মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস



সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস
সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

মিখাইল সের্গেইয়েভিচ গর্বাচভ মারা গেছেন ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর আজ যখন আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন গর্বাচভকে কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁকে বিচার করতে হবে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে—যে প্রক্রিয়ার পরিণতিতে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন আসে।

একজন কমিউনিস্ট হিসেবে গর্বাচভের মৃত্যুতে আমার কোনো ব্যক্তিগত শোক নেই। কারণ, আমার বিবেচনায় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতির রক্ষক ছিলেন না; বরং সেই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন।

তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে শুধু ঘৃণা প্রকাশের দিকে নিয়ে যায় না; বরং ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। কীভাবে একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের ভিত দুর্বল করা হলো? কীভাবে সংশোধনবাদের বিভিন্ন ধারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার নীতিতে পরিণত হলো? কীভাবে সমাজতন্ত্রের নামে এমন সব সংস্কার আনা হলো, যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলল?

নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে একই ধরনের বিপর্যয় অন্য সময়, অন্য নামে, অন্য স্লোগানে আবারও ফিরে আসতে পারে।

কমরেড স্তালিন-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন: পরিবর্তনের সূচনা

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ইতিহাসকে বুঝতে হলে কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পরবর্তী সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। ১৯৫৩ সালে কমরেড জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত পার্টি ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৫৬ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ব্যক্তিপূজার বিরোধিতা’র নামে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচার সোভিয়েত রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় অংশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

এরপর কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত অর্থনীতিতে আমলাতান্ত্রিকতা, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া, ভোক্তা পণ্যের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা জমতে থাকে। একই সঙ্গে পার্টির ভেতরে আদর্শিক দৃঢ়তার জায়গায় আপস ও সুবিধাবাদ প্রবেশ করে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল; কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমস্যা। বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হওয়া, আমলাতান্ত্রিক বিশেষ সুবিধার বিস্তার, পার্টির অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের বিকৃতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের নানা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বও সংকটকে গভীর করে।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সুবিধাভোগী স্তর তৈরি হয়েছিল। তাদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের সঙ্গে এই স্তরেরই একটি অংশ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এবং রাশিয়ার নবগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘অলিগার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গর্বাচভের আবির্ভাব

১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। উৎপাদনশীলতা কমছিল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছিল, আফগানিস্তান যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছিল।

এই পরিস্থিতিতে গর্বাচভ ‘পেরেস্ত্রইকা’—পুনর্গঠন—এবং ‘গ্লাসনস্ত’—উন্মুক্ততা—এর কথা বলেন।

প্রথমদিকে তাঁর বক্তব্যে সমাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের কথাই বেশি শোনা যায়। তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েত ক্ষমতার মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করাই তাঁর লক্ষ্য।

এই ভাষা শুধু সোভিয়েত জনগণকেই নয়, বিশ্বের বহু কমিউনিস্টকেও আশাবাদী করেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, গর্বাচভ হয়তো সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার দুর্বলতাগুলো দূর করতেই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংস্কারের দিক কোন দিকে যাচ্ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

পেরেস্ত্রইকা থেকে ব্যবস্থার রূপান্তর

গর্বাচভের সংস্কারের প্রথম পর্যায়ে অর্থনীতিকে অধিক কার্যকর করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ক্রমে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে থাকে এবং বাজারের ভূমিকা বাড়তে থাকে।

১৯৮৭ সালের পর থেকে সংস্কারের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে বাজারের নানা উপাদানকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের আইনগুলোতে সমবায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বাজারকে কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নিয়ন্ত্রিত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি বাজার ধীরে ধীরে উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে?

ইতিহাস দেখিয়েছে, দ্বিতীয় পথটিই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো উৎপাদনের প্রধান উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ক্ষমতা। যখন এই ভিত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফা এবং বাজারের স্বতন্ত্র শক্তি ক্রমে প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রও বদলাতে থাকে।

‘অখণ্ড বিশ্ব’ এবং শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন

গর্বাচভের রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রেণি-সংঘাতের গুরুত্বকে ক্রমশ কমিয়ে দেখা।

তাঁর ‘নতুন রাজনৈতিক চিন্তা’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন এক ধারণা সামনে নিয়ে আসে, যেখানে মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থকে প্রধান করে দেখা হয় এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মৌলিক বিরোধকে তুলনামূলকভাবে গৌণ করে তোলা হয়।

মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ অবশ্যই অস্বীকার করার বিষয় নয়। যুদ্ধবিরোধিতা, শান্তি, পরিবেশ রক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্ন। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ‘সার্বজনীন মানবিক স্বার্থ’ বলতে গিয়ে যদি শোষক ও শোষিতের স্বার্থের পার্থক্য অস্বীকার করা হয়, তখন তা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে না।

মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো শ্রেণি-বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য না করা।

সমাজে কে উৎপাদনের মালিক? কে শ্রম বিক্রি করে? কে মুনাফা অর্জন করে? রাষ্ট্রের নীতি কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়?—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু ‘মানবিক মূল্যবোধের’ কথা বললে সামাজিক সম্পর্কের বস্তুগত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।

এই জায়গাতেই সংশোধনবাদের বিপদ।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ‘নতুন’ ধারণা

গর্বাচভের নতুন রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সংঘাতের চরিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা।

শীতল যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমানো, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক বিষয় হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

পুঁজিবাদের বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শক্তির অসমতা, বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য, সম্পদ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক জোট এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপ—এসব বাস্তবতা রয়ে গিয়েছিল।

ফলে সাম্রাজ্যবাদকে কেবল একটি সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি অনুধাবন করা যায় না।

শ্রেণিসংগ্রামকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা

গর্বাচভীয় চিন্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি ছিল শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে কমিয়ে দেওয়া।

‘শ্রেণির ঊর্ধ্বে’ উঠে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচার করার আহ্বান শুনতে মানবিক ও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমাজে শ্রেণি কি বিলুপ্ত হয়েছিল?

সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনিক সুবিধাভোগী স্তরের পার্থক্য ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছিল। উৎপাদন ও বণ্টনের প্রশ্ন ছিল। শ্রমের ফল কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নও ছিল।

অর্থাৎ শ্রেণি-প্রশ্ন বাস্তবেই ছিল।

তাই শ্রেণিসংগ্রাম অপ্রাসঙ্গিক—এমন ধারণা বাস্তবতার পরিবর্তে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘শ্রেণির রাজনীতি পুরোনো’, ‘সবাই একই সমাজের মানুষ’, ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানবতা’—এই ধরনের বক্তব্য শোনা যায়। মানবতার কথা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু মানবতার নামে শ্রেণি-বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না।

শ্রমিকের রাষ্ট্র থেকে বাজারের রাষ্ট্র

গর্বাচভের সময় রাজনৈতিক সংস্কারও দ্রুত এগোতে থাকে। গ্লাসনস্তের ফলে দীর্ঘদিন চাপা থাকা নানা সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, অতীতের নানা ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক শুরু হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো যখন তার অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে।

১৯৮৯ সালের নির্বাচনী পরিবর্তন, কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটিজের উত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯৯০ সালে সোভিয়েত সংবিধান থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক ভূমিকার সাংবিধানিক ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়।

এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মোড়।

কারণ, যে রাজনৈতিক দল বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই পার্টিই যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারাতে শুরু করল, তখন রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।

পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন

গর্বাচভের নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাবও ছিল গভীর।

১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের একের পর এক সমাজতান্ত্রিক সরকার পতনের মুখে পড়ে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া—সর্বত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে।

বার্লিন প্রাচীরের পতন শীতল যুদ্ধের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করে।

সোভিয়েত নেতৃত্ব পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোর টিকে থাকার জন্য আগের মতো সামরিক হস্তক্ষেপের পথ গ্রহণ করেনি। এটি শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এর ফলে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ে।

১৯৯০ সালে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ এবং ন্যাটোর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বিস্তারও পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেয়।

সোভিয়েত অর্থনীতির সংকট ও পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন

১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। উৎপাদন কমে যায়, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, পণ্যের ঘাটতি বাড়ে এবং বাজেট সংকট তীব্র হয়।

এখানে গর্বাচভের নীতির একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—পুরনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হলেও তার বিকল্প হিসেবে একটি কার্যকর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।

ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা।

পরিকল্পনার শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কার্যকর বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমেছে, কিন্তু উৎপাদন ও বণ্টনের নতুন কাঠামো স্থিতিশীল হয়নি।

এই শূন্যতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী।

রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী রাশিয়ায় ‘অলিগার্ক’ নামে পরিচিত ধনী পুঁজিপতিদের উত্থানের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি এই রূপান্তরকালেই গড়ে ওঠে।

১৯৯১: পতনের শেষ অধ্যায়

১৯৯১ সালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শক্তিশালী হয়।

আগস্ট ১৯৯১-এ গর্বাচভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং কমিউনিস্ট পার্টির ওপর আঘাত তীব্র হয়।

ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের নেতারা বেলাভেজা চুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বিদ্যমান নেই। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্রও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।

২৫ ডিসেম্বর গর্বাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১—সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।

একটি রাষ্ট্রের পতন হলো। একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও অবসান ঘটল।

কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে গেল—এই পতন কি অনিবার্য ছিল?

পতন কি অনিবার্য ছিল?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে শুধু একজন ব্যক্তি—গর্বাচভের—কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের গভীর শিক্ষা পাওয়া যাবে না।

গর্বাচভ ছিলেন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে আবির্ভূত একজন নেতা। তাঁর আগে বহু দশক ধরে সোভিয়েত ব্যবস্থায় নানা সমস্যা জমা হয়েছিল। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র, পার্টির অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, জাতীয় প্রশ্নের জটিলতা, জনগণের অংশগ্রহণের সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ—সবকিছু মিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছিল।

কিন্তু এটাও সত্য যে সংকটের সমাধান কোন পথে করা হবে, সেটিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।

গর্বাচভের নেতৃত্বে যে পথ নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রকে পুনর্গঠন করার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

অতএব গর্বাচভকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না; আবার তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।

‘সংশোধনবাদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সংশোধনবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়।

মার্কসবাদকে সময়োপযোগী করার নামে তার মৌলিক শ্রেণিচরিত্রকে বাদ দেওয়া, শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণিসমঝোতাকে প্রাধান্য দেওয়া, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে অস্বীকার করা, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দেওয়া—এসবই বিভিন্ন সময়ে সংশোধনবাদের নানা রূপে দেখা গেছে।

সমস্যা হলো, সংশোধনবাদ সাধারণত নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রবিরোধী’ বলে ঘোষণা করে না। বরং সে সমাজতন্ত্রকে আরও মানবিক, আরও আধুনিক, আরও গণতান্ত্রিক, আরও বাস্তবসম্মত করার কথা বলে।

এই কারণেই সংশোধনবাদ বিপজ্জনক।

কারণ, সে অনেক সময় শত্রুর ভাষায় কথা বলে না; বন্ধুর ভাষায় কথা বলে।

গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্থান ও পরবর্তী নীতির মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।

গর্বাচভের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ গর্বাচভকে গণতন্ত্র ও শান্তির নায়ক হিসেবে দেখে। শীতল যুদ্ধের অবসান, পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস এবং পূর্ব-পশ্চিম উত্তেজনা কমানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন।

এই মূল্যায়নের ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্যই আছে।

কিন্তু একজন কমিউনিস্টের মূল্যায়নের প্রশ্ন আলাদা।

আমাদের প্রশ্ন হবে—তিনি কোন শ্রেণির স্বার্থকে শক্তিশালী করেছিলেন? তাঁর নীতির ফলে উৎপাদনের মালিকানার সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল? শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছিল, নাকি দুর্বল হয়েছিল? সমাজতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, নাকি পুঁজিবাদের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।

ইতিহাসের শিক্ষা

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবীর একাংশ ঘোষণা করেছিল—সমাজতন্ত্রের যুগ শেষ। কেউ কেউ বলেছিলেন, পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত ব্যবস্থা।

কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের পৃথিবী সেই দাবিকে সরলভাবে সত্য প্রমাণ করেনি।

বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বেড়েছে। বিপুল সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। শ্রমের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সম্পদের অসম বণ্টন আজও মানবসভ্যতার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে আছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাই সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি।

বরং প্রশ্নটিকে আরও জটিল করেছে—কী ধরনের সমাজতন্ত্র? কীভাবে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে? কীভাবে আমলাতন্ত্র ও বিশেষ সুবিধাভোগী স্তরের বিকাশ ঠেকানো যাবে? কীভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক মালিকানার সমন্বয় ঘটানো যাবে? কীভাবে পার্টিকে জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কের মধ্যে রাখা যাবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে।

গর্বাচভের মৃত্যু এবং আমাদের শপথ

গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্ট হিসেবে আমার ব্যথিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাকে আত্মতুষ্টও করে না।

বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।

শুধু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই সমাজতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। শুধু বিপ্লবের ইতিহাসের গৌরবগাথা বললেই বিপ্লবী পার্টি বিপ্লবী থাকে না। শুধু মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের নাম উচ্চারণ করলেই মার্কসবাদী হওয়া যায় না।

প্রয়োজন তত্ত্ব ও বাস্তবতার সৃজনশীল ঐক্য। প্রয়োজন শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক। প্রয়োজন পার্টির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সততা ও মতাদর্শগত দৃঢ়তা। প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান। এবং সর্বোপরি প্রয়োজন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর আদর্শিক সংগ্রাম।

গর্বাচভের মৃত্যু তাই আমার কাছে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা মাত্র নয়। এটি ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আমাদের শিখিয়েছে—একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তার অভ্যন্তরে যদি শ্রেণিচেতনা দুর্বল হয়, যদি আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগী স্তর শক্তিশালী হয়, যদি বিপ্লবী পার্টির আদর্শিক দৃঢ়তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং যদি সংশোধনবাদ রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করে, তাহলে বিপ্লবের অর্জনও বিপন্ন হতে পারে।

সুতরাং গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্টের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘৃণার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের সংগ্রামের অঙ্গীকার।

সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী ভিত্তিকে ধারণ করে, সব ধরনের সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই হতে পারে এই ইতিহাসের প্রতি আমাদের যথার্থ জবাব।

ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে শেষ করেনি।

বরং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রামকে আরও গভীরভাবে বোঝার দায়িত্ব আমাদের ওপর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।

সম্পাদক, আরপি নিউজ;

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;

‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।

সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।

সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।

প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

E-mail : syedzaman.62@gmail.com

WhatsApp : 01716599589

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সমাজতন্ত্র না সংশোধনবাদের বিপর্যয় ও ইতিহাসের শিক্ষা এবং গর্বাচভের মৃত্যু: ফিরে দেখা ইতিহাস

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মিখাইল সের্গেইয়েভিচ গর্বাচভ মারা গেছেন ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর আজ যখন আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন গর্বাচভকে কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁকে বিচার করতে হবে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে—যে প্রক্রিয়ার পরিণতিতে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন আসে।


একজন কমিউনিস্ট হিসেবে গর্বাচভের মৃত্যুতে আমার কোনো ব্যক্তিগত শোক নেই। কারণ, আমার বিবেচনায় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতির রক্ষক ছিলেন না; বরং সেই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন।


তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে শুধু ঘৃণা প্রকাশের দিকে নিয়ে যায় না; বরং ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। কীভাবে একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের ভিত দুর্বল করা হলো? কীভাবে সংশোধনবাদের বিভিন্ন ধারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার নীতিতে পরিণত হলো? কীভাবে সমাজতন্ত্রের নামে এমন সব সংস্কার আনা হলো, যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলল?


নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে একই ধরনের বিপর্যয় অন্য সময়, অন্য নামে, অন্য স্লোগানে আবারও ফিরে আসতে পারে।


কমরেড স্তালিন-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন: পরিবর্তনের সূচনা


সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ইতিহাসকে বুঝতে হলে কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পরবর্তী সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। ১৯৫৩ সালে কমরেড জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত পার্টি ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৫৬ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ব্যক্তিপূজার বিরোধিতা’র নামে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচার সোভিয়েত রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় অংশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।


এরপর কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত অর্থনীতিতে আমলাতান্ত্রিকতা, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া, ভোক্তা পণ্যের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা জমতে থাকে। একই সঙ্গে পার্টির ভেতরে আদর্শিক দৃঢ়তার জায়গায় আপস ও সুবিধাবাদ প্রবেশ করে।


এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল; কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমস্যা। বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হওয়া, আমলাতান্ত্রিক বিশেষ সুবিধার বিস্তার, পার্টির অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের বিকৃতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের নানা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বও সংকটকে গভীর করে।


এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সুবিধাভোগী স্তর তৈরি হয়েছিল। তাদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের সঙ্গে এই স্তরেরই একটি অংশ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এবং রাশিয়ার নবগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘অলিগার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


গর্বাচভের আবির্ভাব


১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। উৎপাদনশীলতা কমছিল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছিল, আফগানিস্তান যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছিল।


এই পরিস্থিতিতে গর্বাচভ ‘পেরেস্ত্রইকা’—পুনর্গঠন—এবং ‘গ্লাসনস্ত’—উন্মুক্ততা—এর কথা বলেন।


প্রথমদিকে তাঁর বক্তব্যে সমাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের কথাই বেশি শোনা যায়। তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েত ক্ষমতার মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করাই তাঁর লক্ষ্য।


এই ভাষা শুধু সোভিয়েত জনগণকেই নয়, বিশ্বের বহু কমিউনিস্টকেও আশাবাদী করেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, গর্বাচভ হয়তো সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার দুর্বলতাগুলো দূর করতেই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।


কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংস্কারের দিক কোন দিকে যাচ্ছিল?


এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।


পেরেস্ত্রইকা থেকে ব্যবস্থার রূপান্তর


গর্বাচভের সংস্কারের প্রথম পর্যায়ে অর্থনীতিকে অধিক কার্যকর করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ক্রমে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে থাকে এবং বাজারের ভূমিকা বাড়তে থাকে।


১৯৮৭ সালের পর থেকে সংস্কারের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে বাজারের নানা উপাদানকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের আইনগুলোতে সমবায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে।


এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বাজারকে কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নিয়ন্ত্রিত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি বাজার ধীরে ধীরে উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে?


ইতিহাস দেখিয়েছে, দ্বিতীয় পথটিই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।


সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো উৎপাদনের প্রধান উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ক্ষমতা। যখন এই ভিত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফা এবং বাজারের স্বতন্ত্র শক্তি ক্রমে প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রও বদলাতে থাকে।


‘অখণ্ড বিশ্ব’ এবং শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন


গর্বাচভের রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রেণি-সংঘাতের গুরুত্বকে ক্রমশ কমিয়ে দেখা।


তাঁর ‘নতুন রাজনৈতিক চিন্তা’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন এক ধারণা সামনে নিয়ে আসে, যেখানে মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থকে প্রধান করে দেখা হয় এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মৌলিক বিরোধকে তুলনামূলকভাবে গৌণ করে তোলা হয়।


মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ অবশ্যই অস্বীকার করার বিষয় নয়। যুদ্ধবিরোধিতা, শান্তি, পরিবেশ রক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্ন। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ‘সার্বজনীন মানবিক স্বার্থ’ বলতে গিয়ে যদি শোষক ও শোষিতের স্বার্থের পার্থক্য অস্বীকার করা হয়, তখন তা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে না।


মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো শ্রেণি-বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য না করা।


সমাজে কে উৎপাদনের মালিক? কে শ্রম বিক্রি করে? কে মুনাফা অর্জন করে? রাষ্ট্রের নীতি কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়?—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু ‘মানবিক মূল্যবোধের’ কথা বললে সামাজিক সম্পর্কের বস্তুগত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।


এই জায়গাতেই সংশোধনবাদের বিপদ।


সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ‘নতুন’ ধারণা


গর্বাচভের নতুন রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সংঘাতের চরিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা।


শীতল যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমানো, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক বিষয় হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।


কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।


পুঁজিবাদের বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শক্তির অসমতা, বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য, সম্পদ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক জোট এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপ—এসব বাস্তবতা রয়ে গিয়েছিল।


ফলে সাম্রাজ্যবাদকে কেবল একটি সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি অনুধাবন করা যায় না।


শ্রেণিসংগ্রামকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা


গর্বাচভীয় চিন্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি ছিল শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে কমিয়ে দেওয়া।


‘শ্রেণির ঊর্ধ্বে’ উঠে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচার করার আহ্বান শুনতে মানবিক ও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমাজে শ্রেণি কি বিলুপ্ত হয়েছিল?


সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনিক সুবিধাভোগী স্তরের পার্থক্য ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছিল। উৎপাদন ও বণ্টনের প্রশ্ন ছিল। শ্রমের ফল কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নও ছিল।


অর্থাৎ শ্রেণি-প্রশ্ন বাস্তবেই ছিল।


তাই শ্রেণিসংগ্রাম অপ্রাসঙ্গিক—এমন ধারণা বাস্তবতার পরিবর্তে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়।


আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘শ্রেণির রাজনীতি পুরোনো’, ‘সবাই একই সমাজের মানুষ’, ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানবতা’—এই ধরনের বক্তব্য শোনা যায়। মানবতার কথা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু মানবতার নামে শ্রেণি-বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না।


শ্রমিকের রাষ্ট্র থেকে বাজারের রাষ্ট্র


গর্বাচভের সময় রাজনৈতিক সংস্কারও দ্রুত এগোতে থাকে। গ্লাসনস্তের ফলে দীর্ঘদিন চাপা থাকা নানা সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, অতীতের নানা ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক শুরু হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়।


কিন্তু এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।


একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো যখন তার অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে।


১৯৮৯ সালের নির্বাচনী পরিবর্তন, কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটিজের উত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।


১৯৯০ সালে সোভিয়েত সংবিধান থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক ভূমিকার সাংবিধানিক ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়।


এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মোড়।


কারণ, যে রাজনৈতিক দল বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই পার্টিই যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারাতে শুরু করল, তখন রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।


পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন


গর্বাচভের নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাবও ছিল গভীর।


১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের একের পর এক সমাজতান্ত্রিক সরকার পতনের মুখে পড়ে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া—সর্বত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে।


বার্লিন প্রাচীরের পতন শীতল যুদ্ধের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করে।


সোভিয়েত নেতৃত্ব পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোর টিকে থাকার জন্য আগের মতো সামরিক হস্তক্ষেপের পথ গ্রহণ করেনি। এটি শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এর ফলে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ে।


১৯৯০ সালে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ এবং ন্যাটোর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বিস্তারও পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেয়।


সোভিয়েত অর্থনীতির সংকট ও পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন


১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। উৎপাদন কমে যায়, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, পণ্যের ঘাটতি বাড়ে এবং বাজেট সংকট তীব্র হয়।


এখানে গর্বাচভের নীতির একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—পুরনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হলেও তার বিকল্প হিসেবে একটি কার্যকর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।


ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা।


পরিকল্পনার শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কার্যকর বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমেছে, কিন্তু উৎপাদন ও বণ্টনের নতুন কাঠামো স্থিতিশীল হয়নি।


এই শূন্যতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী।


রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী রাশিয়ায় ‘অলিগার্ক’ নামে পরিচিত ধনী পুঁজিপতিদের উত্থানের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি এই রূপান্তরকালেই গড়ে ওঠে।


১৯৯১: পতনের শেষ অধ্যায়


১৯৯১ সালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শক্তিশালী হয়।


আগস্ট ১৯৯১-এ গর্বাচভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং কমিউনিস্ট পার্টির ওপর আঘাত তীব্র হয়।


ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের নেতারা বেলাভেজা চুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বিদ্যমান নেই। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্রও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।


২৫ ডিসেম্বর গর্বাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।


২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১—সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।


একটি রাষ্ট্রের পতন হলো। একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও অবসান ঘটল।


কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে গেল—এই পতন কি অনিবার্য ছিল?


পতন কি অনিবার্য ছিল?


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে শুধু একজন ব্যক্তি—গর্বাচভের—কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের গভীর শিক্ষা পাওয়া যাবে না।


গর্বাচভ ছিলেন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে আবির্ভূত একজন নেতা। তাঁর আগে বহু দশক ধরে সোভিয়েত ব্যবস্থায় নানা সমস্যা জমা হয়েছিল। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র, পার্টির অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, জাতীয় প্রশ্নের জটিলতা, জনগণের অংশগ্রহণের সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ—সবকিছু মিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছিল।


কিন্তু এটাও সত্য যে সংকটের সমাধান কোন পথে করা হবে, সেটিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।


গর্বাচভের নেতৃত্বে যে পথ নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রকে পুনর্গঠন করার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।


অতএব গর্বাচভকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না; আবার তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।


‘সংশোধনবাদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন


কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সংশোধনবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়।


মার্কসবাদকে সময়োপযোগী করার নামে তার মৌলিক শ্রেণিচরিত্রকে বাদ দেওয়া, শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণিসমঝোতাকে প্রাধান্য দেওয়া, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে অস্বীকার করা, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দেওয়া—এসবই বিভিন্ন সময়ে সংশোধনবাদের নানা রূপে দেখা গেছে।


সমস্যা হলো, সংশোধনবাদ সাধারণত নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রবিরোধী’ বলে ঘোষণা করে না। বরং সে সমাজতন্ত্রকে আরও মানবিক, আরও আধুনিক, আরও গণতান্ত্রিক, আরও বাস্তবসম্মত করার কথা বলে।


এই কারণেই সংশোধনবাদ বিপজ্জনক।


কারণ, সে অনেক সময় শত্রুর ভাষায় কথা বলে না; বন্ধুর ভাষায় কথা বলে।


গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্থান ও পরবর্তী নীতির মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।


গর্বাচভের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার


পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ গর্বাচভকে গণতন্ত্র ও শান্তির নায়ক হিসেবে দেখে। শীতল যুদ্ধের অবসান, পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস এবং পূর্ব-পশ্চিম উত্তেজনা কমানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন।


এই মূল্যায়নের ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্যই আছে।


কিন্তু একজন কমিউনিস্টের মূল্যায়নের প্রশ্ন আলাদা।


আমাদের প্রশ্ন হবে—তিনি কোন শ্রেণির স্বার্থকে শক্তিশালী করেছিলেন? তাঁর নীতির ফলে উৎপাদনের মালিকানার সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল? শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছিল, নাকি দুর্বল হয়েছিল? সমাজতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, নাকি পুঁজিবাদের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল?


এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই গর্বাচভের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।


ইতিহাসের শিক্ষা


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবীর একাংশ ঘোষণা করেছিল—সমাজতন্ত্রের যুগ শেষ। কেউ কেউ বলেছিলেন, পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত ব্যবস্থা।


কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের পৃথিবী সেই দাবিকে সরলভাবে সত্য প্রমাণ করেনি।


বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বেড়েছে। বিপুল সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। শ্রমের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সম্পদের অসম বণ্টন আজও মানবসভ্যতার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে আছে।


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাই সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি।


বরং প্রশ্নটিকে আরও জটিল করেছে—কী ধরনের সমাজতন্ত্র? কীভাবে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে? কীভাবে আমলাতন্ত্র ও বিশেষ সুবিধাভোগী স্তরের বিকাশ ঠেকানো যাবে? কীভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক মালিকানার সমন্বয় ঘটানো যাবে? কীভাবে পার্টিকে জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কের মধ্যে রাখা যাবে?


এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে।


গর্বাচভের মৃত্যু এবং আমাদের শপথ


গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্ট হিসেবে আমার ব্যথিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাকে আত্মতুষ্টও করে না।


বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।


শুধু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই সমাজতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। শুধু বিপ্লবের ইতিহাসের গৌরবগাথা বললেই বিপ্লবী পার্টি বিপ্লবী থাকে না। শুধু মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের নাম উচ্চারণ করলেই মার্কসবাদী হওয়া যায় না।


প্রয়োজন তত্ত্ব ও বাস্তবতার সৃজনশীল ঐক্য। প্রয়োজন শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন জনগণের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক। প্রয়োজন পার্টির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সততা ও মতাদর্শগত দৃঢ়তা। প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান। এবং সর্বোপরি প্রয়োজন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর আদর্শিক সংগ্রাম।


গর্বাচভের মৃত্যু তাই আমার কাছে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা মাত্র নয়। এটি ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ।


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আমাদের শিখিয়েছে—একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তার অভ্যন্তরে যদি শ্রেণিচেতনা দুর্বল হয়, যদি আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগী স্তর শক্তিশালী হয়, যদি বিপ্লবী পার্টির আদর্শিক দৃঢ়তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং যদি সংশোধনবাদ রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করে, তাহলে বিপ্লবের অর্জনও বিপন্ন হতে পারে।


সুতরাং গর্বাচভের মৃত্যুতে একজন কমিউনিস্টের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘৃণার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের সংগ্রামের অঙ্গীকার।


সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী ভিত্তিকে ধারণ করে, সব ধরনের সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই হতে পারে এই ইতিহাসের প্রতি আমাদের যথার্থ জবাব।


ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি।


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে শেষ করেনি।


বরং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রামকে আরও গভীরভাবে বোঝার দায়িত্ব আমাদের ওপর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’।

সম্পাদক, আরপি নিউজ;

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;

‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।

সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।

সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।

প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

E-mail : syedzaman.62@gmail.com

WhatsApp : 01716599589


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream