বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

কেঁচো থেকে সার, সার থেকে স্বাবলম্বী সেবেন চন্দ্র



কেঁচো থেকে সার, সার থেকে স্বাবলম্বী সেবেন চন্দ্র
বাণিজ্যিকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

কেঁচো থেকে সার, সেই সার বিক্রি করে আয়—এভাবেই স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে চলেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুদেব গ্রামের কৃষক সেবেন চন্দ্র। মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করা উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে মাঝারি আকারের ভার্মি কম্পোস্ট খামারে। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মণ জৈব সার উৎপাদন করছেন তিনি।

সেবেন চন্দ্র জানান, শুরুতে দিনাজপুর থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ৫ কেজি থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের কেঁচো সংগ্রহ করেন। ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির বিষয়ে শুরুতে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও দেখে তিনি কেঁচো পালন ও জৈব সার তৈরির প্রাথমিক ধারণা নেন। পরে কাজটিকে আরও দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে ঠাকুরগাঁওয়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ ও নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে খামারের পরিসর বাড়াতে থাকেন তিনি। বর্তমানে তার খামারে কেঁচোর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। গোবরসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করছেন ভার্মি কম্পোস্ট। কেঁচোর মাধ্যমে এসব জৈব উপাদান প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের জৈব সার।

সেবেন চন্দ্র বলেন, “শুরুতে ইউটিউব দেখে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির বিষয়টি শিখেছি। পরে ঠাকুরগাঁওয়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কাজটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। এখন নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত সার উৎপাদন করছি। খামারটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।”

বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মণ ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন সেবেন চন্দ্র। প্রতি কেজি সার উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৬ টাকা। আর বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে। অর্থাৎ প্রতি কেজি সারে প্রায় ৪ টাকা লাভ থাকছে। ৪০ মণ বা ১ হাজার ৬০০ কেজি সার বিক্রি হলে মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টাকা এবং উৎপাদন খরচ বাদে লাভ থাকে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ টাকা।

বর্তমানে খামারটি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। উৎপাদিত সারের চাহিদা বাড়ায় ভবিষ্যতে খামারের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন সেবেন চন্দ্র। নতুন বেড ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে উৎপাদন বাড়াতে চান তিনি।

সেবেন চন্দ্রের মতে, ভার্মি কম্পোস্ট শুধু বাড়তি আয়ের উৎস নয়, কৃষিজমির মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব সার উৎপাদন করলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিএস বাদল বলেন, “সেবেন চন্দ্র নিজের আগ্রহ ও চেষ্টায় প্রথমে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কাজ শুরু করেছেন। ইউটিউব থেকে ধারণা নেওয়ার পর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কৃষকেরা এভাবে জৈব সার উৎপাদনে এগিয়ে এলে নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও করতে পারবেন।”

তিনি আরও বলেন, “ভার্মি কম্পোস্ট মাটির জৈব উপাদান বাড়াতে সহায়তা করে। কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাসায়নিক সারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।”

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সেবেন চন্দ্রের উদ্যোগ এলাকায় ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে আগ্রহ তৈরি করেছে। কৃষিজ বর্জ্য ও গোবর কাজে লাগিয়ে জৈব সার উৎপাদনের বিষয়টি তাদের কাছেও সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষিতে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কৃষিজ বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সম্ভব হবে। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে কয়েক কেজি কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করা সেবেন চন্দ্রের উদ্যোগ এখন নিয়মিত আয়ের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষির একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত। নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কেঁচো থেকে সার, সার থেকে স্বাবলম্বী সেবেন চন্দ্র

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কেঁচো থেকে সার, সেই সার বিক্রি করে আয়—এভাবেই স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে চলেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুদেব গ্রামের কৃষক সেবেন চন্দ্র। মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করা উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে মাঝারি আকারের ভার্মি কম্পোস্ট খামারে। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মণ জৈব সার উৎপাদন করছেন তিনি।

সেবেন চন্দ্র জানান, শুরুতে দিনাজপুর থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ৫ কেজি থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের কেঁচো সংগ্রহ করেন। ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির বিষয়ে শুরুতে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও দেখে তিনি কেঁচো পালন ও জৈব সার তৈরির প্রাথমিক ধারণা নেন। পরে কাজটিকে আরও দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে ঠাকুরগাঁওয়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ ও নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে খামারের পরিসর বাড়াতে থাকেন তিনি। বর্তমানে তার খামারে কেঁচোর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। গোবরসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করছেন ভার্মি কম্পোস্ট। কেঁচোর মাধ্যমে এসব জৈব উপাদান প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের জৈব সার।

সেবেন চন্দ্র বলেন, “শুরুতে ইউটিউব দেখে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির বিষয়টি শিখেছি। পরে ঠাকুরগাঁওয়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কাজটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। এখন নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত সার উৎপাদন করছি। খামারটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।”

বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মণ ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন সেবেন চন্দ্র। প্রতি কেজি সার উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৬ টাকা। আর বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে। অর্থাৎ প্রতি কেজি সারে প্রায় ৪ টাকা লাভ থাকছে। ৪০ মণ বা ১ হাজার ৬০০ কেজি সার বিক্রি হলে মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টাকা এবং উৎপাদন খরচ বাদে লাভ থাকে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ টাকা।

বর্তমানে খামারটি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। উৎপাদিত সারের চাহিদা বাড়ায় ভবিষ্যতে খামারের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন সেবেন চন্দ্র। নতুন বেড ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে উৎপাদন বাড়াতে চান তিনি।

সেবেন চন্দ্রের মতে, ভার্মি কম্পোস্ট শুধু বাড়তি আয়ের উৎস নয়, কৃষিজমির মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব সার উৎপাদন করলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিএস বাদল বলেন, “সেবেন চন্দ্র নিজের আগ্রহ ও চেষ্টায় প্রথমে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কাজ শুরু করেছেন। ইউটিউব থেকে ধারণা নেওয়ার পর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কৃষকেরা এভাবে জৈব সার উৎপাদনে এগিয়ে এলে নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও করতে পারবেন।”

তিনি আরও বলেন, “ভার্মি কম্পোস্ট মাটির জৈব উপাদান বাড়াতে সহায়তা করে। কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাসায়নিক সারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।”

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সেবেন চন্দ্রের উদ্যোগ এলাকায় ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে আগ্রহ তৈরি করেছে। কৃষিজ বর্জ্য ও গোবর কাজে লাগিয়ে জৈব সার উৎপাদনের বিষয়টি তাদের কাছেও সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষিতে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কৃষিজ বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সম্ভব হবে। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে কয়েক কেজি কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করা সেবেন চন্দ্রের উদ্যোগ এখন নিয়মিত আয়ের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষির একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত। নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream