দিনাজপুরের জামতলী বাজার এলাকায় চার বছরের শিশু রাকিবা আক্তার রুহি হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় গ্রেপ্তার রিপন টুডুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালিয়ে শিশুটির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার সকালে জামতলী এলাকার একটি পরিত্যক্ত জঙ্গল থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় শিশুটির মা জিন্নাতুন বেগমকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার রিপন টুডু ও জিন্নাতুন বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার প্রকৃত কারণ, লাশ গুমের সঙ্গে কারা জড়িত এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে দিনাজপুর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিশু রুহি হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় রিপন টুডুকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার রাতে তাকে সঙ্গে নিয়ে লাশ উদ্ধারে অভিযান শুরু করে ডিবি পুলিশ। জামতলী বাজারসংলগ্ন আমবাগান, হলুদখেত ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর তল্লাশি চালানো হয়। অভিযানের একপর্যায়ে সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থান খুঁড়েও শিশুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান চালানোর পরও লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পরে গ্রেপ্তার রিপন টুডুর দেওয়া তথ্য পুনরায় যাচাই করে মঙ্গলবার সকালে দ্বিতীয় দফায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে জামতলী এলাকার একটি জঙ্গলের নির্জন ও পরিত্যক্ত স্থানে শিশুটির লাশের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে সেখান থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
লাশ উদ্ধারের সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এসআই শাহাদাত হোসেন, দিনাজপুর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হালিমসহ সাদা পোশাক ও পোশাকধারী পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানসংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার রাতে গ্রেপ্তার রিপন টুডুকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। লাশ কোথায় রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো পথ যাচাই করা হয়। রাতভর একাধিক স্থানে অনুসন্ধানের পর মঙ্গলবার সকালে পুনরায় অভিযান চালানো হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গলের একটি নির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করে সেখান থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।
দিনাজপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন বলেন, গ্রেপ্তার রিপন টুডুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু রুহির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় রিপন টুডু ও শিশুটির মা জিন্নাতুন বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যার মূল ঘটনা কী, কী কারণে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে, লাশ কোথায় এবং কীভাবে গুম করা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছে কি না—এসব বিষয় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার রিপন টুডু দিনাজপুর সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের জামতলী বাজারসংলগ্ন এলাকার নেপাল টুডুর ছেলে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার মাস আগে শিশু রুহির মা জিন্নাতুন বেগমের সঙ্গে রিপন টুডুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে জিন্নাতুন তার শিশুকন্যা রুহিকে নিয়ে রিপন টুডুর বাড়িতে বসবাস শুরু করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও ধারণা করা হচ্ছে, ওই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শিশুটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি পুলিশের প্রাথমিক ধারণা; হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস আগে শিশুটিকে হত্যার পর তার লাশ গুম করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার সময়, স্থান ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে।
উল্লেখ্য যে, এদিকে শিশু রুহির সন্ধান ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গত রোববার দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের জামতলী বাজার এলাকায় বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। এ সময় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত রিপন টুডুর বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। বাড়িতে থাকা মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বাইরে বের করে সড়কের ওপর আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।
অবরোধ চলাকালে দিনাজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলার মূল অভিযুক্ত রিপন টুডুকে গ্রেপ্তার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন।
এর পরদিন সোমবার পুলিশ শিশু রুহি হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত রিপন টুডুকে গ্রেপ্তার করে। তার সঙ্গে শিশুটির মা জিন্নাতুন বেগমের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর তাকেও গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে লাশ গুমের বিষয়টি
শিশু রুহির লাশ উদ্ধারের পর মামলার তদন্তে নতুন করে গতি এসেছে। হত্যার প্রকৃত কারণ, হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, কোথায় শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পর কীভাবে লাশ গুম করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল।
লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করছে পুলিশ। একই সঙ্গে লাশের ময়নাতদন্তসহ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে শিশুটির লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে জামতলী এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুটির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণের পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মতামত