নিয়ম হচ্ছে লাভের ওপর ৩০ শতাংশ কমিশন বিশেষজ্ঞরা পাবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম লাভের ওপর না নিয়ে তাঁরা আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কমিশন নিচ্ছেন।’
উদাহরণ হিসেবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি বলেন, ‘১০০ টাকা আয়ে ব্যয় হয়েছে ৯০ টাকা। তাহলে তাঁরা কমিশন পাবেন ১০ টাকার ওপর। কিন্তু তাঁরা ১০ টাকার ওপর না নিয়ে ১০০ টাকার ওপর কমিশন নিয়ে গেছেন। বেশ কয়েক কোটি টাকা এ রকম আছে। আমরা খুব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছি যে, এই টাকা যেকোনোভাবে আদায় করতে হবে। কারণ এটা স্পষ্ট অনিয়ম। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদায় করবে এবং কত আদায় হচ্ছে প্রতি মাসে কমিটিকে তারা প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে বর্তমানে নিয়ম অনুসারে কমিশন নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটার প্রতিবেদন প্রতি মাসে আমাদের কাছে পাঠাবে।’
তাহের বলেন, ‘এ কমিটির প্রধান কাজ হচ্ছে সরকারের বর্তমান এবং অতীতের যত ব্যয় হয়েছে এবং যেগুলোর ওপর অডিট আপত্তি আছে, সেগুলো এ কমিটিতে আলোচনা হবে। ব্যত্যয়গুলোকে আমরা চিহ্নিত করব এবং যদি কোনো দুর্নীতি থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করতে পারি।’
সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটিকে কোয়াসি-জুডিশিয়াল (আধা-বিচার বিভাগীয়) কমিটিও বলা হয় উল্লেখ করে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে (কমিটি) অন দ্য স্পট একটা ডিসিশন (সিদ্ধান্ত) দেওয়ার এখতিয়ার রাখে। আমাদের দেশে ঠিক সেরকম হয়নি। তবে এখন থেকে যে সুপারিশগুলো যাবে যেকোনো মন্ত্রণালয়ের কাছে, সেটাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আমরা আশা করি, সেটা পাব। আমরা আশা করি, বাংলাদেশে যে দুর্নীতি চলছে, এই কমিটির মাধ্যমে কিছুটা হলেও দুর্নীতি রোধ করার জন্য চেষ্টা করব।’
অডিটে পুরোনো অনেক অডিট কেস সাবমিট করা হচ্ছে উল্লেখ করে তাহের বলেন, ‘আমরা অনেক অতীতে যেতে চাই না। আমরা ২০২৪-২৫ সালকেই অধিকতর টার্গেট করব। বর্তমান সরকারের সময়ের কিছু বিষয় অডিটে আনব আরও একটু সময় পরে, যেটাকে অডিট করার জন্য আমরা নির্দেশ দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অডিট করার জন্য চাচ্ছি। সেই হিসেবে সিএজিকে নির্দেশনা দিয়েছি যে, বড় বড় দুর্নীতি, অনিয়ম যেসব জায়গায় আছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকা দেওয়ার জন্য। সেই তালিকা পেলে আমরা ওই বিষয়গুলো এজেন্ডা বানিয়ে তদন্ত করব।’
প্রথম বৈঠকে বিগত স্বৈরাচার আমলের অডিট নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তাহের। তিনি বলেন, ‘এরপর তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল, এখন বর্তমান সরকার। এগুলো অডিট হবে, তারপর আমাদের কাছে আসবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, ‘এই সরকারেরও এক বছর পর থেকে যে সমস্ত অডিট দেবে, সেগুলো আমরা করব। সুতরাং ইন্টেরিম গভর্নমেন্টও আসবে, অতীতের যারা সরকার পরিচালনা করছে এখনো সেটেল হয়নি অডিট আপত্তি—সবগুলোর ব্যাপারে আমরা অ্যাড্রেস করব। আমরা এ বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস।’
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান, এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, মাহাবুবুর রহমান, হাফিজ ইব্রাহীম, এসকে আজিজুল বারী, মনজুরুল ইসলাম, ফজলে হুদা, মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, রুহুল আমিন।
মতামত