বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ এবং ধারাবাহিকভাবে আরও তিনটি বিভাগে লংমার্চের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে সরকারের সঙ্গে বিরোধী জোটে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকার পতনের হুঁশিয়ারি এবং পাল্টা সরকারের অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগ—উভয়পক্ষের বক্তব্যেই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আভাস দিচ্ছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের পথসভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের বাধার আশঙ্কায় বলেন, “বাধা দেওয়া হলে ৬ দফা ১ দফায় পরিণত হবে।” অন্যদিকে চট্টগ্রাম লালদীঘির সমাপনী সমাবেশে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, এই আন্দোলন ঢিলেঢালা বা ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ হবে না।
জাতীয় সংসদে ও দলীয় প্ল্যাটফর্মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী জোটের এই বিশাল গাড়িবহরের লংমার্চকে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও অরাজকতার অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা যেত, তবে আমরাই আগে তা করতাম।”
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সূত্রে খবর ছিল যে এই লংমার্চকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটিয়ে সরকারের ওপর দায় চাপানোর চক্রান্ত করছিল। বিএনপি নেতৃত্বের দাবি, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এ ধরনের বড় আন্দোলন অযৌক্তিক এবং জামায়াত মূলত আওয়ামী আমলের ১৬ বছরের অব্যবস্থাপনার দায়ও বিএনপির ওপর চাপানোর রাজনীতি করছে।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সমর্থন পেলেও সরকার প্রথম দিন থেকেই গণভোটের রায় ও জুলাই চার্টারকে অস্বীকার করছে। প্রেসিডেন্টশিয়াল অর্ডারে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকা এবং ৬ মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের বাধ্যবাধকতা পূরণ না করায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে তাদের উদ্দেশ্য এখনই সরকার ফেলে দেওয়া নয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, এটি কোনো সহিংসতার রাজনীতি বা দুর্বলতা নয়, বরং সরকারকে দেওয়া স্মারক ও সতর্কবার্তা। তবে দাবি মানা না হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, সংসদে অনভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের নিয়ে জামায়াতের যে একটি 'দুর্বল বিরোধী দল' ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই এই লংমার্চ। তবে জামায়াতের সামনে একটি জটিল হিসাব রয়েছে—তারা বিএনপিকে এমন চাপে ফেলতে চায় না যাতে নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিংবা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়। ফলে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন সরকারকে বিশাল কোনো পতন ঝুঁকিতে না ফেললেও রাজপথে শক্তিশালী বিরোধী দলের শক্ত অবস্থানের জানান দেবে।
উল্লেখ্য, ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১০ অক্টোবর খুলনা ও ২৪ অক্টোবর সিলেটে লংমার্চ শেষে আগামী নভেম্বরে ঢাকায় বড় ধরনের মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য জোট।
সুত্র: বিবিসি
মতামত