কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পাশাপাশি নগরবাসীর কাছে নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন।
মসজিদে নামাজ আদায়, জানাজা, কুলখানি, বিয়ে, সামাজিক আন্দোলন ও বিভিন্ন গণজমায়েতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে এরই মধ্যে নগরজুড়ে নির্বাচনি আমেজ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সিটি প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু। নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন। মহানগর বিএনপির সদস্য কাউসার জামান বাপ্পির নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার এবং সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এজন্য তারা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগে পরপর দুই সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কৃত হন তারা।
জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিন এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়ার নাম শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে এনসিপি কেন্দ্রীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলামকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এরপর থেকে তিনি নগরীর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন, বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরছেন।
সিটি প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, দল ও দলের প্রধান যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে চলবেন। বর্তমানে তিনি নগরবাসীর সেবায় ব্যস্ত রয়েছেন। নির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দলীয় হাইকমান্ড থেকেই আসবে।
নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, বহিষ্কৃত হলেও তিনি দলের বাইরে নন। দলের কার্যক্রম থেকেও কখনো দূরে সরে যাননি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপে অতীতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দল বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে।
সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন করেছেন। পাশাপাশি দলের জন্য নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে কর্মী-সমর্থকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি এগিয়ে যাবেন।
মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, তাদের দলে ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই নির্বাচনে অংশ নেবেন। আপাতত দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
এনসিপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম বলেন, নগরবাসীর সেবা করার প্রস্তুতি নিয়ে তিনি মাঠে নেমেছেন। গণসংযোগের মাধ্যমে বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করছেন। দল তাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং জোটের সমর্থন পাওয়ারও আশা করছেন।
আগের নির্বাচনের ফল
২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। এরপর ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথম সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে মনিরুল হক সাক্কু ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আফজাল খান পান ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট।
২০১৭ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনিরুল হক সাক্কু ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট পেয়ে আবারও মেয়র হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট।
২০২২ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত ৫০ হাজার ৩১০ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু পান ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। ওই নির্বাচনে নিজাম উদ্দিন কায়সার পেয়েছিলেন ২৯ হাজার ২৯ ভোট।
আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালের ৯ মার্চ মেয়র পদে উপনির্বাচন হয়। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তাহসীন বাহার সূচনা ৪৮ হাজার ৮৯০ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু পান ২৬ হাজার ৮৯৭ ভোট এবং নিজাম উদ্দিন কায়সার পান ১৩ হাজার ১৫৫ ভোট।
আগের দুই নির্বাচনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী এবং দলীয় বিরোধ নিয়ে আলোচনা ছিল। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণ কী দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মতামত