মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা


আনোয়ার আলমগীর
আনোয়ার আলমগীর
| ফটো কার্ড

পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়; বরং তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থান, শিল্পায়ন এবং সাধারণ মানুষের মূলধন বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। তবে নীতিগত কাঠামোর জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং মানসিকতার কারণে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে গতিহীন অবস্থায় আটকে রয়েছে।  

​সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক এবং ডিএসই ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী দেশের পুঁজিবাজারের নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।  

​তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালের পুরনো মানসিকতা নিয়ে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার পরিচালনা করা অসম্ভব। বর্তমানে বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না; বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারকে আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। সূচক একটু বাড়লেই (যেমন ৫৮০০ বা ৫৯০০ পয়েন্টে পৌঁছালে) নানামুখী অপ্রয়োজনীয় নজরদারি এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাপে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।  

​তিনি আঞ্চলিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা যেখানে মাত্র ২৯০টি কোম্পানি নিয়ে তাদের সূচক ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশে সাড়ে তিনশরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও সূচক ৫ হাজার বা ৬ হাজারের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে না। এই কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের কারণে গত ৭২ বছরেও বাংলাদেশ 'ফ্রন্টিয়ার মার্কেট' থেকে 'ইমার্জিং মার্কেটে' উন্নীত হতে ব্যর্থ হয়েছে।  

​বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যখন নিয়ন্ত্রণের চাপে স্থবির, তখন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের অর্থনীতি কাটিয়ে ওঠার কৌশলটি বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের নজর কেড়েছে। চরম অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দায়িত্ব নেন গভর্নর জামিল আহমেদ।  

​তিনি অনুভবে আনেন যে, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ফেরানোর সহজ পথ হলো জনগণের হাতে থাকা বিপুল অর্থকে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্রোতে ফিরিয়ে আনা। এর অংশ হিসেবে:

১. সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ারবাজারের জন্য বিভিন্ন নীতিগত প্রণোদনা ঘোষণা করে।

২. বাজারে মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লেনদেনকৃত অর্থ ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকিং সিস্টেমে যুক্ত হয়, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দূর করে।

৩. বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরায় প্রায় ১৮৮০-রও বেশি আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী পাকিস্তানের বাজারে প্রবেশ করে, যার সরাসরি সুফল হিসেবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়।  

​দেশে বিপুল অর্থ, কিন্তু সঠিক কৌশলের অভাব

​বাংলাদেশের বাজারেও সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে যে মূলধনের অভাব নেই, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ 'টেকনো ড্রাগস' আইপিও। মাত্র ৭৩ কোটি টাকার আইপিও আবেদনের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা আবেদন করেছিলেন প্রায় ২৩০০ কোটি টাকা।  

​অর্থনীতিবিদদের মতে, আমাদের দেশে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারকে পরস্পর পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করার কোনো দূরদর্শী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শেয়ারবাজারকে গতিশীল না করে উচ্চ সুদে বন্ড বা সরকারি ঋণের দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে, যা বাজারে তারল্য বাড়ানোর বদলে ঘুরিয়ে মূল্যস্ফীতিকেই ত্বরান্বিত করছে।  

​বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বড় হলেও পুঁজিবাজারের দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বাজারকে গতিশীল করতে হলে:  

​অহেতুক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা: সূচক বাড়া বা কমাকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নিয়মে চলতে দেওয়া এবং অতিরিক্ত নজরদারির নামে বিনিয়োগকারীদের ভয় ছড়ানো বন্ধ করা।  

​সহায়ক নীতি গ্রহণ: ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কাটাতে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করা।  

​বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: বিশ্বমানের পুঁজিবাজার গঠনে আধুনিক ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।  

​শেয়ারবাজারকে ভয় না পেয়ে সাহসের সাথে সঠিক নীতি প্রণয়ন করলেই কেবল দেশের অর্থসংস্থান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রূপ নিতে পারে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়; বরং তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থান, শিল্পায়ন এবং সাধারণ মানুষের মূলধন বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। তবে নীতিগত কাঠামোর জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং মানসিকতার কারণে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে গতিহীন অবস্থায় আটকে রয়েছে।  

​সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক এবং ডিএসই ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী দেশের পুঁজিবাজারের নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।  

​তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালের পুরনো মানসিকতা নিয়ে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার পরিচালনা করা অসম্ভব। বর্তমানে বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না; বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারকে আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। সূচক একটু বাড়লেই (যেমন ৫৮০০ বা ৫৯০০ পয়েন্টে পৌঁছালে) নানামুখী অপ্রয়োজনীয় নজরদারি এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাপে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।  

​তিনি আঞ্চলিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা যেখানে মাত্র ২৯০টি কোম্পানি নিয়ে তাদের সূচক ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশে সাড়ে তিনশরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও সূচক ৫ হাজার বা ৬ হাজারের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে না। এই কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের কারণে গত ৭২ বছরেও বাংলাদেশ 'ফ্রন্টিয়ার মার্কেট' থেকে 'ইমার্জিং মার্কেটে' উন্নীত হতে ব্যর্থ হয়েছে।  

​বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যখন নিয়ন্ত্রণের চাপে স্থবির, তখন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের অর্থনীতি কাটিয়ে ওঠার কৌশলটি বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের নজর কেড়েছে। চরম অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দায়িত্ব নেন গভর্নর জামিল আহমেদ।  

​তিনি অনুভবে আনেন যে, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ফেরানোর সহজ পথ হলো জনগণের হাতে থাকা বিপুল অর্থকে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্রোতে ফিরিয়ে আনা। এর অংশ হিসেবে:

১. সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ারবাজারের জন্য বিভিন্ন নীতিগত প্রণোদনা ঘোষণা করে।

২. বাজারে মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লেনদেনকৃত অর্থ ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকিং সিস্টেমে যুক্ত হয়, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দূর করে।

৩. বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরায় প্রায় ১৮৮০-রও বেশি আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী পাকিস্তানের বাজারে প্রবেশ করে, যার সরাসরি সুফল হিসেবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়।  

​দেশে বিপুল অর্থ, কিন্তু সঠিক কৌশলের অভাব

​বাংলাদেশের বাজারেও সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে যে মূলধনের অভাব নেই, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ 'টেকনো ড্রাগস' আইপিও। মাত্র ৭৩ কোটি টাকার আইপিও আবেদনের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা আবেদন করেছিলেন প্রায় ২৩০০ কোটি টাকা।  

​অর্থনীতিবিদদের মতে, আমাদের দেশে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারকে পরস্পর পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করার কোনো দূরদর্শী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শেয়ারবাজারকে গতিশীল না করে উচ্চ সুদে বন্ড বা সরকারি ঋণের দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে, যা বাজারে তারল্য বাড়ানোর বদলে ঘুরিয়ে মূল্যস্ফীতিকেই ত্বরান্বিত করছে।  

​বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বড় হলেও পুঁজিবাজারের দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বাজারকে গতিশীল করতে হলে:  

​অহেতুক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা: সূচক বাড়া বা কমাকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নিয়মে চলতে দেওয়া এবং অতিরিক্ত নজরদারির নামে বিনিয়োগকারীদের ভয় ছড়ানো বন্ধ করা।  

​সহায়ক নীতি গ্রহণ: ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কাটাতে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করা।  

​বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: বিশ্বমানের পুঁজিবাজার গঠনে আধুনিক ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।  

​শেয়ারবাজারকে ভয় না পেয়ে সাহসের সাথে সঠিক নীতি প্রণয়ন করলেই কেবল দেশের অর্থসংস্থান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রূপ নিতে পারে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream