দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা, রটনা, দুর্ঘটনা, হানাহানি কিংবা ছোট-বড় সংঘাতের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এর নেপথ্যে কোনো না কোনো স্বার্থ প্রায়ই কাজ করে। কখনো সেই স্বার্থ প্রয়োজনের সীমায় থাকে, আবার কখনো তা স্বার্থপরতার অন্ধকার সীমা অতিক্রম করে মানুষকে এমন এক আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যের সুখ,দুঃখ, প্রাপ্য কিংবা অধিকার আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
আধুনিক সমাজে মানুষের মূল্যায়নও অনেক সময় মানুষ হিসেবে নয়, তার অবস্থান ও সামর্থ্য দিয়ে করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্ধুতালিকায় কত মানুষই তো থাকে। কিন্তু যার সামাজিক পদমর্যাদা আছে, প্রভাব আছে কিংবা ভবিষ্যতে আরও ওপরে ওঠার সম্ভাবনা আছে, তার একটি পোস্ট ঘিরে শুরু হয় প্রশংসার বন্যা। দীর্ঘ মন্তব্য, প্রশংসাসূচক শব্দ, অতিরিক্ত সমীহ। অথচ একই তালিকায় থাকা এমন কেউ, যার সামাজিক অবস্থান আছে কিন্তু আর্থিক বা প্রভাবের দিক থেকে ‘দেওয়ার’ মতো কিছু নেই, তার পোস্টে হয়তো একটি লাইক দিয়েই দায়িত্ব শেষ। আর যার সামাজিক মর্যাদাই নেই, সে আপন আত্মীয় হলেও অনেকের কাছে যেন অদৃশ্য।
মানুষের প্রতি ভালোবাসার জায়গায় যদি মানুষের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেখানে সম্পর্ক থাকে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের প্রাণ থাকে না। থাকে হিসাব। কে কতটা কাজে আসবে, কার কাছ থেকে কী পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে থাকলে নিজের পরিচিতি বাড়বে, কার সান্নিধ্য ভবিষ্যতে সুবিধা এনে দিতে পারে, এসব হিসাব নিঃশব্দে অনেক সম্পর্কের ভিত গড়ে দিচ্ছে।
সমাজে যার দাপট আছে,তার চারপাশে মানুষের ভিড় জমে। যার অর্থ আছে, তার কথার গুরুত্ব বেড়ে যায়। তিনি খুব শিক্ষিত নাও হতে পারেন,কথাবার্তায় প্রজ্ঞার গভীরতা নাও থাকতে পারে,তবু তার সামনে অনেকে মনোযোগী শ্রোতার ভান করেন। মাথা নাড়েন,সম্মতি জানান,প্রশংসা করেন। কারণ সেখানে কোনো না কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকে।
অথচ যে মানুষটি সৎ, পরিশ্রমী, নিরহংকার কিন্তু অর্থহীন, তার মূল্যায়ন অনেক সময় হয় না। দরিদ্র আত্মীয় অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়ার সময় থাকে না; কিন্তু অর্থবান আত্মীয় অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়ার মানুষের অভাব হয় না। যেন মানুষের মূল্য তার হৃদয়ে নয়, তার সম্পদের পরিমাণে।
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রেও স্বার্থপরতা দলগত সম্পর্ক নষ্ট করে। কেউ অন্যের শ্রমের কৃতিত্ব নিজের নামে নিতে চায়, কেউ সহকর্মীর সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার বদলে ঈর্ষান্বিত হয়। কারণ আধুনিক প্রতিযোগিতার এক অদৃশ্য শিক্ষা যেন হয়ে উঠেছে, ‘আমি বড় হলেই হলো; অন্যজন কোথায় দাঁড়াল, তা আমার বিষয় নয়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সেখানে অনেকেই নিজের জীবনের সুখের মুহূর্তগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন জীবন মানেই আনন্দ,সাফল্য ও প্রাচুর্য। অথচ ছবির আড়ালে থাকতে পারে অশান্তি, নিঃসঙ্গতা কিংবা গভীর শূন্যতা। অন্যদিকে ভিউ, লাইক, শেয়ার কিংবা অর্থের জন্য কেউ কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে বিনোদনে পরিণত করে। কেউ দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে ক্যামেরা বের করেন। কেউ গুজব ছড়ান কয়েকটি ক্লিকের আশায়। কেউ অন্যকে অপমান করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান।
মানুষের অসহায়ত্ব যখন অন্যের বিনোদন হয়ে যায়, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো সমাজের বিবেক আহত হয়।
তবে জীবনের একটি অদ্ভুত সত্যও আছে। অর্থ ও প্রাচুর্য সব সুখের নিশ্চয়তা নয়। যার অর্থ আছে, সে হয়তো ইচ্ছেমতো সবকিছু কিনতে পারে, কিন্তু সবকিছু উপভোগ করতে পারে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থেকেও তার ঘুম নাও আসতে পারে। আর যে মানুষটি অল্পে জীবন কাটায়, সে হয়তো সাধারণ খাবারেই তৃপ্ত, সাধারণ বিছানাতেই শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে নেয়। মানুষের সুখের হিসাব ব্যাংক ব্যালান্সে লেখা থাকে না। সুখের একটি অংশ থাকে মনের ভেতর, আর সেই অংশটি অনেক সময় অর্থ দিয়ে কেনা যায় না।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে গভীর সতর্কবাণী রয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১১৭তম সূক্তে ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষের সঙ্গে অন্ন ভাগ করে নেওয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দানের বিপরীতে কৃপণতাকে শুধু সামাজিক দোষ হিসেবে নয়, নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের কাছে থাকা অন্ন, সম্পদ কিংবা সামর্থ্য কেবল নিজের জন্য আটকে না রেখে অন্যের প্রয়োজনেও তা ব্যয় করার মধ্যেই মানবতার প্রকৃত পরিচয়।
‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীকে এক পরিবার হিসেবে দেখার যে মহৎ দর্শন ভারতীয় চিন্তায় পাওয়া যায়, তার সঙ্গে চরম আত্মকেন্দ্রিকতার কোনো মিল নেই। যে মানুষ শুধু নিজের সুখ, নিজের সম্পদ, নিজের সাফল্য এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত, সে ধীরে ধীরে বৃহত্তর মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
শিবপুরাণের আধ্যাত্মিক ভাবধারাতেও মানুষের অন্তর্গত পশুবৃত্তি জয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাগ, দ্বেষ, ঈর্ষা, অহংকার ও তীব্র স্বার্থপরতা মানুষকে তার মানবিক সত্তা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। মানুষের প্রকৃত উন্নতি বাহ্যিক আড়ম্বর, বিপুল সম্পদ কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে নয়; বরং অন্তরের শুদ্ধতা, পরোপকার, সংযম ও নিঃস্বার্থ কর্মে।
শিবকে খুঁজতে দূর তীর্থে যাওয়ার আগে যদি একজন মানুষ তার পাশের ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকাতে না পারে, অসুস্থ প্রতিবেশীর কষ্ট অনুভব করতে না পারে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারে, তবে তার আধ্যাত্মিকতার গভীরতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।
কারণ ঈশ্বরকে মন্দিরে খোঁজা যত সহজ, জীবের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখা তত কঠিন।
নিঃস্বার্থ সেবা তাই কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি এক ধরনের সাধনা। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের উপকার করা, কারও দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, কারও অশ্রু মুছে দেওয়া, কারও ক্ষুধার সময় অন্ন ভাগ করে নেওয়া, এমনকি কখনো কখনো বিনিময়ের প্রত্যাশা না করে একটি ভালো কথা বলাও মানুষের ভেতরের আলোকে জাগিয়ে তোলে।
যে মানুষ সারাজীবন সম্পর্ককে লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায় মাপে, একদিন যখন তার নিজের প্রয়োজন হয়, তখন সেই দাঁড়িপাল্লাই তার সামনে ফিরে আসে। মানুষ তখন তাকে ঘিরে থাকে না, কারণ সে নিজেই কোনোদিন মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসেনি। পরিবারে দূরত্ব তৈরি হয়, বন্ধুত্বে বিশ্বাস নষ্ট হয়, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। বাইরে যত পরিচিতি থাকুক, ভেতরে ততই বাড়তে থাকে শূন্যতা।
স্বার্থপরতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষকে নিজের সাফল্যে বন্দি করে ফেলে। অন্যের উন্নতি তখন আনন্দের কারণ হয় না, বরং ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য কেউ এগিয়ে গেলে মনে হয়, নিজের জায়গা যেন ছোট হয়ে গেল। অথচ সত্য হলো, অন্যের আলো নিভিয়ে নিজের আলো উজ্জ্বল করা যায় না।
পৃথিবীর সব অর্জনই ক্ষণস্থায়ী। অর্থ থাকবে না,পদ থাকবে না,ক্ষমতা থাকবে না,খ্যাতিও একদিন মুছে যাবে। যে মানুষ আজ শত মানুষের শ্রদ্ধার কেন্দ্রে, কাল হয়তো তার নামটিও কেউ মনে রাখবে না। শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে থেকে যায় তার ব্যবহার,তার ভালোবাসা,তার দয়া,তার সততা এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কিছু আলো।
তাই স্বার্থ থাকা অপরাধ নয়। নিজের প্রয়োজন, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা ভাবা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই স্বার্থ যখন অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করে, সম্পর্ককে পণ্যে পরিণত করে, তখন তা স্বার্থ নয়, স্বার্থপরতা।
আমাদের প্রয়োজন স্বার্থহীন মানুষ হওয়ার চেয়ে স্বার্থের সীমা বোঝা মানুষ হওয়া। কারণ মানুষ নিজের জন্য বাঁচবে, কিন্তু শুধু নিজের জন্য বাঁচবে না।
জীবন যত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের হতে প্রযুক্তি যত বাড়ছে, পৃথিবী যত ছোট হয়ে আসছে, ততই আমাদের হৃদয় যেন ছোট হয়ে না যায়। মানুষের পরিচয় তার অর্থে নয়, তার পদে নয়, তার সামাজিক দাপটে নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতায়।
যে হাত অন্যকে ঠেলে নিজে ওপরে উঠতে চায়, সে হয়তো সাময়িকভাবে ওপরে উঠতে পারে। কিন্তু যে হাত অন্যকে তুলে ধরতে শেখে, সে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
স্বার্থ থাকবে, কিন্তু স্বার্থপরতা নয়। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু হিংসা নয়। সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা থাকবে, কিন্তু অন্যের পতনের বিনিময়ে নয়। ধর্ম থাকবে, কিন্তু প্রদর্শন নয়। সম্পদ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে দানের হাত। আর জীবনের পথে যতদূরই যাই, মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাটুকু যেন হারিয়ে না ফেলি।
কারণ পৃথিবীতে মানুষ অনেক, কিন্তু সত্যিকারের মানবিক মানুষই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখে।
মতামত