ভালোবাসার সম্পর্কে টুকটাক মান-অভিমান স্বাভাবিক হলেও সঙ্গীর ভালোবাসা বা নিজের অনুভূতি নিয়ে অনবরত দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা মানসিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধরনের সংশয় যখন স্থায়ী রূপ নেয় এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক চিন্তাভাবনাকে গ্রাস করে ফেলে, তখন তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকের মতে, এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগেন। মনের ভেতর ‘আমি কি আসলেই তাকে ভালোবাসি?’ বা ‘আমি কি কোনো ভুল সম্পর্কে জড়ালাম?’—এ জাতীয় প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। কোনো উত্তর পাওয়ার পরও নতুন করে সংশয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা মানসিক চিন্তার নেতিবাচক চক্রে রূপ নেয়। এ অবস্থায় অনেকেই সঙ্গীর সান্নিধ্যে রোমাঞ্চ কাজ করছে কি না মেপে দেখেন, পুরোনো ছবি দেখে প্রেমের গভীরতা যাচাই করেন কিংবা অন্যদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের অবাস্তব তুলনা করেন। এতে নিশ্চিন্ত হওয়ার বদলে সন্দেহের পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া সঙ্গীর সামান্য নীরবতা, খুদে বার্তার দেরিতে উত্তর দেওয়া বা প্রশংসায় ঘাটতি দেখলেই অনেকে ধরে নেন ভালোবাসা কমে গেছে। মনের অস্বস্তি কাটাতে অনেকে সঙ্গীর কাছ থেকে বারবার নিশ্চয়তা চান বা বন্ধুদের কাছে মতামত খোঁজেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে এটি কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্কের সাবলীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যান্য যুগলদের আনন্দঘন মুহূর্তের প্রদর্শনী দেখে বাস্তব সম্পর্কের তুলনা করাও এই অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে ডা. সানজিদা শাহরিয়া স্পষ্ট করেছেন যে সব দ্বিধাই কাল্পনিক নয়। সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতারণা, নিয়মিত মিথ্যাচার, অসম্মান বা দায়িত্বহীনতার মতো সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে সেটি যৌক্তিক সমস্যা। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়া কেবল কাল্পনিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সারাক্ষণ সম্পর্কের স্থায়িত্ব যাচাই করার প্রবণতা মানসিক সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
এই নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটিক পরামর্শ দিয়েছেন:
তাৎক্ষণিক মীমাংসা বন্ধ করা: সন্দেহ মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সেটির সমাধান বা উত্তর খোঁজার তাগিদ বন্ধ করতে হবে।
বাস্তবতার বোধ জাগ্রত করা: অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো চিন্তা মাথায় আসা মানেই তা বাস্তব সত্য নয়—এই বোধ তৈরি করা জরুরি।
তুলনা ও নিশ্চয়তা চাওয়া থেকে বিরত থাকা: বারবার নিশ্চয়তা চাওয়া, অনুভূতি পরীক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে তুলনা করা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে হবে।
পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ: সমস্যাটি দৈনন্দিন কাজ ও সম্পর্কের স্বাভাবিকতায় তীব্র ব্যাঘাত ঘটালে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি শতভাগ নিশ্চিত কোনো গাণিতিক সূত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং কিছুটা অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে পরস্পরের পাশে থাকার মধ্যেই সম্পর্কের মূল সৌন্দর্য নিহিত থাকে।
মতামত