ইইউ প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করতে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সেখানে দুই দিনের সফরে যাচ্ছেন।
তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে সোমবার একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করবেন।
রয়্যাল ড্যানিশ ডিফেন্স কলেজের গবেষক মার্ক ইয়াকবসেন বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং এর ভূরাজনৈতিক অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও আর্কটিক নিরাপত্তায় ভূমিকার কারণে গ্রিনল্যান্ড ইইউর কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছিলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিশাল এই আর্কটিক দ্বীপটির ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তবে পরে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন।
এরপর ভবিষ্যতে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ কর্মগোষ্ঠী নিয়মিত বৈঠক করে আসছে।
ট্রাম্পের হুমকির পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ব্যাপকভাবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়ায়। জানুয়ারিতে ভন ডার লেয়েন আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে গ্রিনল্যান্ডে ‘বিপুল’ ইইউ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
গ্রিনল্যান্ড ইইউর সদস্য নয়, তবে ডেনমার্ক ইইউর সদস্য।
এদিকে, ২০২৮ থেকে ২০৩৪ মেয়াদের পরবর্তী বাজেটে গ্রিনল্যান্ডের জন্য সরাসরি ইইউ সহায়তা দ্বিগুণ করে ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো (৬১৬ মিলিয়ন ডলার) করার প্রস্তাব দিয়েছে ব্রাসেলস।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভন ডার লেয়েন রোববার ও সোমবারের সফরে গ্রিনল্যান্ডের জন্য আরো ২০০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার প্রস্তাব দিতে পারেন।
তার সফরের সময়ই শুরু হচ্ছে ন্যাটোর ‘আর্কটিক শিল্ড’ সামরিক মহড়া। এতে ১০টি দেশের সেনারা অংশ নিচ্ছেন।
কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরাজনীতি গবেষক মিকায়া ব্লুজোঁ-মেরে এই সময়েই এই মহড়াকে ‘একেবারেই গুরুত্বহীন কাকতালীয় ঘটনা নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে অবহেলার অভিযোগ করে আসছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কোপেনহেগেন ওই অঞ্চলে নতুন করে বিনিয়োগ করেছে। ন্যাটোও একইভাবে আর্কটিক অঞ্চলে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে এবং বছরের শুরুতে ‘আর্কটিক সেন্ট্রি’ অভিযান শুরু করেছে।
ইয়াকবসেন বলেন, ‘ন্যাটো যেভাবে গ্রিনল্যান্ডকে সামরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে, ইইউ সেভাবে পারে না। তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিতে পারে—গ্রিনল্যান্ড একা নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর চাপ অব্যাহত রাখায় এই বার্তা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে মে মাসে ট্রাম্পের বিশেষ দূত জেফ ল্যান্ড্রি গ্রিনল্যান্ড সফরের পর এ বিষয়ে ট্রাম্পকে তুলনামূলকভাবে কম সরব হতে দেখা গেছে।
ব্লুজোঁ-মেরে বলেন, ‘প্রতি মাসেই আমরা ট্রাম্প বা তার ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ‘পোস্টকার্ড’ পাচ্ছি। এতে বোঝা যায়, তারা বিষয়টি ভুলে যাননি।’
মে মাসে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এমন একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে তাকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় এবং শিরোনাম ছিল— ‘হ্যালো, গ্রিনল্যান্ড!’
আগস্টে গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় একটি মার্কিন তেল কোম্পানির প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হলে দ্বীপটিতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
টেক্সাসভিত্তিক একটি কোম্পানি এই প্রকল্প পরিচালনা করছে। ২০২১ সালে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেয়েছিল। তবে প্রকল্পটি স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অনুসন্ধানমূলক খননকাজ শুরু করতে কোম্পানিটিকে এখনো অনুমোদন দেয়নি কর্তৃপক্ষ। এর কারণ হিসেবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড তার খনিজ শিল্পও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই শিল্পের উন্নয়ন হলে ডেনমার্কের কাছ থেকে ভবিষ্যতে স্বাধীন হওয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে।
ইয়াকবসেন বলেন, এ ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ড ও ইউরোপের স্বার্থ অনেকটাই পরস্পর সম্পূরক।
তিনি আরো বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের খনিজসম্পদ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও বাজার প্রয়োজন। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের আরো নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় উৎস নিশ্চিত করতে চাইছে।’
তবে গ্রিনল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে কাজে লাগানো প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
৬০টির বেশি কোম্পানির হাতে প্রায় ১৩৫টি খনন অনুমতিপত্র থাকলেও বর্তমানে মাত্র দু’টি খনি চালু রয়েছে।
ইয়াকবসেন বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির গতি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।’
ব্লুজোঁ-মেরে বলেন, দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ভন ডার লেয়েনের গ্রিনল্যান্ড সফর ইউরোপীয় বিনিয়োগ যে দীর্ঘমেয়াদি, তার একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে।
সফরে ভন ডার লেয়েন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং ডেনমার্কের অপর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ফারো দ্বীপপুঞ্জের সরকার প্রধানের সাথে বৈঠক করবেন।
সূত্র : বাসস
মতামত