দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর আবারও উৎপাদনে ফিরতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ছাতক বাজার কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সপ্তাহে সরকারি এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নতুন করে কংক্রিট স্লিপার উৎপাদন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদন পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্লান্টের বিভিন্ন মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উৎপাদন শুরুর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মো. কবির হোসেন, প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন, ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট।
দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্লান্টের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবারও অকেজো হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেগুলো সচল করার পাশাপাশি উৎপাদন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের ছাতক বাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ের কংক্রিট স্লিপার প্লান্টটি দেশের সরকারি মালিকানাধীন গুরুত্বপূর্ণ স্লিপার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সরকারি তথ্য সরজমিনে গিয়ে জানাযায়, ১৯৮৮ সালের ২৭ অক্টোবর রেলওয়ের মালিকানায় প্লান্টটি স্থাপন করা হয়। কাঠের স্লিপারের পরিবর্তে অধিক স্থায়িত্বসম্পন্ন কংক্রিট স্লিপার উৎপাদনের লক্ষ্যেই এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ছাতক উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্লান্টটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৭৫ হাজার পিস পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
প্লান্টটির প্রাথমিক দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৬৪টি স্লিপার। দীর্ঘদিন উৎপাদন করলেও পরবর্তী সময়ে নানা সংকটে এর কার্যক্রম অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
প্লান্ট সংশ্লিষ্টদের মতে, জনবল সংকট, কাঁচামাল সরবরাহে সমস্যা, যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ থাকার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালেও কয়েক দফায় উৎপাদন চালু ও বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই বছর
"বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন "ঠিকাদারের সহযোগিতায় প্লান্টটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল বলে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্ত্বে জানাযায়। কর্মকর্তারা তখন স্থায়ী জনবল না থাকায় ঠিকাদারের সহযোগিতা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট পরিদর্শন করেন। ওই সময় কয়েকটি স্লিপার উৎপাদনের মধ্য দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
মোঃ কবির হোসেন,প্রজেক্ট ইন্জিনিয়ার
বলেন ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্লান্টের মেশিনারিজ পানিতে তলিয়ে গিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় মেশিনারিজ মেরামত করে উৎপাদন চালুর চেষ্টা করা হলেও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ বিরতির কারণে আবারও যন্ত্রপাতি সচল রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।
এদিকে প্লান্টটির অন্যতম বড় সমস্যা জনবল সংকট। ওয়েল্ডার, লাইনম্যান, ল্যাব সহকারী, চালক, টুলকিপার, ট্রাভার্সার অপারেটর, কাস্টিং মেশিন অপারেটর, মেকানিক, কংক্রিট মিক্সার অপারেটর, ডিমোল্ডিং অপারেটর, সহকারী ক্রাশার অপারেটর, ল্যাব হেলপার, ওয়েল্ডার হেলপার, টেনশনিং হেলপার, নিরাপত্তাকর্মী, খালাসি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।সর জমিনে গিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে কথা বলে জানা যায় ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও এসব পদে জনবল সংকটের কথা উঠে আসে।
জনবল সংকটের কারণে প্লান্ট পরিচালনায় বিভিন্ন সময়ে বাইরের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে বলে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আগামী সপ্তাহে উৎপাদন শুরু হলে এবার যেন তা সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থাকে। দীর্ঘমেয়াদে প্লান্টটি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, মেশিনারিজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, সরকারি এ প্লান্ট নিয়মিত উৎপাদনে রাখা গেলে সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেলওয়ের কংক্রিট স্লিপারের চাহিদা পূরণে নিজস্ব সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এবারকার উদ্যোগ শুধু উৎপাদন পুনরায় শুরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রয়োজনীয় জনবল, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্টকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত উৎপাদনের আওতায় আনা হবে।
মতামত