শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

দিনাজপুরের দশমাইল কলার হাটে জমজমাট বেচাকেনা



দিনাজপুরের দশমাইল কলার হাটে জমজমাট বেচাকেনা
দিনাজপুরের দশমাইল কলার হাটে জমজমাট বেচাকেনা

দিনাজপুর কাহারোলের দশমাইলে বসেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা কলার পাইকারি হাট। ঢাকা-দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা বেচাকেনা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে কৃষকরা কলা নিয়ে আসছেন এখানে। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা এসব কলা কিনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।

বর্তমানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫টি ট্রাক বোঝাই কাঁচা কলা দশমাইলের হাট থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাটজুড়ে থাকে কৃষক, পাইকার, শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের ব্যস্ততা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি কলার কাঁদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

কৃষকরা ভ্যান, অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনে করে জমি থেকে সদ্য কাটা কাঁচা কলা নিয়ে আসছেন। হাটে আসার পর পাইকাররা কলার মান ও আকার দেখে দরদাম করছেন। কোথাও ভ্যানের ওপর থেকেই বিক্রি হচ্ছে কলা, আবার কোথাও ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

বড় এই কলার হাটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও। প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কলা নামানো, বাছাই, ওজন করা এবং ট্রাকে ওঠানোর কাজে যুক্ত থাকছেন। এতে হাটকেন্দ্রিকভাবে স্থানীয় অনেক শ্রমিকের নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, তিনি সম্প্রতি দশমাইলের বৃহৎ কলার হাটটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ কলার আমদানি দেখতে পেয়েছেন। জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পাইকার এখানে কলা কিনতে আসছেন।

তিনি বলেন, কাহারোলের পাশাপাশি বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর ও বোচাগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও সদর ও পীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কলা চাষের উপযোগী জমি রয়েছে। কলা চাষ লাভজনক হওয়ায় এসব এলাকায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলা বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন সময়ে সারাদেশে কলার চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। বর্তমানে বাজারে ভালো দাম ও চাহিদা থাকায় কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কাঁচা কলা প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।

চলতি বছর দিনাজপুরে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারে ভালো চাহিদার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৫০ হেক্টর বেশি জমিতে কলার আবাদ হয়েছে।

কাহারোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫৪২ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৩৩৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উপজেলায় কলার আবাদ বেড়েছে ১০৭ হেক্টর।

তিনি বলেন, এ বছর কাহারোলে কলার বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাও সন্তুষ্ট। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কলা চাষ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

কাহারোলের গুড়নুরপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম লাইজু এবার ৫২ শতক জমিতে কলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, দশমাইলের হাটে ১০০টি কলার কাঁদি এনে ৮২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে তার জমি থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

একই গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছেন। প্রতিটি কলার কাঁদি ৬৯০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে এ ধরনের দাম অব্যাহত থাকলে এবার সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

 কলা ব্যবসায়ী মো. নিয়ামুল ইসলাম জানান, দশমাইলের হাটে ভালো মানের কলার চাহিদা বেশি এবং সে অনুযায়ী দামও পাওয়া যায়। তিনি নিয়মিত এখান থেকে কাঁচা কলা কিনে ঢাকায় পাঠান। বর্তমানে প্রতিদিন কয়েক ট্রাক করে কলা কিনছেন তিনি।

হাটের শ্রমিক মো. সহেন আলী বলেন, কলা ট্রাকে ওঠানোর কাজে প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কাজ করেন। একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ফলে কলার হাটটি শুধু কৃষকদের জন্যই নয়, স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষেরও আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।

দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, কলা একটি লাভজনক ফসল। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া কলা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের মেহেরসাগর, মালভোগ, চিনিচাঁপা ও সবরি কলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে।

তিনি বলেন, কৃষকদের কলা চাষে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত চাষপদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে ফলন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকরা বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


দিনাজপুরের দশমাইল কলার হাটে জমজমাট বেচাকেনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দিনাজপুর কাহারোলের দশমাইলে বসেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা কলার পাইকারি হাট। ঢাকা-দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা বেচাকেনা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে কৃষকরা কলা নিয়ে আসছেন এখানে। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা এসব কলা কিনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।

বর্তমানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫টি ট্রাক বোঝাই কাঁচা কলা দশমাইলের হাট থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাটজুড়ে থাকে কৃষক, পাইকার, শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের ব্যস্ততা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি কলার কাঁদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

কৃষকরা ভ্যান, অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনে করে জমি থেকে সদ্য কাটা কাঁচা কলা নিয়ে আসছেন। হাটে আসার পর পাইকাররা কলার মান ও আকার দেখে দরদাম করছেন। কোথাও ভ্যানের ওপর থেকেই বিক্রি হচ্ছে কলা, আবার কোথাও ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

বড় এই কলার হাটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও। প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কলা নামানো, বাছাই, ওজন করা এবং ট্রাকে ওঠানোর কাজে যুক্ত থাকছেন। এতে হাটকেন্দ্রিকভাবে স্থানীয় অনেক শ্রমিকের নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, তিনি সম্প্রতি দশমাইলের বৃহৎ কলার হাটটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ কলার আমদানি দেখতে পেয়েছেন। জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পাইকার এখানে কলা কিনতে আসছেন।

তিনি বলেন, কাহারোলের পাশাপাশি বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর ও বোচাগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও সদর ও পীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কলা চাষের উপযোগী জমি রয়েছে। কলা চাষ লাভজনক হওয়ায় এসব এলাকায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলা বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন সময়ে সারাদেশে কলার চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। বর্তমানে বাজারে ভালো দাম ও চাহিদা থাকায় কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কাঁচা কলা প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।

চলতি বছর দিনাজপুরে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারে ভালো চাহিদার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৫০ হেক্টর বেশি জমিতে কলার আবাদ হয়েছে।

কাহারোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫৪২ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৩৩৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উপজেলায় কলার আবাদ বেড়েছে ১০৭ হেক্টর।

তিনি বলেন, এ বছর কাহারোলে কলার বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাও সন্তুষ্ট। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কলা চাষ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

কাহারোলের গুড়নুরপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম লাইজু এবার ৫২ শতক জমিতে কলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, দশমাইলের হাটে ১০০টি কলার কাঁদি এনে ৮২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে তার জমি থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

একই গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছেন। প্রতিটি কলার কাঁদি ৬৯০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে এ ধরনের দাম অব্যাহত থাকলে এবার সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

 কলা ব্যবসায়ী মো. নিয়ামুল ইসলাম জানান, দশমাইলের হাটে ভালো মানের কলার চাহিদা বেশি এবং সে অনুযায়ী দামও পাওয়া যায়। তিনি নিয়মিত এখান থেকে কাঁচা কলা কিনে ঢাকায় পাঠান। বর্তমানে প্রতিদিন কয়েক ট্রাক করে কলা কিনছেন তিনি।

হাটের শ্রমিক মো. সহেন আলী বলেন, কলা ট্রাকে ওঠানোর কাজে প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কাজ করেন। একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ফলে কলার হাটটি শুধু কৃষকদের জন্যই নয়, স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষেরও আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।

দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, কলা একটি লাভজনক ফসল। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া কলা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের মেহেরসাগর, মালভোগ, চিনিচাঁপা ও সবরি কলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে।

তিনি বলেন, কৃষকদের কলা চাষে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত চাষপদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে ফলন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকরা বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream