রক্তাক্ত এক সকাল বদলে দিয়েছিল বিশ্বকে
সময় কখনো থেমে থাকে না। কিন্তু কিছু দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে ইতিহাস হয়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তেমনই এক দিন—যে দিন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা শুধু হাজারো মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিমান চলাচল, যুদ্ধনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বৈশ্বিক কাঠামো।
আজ সেই ভয়াবহ ঘটনার ২৫ বছর। এক প্রজন্মের কাছে ৯/১১ এখন ইতিহাসের অধ্যায়; আর যারা সেদিনের দৃশ্য দেখেছেন, তাঁদের কাছে এটি এখনো এক জীবন্ত স্মৃতি—আগুনে জ্বলতে থাকা ভবন, আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষ এবং অবশেষে নিউইয়র্কের আকাশরেখা থেকে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের দুই প্রতীকী টাওয়ারের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সমন্বিত আত্মঘাতী হামলা চালায়। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ও দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। তৃতীয় বিমানটি আঘাত হানে ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। চারটি বিমানেই থাকা যাত্রী ও ক্রুসহ বহু মানুষ নিহত হন।
কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই টাওয়ার কেন ধসে পড়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘বিমান আঘাত করেছিল’ বললে সম্পূর্ণ হয় না। এর পেছনে ছিল একাধিক কাঠামোগত ও অগ্নিকাণ্ডজনিত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (NIST)-এর দীর্ঘ তদন্তে সেই প্রক্রিয়ার একটি বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
আঘাত ছিল প্রথম ধাক্কা, শেষ কারণ নয়
দুটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান অত্যন্ত উচ্চগতিতে টাওয়ার দুটির সঙ্গে সংঘর্ষ করে। বিমানের আঘাতে ভবনের বহির্ভাগের বহু কলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরের কাঠামোরও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে ভবনের বেশ কয়েকটি তলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিমান আঘাতের পরপরই টাওয়ার দুটি ধসে পড়েনি। বরং উভয় ভবনই কিছু সময় দাঁড়িয়ে ছিল। এর অর্থ, প্রাথমিক আঘাত ভবনের কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও সেটিই এককভাবে ধসের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল না।
বিমান সংঘর্ষের পর শুরু হয় দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়—আগুন।
আগুনের ভয়াবহতা
বিমান দুটিতে বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল ছিল। সংঘর্ষের মুহূর্তে এর একটি বড় অংশ ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুন দ্রুত ভবনের একাধিক তলায় ছড়িয়ে দেয়। বিমানটির জ্বালানি অত্যন্ত তীব্র আগুন সৃষ্টি করলেও এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা সংশোধন করা প্রয়োজন: আগুনে টাওয়ারের ইস্পাত সরাসরি গলে যায়নি।
ইস্পাত গলতে যে তাপমাত্রা প্রয়োজন, ভবনের আগুন সাধারণত সেখানে পৌঁছায়নি। কিন্তু কোনো ধাতুকে গলিয়ে ফেলাই তার কাঠামোগত ব্যর্থতার একমাত্র পথ নয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাতের শক্তি ও দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র তাপের সংস্পর্শে থাকলে কাঠামোগত সদস্যগুলো বিকৃত হতে পারে এবং তারা যে ভার বহন করার জন্য নকশা করা হয়েছিল, সেই সক্ষমতাও হারাতে পারে।
৯/১১-এর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাপ্রবাহটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফায়ারপ্রুফিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভূমিকা
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ইস্পাত কাঠামোর ওপর অগ্নিরোধী আবরণ বা ফায়ারপ্রুফিং ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আগুনের তাপে ইস্পাতের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া ঠেকানো এবং ভবনকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাঠামোগত স্থিতিশীলতা দেওয়া।
বিমানের সংঘর্ষের প্রবল অভিঘাতে বিভিন্ন স্থানে এই ফায়ারপ্রুফিং ক্ষতিগ্রস্ত বা খসে পড়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ইস্পাত কাঠামো আগুনের তাপের কাছে আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
এখানে বিমানের আঘাত ও অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। সংঘর্ষ শুধু কলাম ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; একই সঙ্গে ভবনের অগ্নিনিরোধী সুরক্ষাকেও দুর্বল করে দিয়েছিল।
মেঝের কাঠামোতে তাপের প্রভাব
ভবনের মেঝেগুলো ছিল বিস্তৃত কাঠামোগত ব্যবস্থার অংশ। তীব্র আগুনে মেঝের ইস্পাত ট্রাসগুলো উত্তপ্ত হয়ে দুর্বল ও বিকৃত হতে থাকে। উত্তপ্ত মেঝের কাঠামো নিচের দিকে বেঁকে যেতে থাকে এবং এর সঙ্গে যুক্ত বহির্ভাগের কলামগুলোর ওপরও টান সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, বিমান আঘাতে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কলামগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। ফলে কাঠামোর বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভারবহন ও ভার পুনর্বণ্টনের যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি ক্রমশ সংকটের মুখে পড়ে।
একটি বহুতল ভবনের শক্তি শুধু একটি কলাম বা একটি বিমের ওপর নির্ভর করে না। বহু উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে। কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য অংশগুলো সাময়িকভাবে সেই অতিরিক্ত ভার বহন করতে পারে। কিন্তু ক্ষতির মাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে সেই ভার পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থাও ব্যর্থ হতে শুরু করে।
শুরু হয় ধসের ধারাবাহিকতা
তদন্ত অনুযায়ী, আগুন ও কাঠামোগত ক্ষতির সম্মিলিত প্রভাবে টাওয়ারের নির্দিষ্ট তলায় কাঠামোগত ব্যর্থতা শুরু হয়। যখন ওপরের বিশাল ভর নিচের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশের ওপর পতিত হতে শুরু করে, তখন সেই গতিশীল ভার অত্যন্ত দ্রুত বাড়তে থাকে।
এখানেই ‘প্রগ্রেসিভ কলাপ্স’ বা ধারাবাহিক ধসের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
সহজ ভাষায় বলা যায়, একটি তলার ওপরের বিশাল কাঠামো যখন নিচের অংশের ওপর পতিত হয়, তখন নিচের অংশকে শুধু স্থির অবস্থায় থাকা ভবনের ওজনই বহন করতে হয় না; পতনশীল ভরের গতিশক্তিও সামলাতে হয়। এক পর্যায়ে নিচের কাঠামো সেই ভার ধারণ করতে না পারলে ধস আরও নিচে ছড়িয়ে পড়ে।
এভাবে একটি স্থানীয় কাঠামোগত ব্যর্থতা দ্রুত বৃহত্তর ধসে রূপ নিতে পারে।
তাই টুইন টাওয়ারের পতনকে শুধু ‘বিমান ধাক্কা দিয়ে ভবন ফেলে দিয়েছে’—এভাবে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্পূর্ণ। আবার শুধু ‘আগুনেই ভবন ধসে পড়েছে’ বলাও যথেষ্ট নয়। বরং বিমান আঘাত, কাঠামোগত ক্ষতি, ফায়ারপ্রুফিংয়ের ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী তীব্র অগ্নিকাণ্ড, উত্তপ্ত ইস্পাতের দুর্বলতা ও বিকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ কলাপ্স—সবগুলো পরস্পর সম্পর্কিত ধাপ হিসেবে কাজ করেছে।
আগুনে ইস্পাত গলেনি, কিন্তু ভবন হারাল স্থিতিশীলতা
৯/১১ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্ত একটি ভুল ধারণা হলো—‘জেট ফুয়েল ইস্পাত গলিয়ে দিয়েছিল।’ বাস্তবে ঘটনাটি এভাবে ঘটেনি।
ইস্পাত গলানোর মতো তাপমাত্রায় পৌঁছানোর প্রয়োজনই ছিল না। প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চ তাপমাত্রায় ইস্পাতের শক্তি ও দৃঢ়তা কমে যায় এবং কাঠামোগত উপাদানগুলো বিকৃত হতে পারে।
একটি ইস্পাতের ভবন আগুনে টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করে শুধু আগুনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ওপর নয়; বরং কতক্ষণ আগুন চলেছে, অগ্নিরোধী সুরক্ষা কতটা অক্ষত ছিল, কোন কাঠামোগত অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেই সময় ভবনের ভার কীভাবে বিভিন্ন অংশে বণ্টিত হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর।
৯/১১-এর টাওয়ারগুলোর ক্ষেত্রে এসব কারণ একই সময়ে কাজ করেছিল।
উদ্ধারকর্মীদের জন্য ছিল অকল্পনীয় বিপর্যয়
ভবন ধসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি ১১ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় হলো মানুষের জীবনহানি।
বিমান আঘাতের পর হাজারো মানুষ ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, জরুরি চিকিৎসাকর্মী এবং অন্যান্য উদ্ধারকর্মীরা বিপদের মাত্রা জেনেও মানুষের জীবন বাঁচাতে ভবনের দিকে এগিয়ে যান।
অনেক উদ্ধারকর্মী শেষ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
সেদিনের ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি স্থাপত্যের পতনের প্রতীক নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধেরও এক গভীর স্মারক।
৯/১১-এর পর বদলে যায় বিশ্ব
১১ সেপ্টেম্বরের প্রভাব নিউইয়র্কের সীমানায় আটকে থাকেনি। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, পরবর্তী সময়ে ইরাক যুদ্ধ, বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার বিস্তার—সবকিছুই ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
বিমানযাত্রার অভিজ্ঞতাও বদলে যায়। যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি, ককপিটের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের প্রবেশব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়।
তবে এই পরিবর্তনের মূল্য নিয়েও বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক স্বাধীনতা, যুদ্ধের বৈধতা এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানি—এসব প্রশ্নও ৯/১১-পরবর্তী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্মৃতি যেন ঘৃণার নয়, শিক্ষার হয়
২৫ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বরের দিকে ফিরে তাকানোর অর্থ শুধু পুরোনো ক্ষতকে স্মরণ করা নয়। বরং এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অগ্রসর একটি আধুনিক সমাজও কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এটি আরও শেখায় যে বড় বিপর্যয় সাধারণত একটি মাত্র কারণে ঘটে না। অনেক সময় একাধিক দুর্বলতা একই সময়ে একত্রিত হয়ে বিপর্যয়কে ভয়াবহ করে তোলে। প্রকৌশল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি যোগাযোগ এবং মানবিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাই একটি ছোট ভুলও কখনো কখনো বড় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আজকের বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ আগের রূপে নেই—এমনটা বলা যায় না। এর চরিত্র বদলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বদলেছে, হুমকির ধরন বদলেছে। কিন্তু ৯/১১-এর শিক্ষা এখনো প্রাসঙ্গিক: নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র বা নজরদারি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয়, নিরাপদ অবকাঠামো, মানবিক মূল্যবোধ এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি।
২৫ বছর পর
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সেই দুই টাওয়ার আজ আর নেই। কিন্তু তাদের পতনের ছবি, ধোঁয়ায় ঢাকা নিউইয়র্কের আকাশ এবং সেদিনের মানুষের আর্তনাদ ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি।
২৫ বছর পরও ১১ সেপ্টেম্বর তাই কেবল আমেরিকার ইতিহাসের একটি দিন নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী স্থাপনাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানবিক উন্মাদনা তার অপব্যবহার করতে পারে। আবার বিপর্যয়ের মুহূর্তে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে—যেমন দাঁড়িয়েছিলেন সেদিনের অগণিত উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর একটি স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় সম্ভবত প্রতিশোধের আগুনকে দীর্ঘায়িত করা নয়; বরং সেই ইতিহাস থেকে এমন শিক্ষা নেওয়া, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
১১ সেপ্টেম্বরের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে কেবল তাঁদের নাম স্মরণ করা নয়—মানবজীবনের মূল্য, শান্তির প্রয়োজন এবং সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতিকে স্মরণ করা।
"টুইন টাওয়ার"
পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেল, তবু সে দিন যায়নি,
ধোঁয়ার কালো মেঘের নিচে সকাল থেমে রইল যেনই।
নিউইয়র্কের আকাশজুড়ে আগুন জ্বলার ক্ষণ,
মানুষ তখন বুঝেছিল—কত ভঙ্গুর জীবন।
দুটি টাওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল স্বপ্নের মতো উঁচু,
বিশ্ববাণিজ্যের প্রতীক যেন আকাশ ছুঁতে পিছু।
হঠাৎ এসে লোহার পাখি ছিন্ন করল বুক,
শহরজুড়ে আতঙ্ক নামে, স্তব্ধ হলো সুখ।
একটি আঘাত—তারপর আগুন, ধোঁয়া, আর্তনাদ,
ভেঙে গেল নিরাপত্তার অহংকারের বাঁধ।
ইস্পাত গলেনি আগুনে, তবু দুর্বল হলো প্রাণ,
ক্ষত-বিক্ষত কাঠামো বলল—শেষ নয় আঘাতের গান।
বিমানের সেই অভিঘাতে ক্ষত হলো স্তম্ভ,
ফায়ারপ্রুফিং খসে গিয়ে বাড়ল আগুনের দম্ভ।
উত্তপ্ত হলো মেঝে, বাঁকল ইস্পাতের শরীর,
ভারবণ্টনের সীমা পেরিয়ে নড়ল স্থাপত্যের নীর।
একটি তলার ব্যর্থতা যে নামল নিচের তলায়,
পতন তখন বজ্রের মতো ছড়িয়ে গেল ছায়ায়।
ওপর থেকে নিচে নেমে ধসের কালো ঢেউ,
মানুষ তখন জীবন বাঁচায়—নিজের কথা ভোলে কেউ।
সিঁড়ি বেয়ে নামছে মানুষ, চোখে ভয়ের জল,
উঠছে উল্টো দিকেই কেউ—বাঁচাতে জীবন শতশত দল।
অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ, চিকিৎসকের সারি,
মৃত্যু জেনে ছুটে গেল তারা—মানুষ বাঁচাবার ভারী।
কেউ ফিরেছে, কেউ বা ফেরেনি আপন ঘরের দ্বারে,
কারও নামটি পাথর হয়ে আজও লেখা স্মৃতিধারে।
ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে কত স্বপ্ন, কত গান,
কত মায়ের বুকের ধন, কত শিশুর প্রাণ।
শুধু কি তবে একটি নগর হারিয়েছিল তার মুখ?
না—সেদিন কেঁপে উঠেছিল পৃথিবীর নিরাপত্তার সুখ।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে গেল আতঙ্কেরই ছায়া,
যুদ্ধের নামে বহু দেশে জ্বলল নতুন মায়া।
আফগান পাহাড়, মরুপ্রান্তর দেখল যুদ্ধের ক্ষত,
প্রতিশোধের আগুনে কত জীবন হলো নিঃস্ব, হত।
সন্ত্রাস রুখতে গড়ে উঠল নজরদারির জাল,
নিরাপত্তার নামে কখনো স্বাধীনতারও কাল।
বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি, কঠোর হলো দ্বার,
গোপন তথ্য, গোয়েন্দা চোখ—বদলে গেল সংসার।
প্রশ্ন উঠল—নিরাপত্তা কতদূর, আর ভয় কত?
মানবাধিকারের পাল্লায় কে রাখবে মানুষের মত?
ইতিহাস তাই একরৈখিক কোনো কাহিনি নয়,
একটি দিনের অগ্নিকাণ্ডে বহু দিনের ক্ষয়।
আতঙ্ক যেমন সত্য ছিল, তেমনি সত্য ক্ষত,
যুদ্ধের ভেতর নিরীহ মানুষের কান্নাও অবিরত।
তবু সেই দিন শুধু কি অন্ধকারের নাম?
না, অন্ধকার ভেদ করে উঠেছিল মানবতার দাম।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষ মানুষকে ধরেছে,
অচেনা হাত অচেনা প্রাণ বাঁচাতে এগিয়েছে।
আগুনের ভেতর যে মানুষ অন্যের হাত ধরে,
তারই কাছে মানবসভ্যতা আজও মাথা নত করে।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যারা দেখিয়েছে সাহস,
তাদের স্মৃতি শেখায়—মানুষের হৃদয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়।
পঁচিশ বছর পর আজ তাই প্রশ্ন জাগে মনে—
কী পেল বিশ্ব প্রতিশোধের দীর্ঘ অগ্নিক্ষণে?
কত শহর ছাই হয়েছে, কত চোখ হয়েছে শূন্য,
কত শিশুর শৈশব গেল যুদ্ধের কাছে ঋণী?
সন্ত্রাস যদি অন্ধকার হয়, যুদ্ধ কি তার ঔষধ?
নিরীহ প্রাণের রক্ত দিয়ে মুছে কি যায় ক্ষত?
ঘৃণার বীজ ঘৃণাই আনে—ইতিহাস তার সাক্ষী,
শান্তির পথে ফিরতে হলে মানুষকেই হতে হবে রক্ষী।
প্রযুক্তি যত শক্তিশালী, তত বাড়ে দায়,
জ্ঞান যদি বিবেকহীন হয়, ধ্বংস নেমে যায়।
আকাশচুম্বী অট্টালিকা, পারমাণবিক শক্তি,
মানবতার কাছে হেরে যায় যদি হারায় নৈতিক ভক্তি।
ভবন শেখায়—কাঠামো চাই শক্ত, নিরাপদ, দৃঢ়,
আগুন এলে প্রস্তুতি চাই, চাই ব্যবস্থাপনা নির্ভুল।
রাষ্ট্র শেখায়—গোয়েন্দা জ্ঞান, সহযোগিতা, সংহতি,
মানুষ শেখায়—দুঃসময়ে মানবতাই মহাশক্তি।
স্মরণ মানে প্রতিশোধ নয়, স্মরণ মানে শপথ—
আর যেন কোনো শিশুর চোখে না নামে যুদ্ধরাত্রির ক্ষত।
আর যেন কোনো মা না হারায় সন্তানের উষ্ণ হাত,
আর যেন কোনো শহর না শোনে মৃত্যুর উন্মত্ত রাত।
নিউইয়র্কের সেই আকাশ আজও সাক্ষী হয়ে রয়,
ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন মরে না কোনোদিনই ক্ষয়।
টাওয়ার নেই, তবু আছে মানুষের অমর স্মৃতি,
ধ্বংসের বুক চিরে জাগে শান্তির নতুন গীতি।
পঁচিশ বছর—সময় বয়ে যায়, ইতিহাস থাকে জেগে,
পুরোনো ক্ষত শেখায় মানুষ কেমন থাকবে বেঁচে।
শক্তির চেয়ে বিবেক বড়, ঘৃণার চেয়ে প্রেম,
মানুষ যদি মানুষ থাকে—সুন্দর হবে হেম।
তাই এসো আজ স্মরণ করি অশ্রুভেজা প্রাতে,
নিহত সকল মানুষের নাম শ্রদ্ধার সাথে।
ধর্ম-বর্ণ-দেশের ঊর্ধ্বে একটাই হোক মান—
মানুষের চেয়ে বড় নয় কোনো রাষ্ট্র, কোনো প্রাণ।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যে শিক্ষা আজও রয়—
সহিংসতার শেষ ঠিকানা কখনো শান্তি নয়।
ইতিহাস শুধু মনে রাখি—এই হোক অঙ্গীকার,
ঘৃণার বদলে মানবতায় গড়ব পৃথিবী আবার।
পঁচিশ বছর পরও তাই প্রশ্নটি যায় জেগে—
শুধু কি স্মৃতি বয়ে যাব, নাকি শিক্ষা নেব বুকে?
যদি সত্যিই শিখি তবে সার্থক হবে স্মরণ—
মানুষ বাঁচুক, শান্তি জাগুক—এই হোক শেষ উচ্চারণ।
—(টুইন টাওয়ার, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
২৫ বছর পরও তাই ১১ সেপ্টেম্বর আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করব, নাকি ইতিহাস থেকে সত্যিই শিখব?
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মতামত