জন্মের মাত্র তিন দিন বয়সে আদালতের এফিডেভিটের মাধ্যমে দত্তক নেওয়া এক কন্যাশিশুকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন, লেখাপড়া করানো এবং পরবর্তীতে বিয়ে দেওয়ার পরও পালক বাবার মৃত্যুর পরে ওয়ারিশান সনদ না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা ইউনিয়নের ধাদালীপাড়া গ্রামে।
এ ঘটনায় বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পালিত কন্যা নিতা ইয়াসমিনকে ওয়ারিশান সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নিতা ইয়াসমিন ও তার পালক মা রেজিয়া বেগম।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জন্মের মাত্র তিন দিন বয়সে নিতা ইয়াসমিনকে আদালতের এফিডেভিটের মাধ্যমে দত্তক নেন মরহুম নেজাম উদ্দিন ও তার স্ত্রী রেজিয়া বেগম। তাদের কোনো জৈবিক সন্তান না থাকায় নিতাকে নিজেদের একমাত্র কন্যাসন্তান হিসেবে লালন-পালন করেন তারা।
নিতার টিকার সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা জাতীয় পরিচয় পত্র ও এসএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন শিক্ষাসনদে পিতা হিসেবে নেজাম উদ্দিন এবং মাতা হিসেবে রেজিয়া বেগমের নাম উল্লেখ রয়েছে৷
নিতার শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তাকে কৃষ্ণনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে পড়াশোনা শেষে তিনি ২০২৩ সালে এসএসসি পাস করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অসুস্থতার কারণে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটলে নেজাম উদ্দিন পারিবারিকভাবে নিতার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বিয়ের কিছুদিন পর ২০১৭ সালে নেজাম উদ্দিন মারা যান।
স্থানীয় বাসিন্দা আজুবা বেগম, হাজ্জাজ মুনছুর রহমান, খায়রুল ও রফিকুলসহ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, জন্মের মাত্র তিন দিন বয়সে নিতাকে কাগজপত্রের মাধ্যমে দত্তক নিয়ে নেজাম উদ্দিন নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। তাকে লেখাপড়া করিয়েছেন এবং পরবর্তীতে বিয়েও দিয়েছেন। নেজাম উদ্দিনের পূর্বপুরুষের কোনো উত্তর অধিকার নেই তার স্ত্রী ও পালক কন্যা এক মাত্রা অভিভাবগ৷
স্থানীয়দের দাবি, নেজাম উদ্দিনের কোনো জৈবিক সন্তান ছিল না। তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও পূর্বসূত্রে কোনো প্রত্যক্ষ ওয়ারিশ নেই বলে তারা দাবি করেন। নেজাম উদ্দিনের প্রায় সাত বিঘা জমিজমা রয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তার স্ত্রী রেজিয়া বেগম ও পালিত কন্যা নিতা ইয়াসমিন ওই সম্পত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জয়পুরহাট জেলা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাফিউজ্জামান বলেন,পালক সন্তান সাধারণভাবে পালক পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সম্পত্তির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হিসেবে অংশ পাওয়ার অধিকারী নয়। তবে মরহুম নেজাম উদ্দিনের কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী বা নিকটাত্মীয় ওয়ারিশ না থাকলে এবং তিনি জীবদ্দশায় পালক কন্যা নিতা ইয়াসমিনকে নিজের সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে লালন-পালন ও শিক্ষিত করে তার বিভিন্ন একাডেমিক ও পরিচয়সংক্রান্ত সনদে পিতা হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করে থাকলে প্রচলিত আইন পর্যালোচনা করে নিতা ইয়াসমিনের ওয়ারিশান সনদের বিষয়ে তদন্তপূর্বক
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নেজাম উদ্দিনের মৃত্যুর পর নিতা ইয়াসমিন ওয়ারিশ হিসেবে বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে ওয়ারিশান সনদের আবেদন করেন। তবে চেয়ারম্যান তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিতার পালক মা রেজিয়া বেগম বলেন, নিতা আমার নিজের সন্তান জন্মের পর থেকেই আমার স্বামী ও আমি তাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। লোকে কী বলল, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েকে নিয়ে ওয়ারিশান সনদের জন্য কয়েকবার চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছি, কিন্তু তিনি সনদ দিতে রাজি হননি।
ভুক্তভোগী নিতা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জন্মের পর থেকেই নেজাম উদ্দিন আমার বাবা এবং রেজিয়া বেগম আমার মা। তারা আমাকে মানুষ করেছেন, লেখাপড়া করিয়েছেন। আমার শিক্ষাসনদেও তাদের নাম বাবা-মা হিসেবে রয়েছে। বাবার সম্পত্তি থাকায় একটি পক্ষ আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে বলে আমার মনে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ওয়ারিশান সনদের জন্য চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো সনদ পাচ্ছি না। কতিপয় ব্যক্তি বিভিন্নভাবে আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলেও আশঙ্কা করছি। আমি ও আমার মা বাড়িতে একা থাকি। আমার স্বামী একটি এনজিওতে চাকরি করেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, নিতা ইয়াসমিন মরহুম নেজাম উদ্দিনের পালিত কন্যা। আইন অনুযায়ী পালিত সন্তানকে ওয়ারিশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বৈধতা আছে কি না, সেটি বিবেচনার বিষয়। তাই আমি ওয়ারিশান সনদ প্রদান করিনি।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি বলেন, আমরা এখনো এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত