রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

চিরিরবন্দরে বিনা-১৭ জাতের ধানে বাম্পার ফলন, একই জমিতে চার ফসলের স্বপ্ন



চিরিরবন্দরে বিনা-১৭ জাতের ধানে বাম্পার ফলন, একই জমিতে চার ফসলের স্বপ্ন

সোনালি ধানে ভরে উঠেছে মাঠ। কোথাও পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও চলছে ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র হারভেস্টারের কর্মযজ্ঞ। যন্ত্রের সাহায্যে জমি থেকেই ধান কেটে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এরপর সেই ধান সরাসরি চলে যাচ্ছে কৃষকের নিজস্ব মিল-চাতালে। ধান কাটা শেষ হলেই একই জমিতে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি। এতে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি একই জমিতে বছরে চারটি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকেরা।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের আউলিয়াপুর ইউনিয়নের গার্মেন্টস বাজারসংলগ্ন এলাকায় বিনা-১৭ জাতের আগাম ধান চাষ করে এমন সাফল্য পেয়েছেন কৃষক আব্দুল খালেক। চলতি মৌসুমে প্রায় দুই একর জমিতে এ জাতের ধানসহ অন্যান্য জাতের ধান আবাদ করেছেন তিনি। এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধান পাকায় ইতিমধ্যে শুরু করেছেন হার্ভেস্টিং মেশিন দিয়ে ধান কাটা। তাঁর দাবি, প্রতি একর জমিতে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। ধান কাটার পরপরই জমিতে আগাম আলু চাষ করবেন তিনি।

কৃষক আব্দুল খালেক জানান, জমি থেকেই হারভেস্টার দিয়ে ধান কেটে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। বর্তমানে কাঁচা ধান প্রতি মণ এক হাজার থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। সে হিসাবে প্রতি বস্তা ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২২০০ টাকায়। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।

আব্দুল খালেক বলেন, “জুলাই মাসের প্রথম দিকে বিনা-১৭ জাতের ধান রোপণ করি। এরপর জমিতে সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করেছি। মাত্র ১১৫ দিনের মধ্যেই ধান কাটতে পারছি। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। রোগবালাই ও চিটা তেমন দেখা যায়নি। হারভেস্টার দিয়ে জমি থেকেই ধান কেটে নিতে পারায় শ্রমিকের প্রয়োজন ও সময়—দুটিই কম লাগছে।

তিনি আরও বলেন, “ধান কাটার পরই আগাম আলু চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছি। এবার ধান চাষের খরচ মেটাতে পারছি। আগামী মৌসুমেও বিনা-১৭ জাতের ধান আবাদ করতে চাই।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা ধানের সোনালি শিষে ভরে উঠেছে খেত। হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার পর খড় জমিতেই পড়ে থাকছে। অন্যদিকে, কাটা ধান বস্তাবন্দী করে রাস্তার পাশে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধান নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কৃষকের নিজস্ব মিল-চাতালে। দ্রুত ধান কেটে জমি খালি করতে পারায় পরবর্তী ফসল আবাদেও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। 

খালেকের পাশের জমির কৃষক সবুজ রানা বলেন, “আমাদের জমিতে এখনো ধানের শিষ বের হচ্ছে। অথচ পাশের জমিতে আব্দুল খালেক চাচার ধান কাটা হয়ে গেছে। তাঁর জমিতে ফলনও ভালো হয়েছে। এভাবে আগাম জাতের ধান চাষ করতে পারলে একই জমিতে পরবর্তী ফসলের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। আমরা তাঁর ফলন দেখে আগামীতে বিনা-১৭ জাতের ধান চাষে আগ্রহী হয়েছি।

আরেক প্রতিবেশী কৃষক বেলাল উদ্দিন বলেন, “আব্দুল খালেকের জমিতে ধানের ফলন দেখে ভালো লাগছে। ১১৫ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ধান ঘরে তুলতে পারলে একই জমিতে আগাম আলু চাষ করা সম্ভব। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। আধুনিক কৃষির জন্য এটি আশাব্যঞ্জক।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রহমতুল্লাহ বলেন, আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ব্লকে বিনা-১৭, বিআর-৭৫, বিআর-৯০ ও শতাব্দী জাতের আগাম ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধানের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেশি। এ জাতের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন এলাকায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে আগাম জাতের ধান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। এখন অনেক কৃষক নিজেরাই এসব জাতের ধান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। বাজারেও এ ধানের চাহিদা রয়েছে। চালের ভাত সুস্বাদু হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৭০০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান চাষ হয়েছে। এরই মধ্যে কৃষকেরা পাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন। প্রতি একর জমিতে প্রায় ৫৫ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগাম জাতের ধান চাষে তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির পানির সহায়তায় ধান আবাদ করা গেলে সেচের খরচও কমতে পারে। আগাম ধান বিক্রি করে কৃষকেরা পরবর্তী ফসলের বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার অর্থ জোগাড় করতে পারছেন। বিশেষ করে বিনা-১৭ জাতের ধানের ফলন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কৃষকদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের আধুনিক ও লাভজনক কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলা ও জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চাষাবাদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬


চিরিরবন্দরে বিনা-১৭ জাতের ধানে বাম্পার ফলন, একই জমিতে চার ফসলের স্বপ্ন

প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সোনালি ধানে ভরে উঠেছে মাঠ। কোথাও পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও চলছে ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র হারভেস্টারের কর্মযজ্ঞ। যন্ত্রের সাহায্যে জমি থেকেই ধান কেটে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এরপর সেই ধান সরাসরি চলে যাচ্ছে কৃষকের নিজস্ব মিল-চাতালে। ধান কাটা শেষ হলেই একই জমিতে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি। এতে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি একই জমিতে বছরে চারটি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকেরা।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের আউলিয়াপুর ইউনিয়নের গার্মেন্টস বাজারসংলগ্ন এলাকায় বিনা-১৭ জাতের আগাম ধান চাষ করে এমন সাফল্য পেয়েছেন কৃষক আব্দুল খালেক। চলতি মৌসুমে প্রায় দুই একর জমিতে এ জাতের ধানসহ অন্যান্য জাতের ধান আবাদ করেছেন তিনি। এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধান পাকায় ইতিমধ্যে শুরু করেছেন হার্ভেস্টিং মেশিন দিয়ে ধান কাটা। তাঁর দাবি, প্রতি একর জমিতে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। ধান কাটার পরপরই জমিতে আগাম আলু চাষ করবেন তিনি।

কৃষক আব্দুল খালেক জানান, জমি থেকেই হারভেস্টার দিয়ে ধান কেটে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। বর্তমানে কাঁচা ধান প্রতি মণ এক হাজার থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। সে হিসাবে প্রতি বস্তা ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২২০০ টাকায়। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।

আব্দুল খালেক বলেন, “জুলাই মাসের প্রথম দিকে বিনা-১৭ জাতের ধান রোপণ করি। এরপর জমিতে সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করেছি। মাত্র ১১৫ দিনের মধ্যেই ধান কাটতে পারছি। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। রোগবালাই ও চিটা তেমন দেখা যায়নি। হারভেস্টার দিয়ে জমি থেকেই ধান কেটে নিতে পারায় শ্রমিকের প্রয়োজন ও সময়—দুটিই কম লাগছে।

তিনি আরও বলেন, “ধান কাটার পরই আগাম আলু চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছি। এবার ধান চাষের খরচ মেটাতে পারছি। আগামী মৌসুমেও বিনা-১৭ জাতের ধান আবাদ করতে চাই।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা ধানের সোনালি শিষে ভরে উঠেছে খেত। হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার পর খড় জমিতেই পড়ে থাকছে। অন্যদিকে, কাটা ধান বস্তাবন্দী করে রাস্তার পাশে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধান নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কৃষকের নিজস্ব মিল-চাতালে। দ্রুত ধান কেটে জমি খালি করতে পারায় পরবর্তী ফসল আবাদেও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। 

খালেকের পাশের জমির কৃষক সবুজ রানা বলেন, “আমাদের জমিতে এখনো ধানের শিষ বের হচ্ছে। অথচ পাশের জমিতে আব্দুল খালেক চাচার ধান কাটা হয়ে গেছে। তাঁর জমিতে ফলনও ভালো হয়েছে। এভাবে আগাম জাতের ধান চাষ করতে পারলে একই জমিতে পরবর্তী ফসলের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। আমরা তাঁর ফলন দেখে আগামীতে বিনা-১৭ জাতের ধান চাষে আগ্রহী হয়েছি।

আরেক প্রতিবেশী কৃষক বেলাল উদ্দিন বলেন, “আব্দুল খালেকের জমিতে ধানের ফলন দেখে ভালো লাগছে। ১১৫ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ধান ঘরে তুলতে পারলে একই জমিতে আগাম আলু চাষ করা সম্ভব। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। আধুনিক কৃষির জন্য এটি আশাব্যঞ্জক।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রহমতুল্লাহ বলেন, আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ব্লকে বিনা-১৭, বিআর-৭৫, বিআর-৯০ ও শতাব্দী জাতের আগাম ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধানের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেশি। এ জাতের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন এলাকায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে আগাম জাতের ধান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। এখন অনেক কৃষক নিজেরাই এসব জাতের ধান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। বাজারেও এ ধানের চাহিদা রয়েছে। চালের ভাত সুস্বাদু হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৭০০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান চাষ হয়েছে। এরই মধ্যে কৃষকেরা পাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন। প্রতি একর জমিতে প্রায় ৫৫ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগাম জাতের ধান চাষে তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির পানির সহায়তায় ধান আবাদ করা গেলে সেচের খরচও কমতে পারে। আগাম ধান বিক্রি করে কৃষকেরা পরবর্তী ফসলের বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার অর্থ জোগাড় করতে পারছেন। বিশেষ করে বিনা-১৭ জাতের ধানের ফলন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কৃষকদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের আধুনিক ও লাভজনক কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলা ও জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চাষাবাদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন।



Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream