সালটা সম্ভবত ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র এক-দুই বছর। অভাবের সংসারে তখন বয়স মাত্র ১৩-১৪ বছর। বাবার সামান্য জমি বিক্রি করে পাওয়া এক হাজার টাকা নিয়ে ছোট্ট একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন শফিক মিয়া। চা আর খাস্তা-গোলগোল্লা দিয়ে শুরু হওয়া সেই পথচলার প্রায় ৫২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো টিকে আছে তার মাটির ঘরের ছোট্ট দোকান-‘শফিক স্টোর’।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর মোড়সংলগ্ন মসজিদ সড়ক ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে আধুনিকতার চাকচিক্যের মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো মাটির ঘরটি। প্রায় ৫২ বছরের পুরোনো এই দোকানের নাম ‘শফিক স্টোর’। মাটির দেয়াল, চুলা থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া আর দোকানের ভেতরে বসে থাকা সত্তর ছুঁই ছুঁই এক প্রবীণের হাসিমুখ-সব মিলিয়ে জায়গাটিতে রয়েছে অন্যরকম এক প্রশান্তি। তিনিই শফিক মিয়া।
স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘শফিক কাকা’ নামেই বেশি পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেউ তাকে ‘কাকা’, আবার কেউ ‘মামা’ বলে ডাকেন। আপন করে ডাকা এসব শিক্ষার্থীর প্রতি শফিক মিয়ার স্নেহও কম নয়। কোনো শিক্ষার্থী দোকানে এলেই হাসিমুখে বলেন, ‘বসেন আব্বা, কী দিমু? যতটুকু খাইতে পারেন, খান আব্বা।’
চারপাশে আধুনিকতা আর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রতিযোগিতায় যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস, তখন স্বল্প আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমী এক ব্যবস্থা চালু রেখেছেন শফিক মিয়া। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে তিনি চালু রেখেছেন ৬০ টাকার ‘পেট চুক্তি’ প্যাকেজ। মাত্র এক বছরে এ প্যাকেজের দাম বেড়েছে ১০ টাকা।
সামান্য এই টাকায় শিক্ষার্থীরা ভাতের সাথে মাছ, মুরগি কিংবা সবজি পান। কোনো কোনো দিন মেন্যুতে থাকে হাঁস বা গরুর মাংসও। শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের এই ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে শফিক মিয়া বলেন, রিজিকের মালিক ওপরওয়ালা। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলে তিনি ফিরিয়ে দেন না। মানুষের উপকার করলে আল্লাহ তার প্রতিদান দেন। সামর্থ্য থাকলে শিক্ষার্থীদের আমি বিনা পয়সায় খাওয়াতাম। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব, আমি চেষ্টা করি।
জীবনের দীর্ঘ এই পথচলায় মাটির ঘরের দোকানটিই ছিল শফিক মিয়ার পরিবারের প্রধান ভরসা। এই দোকানকে ঘিরেই তিনি সন্তানদের বড় করেছেন, গড়ে তুলেছেন তাদের ভবিষ্যৎ। তার এক ছেলে বর্তমানে শালবন জাদুঘরে কর্মরত। আর মেয়ে পড়াশোনা করছেন একটি টেকনিক্যাল কলেজে। সন্তানদের প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে দেখাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা মনে করেন শফিক কাকা।
এক হাজার টাকা নিয়ে শুরু করা সেই কিশোরের সংগ্রামের গল্প আজও তাই টিকে আছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ছোট্ট সেই মাটির ঘরে-চুলার ধোঁয়া, সাদামাটা খাবার আর শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত মমতা নিয়ে। সন্তানদের প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে দেখাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা মনে করেন শফিক কাকা।
এক হাজার টাকা নিয়ে শুরু করা সেই কিশোরের সংগ্রামের গল্প আজও তাই টিকে আছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ছোট্ট সেই মাটির ঘরে-চুলার ধোঁয়া, সাদামাটা খাবার আর শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত ম
মতা নিয়ে।
মতামত