বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং পরিবহণ ও আমদানি ব্যয় বাড়ার বিষয়গুলো বাস্তবতা বলে মনে করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। তবে এসব চাপ একবারে জনগণের ওপর না দিয়ে ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব ছিল বলে দাবি করেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। ‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, সেচ এবং গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এর প্রভাব বিভিন্ন খাতে পড়বে। এতে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ ভোক্তারা বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে সেই ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর দেওয়ার কোনো বাধ্যতামূলক নীতি নেই। এবি পার্টি বড় ধরনের ‘প্রাইস শক’-এর পরিবর্তে ধাপে ধাপে ‘প্রাইস এডজাস্টমেন্ট’-এর পক্ষে।
দলের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনার খরচ বাড়বে। এর প্রভাব কৃষিপণ্য উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানোয় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবি পার্টির ছায়া সরকারবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
তিনি বলেন, সরকার জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এই আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহণ, বিমা, বিনিময় হার, কর, হ্যান্ডলিং ও বিতরণ ব্যয়সহ বিপিসির প্রকৃত ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
আব্বাস ইসলাম খান নোমান আরও বলেন, সংকটের সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়ের পাশাপাশি বিপিসির কার্যকারিতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং জ্বালানি চুরি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ সময় সরকারের কাছে ১১ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে এবি পার্টি। এর মধ্যে কৃষি, সেচ, গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক মূল্যনীতি প্রণয়ন এবং বড় ধরনের এককালীন মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে দাম সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও করের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বচ্ছ ও সূত্রভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু, দাম কমলে তার সুফল জনগণকে দেওয়া, সংকটকালে আমদানি শুল্ক ও কর সমন্বয় এবং প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ডিজেল সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
পরিবহণ খাতে জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ভাড়া সমন্বয় ব্যবস্থা এবং বিপিসির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহণ, বিতরণ, ক্রয়, ব্যবস্থাগত ক্ষতি ও জ্বালানি চুরির বিষয়ে স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষার দাবিও জানানো হয়।
সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার বন্ধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু, চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি জরুরি তহবিল গঠন এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কথাও বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে এবি পার্টি।
আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, কৃষি উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে জ্বালানি নীতি তৈরি করা প্রয়োজন। তার দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেও জনগণের ওপর এককালীন বড় মূল্যবৃদ্ধির চাপ এড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব বাড়াতে কর ফাঁকি বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধের দিকে নজর দেওয়া দরকার। জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে ‘প্রগ্রেসিভ রেভিনিউ মবিলাইজেশন’-এর মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
মতামত