বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন,সংস্কার ও আধুনিকায়নের ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে,তাঁদের অন্যতম সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আজ তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকী।
রাজনীতির অঙ্গনে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও দৃঢ়চেতা। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কঠোর অবস্থান,হিসাব-নিকাশে সতর্কতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনমনীয়তার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কড়া মেজাজের অর্থমন্ত্রী’ হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ছিল একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ,দক্ষ সংস্কারক এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আধুনিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা।
মৌলভীবাজারের এক প্রত্যন্ত এলাকায় জন্ম নেওয়া এম সাইফুর রহমান পেশাজীবনে ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অল্পসংখ্যক এফসিএ ডিগ্রিধারীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি চা-বাগানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিতে নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
হিসাব,নিরীক্ষা ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়, রাজস্বনীতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর হিসাবনির্ভর ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমান ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। সে সময় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিসরেও ছিল নানা সমালোচনা ও চাপ।
তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। সময়ের সঙ্গে ভ্যাট দেশের রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে সে সময়ের বিতর্কিত ও কঠিন সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এম সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংক,আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তিনি দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিতেন।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল,উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে,কিন্তু দেশের বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতির আলোচনায় তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এম সাইফুর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত অর্জনগুলোর একটি হলো জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট উপস্থাপন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর সময়ে করব্যবস্থা,আর্থিক খাত, বাণিজ্যনীতি ও বাজারব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে অধিকতর বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং একাধিক অপারেটরের জন্য সুযোগ তৈরি হওয়ার ফলে পরবর্তী সময়ে মোবাইল যোগাযোগ দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এই পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের নীতিগত পরিবেশ তৈরিতে এম সাইফুর রহমানের সময়ের সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ মোবাইল ফোন যখন দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ,তখন সেই পরিবর্তনের শুরুর দিকের নীতিগত পদক্ষেপগুলোর কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমানের প্রকাশ্য ভাবমূর্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কঠোরতা। সংসদে কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও হিসাবের গুরুত্ব বেশি থাকত।
তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই সাদাসিধে ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকা।
মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করা হয়। সড়ক যোগাযোগ,শিক্ষা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে তাঁর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা এ অঞ্চলের উন্নয়ন-ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
একজন অর্থমন্ত্রীর মূল্যায়ন কেবল তিনি কতটি বাজেট দিয়েছেন,তা দিয়ে শেষ করা যায় না। তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে, অর্থনীতির কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আনে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের ভিত্তি তৈরি করে,সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এম সাইফুর রহমানের ক্ষেত্রেও সেই মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। রাজনীতির বাইরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি,রাজস্ব সংস্কারের প্রচেষ্টা,বাজারমুখী অর্থনীতির প্রতি আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে দরকষাকষির মানসিকতা ছিল,তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল,তা আজও অনুভূত হয়। সময়ের সঙ্গে মানুষ চলে যায়,কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম ও সিদ্ধান্ত ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়।
এম সাইফুর রহমান তেমনই এক নাম। তাঁর ১৭তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও আধুনিকায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা।
এই দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
মতামত