“আমরা কমিউনিস্টরা বীজের মতো এবং মানুষরা পৃথিবীর মতো। আমরা যেখানেই যাই মানুষের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, মানুষের মাঝে শিকড় ও উন্নতি করতে হবে।” – মাও সেতুং
কিংবদন্তি বিপ্লবী রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক ও নিজস্ব মতবাদিক চিন্তাধারার প্রবক্তা, চীন বিপ্লবের মহানায়ক, আধুনিক ও নয়া গণতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মাও সেতুংয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
কমরেড লেনিন ও কমরেড স্ট্যালিন পরিচালিত ১৯১৭ সালের অক্টোবরে দুনিয়া কাঁপানো বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব চর্চায় চীনা বাস্তবতায় বৈজ্ঞানিক ও সৃজনশীল প্রয়োগে নতুন এক বৈপ্লবিক মতবাদিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়ে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
মহান বিপ্লবী নেতা কমরেড মাও সেতুংকে আধুনিক চীনের রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন চীনা বিপ্লব, বিশেষত আর্থ-সামাজিক আমূল পরিবর্তনের নতুন স্তর নির্ধারণ ও সমাজ বদল এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব, তার প্রভাবের কারণেই। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের চেয়ারম্যান এবং আমৃত্যু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বে বিবেচিত হন একজন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক হিসেবেও। এছাড়া অনেকগুলো বইয়ের লেখক ও কবি হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। তার দর্শনই মাও সেতুং চিন্তাধারা বা মাওবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। জীবদ্দশায়ও পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের আদর্শের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন।
মৃত্যুর এত বছর পরও কমরেড মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারায় প্রবর্তিত সাম্যবাদ-সমাজতন্ত্র অভিমুখী নয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনো বিদ্যমান।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ২৪ বছর বয়সে রাজধানী পিকিংয়ে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ও সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া কমরেড মাওয়ের নিরন্তর বিপ্লবী সংগ্রাম ও প্রচেষ্টায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। পরে সফলভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রনায়কও হন তিনি।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে চীন কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসনে বুঁদ ছিল। জনসাধারণ রাজতন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সান ইয়াত সেনের সঙ্গে যোগ দেন কমরেড মাও সেতুং। গণআন্দোলনে সফল হন। চীন মুক্তি পায় কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসন থেকে।
তিনি ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের শাং তান জেলার শাউ শাং চুং গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাও সেতুংয়ের বাবার নাম ছিল মাও জেন শেং (শুন সেন)। শুন শেং দরিদ্র কৃষক হলেও কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করে জমিজমা ক্রয় করে অবস্থার উন্নতি করেন এবং কাঁচামালের ব্যবসা করে রীতিমতো মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হয়ে ওঠেন। মাওয়ের অন্য দুই ভাইয়ের নাম ছিল সে সেন ও সে তান। মাওয়ের মা ছিলেন শিয়াং শিয়াং জেলার তং শিয়াতো গ্রামের বেন পরিবারের কন্যা। তিনি ছিলেন দয়ালু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগী। মাওয়ের বয়স যখন মাত্র সাত তখন থেকে ক্ষেতখামারের কাজে লেগে যান। ১৯০১ সালে আট বছর বয়সে মাও গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। এবং ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত ওই পাঠশালায় লেখাপড়া করেন। ১৯০৬ সালে মাওয়ের গ্রামের পড়াশোনা শেষ হয়। এরপর তার বাবা তাকে সৈন্য দলে ভর্তি করানোটাকে লাভজনক মনে করেন।
তরুণ বয়স থেকেই মাও সেতুং বামপন্থী রাজনৈতিক ধ্যানধারণার অনুসারী হয়ে পড়েন। ১৯১৯ সালে চীনকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে চীনের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে একটি আন্দোলন চলছিল। সে আন্দোলনে তিনিও ভূমিকা রাখেন লেখনীর মাধ্যমে। ১৯২০ সালের দিকে তিনি একজন মার্কসবাদী হিসেবে চীনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ওই বছরই চীনের চাংশায় ফিরে যান এবং হুনান প্রদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য উদ্যোগী হন, যদিও তার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর ১৯২১ সালে সাংহাই যান তিনি। সে সময় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হচ্ছিল ওখানে। সেই গোপন মিটিংয়ে উপস্থিত হন কমরেড মাও। তারপর তিনি হুনান প্রদেশে ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির একটি আঞ্চলিক শাখার কাজ শুরু করেন। ১৯২৫ সালে জন্মগ্রাম শাওশানে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন মাও। ১৯২৭ সালের দিকে কৃষক আন্দোলন নিয়ে তার লেখনীতে তিনি কৃষকদের বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
কউমিঙটাঙ দলের নেতা কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল চিয়াং কাই সেক কমিউনিস্টবিরোধী দমননীতি শুরু করলে মাও সেতুং হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্য বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিলেও পরাজিত হন তিনি। পরে চীনের দক্ষিণের পার্বত্য এলাকা জিয়াংজি প্রদেশে চলে যান মাও। এ সময় অসংখ্য তরুণ দলে দলে মাও নিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করে। মাও সেতুং তাদের সশস্ত্র সংগঠিত করেন। ইতিহাসে এই সশস্ত্র দলটি রেড আর্মি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল কৃষকের মুক্তি। আর সে লক্ষ্য অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করেন তারা।
১৯৩৪ সালে চিয়াং কাই শেক চীনের জিয়াংজি প্রদেশ ঘিরে ফেলে। বিস্ময়কর ও অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে সে বেড়াজাল ছিন্ন করে রেড আর্মিকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন কমরেড মাও সেতুং। এরপর তিনি শুরু করেন এক দীর্ঘ পদযাত্রা, যা ইতিহাসে লংমার্চ হিসেবে পরিচিত। চীনের উত্তরের ইয়ানান প্রদেশের উদ্দেশ্যে রেড আর্মির সঙ্গে ছয় হাজার মাইল দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে শুরু হয় এ পদযাত্রা।
১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই শেকের ন্যাশনাল পার্টি এবং মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে আগ্রাসী জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯৪৫ সালে জাপান পরাজিত হয়। তারপর চীনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ গৃহযুদ্ধে জয়ী মাও সেতুং চীনের বিশাল ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর বিজয়ী কমিউনিস্ট মুক্তিফৌজের অগ্রগামী অংশ ক্যান্টনে প্রবেশ করলে চিয়াং কাই শেক সদলবলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পালিয়ে ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নেন। স্বৈরশাসক কাই শেককে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন কমরেড মাও। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন।
১৯৪৯ সালে সমাজতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চীন শাসন করেন। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তার তাত্ত্বিক অবদান, সমর কৌশল এবং তার কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওসেতুং চিন্তাধারা বা মাওবাদ নামে পরিচিত। শাসনকালে তিনি চীনকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেন। তিনি চীনের শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনেন। ‘মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী’ পন্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় তিনি নিজের উদ্ভাবিত তত্ত্বের সৃজনশীল প্রয়োগে কাজে লাগান।
দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে কমরেড মাও সেতুং পার্টি ও জনগণের মধ্যে সংগ্রাম পরিচালনা করে বিজয়ের মাধ্যমে চীনকে তিনি নিয়ে যেতে সক্ষম হন আধুনিক দেশের কাতারে। ১৯৪৯ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই সময় কমিউনিস্ট পার্টিকে একমাত্র শ্রমিক শ্রেণির দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভূমি সংস্কারের সংগ্রাম ও কাজে তাকে শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় ভূস্বামীদের। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিজ দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে এ ক্ষেত্রেও তিনি সফলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন। কিছুক্ষেত্রে তাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা হলেও তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা প্রসারের মতো আরো কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনকে এক সময় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত করেন। কমরেড মাও যখন চীনের ক্ষমতায় আসেন তখন সমগ্র বিশ্বে চীনের পরিচয় ছিল একটি অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবে। বিগত সময়ের যুদ্ধ-বিগ্রহে চীন তখন ক্ষত-বিক্ষতপ্রায়। পুঁজিবাদী ভগ্নপ্রায় চীনকে নতুনভাবে কমরেড মাও সেতুং নির্মাণ করতে শুরু করলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে।
জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘ লড়াইয়ের সময় পার্টির ক্ষমতার প্রধান ভিত্তিই ছিল দেশটির গ্রামাঞ্চলে, ক্ষমতায় গিয়ে সে কথা ভুলে যাননি কমরেড মাও। চীনের কৃষিজীবী মানুষকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি পার্টির শাসন ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। কমরেড মাওয়ের রাষ্ট্রনীতি চীনকে বদলে দিয়েছিল। দেশটির সর্বজনীন আধুনিকায়ন, দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন এবং গণশিক্ষার ব্যাপক অগ্রগতিতে কমরেড মাও সেতুং বিশাল অবদান রেখেছেন নিঃসন্দেহে।
জনগণ এবং কেবল জনগণই হচ্ছেন বিশ্ব ইতিাহাস সৃষ্টির চালিকা শক্তি এবং গণলাইনের এই ধারণাকে কমরেড মাও আরও বিকশিত করেন। তিনি বলেছেন, “জনগণের ধারণাকে সংগ্রহ করুন, সে সবকে সুসংবদ্ধ করুন এবং তারপর সেই সব ধারণা নিয়ে জনগণের কাছে যান।”
কমরেড মাও সেতুংয়ের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার অন্যমত দিক ছিল উদারনৈতিকতা। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় অনুপ্রারিত কমরেড মাও সেতুং উদারনৈতিক মানসিকতার অধিকারী ছিলেন।
মার্কসবাদে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মাও সেতুং বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়ে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় নতুন প্রাণস্পন্দন নিয়ে আসেন। মাও সেতুং তাই বলেন, “Let hundred flowers bloom, let diverse a school of thought contend”. মাও সেতুং-এর এই উদারনৈতিক মানসিকতা চীনের সমাজতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কমরেড মাও সেতুং (মাও জে দং) চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা ও প্রাণপুরুষ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন আমৃত্যু। সেদেশে সমাজতন্ত্রের সাম্য প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয়। মাও সেতুং- কবি, সংস্কারক, শাসক, সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার মতো গুণাবলি তাকে ইতিহাস বিশিষ্ট স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে তিনি বিশ্বে কিংবদন্তি হিসেবেও পরিচিত হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী তিনি চেয়ারম্যান মাও নামে খ্যাত হন।
"কমরেড মাও"
রক্তাক্ত চীনের বুকে জ্বাললে বিপ্লবের দীপ,
শোষণের অন্ধকারে উঠল বজ্রের মতো শপথ;
কৃষকের কণ্ঠে দিলে মুক্তির দুরন্ত ডাক,
মেহনতি মানুষের হাতে তুলে দিলে লাল পতাকাখানা।
হুনানের মাটিতে জন্ম, কৃষকের ঘরে প্রাণ,
শৈশবেই দেখলে তুমি দারিদ্র্যের দীর্ঘ হাহাকার;
ক্ষেতের আল, কাদামাটি, শ্রমজীবনের ঘ্রাণ—
সেখানেই গড়লে তুমি সংগ্রামের প্রথম অঙ্গীকার।
অক্টোবরের বিপ্লব যখন কাঁপাল দুনিয়ার বুক,
লেনিনের বজ্রবাণী ছড়াল নতুন দিনের গান,
মার্কসের তত্ত্ব হাতে, বাস্তবতার দিকে চোখ—
চীনের মাটিতে গড়লে বিপ্লবের নব অভিযান।
নগর নয়, গ্রাম জাগে, জাগে কোটি কৃষকজন,
লাঙলের ফলা হয়ে শাণিত হলো বিদ্রোহ;
জনগণই ইতিহাসের নির্মাতা—এই দৃঢ় বচন
শিখিয়ে দিলে সংগ্রামে, ভাঙলে পরাজয়ের মোহ।
চিয়াংয়ের দমন নামে আগুনের মতো চারি পাশে,
বন্দুকের নল তাক করা শ্রমজীবী মানুষের প্রাণে;
তবু রেড আর্মি এগোয় পাহাড়-নদী পেরিয়ে হাসে,
গেরিলা সংগ্রাম জাগে মুক্তির অগ্নিগানে।
জিয়াংসির ঘেরাটোপ ভেঙে যে দুরন্ত যাত্রা,
হাজার বিপদ পেরিয়ে লংমার্চের অমর পথ;
বরফ, পর্বত, ক্ষুধা—তবু থামেনি সে মাত্রা,
ছয় হাজার মাইল জুড়ে লিখলে সংগ্রামের মহাকাব্য।
ইয়ানানের পথে পথে রক্তে লেখা ইতিহাস,
মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এগিয়ে চলে লাল বাহিনী;
পরাজয় যত আসে, তত দৃঢ় হয় প্রত্যয়-শ্বাস,
জনতার শক্তিতেই জাগে বিজয়ের রক্তিম ঋণী।
জাপানি আগ্রাসনে যখন জ্বলছে চীনের দেশ,
জাতীয় ঐক্যের ডাক উঠল প্রতিরোধের তরে;
দখলদার হটিয়ে শেষে বদলে গেল যুদ্ধের রেশ,
স্বাধীনতার সূর্য উঠল লাল পতাকার ঘরে।
উনিশশো ঊনপঞ্চাশ—বেজে উঠল বিজয়-ঢাক,
তিয়েনআনমেন চত্বরে নতুন রাষ্ট্রের ঘোষণা;
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন পেল নতুন দিনের ডাক,
ইতিহাসে অমর হলো বিপ্লবের সেই ক্ষণ।
ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে এলো ভূমির অধিকার,
কারখানায় উঠল শ্রমের নতুন মর্যাদার গান;
শিক্ষার আলো ছড়াল, নারীর খুলল অধিকার,
ধ্বংসস্তূপের চীন পেল নির্মাণের নতুন প্রাণ।
“জনগণ, জনগণ”—তোমার রাজনীতির মূলমন্ত্র,
জনতার মাঝেই খুঁজলে বিপ্লবের প্রাণশক্তি;
তাদের কাছ থেকে নিয়ে আবার তাদেরই কাছে ফের—
গণলাইনের পথে গড়লে সংগ্রামের যুক্তি।
“শত ফুল ফুটুক”—দিলে চিন্তার স্বাধীন আহ্বান,
বহু মতের সংঘাতে জাগুক জ্ঞানের দীপ্তি;
বিতর্কের আগুনে হোক সত্যেরই সন্ধান,
সমাজের গতিপথে আসুক নব সৃষ্টির শক্তি।
তোমার পথে ভুল ছিল না—এ কথা ইতিহাস বলে না,
তোমার পথও প্রশ্নহীন—এমন দাবিও নয়;
বিপ্লবের ইতিহাসে আলো যেমন, ছায়াও তেমনি থাকে,
তবু কোটি মানুষের স্বপ্নে তোমার নাম আজও রয়।
মহান নেতা, কবি তুমি, তাত্ত্বিক, সংগঠক,
যুদ্ধের ময়দানে যেমন, চিন্তায় তেমনি দৃঢ়;
সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে ছিলে অগ্রণায়ক,
নিপীড়িতের স্বপ্নে তাই তোমার প্রতিচ্ছবি স্থির।
তোমার মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে আজ,
সময়ের স্রোত মুছে দিতে পারেনি সেই নাম;
যেখানে শোষিত মানুষ তোলে মুক্তির আওয়াজ,
সেখানেই প্রতিধ্বনিত হয়—মাও, তোমায় লাল সালাম।
যেখানে কৃষকের চোখে জমে অন্যায়ের জল,
যেখানে শ্রমিকের ঘামে অন্যের প্রাসাদ গড়ে,
যেখানে মানুষের অধিকার হয় পুঁজির কাছে জিম্মি—
সেখানেই বিপ্লবের প্রশ্ন নতুন করে জেগে ওঠে।
মাও, তুমি ইতিহাসের এক জ্বলন্ত অধ্যায়,
তোমার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকুক যত;
শোষণহীন পৃথিবীর স্বপ্ন যে আজও মরে নাই,
মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তেমনি অমর, অবিরত।
লাল পতাকা উড়ুক আজ শ্রমজীবী মানুষের হাতে,
কৃষকের ঘামে ফুটুক ন্যায়ের নতুন ভোর;
বঞ্চিতের অধিকার ফিরুক সংগ্রামের প্রভাতে,
মানুষের পৃথিবী হোক মানুষেরই ঘর।
পঞ্চাশতম মৃত্যুদিনে তাই উচ্চারিত হোক নাম—
চীনের বিপ্লবী নেতা, জনতার প্রিয় মাও;
ইতিহাসের পাতায় তুমি জাগ্রত অবিরাম—
নিপীড়িতের মুক্তিস্বপ্নে আজও তুমি দাও ডাক।
বিপ্লবের লাল সূর্য অস্ত যায়, আলো যায় না,
সংগ্রামের রক্তস্রোত থেমে থাকে না কোনো কাল;
মানুষের মুক্তির স্বপ্ন কখনো মরে যায় না—
কমরেড মাও সেতুং, তোমায় জানাই লাল সালাম।
লাল সালাম!
লাল সালাম!
শোষিত মানুষের সংগ্রামে—
কমরেড মাও, তোমায় লাল সালাম।
—(কমরেড মাও,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবী ও মহান নেতা কমরেড মাও সে তুংয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মতামত