রাজধানীর মিরপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে’ হামলা, ভাঙচুর ও জায়গা দখলের চেষ্টার ঘটনায় সদ্য পদত্যাগকারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও তাঁর অনুসারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্ষোভ সৃষ্টিকারী এই নজিরবিহীন ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন পদস্থ নেতাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঘটনাটির পেছনে প্রভাবশালী চক্রের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি দখল করে বিপণিবিতান (মার্কেট) নির্মাণের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা ছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার রাতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালানোর আগে রাত ১২টা ৫ মিনিটে শাহআলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে ‘শুটার লেলিন’-এর কার্যালয়ের সামনে সশস্ত্র ক্যাডাররা জড়ো হয়। অন্যদিকে, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে থেকেও পৃথক দল জড়ো হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় পাশেই আন-নূরী জামে মসজিদ সড়কে একটি সাদা রঙয়ের মাইক্রোবাসে অবস্থান করছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। গাড়িতে বসে তাঁর সঙ্গে থেকে পুরো হামলার দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন যুবদল নেতা মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল, হানিফ মিয়াসহ ঘনিষ্ঠ নেতারা। সেসময় শাহআলী থানা শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিম লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে পথ পাহারা দেন।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে দেশে ফিরেই ঘটনার সার্বিক খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তদন্তে স্থানীয় সাবেক এমপি ও দলীয় নেতাদের যুক্ততার প্রমাণ মেলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে কঠোর আইনি ও সাংগঠনিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেন তিনি।
ঘটনার পরই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি, মহানগর উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এছাড়া শাহআলী, দারুসসালাম ও বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রায় এক ডজন পদস্থ নেতাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্পষ্ট জানিয়েছেন, "দলে ঢুকে যারা অনৈতিক, সন্ত্রাসী ও গর্হিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
রাড্ডাকাণ্ডে সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত প্রধান আসামি মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে গুদারাঘাট এলাকা থেকে শুটার লেলিনের সহযোগী নুর আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় ভেকু গাড়ির চালক থেকে শুরু করে স্থানীয় শ্রমিক দল ও বিএনপি সমর্থিত সমিতির একাধিক সদস্য রয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্ত সাবেক এমপি মিষ্টিসহ মূল কারিগররা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং তদন্তে উঠে আসা অন্য রডবড় বা পেছন থেকে উসকানিদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
মতামত