দক্ষিণ এশিয়ায় পানি নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পারস্পরিক আস্থা, ন্যায্যতা ও যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আয়োজিত এক সেমিনারের বক্তারা। তাঁরা বলেন, নদী ও পানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু পানি বণ্টন নয়, উজান-ভাটির সম্পর্ক, ভূরাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রগুলোর দর-কষাকষির সক্ষমতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে ‘দক্ষিণ এশিয়ার হাইড্রোপলিটিক্স: পানি বণ্টন, ক্ষমতা ও ভূরাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফর পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি সোসাইটি এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের ফ্যাকাল্টি মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কোন দেশ কতটুকু পানি পাবে বা নিয়ন্ত্রণ করবে—শুধু এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে হাইড্রোপলিটিক্সকে বোঝা যায় না। নদীর উজান-ভাটির ভৌগোলিক অবস্থান, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সুবিধা, তথ্যের প্রাপ্যতা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণও একটি রাষ্ট্রের দর-কষাকষির সক্ষমতা নির্ধারণ করে।
মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর ভবিষ্যৎ কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি সহযোগিতা, ন্যায্যতা ও যৌথ দায়িত্বের প্রশ্ন। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলোকে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম মাহফুজুল হক (মাহফুজ পারভেজ) বলেন, পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। নদী ও পানি নিয়ে সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে বহুবিষয়ক (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নীতি প্রণয়নে সরকারকে বিশেষজ্ঞনির্ভর উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সামছুদ্দিন ইলিয়াস বাংলাদেশের নদীগুলো নিয়ে একাডেমিক গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। নদীগুলোর জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান কত শতাংশ, গবেষণার মাধ্যমে তা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
গঙ্গা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে সামছুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে শুধু মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তা না করে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নতুন ও ন্যায্য ধারা যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলোকে জনবান্ধব চুক্তি করতে হবে। পানি বণ্টনসহ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান বলেন, তরুণদের পানি ব্যবহারের নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশের আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি এখন ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করে ন্যায্যতা ও বাস্তবধর্মী গবেষণার ভিত্তিতে পানি চুক্তি করতে হবে। বাংলাদেশের পানির ন্যায্যতা রক্ষায় তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার।
মতামত