নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের জন ৯২ কোটি ৭৬ লাখ ১ হাজার ৩৯৩ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকাল ৩ টায় পৌর কমিউনিটি সেন্টারের হলরুমে এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পৌরসভার কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জন প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সংবাদ কর্মী ও সূধীজন এতে অংশ গ্রহণ করেন।
এতে সভাপতিত্ব করেন পৌর প্রশাসক ও সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা। লিখিত বাজেটপত্র পাঠ করেন পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী আইয়ুব আলী। উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকৌশলী এম এম আলী রেজা রাজু, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আকতার শাহীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন প্রামাণিক, সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর শফিকুল ইসলাম, পৌর আমীর আলহাজ্ব শরফুদ্দীন খান ও সেক্রেটারি মাওলানা ওয়াজেদ আলী, নীলফামারী চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের সাবেক সহ সভাপতি আলহাজ্ব ইমতিয়াজ আহমেদ।
বাজেটপত্র পাঠ শেষ হতেই প্রশাসক হুট করে সভাস্থল থেকে চলে যান। এতে উপস্থিতরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েন এবং পরে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এতে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। অনেকে ক্ষিপ্ত হয়ে পৌর কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আবার অনেকে নিন্দা জানিয়ে বক্তব্য দেন। প্রশাসকের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণে পুরো হলজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে।
এসময় সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য নীলফামারী-৪ শওকত চৌধুরী বলেন, এটা কোন সভ্য মানুষের কাজ নয়। প্রশাসক চরম অসৌজন্যতা দেখালেন। আমাদের দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে তিনি কিছু না বলে চলে গেলেন। এটা আমাদেরকে অপমান করার শামিল। তার যদি এতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো তাহলে কেন ডাকলেন।
তিনি আরও বলেন, এর দ্বারা তিনি আমাদেরকে বোঝালেন যে, আমরা নাগরিকরা তার কাছে কিছুই না। এটা অত্যন্ত উদ্ধততা। আসলে পৌরসভায় লুটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। তাই জনগণের প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার হাত থেকে পালিয়ে গেছেন তিনি। পৌর কর্মকর্তারা তার মাধ্যমে ব্যাপক দূর্নীতি করে চলেছে। একেকজন বিশাল বাড়ি করে, গাড়ি কিনে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছেন।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আকতার শাহীন বলেন, এধরনের কর্মকাণ্ড সত্যই হতবাক করেছে আমাদেরকে। ইতোপূর্বে কখনই পৌর বাজেট ঘোষণা নিয়ে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেনি। আমি দীর্ঘদিনের একজন জন প্রতিনিধি হিসেবে প্রচন্ডভাবে অপমান বোধ করছি। পৌর কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে এরকম লজ্জা জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার আহবান জানান তিনি।
উপজেলা জামায়াতের আমীর শফিকুল ইসলাম বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে বড় লজ্জিত ও অপমানিত মনে করছি। অত্যন্ত সম্মানহানীকর পরিস্থিতিতে ফেলেছেন পৌর প্রশাসক। তিনি সামান্য সৌজন্যতা দেখাননি। অভদ্রতার পরিচয় দিয়ে তিনি সভা ত্যাগ করেছেন। যা তার মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে কখনোই প্রত্যাশিত নয়। এজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে গেছে। তব আশা করি ভবিষ্যতে তিনি সৈয়দপুরবাসীর শাসক না হয়ে অভিভাবক হয়ে সেই মতো আচরণ করবেন।
আরমান হোসেন নামে একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ইতোপূর্বে প্রতি বছরই জুন মাসের শেষ সপ্তাহে নিয়মিতভাবে আনুষ্ঠানিক বাজেট ঘোষণা করা হতো। এতে পৌরসভার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের জনগণ অংশ গ্রহণ করতেন এবং তাদের মতামত তুলে ধরতেন। এমনকি ঘরে বসে থেকে অনলাইনে প্রশ্ন করে নিজ এলাকার সমস্যা সমাধানে পৌর পরিষদকে জবাবদিহি করতেন।
যা ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। ফলে সবাই জানতে পারতো বিগত বছরে কোন কোন কাজ কত টাকায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং আগামীতে করা হবে। কিন্তু এবার ৩ মাস পেরিয়েও বাজেট ঘোষণা করা হয়নি। কেউ জানতেই পারছিনা কোথায় কোন কাজ কিভাবে করা হচ্ছে। অথচ এটা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।
তিনি বলেন, মূলত: কাজের নামে দীর্ঘ সূত্রিতা আর লুটপাট করা হচ্ছে। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদেরকে। এনিয়ে লেখালেখির কারণে বাধ্য হয়ে এই বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে পৌর প্রশাসন। কিন্তু জনগণের প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন বলে প্রশাসক পালিয়ে গেছেন। এটা আমলাতান্ত্রিক চরিত্র। সৈয়দপুরবাসী এই আচরণ বরদাস্ত করবেনা। এজন্য তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে।
এছাড়াও উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ এনিয়ে নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রায় সকলেই প্রশাসকের এহেন কর্মকান্ডকে নেতিবাচক বলেই উল্লেখ করেন এবং ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, একেতো জুন মাসের বাজেট অক্টোবরে এসে ঘোষণা করছেন। তার উপর এভাবে সবাইকে অপমানকর অবস্থায় ফেলেছেন। যা কোনভাবেই মেনে নেওয়ার মত নয়।
বাজেটে রাজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ৩২ কোটি ৭৫ লাখ ৫২ হাজার ৯৩৪ টাকা এবং রাজস্ব ব্যায় ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ২৫ হাজার ৪৮ টাকা। আর উন্নয়ন হিসাবে আয় ও ব্যয় সম পরিমান উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যা আয় হবে তা সবই ব্যয় করে উন্নয়ন কাজ করা হবে। এ খাতে ধরা হয়েছে মোট ৪৪ কোটি ৮০ লাখ।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ আরইউটিডিপি এর আওতায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ এবং সড়ক বাতি স্থাপনে ৩০ কোটি টাকা। এছাড়া এডিপির অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংষ্কারে ৩ কোটি, সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলা সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী ও কিচেন মার্কেট নির্মাণ বাবদ ৩ কোটি। সেই সাথে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নির্মাণে ২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
এদিকে ঋণ গ্রহণ ৪০ কোটি আর পরিশোধ ৫০ কোটি, প্রদানকৃত ঋণ ফেরত ৩৫ কোটি ও নতুন করে ঋণ প্রদান ৪৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য খাত হলো কর ৭ কোটি ৬৪ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৮, রেইট ৮ কোটি ৪৯ লাখ ৬৪ হাজার ৮৬, ফিস ৪ কোটি ১৯ লাখ ৪ হাজার ১৭০, স্থাবর সম্পত্তি থেকে ৬ কোটি ৫০ লাখ, পৌর সম্পত্তি থেকে ১ কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য খাত হলো কনজার্ভেন্সি (দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক মজুরি) কর্মচারীদের মজুরি ৭ কোটি, সংস্থাপন খরচ ৭ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের পাওনা ৩ কোটি ৯০ লাখ এবং কর্মরতদের বেতন ও সম্মামী ভাতা ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৭৭০ টাকা। কর আদায় ও নির্ধারণ খাতে ২৮ লাখ ও পানি শাখার খরচ ৫৮ লাখ ৯ হাজার ৫৭৮ টাকা।
নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থাপনা খাতে মাত্র ২ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। আর ইপিআই খরচ ৫২ লাখ ও রাস্তার বাতিসহ আনুষঙ্গিক খরচ ৫০ লাখ টাকা। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যয় ১০ লাখ টাকা, আবার খেলাধূলা ও সংস্কৃতি খাতেও ১০ লাখ টাকা। যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে অনুদান ১০ লাখ টাকা শুধু কাগজে কলমেই বিদ্যমান।একইভাবে বৃক্ষরোপণে ৮ টাকা ধরা হলেও আদৌ সঠিকভাবে তা করা হবে কি না তা নিয়ে বিগত বছরের মত এবছর সংশয় দেখা দিয়েছে। পৌর বৃত্তি ও গুণিজন সম্মাননা ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। অথচ পৌর বৃত্তি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে।
অন্যদিকে অফিস ভবন, শিশু পার্ক, হাটে-বাজারের জমি ক্রয় এবং শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বর্ধন খাতে ২ কোটি ৩০ লাখ ধরা হয়েছে। যা প্রতি বছরই বাজেটপত্রে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কখনই তা ব্যয় করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়না। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালও দীর্ঘদিন থেকে চরম অবনতিশীল অবস্থায়। বাজেটে এর সংষ্কার বাবদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোন উন্নয়ন করা হয়নি।
মতামত