ভিসা জটিলতায় বদলেছে চিকিৎসা ভ্রমণের চিত্র, কুনমিংয়ে বাড়ছে আগ্রহ
বাংলাদেশিদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রধান গন্তব্য ভারত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা জটিলতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং চিকিৎসা ভ্রমণে অনিশ্চয়তার কারণে ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশি রোগীদের। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং এখন চিকিৎসা নিতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের কাছে নতুন একটি গন্তব্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতে চিকিৎসা নিতে না পেরে চীনে যাওয়ার বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ২০২৫ সালে এক বাংলাদেশি রোগী ভারতীয় মেডিকেল ভিসা না পেয়ে কুনমিংয়ে গিয়ে মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করান। তাঁর পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসায় খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউয়ান, যা সে সময় প্রায় ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।
বাংলাদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করতে চীনও উদ্যোগ বাড়িয়েছে। কুনমিংয়ের কয়েকটি হাসপাতালকে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে রোগী, চিকিৎসক, ট্রাভেল এজেন্টসহ বাংলাদেশিদের একটি প্রতিনিধিদল কুনমিংয়ের হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে। একই সময়ে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।

কেন চীন?
চীনের প্রতি আগ্রহের অন্যতম কারণ আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় এবং কিছু জটিল রোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত সুবিধা। ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ ও জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে কুনমিংসহ চীনের বিভিন্ন হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের আকর্ষণ করছে। ঢাকা থেকে কুনমিংয়ের উড়ান সময়ও তুলনামূলক কম হওয়ায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি একটি সুবিধা।
তবে চীনে চিকিৎসা নিতে গেলে ভাষা ও যোগাযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ভিসা প্রক্রিয়া, বিমানভাড়া এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রোগীদের জন্য অতিরিক্ত বিবেচনার বিষয়। বিভিন্ন হাসপাতালে দোভাষীর ব্যবস্থা থাকলেও ভারতের মতো দীর্ঘদিনের বাংলাদেশি রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো চীনে গড়ে ওঠেনি।
ভারত কি পিছিয়ে পড়ছে?
চীনের আগ্রহ বাড়লেও বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা ভ্রমণে ভারত এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভাষাগত সুবিধা, ভৌগোলিক নৈকট্য, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা যোগাযোগ, হাসপাতালের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপের কারণে অনেক রোগীর কাছে ভারত এখনো তুলনামূলক সহজ গন্তব্য।
তবে রোগী কমে যাওয়ার বিষয়টি কলকাতার হাসপাতালগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কলকাতার কয়েকটি হাসপাতাল বাংলাদেশে লিয়াজোঁ টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা ও থাকার ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে চিকিৎসা পর্যটনের সমীকরণ
বাংলাদেশিদের মধ্যে চীনের প্রতি আগ্রহ বাড়ার অর্থ এই নয় যে রোগীরা পুরোপুরি ভারত থেকে সরে যাচ্ছেন। বরং ভিসা জটিলতার সময় বিকল্প গন্তব্য হিসেবে চীন দ্রুত গুরুত্ব পেয়েছে। এখন রোগীরা চিকিৎসার ধরন, খরচ, ভিসা, যাতায়াত, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা-পরবর্তী সেবার মতো বিষয় বিবেচনা করে গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।
ফলে বাংলাদেশের চিকিৎসা পর্যটনের বাজারে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ভারতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার বিপরীতে চীন এখন প্রযুক্তি, হাসপাতাল অবকাঠামো ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকে সামনে রেখে বাংলাদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সুবিধা পেতে পারেন বাংলাদেশি রোগীরাই—যদি চিকিৎসার মান, স্বচ্ছ খরচ, ভিসা সুবিধা ও রোগীসেবার ক্ষেত্রে দুই দেশই আরও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
মতামত