শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| ফটো কার্ড

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন
ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ভাগের প্রায় সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর প্রথম এবং একমাত্র সফর। শারীরিকভাবে অসুস্থ জিন্নাহর জীবনে সফরটি ছিল শেষ দিকের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি। ঢাকায় আসার প্রায় ছয় মাস পরই তিনি মারা যান।

প্রায় ১০ দিনের সফরে জিন্নাহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং একাধিক বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। বিশেষ করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে তাঁর অবস্থান তৎকালীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ শুরুতেই বলেন, আনুষ্ঠানিক সমাবর্তন বক্তৃতা প্রস্তুত করার মতো পর্যাপ্ত সময় তাঁর ছিল না। তাই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি নিজের কিছু কথা তুলে ধরছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের সামনে থাকা দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

জিন্নাহর বক্তব্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পটভূমি, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র গঠনের কাজ আরও কঠিন। তাই তরুণদের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তৃতার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি ‘প্রাদেশিকতাবাদ’ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করেন। ভাষা নিয়ে চলমান বিতর্ককেও তিনি সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহ স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের প্রাদেশিক ও সরকারি ব্যবহারের ভাষা নির্ধারণ করতে পারে। তবে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য একটি অভিন্ন ভাষা প্রয়োজন এবং সেই ভাষা হিসেবে তিনি উর্দুর পক্ষে মত দেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঐক্যের স্বার্থে একটিই রাষ্ট্রভাষা থাকা উচিত এবং সেটি হবে উর্দু।

বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন। ভাষা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দাবিগুলোকে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা করেন।

তরুণদের রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতিয়ার না হওয়ার আহ্বান জানান জিন্নাহ। পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়ে নিজেদের দেশের সম্পদ ও শক্তিতে পরিণত করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সততা ও জনকল্যাণে কাজ করা সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করার কথাও বলেন।

মুসলিম লীগের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন জিন্নাহ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় দলটির অবদানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রেও মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে বলেন।

বক্তৃতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তরুণদের কর্মজীবন নিয়ে। শুধু সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে ব্যবসা, ব্যাংকিং, বাণিজ্য, আইন, শিল্প ও কারিগরি শিক্ষার দিকে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণকে সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি ও উৎপাদনমুখী খাতে কাজ করার সুযোগ খুঁজতে হবে।

কায়িক শ্রমকে ছোট করে না দেখার পরামর্শও দেন জিন্নাহ। তাঁর মতে, কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নতুন পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নতুন শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় তরুণদের জন্য এসব ক্ষেত্রে কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নিজের বক্তব্যের উদাহরণ হিসেবে এক তরুণের কর্মজীবনের কথাও তুলে ধরেন জিন্নাহ। সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া ওই ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যে উচ্চতর পদে উন্নীত হয়ে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে তরুণদের সরকারি চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা।

শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জিন্নাহ। পূর্ব বাংলার তরুণদের ওপর নিজের আস্থা প্রকাশ করে তাদের ভবিষ্যৎ পাকিস্তান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন

প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ভাগের প্রায় সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর প্রথম এবং একমাত্র সফর। শারীরিকভাবে অসুস্থ জিন্নাহর জীবনে সফরটি ছিল শেষ দিকের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি। ঢাকায় আসার প্রায় ছয় মাস পরই তিনি মারা যান।

প্রায় ১০ দিনের সফরে জিন্নাহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং একাধিক বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। বিশেষ করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে তাঁর অবস্থান তৎকালীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ শুরুতেই বলেন, আনুষ্ঠানিক সমাবর্তন বক্তৃতা প্রস্তুত করার মতো পর্যাপ্ত সময় তাঁর ছিল না। তাই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি নিজের কিছু কথা তুলে ধরছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের সামনে থাকা দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

জিন্নাহর বক্তব্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পটভূমি, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র গঠনের কাজ আরও কঠিন। তাই তরুণদের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তৃতার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি ‘প্রাদেশিকতাবাদ’ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করেন। ভাষা নিয়ে চলমান বিতর্ককেও তিনি সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহ স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের প্রাদেশিক ও সরকারি ব্যবহারের ভাষা নির্ধারণ করতে পারে। তবে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য একটি অভিন্ন ভাষা প্রয়োজন এবং সেই ভাষা হিসেবে তিনি উর্দুর পক্ষে মত দেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঐক্যের স্বার্থে একটিই রাষ্ট্রভাষা থাকা উচিত এবং সেটি হবে উর্দু।

বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন। ভাষা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দাবিগুলোকে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা করেন।

তরুণদের রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতিয়ার না হওয়ার আহ্বান জানান জিন্নাহ। পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়ে নিজেদের দেশের সম্পদ ও শক্তিতে পরিণত করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সততা ও জনকল্যাণে কাজ করা সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করার কথাও বলেন।

মুসলিম লীগের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন জিন্নাহ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় দলটির অবদানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রেও মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে বলেন।

বক্তৃতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তরুণদের কর্মজীবন নিয়ে। শুধু সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে ব্যবসা, ব্যাংকিং, বাণিজ্য, আইন, শিল্প ও কারিগরি শিক্ষার দিকে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণকে সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি ও উৎপাদনমুখী খাতে কাজ করার সুযোগ খুঁজতে হবে।

কায়িক শ্রমকে ছোট করে না দেখার পরামর্শও দেন জিন্নাহ। তাঁর মতে, কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নতুন পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নতুন শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় তরুণদের জন্য এসব ক্ষেত্রে কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নিজের বক্তব্যের উদাহরণ হিসেবে এক তরুণের কর্মজীবনের কথাও তুলে ধরেন জিন্নাহ। সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া ওই ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যে উচ্চতর পদে উন্নীত হয়ে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে তরুণদের সরকারি চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা।

শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জিন্নাহ। পূর্ব বাংলার তরুণদের ওপর নিজের আস্থা প্রকাশ করে তাদের ভবিষ্যৎ পাকিস্তান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream