প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত চিলাহাটি আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন এখন অবহেলিত ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সীমান্ত ঘোষা নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটি এলাকায় অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এই ভবনটি দূর থেকে দেখলে নজর কাড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল যে উদ্দেশ্যে সেটি বন্ধ রয়েছে ।
বর্তমানে ভবনটির ভিতরের আসবাবপত্রগুলো অব্যবস্থাপনা অবস্থায় ধুলোবালিতে জরাজীর্ণ নোংরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্টেশনের ভবনের আশপাশে বেশ কিছু বিল্ডিং যেগুলো নির্মিত হয়েছিল চিলাহাটি স্থলবন্দরের বিভিন্ন কাজ পরিচালনার জন্য । এর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভিআইপি রেস্ট হাউজ ।
ভবনের দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য রাখা ঘরগুলো খালি পড়ে আছে। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জায়গাটি ফাঁকা। বহুমুখী এই স্টেশন ভবনের পাশে দোতলা ভিআইপি অতিথিশালাটিও তালাবদ্ধ। বেকার পড়ে আছে ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম। সীমান্ত পর্যন্ত টানা রেললাইনে মরিচা পড়েছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব নির্মাণ করা হয়েছিল উত্তরের জেলা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি স্থলবন্দরের জন্য। সেসময় স্থলবন্দরটি দিয়ে ভারতের সঙ্গে রেলপথে পণ্য ও যাত্রী চলাচল শুরুও হয়েছিল, যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করলেও চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠা নামার সুযোগ মেলেনি, খুব দ্রুতই এই রেলওয়ে স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামার কথা ছিল । তবে ২০২৪ সালের কোন অভ্যুত্থানের পর তা থেমে যায়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক অবকাঠামো না থাকার যুক্তিতে প্রজ্ঞাপন দিয়ে চিলাহাটি স্থলবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। সুতরাং ভবন, রেলপথ সবই বেকার খরচের খাতায় চলে গেছে। থমকে গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ-আয়োজন আর আশা।
২০১৩ সালে চিলাহাটিকে স্থল বন্দর হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চিলাহাটি স্টেশন দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনটিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকে আর আয়ের মুখ দেখেনি স্টেশনটি। তিনি আরও বলেন, পূর্ণরায় যদি এই স্টেশন দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া শুরু করার পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামা বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যেমন রাজস্ব আদায় বাড়বে তেমনি যাত্রী ওঠানামার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রী এসে যখন চিলাহাটি স্টেশন থেকে ওঠানামা করবে তখন সেখান থেকেও সরকার ব্যাপক রাজস্ব আয় করতে পারবে।
এছাড়াও চিলাহাটি স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে যেসব আনুষঙ্গিক অবকাঠামো প্রয়োজন যেমন, ভিআইপি রেস্ট হাউস, ব্যাংক, যাত্রী চেকিং করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি এখানে রয়েছে। তিনি বলেন, এখানে আরএমবি, জিআরপি এবং কাস্টমস কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অফিস থাকার জায়গারও সুব্যবস্থা রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা যাত্রী ওঠানামা ও পণ্য আনা নেওয়াসহ খালাসের ক্ষেত্রেও আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছি। মূলত সব ধরনের অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে রয়েছে।
চিলাহাটির স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে শ্রমিক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আনাগোনা ছিল এই স্থলবন্দরকে ঘিরে। সেসময় আশপাশের জমির দামও বেড়ে গিয়েছিল। বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে অনেকে বিনিয়োগেরও পরিকল্পনা করেছিলেন।
এবিষয়ে চিলাহাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুল হক ওহাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক কাজল জানায়, বন্দরটি দিয়ে পণ্য আনা নেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এখানকার পরিবেশটাই চেঞ্জ হয়ে গেছে। অনেক দরিদ্র মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর থেকে সেই মানুষ গুলো কাজকর্ম হারিয়ে বেকারত্বের অভিসাপে ভুকছে।তারা আরও জানায়, স্থলবন্দরটি দ্রুত চালু হলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে। এছাড়াও বর্তমানে স্টেশনের আয় কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। শত কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো তৈরির পর স্থলবন্দরটির পাশাপাশি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ লোকসান গুনছেন।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই দেশের মধ্যে পণ্য সেবা চালুর পর পাথরের এক একটি চালানে ভাড়া বাবদ রেল কর্তৃপক্ষ ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পেত। এবং মাস শেষে সেটা দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। স্টেশনের আয়-ব্যয়ের খাতা বলছে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে স্টেশনের আয় হয়েছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এছাড়াও স্টেশনটিতে দুজন স্টেশন মাস্টারসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এখন তাঁদের কাজও কমে গেছে। বর্তমানে কেবল অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ট্রেনই চলছে।
চিলাহাটির স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এ বন্দরটির কার্যক্রম পূর্ণরায় চালু হলে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুবিধা হতো। বর্তমানে স্থলবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাঁরা বিপাকে পড়েছেন।
নীলফামারী চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহাবুব-উর রহমান জানায়, চিলাহাটি স্থলবন্দর নিয়ে আমরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা চালু করার জন্য যেখানে যেখানে কথা বলা দরকার আমরা সেই যোগাযোগ অব্যহত রেখেছি। পাশাপাশি এখানে রেলপথটি যেহেতু আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সম্পৃক্ত এবং বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক নাজুক, তারপরও আমরা চিলাহাটি স্থলবন্দর ও রেলপথ চালুর বিষয়ে আমাদের চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব স্থলবন্দর ও রেলপথ চালুর বিষয়ে আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বলে তিনি জানান।
এবিষয়ে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের বরাতে জানা যায় চিলাহাটি স্থলবন্দরটি আপাতত চালু হচ্ছে না। তবে চালু করতে হলে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
মতামত